একটি খোলা দরজা দিয়ে একসাথে বহু লোক
বেরোতে চাইলে প্রকৃতপক্ষে কেউই বেরোতে পারে না। আমাদের মনের দরজাও তেমনই। একসাথে বহু
কথা, বহু ভাব এসে জমাট বাঁধলে কিছুই যেন প্রকাশ করা যায় না। কোথা থেকে শুরু, কোথায়
শেষ - তার হদিশ খুঁজে হয়রান হতে হয় আকছার।
কবি রত্নদীপ দেব-এর সদ্য প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘আমার হিরোশিমা’র আলোচনা এমনই এক দুরূহ কাজ। এ গ্রন্থের শুরু কিংবা শেষ বলে কিছু থাকতে পারে না। শুধু গ্রন্থনাম নিয়ে লিখতে গেলেই হয়তো লেখা হয়ে যাবে কয়েকটি পৃষ্ঠা। কারণ গ্রন্থনামের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে একাধিক ব্যঞ্জনা।
হিরোশিমা - পৃথিবীর বুকে ঘটে যাওয়া ঘটনার নিদারুণতম উদাহরণ। অভাবিত ক্ষণে এক পলকে এক পরমাণু বোমার আঘাতে একটি জনপদ, একটি শহরের এক অসহায় ধ্বংসময় আখ্যানের নাম হিরোশিমা। পাশাপাশি এক পুনর্জন্ম, এক পুনর্নির্মাণের গাথাও হিরোশিমা।
সব মিলিয়ে ৬৪ পৃষ্ঠার চার বাই আট ইঞ্চির পুচকে আকারের কাব্যগ্রন্থটি তেমনই যেন এক অমেয় শক্তি ভাণ্ডার যার ভেতর রয়েছে উপন্যাসের মতো একের পর ধারাবাহিক দুর্ঘনার শক্তিশালী কাব্যরূপ। কবির মননে হিরোশিমা ধ্বংসের মতোই এক দুর্ঘটনা তাঁর মাতৃবিয়োগ। উপন্যাসের ঘটনাবলি যেন হিরোশিমার পতন ও তৎপরবর্তী পুনর্নির্মাণের এক ধারাবাহিক প্রকাশ যার মধ্যে রয়েছে মৃত্যু, চিতা, শ্মশানের নিঃসঙ্গতা, অশৌচ যাপন, পারলৈকিক ক্রিয়াকর্ম, প্রক্ষেপিত শূন্যতা, স্মৃতিচারণ ও স্বপ্নময় মাতৃযাপন। সব মিলিয়ে গ্রন্থের এই ভিতরগত উপন্যাসের শিরোনাম তাই আসলে এক ‘মাতৃহারার ডায়েরি’।
সুচয়িত ভাষার যথার্থ প্রয়োগে, সংক্ষিপ্ত গদ্যে ‘নেপথ্য বয়ান’ শিরোনামে নিজের কথা লিপিবদ্ধ করেছেন কবি গ্রন্থের শ্রীগণেশ-এ, যেখানে তিনি লিখছেন - ‘... হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পরপারে পাড়ি দিলেন মা। হঠাৎ তছনছ হয়ে গেল সব। স্তব্ধ হয়ে গেল জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। গ্রাস করল অসীম শূন্যতা, তৈরি হল গাঢ় ক্ষত। ... মৃত্যুদিন থেকে শুরু করে অশৌচ যাপন এবং পরবর্তী টানা দেড়-দু’মাস নানা মুহূর্তে হৃদয়ের রক্তক্ষরণে উঠে এসেছে অসংখ্য পঙ্ক্তি। বলা যায়, ওই সময়ের যাবতীয় ব্যথা-বিষাদ-শোক আর অন্তর্গত রক্তপাতেই তৈরি ‘আমার হিরোশিমা’ কবিতাগ্রন্থ। জানি, এই ব্যথা-উচ্চারণ নৈর্ব্যক্তিক নয়। তবু, এই শোকলিপি নিয়েই দু’মলাটে তৈরি ‘আমার হিরোশিমা’......।’ আসলে ব্যক্তিগত ব্যথা-উচ্চারণ তখনই নৈর্ব্যক্তিক হয়ে ওঠে যখন উচ্চারণ সৌকর্যে তা পৌঁছে যায় সহস্র হৃদয়ে। তাই কবির এই উচ্চারণ এখানে নৈর্ব্যক্তিকই হয়ে উঠেছে।
কবি, গদ্যকার রূপরাজ ভট্টাচার্য অপরূপ বিশ্লেষণে বিভূষিত করেছেন গ্রন্থটি ‘তবুও কিছু কথা তো থেকে যায়...’ শীর্ষক ভূমিকায়। বিশেষিত করেছেন উপন্যাসোপম এই ‘অনন্তের বার্তা’।
স্বল্প কথায় এক একটি শিরোনামহীন কবিতায় গড়ে উঠেছে গ্রন্থের ভিত। অনায়াসে তাই তুলে দেওয়া যায় আস্ত এই প্রথম কবিতাটি -
এরপর হঠাৎ হামলা
বোমারু কে ছিল কে জানে।
ক্ষতবিক্ষত দুই সহোদর
শেকড় শতাব্দ-গাঢ়
মা হেঁটে যাচ্ছেন একা
অনন্তযাত্রায়......
চোখের জল সম্বল করে
নিথর শরীর আঁকড়ে বসে আছি আমরা
হিরোশিমার পতনের পর, ধাপে ধাপে এগিয়েছে দহনকথার বয়ন, কবিতার গ্রন্থনা। ৬ আগস্ট, ১৯৪৫ ও ১৯ জানুয়ারি ২০২৩ - হিরোশিমা কাণ্ড ও মাতৃবিয়োগ সমার্থক হয়ে উঠেছে কবির জীবনে। তারই যাপন ধারায় ভিন্ন ভিন্ন আবহে একের পর এক ব্যথিত হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে নিঃসরিত হয়েছে দুঃখ-ব্যথার ক্ষরণ-পঙ্ক্তি। রচিত হয়েছে ব্যথিত যাপনের উপন্যাস। অনুভব করা যাক কবিতারই পঙ্ক্তি ধরে ধরে -
কাঠের পর কাঠ সাজানো চিতায়
মুখাগ্নি সেরেছি আমার নীলচে আগুনে -
মন্ত্রোচ্চারণে
আকাশে পাড়ি দিয়েছে
শ্মশান-চুল্লির আগুন,
স্বর্গদ্বারে অদ্ভুত গন্ধ রেখে
মা চলে যাচ্ছেন সীমানা ছাড়িয়ে... (কবিতা - ৬)
কবির বয়ানে -
আজন্ম খাটুনির পর
বিবর্ণ শীতে যারা নিঃশব্দে
ঝরা পাতার মতো খসে পড়েন
মা তাদেরই একজন... (কবিতা - ২৮)
কবির শেষ কথা -
কিছু না বলে তোমার পায়ের কাছে
রেখে দিলাম সব কবিতা, মনে হল
আমার সুখ-অসুখের মাঝে
একটা হাইফেন জুড়ে দিয়েছে কেউ... (শেষ কবিতা)।
উপরিউক্ত তিনটি স্তবকেই যেন আঁকা হয়ে যায় দহনকথার এক উপন্যাস। আর এই সূত্র ধরেই ৫২ টি কবিতার গ্রন্থটি কবি উৎসর্গ করেছেন ‘শ্রীচরণেষু মা শান্তা (চৌধুরী) দেবকে’। প্রাসঙ্গিক প্রচ্ছদের সৌজন্যে ড. রাজকুমার মাজিন্দার। বাতায়ন, শিলচরের গোবিন্দ কংস বণিক কর্তৃক প্রকাশিত গ্রন্থটির অলংকরণ, ছাপা ও কাগজের মান, বাঁধাই সব যথাযথ। ‘প্রায়’ একশো শতাংশ শুদ্ধ বানান গ্রন্থের অন্যতম সম্পদ। ফলত বিষয়ে, কাব্যগুণে ও সার্বিক আয়োজনে এক নান্দনিক পঠনবান্ধব গ্রন্থ। এক নৈর্ব্যক্তিক শ্রদ্ধাঞ্জলি।
কবি রত্নদীপ দেব-এর সদ্য প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘আমার হিরোশিমা’র আলোচনা এমনই এক দুরূহ কাজ। এ গ্রন্থের শুরু কিংবা শেষ বলে কিছু থাকতে পারে না। শুধু গ্রন্থনাম নিয়ে লিখতে গেলেই হয়তো লেখা হয়ে যাবে কয়েকটি পৃষ্ঠা। কারণ গ্রন্থনামের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে একাধিক ব্যঞ্জনা।
হিরোশিমা - পৃথিবীর বুকে ঘটে যাওয়া ঘটনার নিদারুণতম উদাহরণ। অভাবিত ক্ষণে এক পলকে এক পরমাণু বোমার আঘাতে একটি জনপদ, একটি শহরের এক অসহায় ধ্বংসময় আখ্যানের নাম হিরোশিমা। পাশাপাশি এক পুনর্জন্ম, এক পুনর্নির্মাণের গাথাও হিরোশিমা।
সব মিলিয়ে ৬৪ পৃষ্ঠার চার বাই আট ইঞ্চির পুচকে আকারের কাব্যগ্রন্থটি তেমনই যেন এক অমেয় শক্তি ভাণ্ডার যার ভেতর রয়েছে উপন্যাসের মতো একের পর ধারাবাহিক দুর্ঘনার শক্তিশালী কাব্যরূপ। কবির মননে হিরোশিমা ধ্বংসের মতোই এক দুর্ঘটনা তাঁর মাতৃবিয়োগ। উপন্যাসের ঘটনাবলি যেন হিরোশিমার পতন ও তৎপরবর্তী পুনর্নির্মাণের এক ধারাবাহিক প্রকাশ যার মধ্যে রয়েছে মৃত্যু, চিতা, শ্মশানের নিঃসঙ্গতা, অশৌচ যাপন, পারলৈকিক ক্রিয়াকর্ম, প্রক্ষেপিত শূন্যতা, স্মৃতিচারণ ও স্বপ্নময় মাতৃযাপন। সব মিলিয়ে গ্রন্থের এই ভিতরগত উপন্যাসের শিরোনাম তাই আসলে এক ‘মাতৃহারার ডায়েরি’।
সুচয়িত ভাষার যথার্থ প্রয়োগে, সংক্ষিপ্ত গদ্যে ‘নেপথ্য বয়ান’ শিরোনামে নিজের কথা লিপিবদ্ধ করেছেন কবি গ্রন্থের শ্রীগণেশ-এ, যেখানে তিনি লিখছেন - ‘... হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পরপারে পাড়ি দিলেন মা। হঠাৎ তছনছ হয়ে গেল সব। স্তব্ধ হয়ে গেল জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। গ্রাস করল অসীম শূন্যতা, তৈরি হল গাঢ় ক্ষত। ... মৃত্যুদিন থেকে শুরু করে অশৌচ যাপন এবং পরবর্তী টানা দেড়-দু’মাস নানা মুহূর্তে হৃদয়ের রক্তক্ষরণে উঠে এসেছে অসংখ্য পঙ্ক্তি। বলা যায়, ওই সময়ের যাবতীয় ব্যথা-বিষাদ-শোক আর অন্তর্গত রক্তপাতেই তৈরি ‘আমার হিরোশিমা’ কবিতাগ্রন্থ। জানি, এই ব্যথা-উচ্চারণ নৈর্ব্যক্তিক নয়। তবু, এই শোকলিপি নিয়েই দু’মলাটে তৈরি ‘আমার হিরোশিমা’......।’ আসলে ব্যক্তিগত ব্যথা-উচ্চারণ তখনই নৈর্ব্যক্তিক হয়ে ওঠে যখন উচ্চারণ সৌকর্যে তা পৌঁছে যায় সহস্র হৃদয়ে। তাই কবির এই উচ্চারণ এখানে নৈর্ব্যক্তিকই হয়ে উঠেছে।
কবি, গদ্যকার রূপরাজ ভট্টাচার্য অপরূপ বিশ্লেষণে বিভূষিত করেছেন গ্রন্থটি ‘তবুও কিছু কথা তো থেকে যায়...’ শীর্ষক ভূমিকায়। বিশেষিত করেছেন উপন্যাসোপম এই ‘অনন্তের বার্তা’।
স্বল্প কথায় এক একটি শিরোনামহীন কবিতায় গড়ে উঠেছে গ্রন্থের ভিত। অনায়াসে তাই তুলে দেওয়া যায় আস্ত এই প্রথম কবিতাটি -
এরপর হঠাৎ হামলা
বোমারু কে ছিল কে জানে।
ক্ষতবিক্ষত দুই সহোদর
শেকড় শতাব্দ-গাঢ়
মা হেঁটে যাচ্ছেন একা
অনন্তযাত্রায়......
চোখের জল সম্বল করে
নিথর শরীর আঁকড়ে বসে আছি আমরা
হিরোশিমার পতনের পর, ধাপে ধাপে এগিয়েছে দহনকথার বয়ন, কবিতার গ্রন্থনা। ৬ আগস্ট, ১৯৪৫ ও ১৯ জানুয়ারি ২০২৩ - হিরোশিমা কাণ্ড ও মাতৃবিয়োগ সমার্থক হয়ে উঠেছে কবির জীবনে। তারই যাপন ধারায় ভিন্ন ভিন্ন আবহে একের পর এক ব্যথিত হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে নিঃসরিত হয়েছে দুঃখ-ব্যথার ক্ষরণ-পঙ্ক্তি। রচিত হয়েছে ব্যথিত যাপনের উপন্যাস। অনুভব করা যাক কবিতারই পঙ্ক্তি ধরে ধরে -
কাঠের পর কাঠ সাজানো চিতায়
মুখাগ্নি সেরেছি আমার নীলচে আগুনে -
মন্ত্রোচ্চারণে
আকাশে পাড়ি দিয়েছে
শ্মশান-চুল্লির আগুন,
স্বর্গদ্বারে অদ্ভুত গন্ধ রেখে
মা চলে যাচ্ছেন সীমানা ছাড়িয়ে... (কবিতা - ৬)
কবির বয়ানে -
আজন্ম খাটুনির পর
বিবর্ণ শীতে যারা নিঃশব্দে
ঝরা পাতার মতো খসে পড়েন
মা তাদেরই একজন... (কবিতা - ২৮)
কবির শেষ কথা -
কিছু না বলে তোমার পায়ের কাছে
রেখে দিলাম সব কবিতা, মনে হল
আমার সুখ-অসুখের মাঝে
একটা হাইফেন জুড়ে দিয়েছে কেউ... (শেষ কবিতা)।
উপরিউক্ত তিনটি স্তবকেই যেন আঁকা হয়ে যায় দহনকথার এক উপন্যাস। আর এই সূত্র ধরেই ৫২ টি কবিতার গ্রন্থটি কবি উৎসর্গ করেছেন ‘শ্রীচরণেষু মা শান্তা (চৌধুরী) দেবকে’। প্রাসঙ্গিক প্রচ্ছদের সৌজন্যে ড. রাজকুমার মাজিন্দার। বাতায়ন, শিলচরের গোবিন্দ কংস বণিক কর্তৃক প্রকাশিত গ্রন্থটির অলংকরণ, ছাপা ও কাগজের মান, বাঁধাই সব যথাযথ। ‘প্রায়’ একশো শতাংশ শুদ্ধ বানান গ্রন্থের অন্যতম সম্পদ। ফলত বিষয়ে, কাব্যগুণে ও সার্বিক আয়োজনে এক নান্দনিক পঠনবান্ধব গ্রন্থ। এক নৈর্ব্যক্তিক শ্রদ্ধাঞ্জলি।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
মূল্য - ১০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩৫২৩২০৭৪
যোগাযোগ - ৯৪৩৫২৩২০৭৪

Comments
Post a Comment