Skip to main content

কথোৎকর্ষে উন্মোচিত হিয়ার মাঝে লুকিয়ে থাকা জগৎ ‘পঁচিশটি গল্প’


মিথিলেশ ভট্টাচার্য এই মুহূর্তে উত্তরপূর্বের কথাসাহিত্যে গল্পকার হিসেবে এমন এক স্থানে বিরাজ করছেন যেখানে ধারেকাছে কেউ আছেন বলে প্রতীয়মান হয় না মানুষ তার জীবিতকালে উপযুক্ত মর্যাদা পায় না এটা স্বীকৃত সত্য একদিন আসবে যখন উত্তর পূর্বের সাহিত্যাকাশে মিথিলেশের নাম সর্বকালের শ্রেষ্ঠ গল্পকার হিসেবে উচ্চারিত হবে এ নিশ্চিত একের পর এক গল্প যেন স্বতঃস্ফুর্ত ধারায় প্রসবিত হয়ে চলেছে তাঁর লেখনী থেকে সামান্য ঘটনা কিংবা বিষয়কে আবর্তিত করে তাঁর গল্প নিজেই যেন ধরা দেয় অসামান্য হয়ে, আপন বৈভবে সেইছোট ছোট দুঃখ ব্যথাগভীর হয়ে পাঠকের হৃদয়ে স্থান করে নেয় উৎকর্ষে, মুনশিয়ানায় বয়ানকুশলতা, পোক্ত বুনোটের কারুকার্য, সংলাপের স্বতঃস্ফুর্ততা, অমসৃণ চলন আর সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা ঘটনাক্রমকে জহুরির মতো তুলে এনে তাকে গল্পের আবর্তে সুচারু পরিবেশনার মাধ্যমে গল্পকার মিথিলেশ যে সৃষ্টিতে মেতে আছেন বহু দশক থেকে সেই বার্তা সাহিত্য পরিমণ্ডলে যে যথোচিত চর্চিত, নন্দিত কিংবা স্বীকৃত হয় না এ গল্পকারের নয়, সমাজেরই এক চরম ব্যর্থতা বই আর কিছু নয় এই ধারণা আলোচ্য গ্রন্থের দ্বিতীয় ব্লার্বে কিছুটা বর্ণিত হয়েছে প্রকাশকের তরফেও যদিও গ্রন্থ সম্পর্কিত প্রথম ব্লার্বটি শূন্য রয়ে গেছে
সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে মিথিলেশের গল্পগ্রন্থ ‘পঁচিশটি গল্প এর আগে তাঁরশ্রেষ্ঠ গল্পসংকলনে স্থান পাওয়া আটটি গল্প (জগৎ পারাবারের তীরে, সন ১৩৮১, কেশবলালের ভূমিকা, নষ্ট শশা, স্বপ্ন পূরাণ, অজগরটি আসছে তেড়ে, কর্কটক্রান্তি, ও নিলাজবতী) এখানেও স্থান পেয়েছে এছাড়া পূর্ব প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত মিলিয়ে আরোও সতেরোটি গল্পের সমাহার আলোচ্য গ্রন্থটির প্রকাশকএকুশ শতক’, কলকাতা ভূমিকায় দিকপাল সাহিত্যিক তপোধীর ভট্টাচার্য দশ পৃষ্ঠা জুড়ে বিস্তৃতভাবে লিখেছেন - যাকে বলেমেকিং অব মিথিলেশ মানুষ মিথিলেশ ও গল্পকার মিথিলেশের চুলচেরা বিশ্লেষণের বাইরেও অধিকাংশ গল্পের সৃষ্টিতত্ত্ব সহ গল্পের একশো শতাংশ নির্যাস নিয়ে রয়েছে এই সমৃদ্ধ ভূমিকা যা গল্প পাঠের পূর্বে এক মূল্যবান মঙ্গলাচরণ হিসেবে আখ্যায়িত হতেই পারে
কল্পনার কোনও অতিপ্রাকৃত ক্যানভাস নয়, মিথিলেশের প্রকৃতিবন্দনা আপন পরিসরকে নিয়েই পাঁচজন আটপৌরে মানুষের চোখ আর গল্পকারের দেখার চোখের এই ফারাক মূর্ত হয়ে ওঠে গল্পে গল্পে আমাদের অতি আপন পটভূমিও যে একটি সার্থক ছোটগল্পের প্রেক্ষাপট হয়ে উঠতে পারে তা যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন গল্পকার তাঁর একের পর এক গল্পে পঁচিশটি বা সতেরোটি গল্পেরও আলাদা করে আলোচনার পরিসর এখানে নেই বলেই একটুখানি চেষ্টা করা যেতে পারে গল্পের শৈলী বা বুনোটকে ছুঁয়ে যাওয়ার -
‘লালমাটি বিছানো গলিপথের কিছু জায়গা গিরিনবাবুদের নারকেল গাছের কুচি কুচি ছড়ানো হলুদ ফুলে ছেয়ে আছে। বেশ লাগছে দেখতে। পথের ডান পাশে বিনয়দের বেঁটে মাপের দেয়াল ডিঙিয়ে বিশাল আকৃতির দুটি মানকচু পাতা বাইরের দিকে চলে এসেছে। কী গাঢ় সবুজ রঙের পাতা। ছেলেবেলা কত বৃষ্টিঝরা দিনে একখানা ছাতার অভাবে মানকচু পাতা মাথায় দিয়ে অসিতবরণ ও তার সঙ্গীসাথিরা স্কুলে পড়তে গেছে। ঝিমলিদের স্থলপদ্ম গাছের ডালে একদল চড়ুই কিচিরমিচির শব্দে ঝগড়া বাঁধিয়েছে। কয়েকটি শাদা ও হলদে রঙের প্রজাপতি আচমকা উড়ে গে তাদের সামনে দিয়ে। একটি খয়েরি রঙের ফড়িং এসে উড়ে বসল ঝিমলিদের দেয়ালে...।’ (গল্প - দেখার চোখ’। আহা ! পাহাড় কিংবা সমুদ্র নয় এ একেবারেই একান্ত আপন পরিমণ্ডলের চেনা আবহ, এখানেও যে প্রকৃতি উপস্থিত আছে তার সাজানো সম্ভার নিয়ে কতজন সে সন্ধানে ব্রতী হয়েছেন ? এখানেই মিথিলেশের বাহাদুরি। ......’আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি  পাইনি। বাহির পানে চোখ মেলেছি, আমার হৃদয় পানে চাইনি।’ মিথিলেশের গল্পে হৃদয়ের কথা উচ্চারিত হয় ছত্রে ছত্রে।
গল্পে রূপক, ব্যঞ্জনা, পরাবাস্তববাদ এমন এক অনুষঙ্গ যা উপাদেয় করে তোলে পরিবেশনা। মিথিলেশের গল্পে আকছার পাওয়া যায় এইসব অনুষঙ্গ - ‘...নির্জন নদীপারে অস্পষ্ট কুয়াশায় চারজন লোক এসে দাঁড়ায়। একজনের হাতে ধরা ধোঁয়াটে লণ্ঠন। তাদের কাঁধে অনেক দূর থেকে বাহিত হয়ে এসেছে একটি শবদেহ। কাঁধ থেকে নামিয়ে নদীপারে রাখে তারা। এরপর নীরবে চিতা সাজায়। অদূরে দাঁড়িয়ে মৃগাঙ্ক অপলক চোখে দেখে যায় চিতা সাজানো। একসময় দুজন লোক শবদেহের আচ্ছাদন খুলে ধরে। মৃগাঙ্ক চমকে ওঠে ঘোর বিস্ময়ে। কী দেখল সে ? এ যে তারই মৃতদেহ ! আকাশের দিকে মুখ করে টানটান হয়ে নিথর শুয়ে আছে সে। চোখের কোণায় টলমল করছে দু’ফোঁটা অশ্রুবিন্দু। এই ছবি সে ছেলেবেলা থেকেই ঘুরে ঘুরে দেখে আসছে। চিতায় শায়িত তার শবদেহ। একজন অস্পষ্ট চেহারার লোক মৃতদেহের প্রদক্ষিণ শেষ করে তার মুখে আগুন দিচ্ছে। দাউ দাউ করে জ্বলছে তার দেহ। আগুনের তাণ্ডবে দূর অনেক দূর হয়ে যাচ্ছে পৃথিবী, মানুষ, গাছপালা...। মৃগাঙ্ক চুপিচুপি এসে চিতায় শায়িত মৃতদেহের কাছে দাঁড়ায়...।’ (গল্প - আট বছর আগের একদিন)।
নানা বিষয় নিয়ে নিটোল গল্পের এক আপন বিশ্ব গড়ে তুলেছেন মিথিলেশ। তাঁর গল্পে দেশভাগের ছায়া থাকবে না এ অসম্ভব। আলোচ্য গ্রন্থেও আছে কয়েকটি গল্পে দেশভাগের অনুষঙ্গ। নিঃসহায় মানুষের জীবনযুদ্ধের শেষ পরিণতিও যে সব সময় সুখকর হয় না তার অপূর্ব চিত্রায়ন ফুটে ওঠে গল্পে - ‘...ধীর পায়ে হেঁটে শ্রাদ্ধবাসরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় বারীন। ...ধুপ পোড়ার গন্ধ। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন চারপাশ। উচ্চকিত সুরের মন্ত্রপাঠ। মৃদুকণ্ঠে আত্মীয় পরিজনের গালগল্প। কচিকাঁচাদের হই-হুল্লোড়। ওসব কিছুর আড়ালে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছেন নিবারণকাকা। নিতান্ত আটপৌরে, সাদামাটা, অকিঞ্চিৎকর এক ব্যক্তি। দূর থেকে দূরে - সকল পার্থিব যোগসূত্র আজ ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে। কোথায় যেন বিঁধছিল বারীনের। এক অব্যক্ত বেদনা বোধ করছিল সে। আবছা হতে হতে দূরে - বহু দূরে মুছে যাচ্ছে যেন একটি বিশাল অধ্যায়, একটি স্থির প্রত্যয়, একটি দেশ...।’
বিভিন্ন সময়ে লেখা পঁচিশটি গল্পের মধ্যে শেষ তিনটি গল্প কিছু সংক্ষিপ্ত মনে হলেও বাকি গল্পগুলি যথেষ্ট বিস্তৃত এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ - যা গল্পের প্রতিটি আঙ্গিককে সংস্থাপিত করেছে যথাযোগ্য মর্যাদায়। ২০৩ পৃষ্ঠার গ্রন্থটির অসাধারণ প্রচ্ছদের সৌজন্যে অলোক ভট্টাচার্য। নিটোল, পরিপাটি ছাপা, বাঁধাই, শব্দ বিন্যাস। আধুনিক বানানের যথাযথ প্রয়োগ সত্ত্বেও কিছু পুরোনো বানান রয়ে গেছে। ‘উদ্‌বৃত্ত’ শব্দটি বার বার ‘উদ্ধৃত’ হয়ে আছে। সেই সব ‘বিন্দু’কে দূরে সরিয়ে গল্পের ‘সিন্ধু’তে অবগাহন করাই হবে পাঠকের জন্য ফলদায়ক কাজ।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

মূল্য - ৪০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৮৫৯৯৫১২৩৩  

Comments

  1. ভালো লাগলো আলোচনাটি। তবে আরো কয়েকটি গল্পের সারসংক্ষেপ তুলে ধরলে আরেকটু ভালো লাগতো।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...