Skip to main content

শাশ্বত আঙ্গিকে শিলং মাতৃমন্দিরের মুখপত্র তথা শারদীয় পত্রিকা ‘শক্তি’


উত্তরপূর্বের সাহিত্যচর্চায় একটি উল্লেখযোগ্য স্থান ছিল মেঘালয়ের বিশেষ করে শিলং ও তুরা এই ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করত বর্তমানেও যে হচ্ছে না তা নয়, তবে সেই ধারা, সেই সাহিত্যসৃষ্টির পরিমাণ (এবং মানও ?) আর আগের মতো নেই নিয়মিত প্রকাশিত পত্রপত্রিকাগুলো অনেকটাই অনিয়মিত এবং হয়তো চিরতরেই বন্ধও হয়ে গেছে এক ঝাঁক প্রতিষ্ঠিত এবং প্রতিশ্রুতিবান কবি লেখকের কবিতা কিংবা লেখা আর এখন সচরাচর প্রকাশিত হতে দেখা যায় না - অবশ্যই কিছু দীর্ঘকালীন ব্যতিক্রমের বাইরে এর কারণ সহজবোধ্য এ নিয়ে এখানে আলোচনা করা যায় না
শিলং পোলো গ্রাউন্ডে অবস্থিত শাশ্বত, সনাতন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মাতৃমন্দিরের প্রতিষ্ঠার উনসত্তর বছর হয়ে গেছে বর্তমান প্রেক্ষাপটে একাধারে এ যেমন এক গৌরবের গাথা অন্যদিকে এক চ্যালেঞ্জও বটে এই টালমাটাল সামাজিক পরিস্থিতিতে আধ্যাত্মিক আবহে, ঐতিহ্য পরম্পরা অনুযায়ী শারদীয় দুর্গোৎসব পালনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এ বড় কম কথা নয় এই দুর্গোৎসবের আবহে প্রকাশিত হয়েছে প্রতিষ্ঠানের মুখপত্র তথা সাহিত্য পত্রিকাশক্তি’ - ১৪৩১ প্রথমেই বলে রাখা ভালো যে এ শুধুই এক নিছক সাহিত্য পত্রিকা নয় এখানে ব্যতিক্রমী হিসেবেই এক নিশ্চিত প্রত্যয়ের বার্তা নিয়ে সন্নিবিষ্ট হয়েছে সনাতন ধর্মীয় একগুচ্ছ নিবন্ধ যা সাধারণত অন্যান্য শারদীয় পত্রিকায় সেই পরিমাণে উপলব্ধ হতে দেখা যায় না
১/৪ ডিমাই সাইজের পত্রিকায় ৫২ পৃষ্ঠার লেখালেখি অর্থে এক সম্ভারই বটে। এই লেখালেখির সূত্রেই ফের নজরে এল কিছু নামি লেখকের লেখা যাঁরা এক সময় নিয়মিত লিখতেন উত্তরপূর্বের পত্রপত্রিকায়। এখনও লিখছেন কেউ কেউ তবে সংখ্যায় তা নিতান্তই কম। এই সংখ্যায় এমন যাঁরা রয়েছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য - সংযুক্তা দাশ পুরকায়স্থ, ফাল্গুনী চক্রবর্তী, ধনঞ্জয় চক্রবর্তী, উমা পুরকায়স্থ প্রমুখ।
সূচিপত্রহীন পত্রিকাটির প্রথমেই আসছে শরৎ, আগমনি, দুর্গোৎসব ও মাতৃমন্দির নিয়ে সম্পাদক কৃষ্ণেন্দু দেব-এর পৃষ্ঠাব্যাপী সম্পাদকীয় যেখানে রয়েছে এক সনাতনী ভূমিকা ও আবহ। সুসংহত এবং যাথার্থ্যসম্পন্ন সম্পাদকীয় প্রচ্ছদ কিংবা অন্যত্র ‘শিলং’ লেখা হলেও সম্পাদকীয়তে ‘শিলঙ’ বানান লেখার নিশ্চিতই এক অন্তর্নিহিত কারণ রয়েছে। পরপর এগোলে প্রথমেই আসছে সংযুক্তা দাশ পুরকায়স্থ-এর গল্প স্কাইলার্ক নার্সিং হোমঘটনায়, সংলাপে এক ব্যতিক্রমী প্লটের গল্প। যথেষ্ট উপভোগ্য যদিও শিরোনাম অধিক প্রাসঙ্গিক হতেই পারত। ফাল্গুনী চক্রবর্তীর অণুগল্প ‘ট্রয় ট্রেন’। একটি নান্দনিক প্লট মার খেয়েছে একগুচ্ছ বানান ও যতিচিহ্নের ভুলের জন্য। শিরোনামেও তাই। সঞ্জয় গুপ্তের অণুগল্প (ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ?) ‘বিড়ম্বনা’ ও নিবন্ধ (ফিরে দেখা ?) ‘শৈল শহর শিলঙের দুর্গাপূজা’ উপভোগ্য হয়েছে বয়ানে ও শৈলীতে। তবে বাক্যের মধ্যে কোটেশন-বিহীন কিছু কথ্য শব্দের আচমকা ব্যবহার রচনার সাহিত্যগুণে বিপ্রতীপ প্রভাব ফেলে বইকী। গীতশ্রী ভট্টাচার্যের গল্প ‘মাতৃত্ব’ পরিচিত প্লটে ব্যতিক্রমী গল্প যা তরতরিয়ে এগিয়েছে ঘটনার ঘনঘটায়। উমা পুরকায়স্থের গল্প ‘রিটায়ারমেন্ট’। বাস্তব প্রেক্ষিতে একটি চমৎকার গল্প। মুদ্রণ বিভ্রাট এখানেও ক্ষুণ্ণ করেছে লেখার মর্যাদা। আশ্চর্যজনকভাবে প্রতিটি ‘কী’ই এখানে ‘কি’ হিসেবে ছাপা হয়েছে। ভারতবর্ষের সনাতন পরম্পরা ও মর্যাদার প্রতিকূল আবহের বাস্তব প্রেক্ষিত যথার্থভাবে ফুটে উঠেছে ড. মলয় দেব-এর নিবন্ধ ‘আমাদের ভারতবর্ষ’তে। বাস্তব, গ্রাম্য প্রেক্ষাপটে এক ‘কিশোর’-এর চোখে দুর্গোৎসবের প্রেক্ষিত সহজ, অকপট বয়ানে গল্পের আবহে লিখেছেন রঙ্গিমা অধ্যাপক।
সনাতন ধর্মীয় বিষয়-আশয়ের উপর কয়েকটি রচনা (আলেখ্য, নিবন্ধ ইত্যাদি) সংখ্যাটির মর্যাদা বাড়িয়েছে নিশ্চিত, যা ‘বিশেষ’ হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে এই আলোচনায়। বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা রচনাগুলি হচ্ছে - সংকলিত আলেখ্য ‘বেদ ও মনুস্মৃতি’, শৌনক ভট্টাচার্যের ’13 Days After Death in Sanatan Dharma - What happens after you Die’, সম্পাদক কৃষ্ণেন্দু দেব-এর ‘Sanatan Dharma’, দ্বিজা ভট্টাচার্যের ‘Goddess Durga : Embodiment of Power’, দিশান্ত ভট্টাচার্যের ‘Narayan, The Epics and Dharma in an Ever-changing World’ ও অসীম দেদশ প্রহরণধারিণী সুচয়িত ও সুলিখিত প্রতিটি রচনাই কবিতা বিভাগটি অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত রয়েছে মাত্র দুটি কবিতা - ধনঞ্জয় চক্রবর্তী ও বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর মল্লিকা দে বিষ্ণ-এর হিন্দি অণুগল্পনোকরীসুখপাঠ্য
অক্ষর-আকার (ফন্ট) ও লাইন স্পেসিং যথেষ্ট বড় হওয়ায় পঠনবান্ধব হয়েছে পত্রিকাটি এক সুস্থ এবং ব্যতিক্রমী চিন্তাধারা নিয়ে যে প্রকাশিত হয় আলোচ্য পত্রিকাটি তা উপলব্ধি করা যায় অনায়াসে শুভ্রা জানার অলংকরণ নান্দনিক হলেও আধিক্য পরিলক্ষিত হয়েছে প্রচ্ছদশিল্পীর নাম অনুল্লেখিত প্রুফ সংশোধনে কিছু অধিক সচেতনতা এবং আরও কিছু নির্বাচিত লেখার সমন্বয়ে ভবিষ্যতেশক্তিহয়ে উঠতে পারে উত্তরপূর্বের এক উল্লেখযোগ্য শারদীয় পত্রিকা এতে দ্বিমত থাকার কোনও কারণ নেই লিটল ম্যাগাজিনসমূহের ক্রম-বিলীয়মান পরিপ্রেক্ষিতে এ দায়ভার কিছুটা হলেও বহন করতেই পারেশক্তি

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

মূল্য - অনুল্লেখিত
যোগাযোগ - অনুল্লেখিত

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...