এমনিতে যুগোপযোগী হলেও ওই ইশারায় কথা বলা কিংবা ট্যা বলতেই ট্যাংরা বুঝে ফেলার মতো চতুর বা চৌকশ কোনোটাই নয় কৌশিক। উঁচু পদে চাকরিবাকরি করেছে নৈপুণ্যের সঙ্গে। মেধাবী বলেই সব মহলে পরিচিত যদিও নিজে এ ব্যাপারে আজীবন সন্দিহান। আর এই সন্দেহের প্রধান কারণ হল এটাই যে কবিতা মানে ওর বউয়ের চোখে যে ও একটা মধ্যমেধার মানুষ তা আকারে ইঙ্গিতে অনেকবারই বলেছে কবিতা।
বন্ধু দেবজিত অবশ্য বলেছে বউরা নাকি এমনই। বউদের দৃষ্টিতে পৃথিবীর তাবৎ স্বামীরাই মধ্য কিংবা নিম্নমেধার। অতটা তলিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি কৌশিক। কারণ এসব তুচ্ছ কথার পিছনে পড়ে থাকার কোনো কারণ খুঁজে পায়নি সে। বহু কাজ পড়ে রয়েছে অসমাপ্ত। জীবন থেমে নেই। দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে জীবিত থাকার বরাদ্দ দিনগুলো।
জীবন সম্বন্ধেও কৌশিক বরাবরই উদাসীন। কিছুই যেখানে নিজের হাতের মুঠোয় নেই সেখানে পারিপার্শ্বিক ঘটনা দুর্ঘটনায় উদ্বেল কিংবা উচ্ছ্বসিত হয়ে কী লাভ ? যা হবার তা তো হবেই। যে কোনও মুহূর্তে এই পৃথিবী থেকে সড়কে যাওয়ার ক্ষেত্রে বয়স কোনও ফ্যাক্টরই নয়। মায়া, মমতা, হর্ষ-বিষাদ এসব বিষয়ে কৌশিক তাই অনেকটাই উদাসীন। প্রেম ভালোবাসার ক্ষেত্রেও এমনই। স্ত্রী পুত্র কন্যার প্রতি অগাধ মায়া ও দায় দায়িত্ব সামলেও মাঝে মাঝেই মনে হয় এ জীবনে কাউকেই সেভাবে ভালোবাসতে পারলাম না। এই তো সেদিন পাশের বাড়ির বউদি কথায় কথায় বলছিলেন - জানো ? তোমার দাদা না আমাকে ভীষণ ভালোবাসেন। কথাটা মনে ধরেছিল কৌশিকের। এ নিয়ে পরে অনেক ভেবেছে অবসর সময়ে। একজন পুরুষ তার স্ত্রীকে কতটুকু ভালোবাসতে পারেন ? কিংবা একজন পুরুষের পক্ষে তার স্ত্রীকে কতটুকু ভালো বাসা উচিত ? ভীষণ মানে ঠিক কতটা হতে পারে ভালোবাসার পরিমাণ ? ভালোবাসার পরিমাপ কি নিজের ইচ্ছেয় নির্ধারণ করা যায় ? সে নিজে কতটা ভালোবাসে কবিতাকে ? যতটা প্রয়োজন ততটা ভালো তো নিশ্চয়ই বাসছে না হলে তো এতদিনে ভেস্তে যেত সংসার।
ঠিক পরিমাপ করে উঠতে পারে না কৌশিক নিজের ভালোবাসাকে। এ নিয়ে আর তাই বেশি ভাবতেও রাজি নয়। চলছে যখন চলুক। মধ্যমেধার সংসার। দিন ফুরোলে যতটা ভালোবাসার কথা হয় তারচে ঢের বেশি হয় মতানৈক্য। নিরেট ফল - কথার বিরতি, মুখ ভার। এরই মধ্যে ধরা পড়ল কবিতার পেটের ভিতর পাথর জমেছে পিত্তথলিতে। কৌশিক ভাবছে এর জন্যই কি কথায় কথায় পিত্তি জ্বলে কবিতার ? ডাক্তার বলেছেন দেরি না করে অপারেশন করিয়ে নিতে। শুনেই তৎপর হয়ে উঠেছে কৌশিক। কৌশিকের এই তৎপরতা, এই গরজ মুগ্ধ করেছে কবিতাকে। ভালোবাসার এই পরোক্ষ উত্তাপ কবিতা উপভোগ করেছে প্রত্যক্ষ হৃদয়ে।
###
আজ সকালেই অপারেশন হল কবিতার। পিত্তথলিটাকে কেটে বাদ দিয়েছেন কুশলী ডাক্তার। কাল রাতে হাসপাতালের ক্যাবিনে ছিল কবিতা। পাশে অ্যাটেনড্যান্ট হিসেবে কৌশিকও ছিল। এবং এই পরিস্থিতিতেও গভীরভাবে হাজির ছিল সেইসব না মেলা অঙ্কের টানাপোড়েন। ফলত এক দুঃখ বোধ এক পরিতাপ-বেদনা অনুভব করেছে কৌশিক - নীরবে। আজ সকালে বরাবরের মতোই সেসব ভুলে হাসপাতালের দেওয়া নির্দিষ্ট অ্যাপ্রন পরে অপারেশন থিয়েটারের দিকে যেতে যেতে উপস্থিত স্বজনদের পাশাপাশি কৌশিকের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়েই 'আসছি' জানাল কবিতা। কৌশিক হাসিমুখে হাত নাড়ল। সবকিছুতেই উদাসীন কৌশিক জানে এই অপারেশন আজকাল আর ততটা জটিল নয়। তাছাড়া ডাক্তারও যথেষ্ট অভিজ্ঞ।
###
সকালেই অপারেশন হয়েছে কবিতার। ডাক্তার কৌশিককে ডেকে কেটে বের করে আনা অঙ্গটি দেখিয়ে বললেন - সব ঠিক আছে। রোগীকে আজ রিকভারি রুমে রাখা হবে। বিকেলে একবার এসে পর্দার ওপার থেকে দেখে যাবেন।
সারা দিন এক আনমনা আচ্ছন্নে রয়েছে কৌশিক। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে কবিতার মুখ। কেমন আছে কী জানি ? সন্ধ্যার প্রাক্কালে কৌশিক এসে দাঁড়ালো পর্দার কাছে। নার্স জানিয়েছে ভালো আছে সবাই। পর্দা সরাতেই কাচের ওপারে বেডে শুয়ে থাকা কবিতাকে আবছা দেখতে পেল কৌশিক। হাত নাড়ল সে। প্রত্যুত্তরে কবিতাও ধীরে ধীরে হাত নাড়ল। কিন্তু কৌশিকের মনে হল এক বিশেষ ভঙ্গিতে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছে কবিতা। কৌশিক আবার হাত নাড়ল। একইভাবে জবাব এল কবিতার দিক থেকে। ততক্ষণে কাচের ওপারে নেমে এসেছে পর্দা।
ওখান থেকে সরে এল চিন্তিত কৌশিক। ভেতরে একটাই প্রশ্ন। কী বোঝাতে চেয়েছিল কবিতা ? কোনও কষ্ট হচ্ছে কি ওর ? যেদিন থেকে কবিতা এসেছে এ সংসারে সেদিন থেকে আর কিছু পারুক না পারুক কবিতার দেহমনের কোনও কষ্ট সহ্য করতে পারেনি সে। সেটা কবিতাও জানে, যদিও সরাসরি বাহবা জানিয়ে কৌশিককে চাপে রাখার স্ট্র্যাটেজি থেকে সরে আসতে চায়নি। হয়তো এটাও এক বিশ্বজনীন বোঝাপড়া।
###
রাত গভীর। একা একা ক্যাবিনে বসে আছে কৌশিক। কবিতা রিকভারি রুমে। কৌশিকের তোলপাড় অন্তরে একটাই প্রশ্ন - কী বলতে চেয়েছিল কবিতা। হাতের ইশারায় কি বিশেষ কোনও বার্তা জানাতে চেয়েছিল ? কোনো অসুবিধা কিংবা কষ্টের কথা ? এখানে এসেই বিধ্বস্ত হয়ে যাচ্ছে কৌশিক। এই অসহায়তা মেনে নিতে পারছে না কিছুতেই। কেন এমন হচ্ছে ? এটাই কি তবে সেই 'ভীষণ ভালোবাসা' ? কিছুই বুঝতে পারছে না মধ্যমেধার কৌশিক। রাত এগিয়ে যাচ্ছে আরোও একটি প্রভাতের দিকে। সেই প্রভাতবেলার শেষেই পর্দা উঠবে সব রহস্যের, সব ইশারার, সেই অপরিমেয় ভালোবাসার।

অসাধারন। ভাবনার জগৎ সৃষ্টি করা কাগজের লেখা গুলো ছবি হয়ে ধরা দিচ্ছিল একটি একটি করে। এরই মাঝে সামান্য কৌতুক, পেটের ভিতর পাথর জমেছে পিত্তথলিতে, এর জন্যই কি কথায় কথায় পিত্তি জ্বলে কবিতার ? বেশ মজা লাগলো। সাসপেন্স সমাপ্তি আরও জানার ইচ্ছাটাকে সজীব করে রাখলো, বেশ ভালো লাগলো।
ReplyDeleteখুব খুশি হলাম। অনেক অনেক ধন্যবাদ।
ReplyDeleteকিন্তু মুশকিল হল এই যে এখানে কমেন্টদাতার নাম আসে না। তাই বুঝতে পারি না কে লিখলেন।
নামটা লিখে আরেকটি কমেন্ট করলে খুশি হব।