Skip to main content

কুবের, মালা ও কপিলা - ত্রিকোণ সম্পর্কের জটিল সমীকরণ : প্রসঙ্গ ‘পদ্মা নদীর মাঝি’



‘বর্ষার মাঝামাঝি।
পদ্মায় ইলিশ মাছ ধরার মরসুম চলিয়াছে...।
কুবের মাঝি আজ মাছ ধরিতেছিল দেবীগঞ্জের মাইল দেড়েক উজানে। নৌকায় আরো দুজন লোক আছে। ধনঞ্জয় এবং গণেশ। তিন জনের বাড়িই কেতুপুর গ্রামে...।’
মানিক বব্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র প্রথম তিনটি পরিচ্ছেদ শুরু হয়েছে এভাবেই। এবং চরিত্রের উপস্থিতি শুরু হয় একত্রে এই তিনজন দিয়েই যদিও পরবর্তীতে শেষোক্ত দুজন ক্রমে গৌণ হয়ে গেলেও পুরো উপন্যাস জুড়ে রয়ে গেছে কুবের চরিত্রটি - গণেশের ভাষায় ‘কুবির’ হয়ে - প্রধান চরিত্র হয়ে।
### 
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নষ্টনীড়’ গল্পে যেখানে ভূপতি, চারুলতা ও অমলের মধ্যেকার জটিল ও গুরুগম্ভীর সম্পর্কের এক নিস্তরঙ্গ ও মনস্তাত্ত্বিক চিত্র ফুটে উঠেছে সেখানে ভিন্নতর আঙ্গিকে শ্যালিকা ও ভগ্নীপতির মধুর সম্পর্ক নিয়ে রয়েছে তাঁর সেই বিখ্যাত কবিতা - ‘বর এসেছে বীরের ছাঁদে’ - 
‘শ্যালীর সঙ্গে ক্রমে ক্রমে    
আলাপ যখন উঠল জমে,
রায়বেঁশে নাচ নাচের ঝোঁকে
মাথায় মারলে গাঁট্টা।
শ্বশুর কাঁদে মেয়ের শোকে
বর হেসে কয় - ঠাট্টা’ !...’ 
‘পদ্মা নদীর মাঝি’তেও অনুরূপ একটি চিত্র প্রত্যক্ষ করা যায় কুবের, তার স্ত্রী মালা ও শ্যালিকা কপিলার মধ্যেকার সম্পর্ক নিয়ে। মালা জন্ম পঙ্গু। একটি পা সম্পূর্ণ অকেজো হওয়ার ফলে তাকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হাতের উপর ভর দিয়ে চলতে হয়। মানুষ যখন পঙ্গুত্ব নিয়ে জন্মগ্রহণ করে তখন পরবর্তীতে তার কাছে এটাই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়। এ নিয়ে মালার তেমন কোন অসুবিধে বা আপশোশ দেখা যায় না। এর বাইরে বিশ্বসংসারের যাবতীয় কাজকর্ম, অনুভব অনুভূতি নিয়েই মালার দিনযাপন। আরও একটি পঙ্গু মেয়ে গোপী এবং দুই শিশুপুত্র নিয়ে কুবের মাঝি ও মালার সংসার। জেলেপাড়ার বস্তিতে প্রতিবেশীদেরই মতো দারিদ্র্যের শিখরে পরিবারটির বাস। অথচ মানবিক সম্পর্কের যাবতীয় অনুষঙ্গ নিয়েই তাদের দিনযাপন। মালা নিজে অসহায় পঙ্গু হওয়া সত্ত্বেও কুবেরের গতিবিধির উপর তীক্ষ্ণ নজর রাখে পাছে সে হাতছাড়া না হয়ে যায়। বিপরীতে মালার ক্ষেত্রে ও পান থেকে চুন খসলেই কুবের রাগান্বিত হয়ে ওঠে। এই সমীকরণ হয়তো বিশ্বজনীন। 
অন্যদিকে মালার ছোটবোন কপিলার যখন বড় হয়ে স্বামী পরিত্যক্তা হয়ে পিতৃগৃহে প্রত্যাবর্তন ঘটে তখন একদিন প্রলয়ঙ্করী বন্যার পর মালারই অনুরোধে, অনুযোগে কুবের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে তাকে ও তার ছোট ভাইবোনদের কিছুদিনের জন্য নিজের ঘরে নিয়ে আসে। শ্বশুরবাড়িতে তার উদ্দেশে শাশুড়ির প্রশংসায় মালার প্রতি স্নেহপরায়ণ হয়ে ওঠে কুবের। তার মনে হয় ‘সৎ গৃহস্থ ও সৎ স্বামী বলিয়া যে প্রশংসা তাহার জননী গলার জোরে দিগ্দিগন্তে রটনা করে তাহা যেন মালারই কীর্তি।’ কপিলাদের আগমনে একদিকে খুশি হয় মালা আর অন্যদিকে অভাবগ্রস্ত পরিবারের মুখে ক্ষুধার অন্ন জোগান দেওয়ার মতো সামর্থ্য কিংবা পরিবেশ না থাকায় উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে কুবের। এরই পাশাপাশি কপিলার উপস্থিতি কিছুটা হলেও গৃহমুখী করে তোলে কুবেরকে। ক্রমে ক্রমে কপিলার প্রতি এক ভালোলাগা অনুভবের উন্মেষ ঘটে কুবেরের অন্তরে। মালার সজাগ ইন্দ্রিয়সমূহ স্বভাবতই দ্বিগুণ সজাগ হয়ে ওঠে। কপিলাকে নিয়ে সুখের স্বপ্ন দেখে কুবের, ভিন্ন ভিন্ন ঘটনাক্রমে জন্ম নেয় ভিন্ন আঙ্গিকের এক অনুভূতি - ‘কুবের এইমাত্র খাইয়া উঠিয়াছে, তবু তাহার নিজের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আরো কয়েকটা প্রাণীকে সারি দিয়া বসিয়া খাইতে দেখিয়া ভবিষ্যতের অনিবার্য ক্ষুধায় তার ভরা পেটের অন্ন যেন মুহূর্তে হজম হইয়া যায়…। নৌকায় গিয়া সে বসিয়া থাকে…। হু হু করিয়া বহে বাতাস, অন্ধকার এত গাঢ় যে মনে হয় ধোঁয়ার মতোই বুঝি বাতাসে উড়িয়া যাইবে।
কপিলা যে পিছু পিছু আসিয়াছে তা কি কুবের জানে ?
তাহার আকস্মিক হাসির শব্দে কুবের ভয়ে আধমরা হইয়া যায়। ঠকঠক করিয়া সে কাঁপিতে থাকে… কপিলা বলে, ‘তামুক ফেইল্যা আইছ মাঝি।’
কুবের নামিয়া আসিয়া তামাকের দলাটা গ্রহণ করে…।
কপিলা বলে, ‘ডরাইছিলা হ ? আরে পুরুষ।’
তারপর বলে, ‘আমারে নিবা মাঝি লগে ?’
বলে আর কপিলা আবদার করিয়া কুবেরের হাত ধরিয়া টানাটানি করে, চিরদিনের শান্ত কুবেরকে কোথায় যেন সে লইয়া যাইবে। মালার বোন না কপিলা ? হ, কুবের তাহার দুই কাঁধে শক্ত করিয়া ধরিয়া অবাধ্য বাঁশের কঞ্চির মতো তাহাকে পিছনে হেলাইয়া দেয়, বলে, ‘বজ্জাতি করস যদি, নদীতে চুবানি দিমু কপিলা।’
কপিলা ধপ করিয়া সেখানে কাদার উপর বসিয়া পড়ে, হাসিতে হাসিতে বলে, ‘আরে পুরুষ !’
তাহার নির্বিবাদে কাদায় বসা আর শয়তানি হাসি আর খোঁচা দেওয়া পরিহাস - সব বড় রহস্যময় ও দুর্বোধ্য। হঠাৎ কুবেরের বড় ভয় হয়। সে সস্নেহে বলে, ‘পাঁক খাইয়া মরস কেন কপিলা ? মাইনষে কইব কী ? যা বাড়িত যা।’
কে জানে কী আছে কপিলার মনে। সে চলিয়া গেলে কুবেরের দুটি চোখে ঔৎসুক্য অন্ধকারে গোপন হইয়া থাকে। কপিলার আনিয়া দেওয়া তামাক সাজিয়া সে টানিতে আরম্ভ করে। তামাকের ভাগীদার না থাকার আরামটুকুই কি তাহার মানসিক চাঞ্চল্যকে ক্রমে ক্রমে শান্ত করিয়া আনে, অথবা সে নদীর বাতাস - নায়ের দোলনে পদ্মার প্রেম ? মালা যে কোনোদিন ওঠে নাই, হাঁটে নাই, ঘুরিয়া বেড়াইয়া চারিদিকে ছড়াইয়া মেলিয়া রাখিতে পারে নাই, তার জন্য কুবেরের কোনোদিন আপশোশ ছিল না। গতি নাই বলিয়া মালার আবদ্ধ ঘনীভূত জীবন তারই বুকে উথলিয়া উঠিয়াছে - ভাঙা চালার নীচে সঙ্কীর্ণ শয্যায় পঙ্গু মালার তুলনা জগতে নাই। কিন্তু অন্ধকার রাত্রে তামাক পৌঁছাইয়া দিতে সে তো কোনোদিন নদীতীরে ছুটিয়া আসিতে পারে না - বাঁশের কঞ্চির মতো অবাধ্য ভঙ্গীতে পারে না সোজা হইয়া দাঁড়াইতে।
বেগুনি রঙের শাড়িখানা পরিয়া চুলে চপচপে তেল দিয়া শুধু লীলাখেলা করিতেই কপিলা পটু নয়, কুবেরের সেবাও সে করে - জীবনে কুবের কখনো সে সেবার পরিচয় পায় নাই… ঘুম আসিবার আগেই কপিলা তাহাকে স্বপ্নও আনিয়া দেয়…।’
এভাবেই কুবের কপিলার স্বপ্নে মশগুল হয়, অন্যদিকে মালার স্নেহে আপ্লুত হয়। লেখক নানা অনুষঙ্গে এই দোটানা, এই দ্বৈত প্রাপ্তি অপ্রাপ্তিকে নিটোল বর্ণনায়, নিরন্তর ঘটমান ঘটনার ঘনঘটায় সাজিয়ে রাখেন। 
পঙ্গু কন্যা গোপীর চিকিৎসার জন্য কুবের যখন তাকে শহরের চিকিৎসালয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য হয় বিশেষত মালার পীড়াপীড়িতে, তখন সঙ্গী হয় অবাধ্য, নাছোড়বান্দা কপিলা। সেখানে একরাত থাকতে হয় তাদের। গোপী হাসপাতালে - কুবের ও কপিলার সেখানে থাকার সুবিধা নেই। এদিকে রাতে ফেরারও কোন উপায় নেই। এই অবস্থায় বিকেলে তারা নৌকার জেটিতে গিয়ে বসে থাকে কিন্তু ফেরার নৌকা নেই…  ‘ক্যামনে ফিরবা মাঝি ?’ খানিক পরে কপিলা জিজ্ঞাসা করিল।
‘কেডা জানে ? যেমন কাণ্ড তোর কপিলা। তরে নিয়া কী যে করুম…’
‘আমার লাইগা ভাইব না মাঝি।’
এতক্ষণে কী মনে করিয়া কুবের হাসিল, ‘বড় পোলাপান তুই কপিলা। সোয়ামী শুইনা কী কইব তর ভাবছস নি ?’
‘কউক’।
তা বৈকি ! কলঙ্ক কিনিবার সাধ যে কপিলার ষোলো আনা দেখা যায় ? কুবের গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ে। এ তো ভালো কথা নয়। এক বাড়িতে যারা বাস করে, শুধু দুর্নাম কিনিবার জন্য এখানে তাদের পড়িয়া থাকিবার কোন মানে হয় না। শুধু গোপীর জন্যই কি কপিলা থাকিয়া গেল ? গোপীকে সে এত ভালোবাসে ? কে জানে ! কপিলার মন বুঝিবার ক্ষমতা ভগবান কুবেরকে দেন নাই।’’
অবশেষে একটি জীর্ণ হোটেলঘরের মেঝেয় শুইয়া তাদের রাত কাটে। একজন ভেতরে তো অন্যজন বাইরে। একজন জেগে বসে থাকে, অন্যজন ঘুমোয়। কুবের বলে -
‘‘শো কপিলা’।
‘তুমি কই যাও ?’
‘উই পাটিতে শুই গিয়া আমি, যামু কই ?’
ক্ষীণ ভীরু কণ্ঠে কপিলা বলে, ‘না, যাইও না মাঝি।’
কুবের কি রাগিয়া যায় ? কড়া সুরে জিজ্ঞাসা করে , ‘কী করুম তবে ?’
‘ডরামু মাঝি’।
কী আর করিবে কুবের, আবার সে মাটিতে বসে। কপিলা তাহার চাদরখানা পুঁটলি করিয়া তাহাকে বালিশ করিয়া দেয়। তার নিজের মাথায় দেওয়ার জন্য ছোট একটা পিঁড়ি আছে। কুবের শুইয়া পড়িলে এতক্ষণে কপিলা চুল খুলিয়া দেয়, আঙুল দিয়া চুল আঁচড়াইতে আঁচড়াইতে বলে, ‘গোপীর লাইগা পরানডা পোড়ায় মাঝি, স্যায় বুঝি ডরাইয়া কাইন্দা মরে।’
বুঝিতে পারা যায় কপিলা কাঁদিতেছে। 
‘কেডা জানে কবে মাইয়া সাইরা উঠ্যা বাড়িত যাইব। মাইয়ারে ফেইল্যা ক্যামনে ফিরুম মাঝি কাইল ?’
কুবের কাঠ হইয়া পড়িয়া থাকে। এখানে কাঁদিতেছে কপিলা, ওখানে মালাও হয়তো কাঁদিতেছে এখন। পথের দিকে চাহিয়া কত কী হয়তো ভাবিতেছে মালা...।’’
উপর্যুক্ত অধ্যায়েও উন্মোচিত হয়েছে সম্পর্কের এক অন্যতর সমীকরণ। প্রতিক্ষণে এক দোলাচলের আবহ। মালা ও কপিলার মনের গভীরে প্রবেশ করা কুবেরের সাধ্যের বাইরেই থেকে গেল। একদিকে ভয় আর অন্যদিকে কপিলার প্রতি এক মোহ তাকে দোটানায় মজ্জিত করে নিরন্তর। সে এমনকী কপিলাকে নিয়ে দূরদেশে সংসার গড়ার স্বপ্নও দেখে। ময়নাদ্বীপে বসতি স্থাপনের উদ্যোগী  ‘সর্বশক্তিমান হোসেনকে সে যেন বলিয়াছে, কপিলাকে পাইলে সপরিবারে সে ময়না দ্বীপে গিয়া বাস করিবে।’ তবে এর জের কুবের টের পেল বহুদিন পর যখন গোপীর সুস্থতার ফলে মালার মনেও নিজের পঙ্গুত্ব ঘোচানোর আকাঙ্ক্ষা হল। ডাক্তার দেখানোর কথা বললে কুবের রাজি হয় না। বলে - ‘‘ তর পায়ের কিছু হইব না গোপীর মা’। 
‘কেন ? হইব না কেন ?’ মালা জিজ্ঞাসা করে। আহা, একবার দেখাইয়া আসিতে দোষ কী ? ডাক্তার যদি বলে কিছু হইবে না, নিজের কানে শুনিয়া আসিয়া মালা নিশ্চিত হইয়া থাকিবে...।’
না। লইয়া যাইবে না কুবের। আঁই গো কুবেরের পাষাণ প্রাণ। মালার চোখে জল আসে। বিনাইয়া বিনাইয়া সে বলিতে থাকে, যে মেয়ের জন্য কুবের দশবার হাসপাতাল যাইতে আসিতে পারে, মালাকে একবার, শুধু একটিবার লইয়া যাইতে তাহার আপত্তি। হ, অনেক পাপ করিয়াছিল আর জন্মে মালা, এবার তাই এমন কপাল লইয়া জন্মিয়াছে...।
‘চুপ যা গোপীর মা, চুপ যা।’
কেন চুপ যাইবে ? কুবেরের দরদ আছে নাকি মালার জন্য ? সে তো কপিলার মতো ভঙ্গী করিয়া হাঁটিতে পারে না যে তাকে লইয়া কুবের আমিনবাড়ির হাসপাতালে যাইবে, হোটেলে রাত কাটাইয়া আসিবে পরমানন্দে।
কুবের বিবর্ণ হইয়া বলে, ‘কিবা কথা কস গোপীর মা ? মাইরা ফেলুম কইলাম...।”
কপিলার সঙ্গের সম্পর্কের কোন কূলকিনারা পায় না কুবের। মাঝে একবার কপিলার স্বামী তার বর্তমান স্ত্রীর মৃত্যুর পর এসে কপিলাকে সংসারে স্থান দিয়েছে। এর বেশ কিছুদিন পর কুবের কয়েকদিনের জন্য ফের কপিলার বাড়িতে গিয়ে থেকে এসেছে। সেখানেও সে কপিলার দ্বৈতসত্তার পরিচয় পেয়ে চিন্তায় হাবুডাবু খেয়েছে।  
এদিকে কুবেরের প্রত্যাখ্যানের পর একবার যখন সে নদীতে দীর্ঘকালীন যাত্রায় চলে যায় তখন মালা রাসু নামের এক পরিবারহীন ছেলের সঙ্গে হাসপাতালে গিয়ে পা দেখিয়ে আসে। ডাক্তার বলে দেন যে মালার পঙ্গুত্ব সারার নয়। কুবের ফিরে এসে এ খবর পেয়ে মালার উপর চড়াও হয়। তাকে গালিগালাজ করে। মালা বলে - “ক্যান মাঝি ক্যান, এত গোসা ক্যান ? কবে কই নিছিলা আমারে, চিরডা কাল ঘরের মধ্যে থাইকা আইলাম, এউক্‌কা দিনের লাইগা বেড়াইবার যাই যদি, গোসা করবা ক্যান ?’
‘যা, বেড়া গিয়া মাইজা কত্তার লগে - হারামজাদী, বদ্‌।’
‘কী কইলা মাঝি, কী কইলা ?’’
ঝগড়া শুরু হল। কুবের রাগে কলকের আগুন ছুড়ে মারল মালার দিকে। এতে মালার দেহের অনেক জায়গা পুড়ে গেল। এদিকে লোক জমায়েত হল। নানা কথা বলতে লাগল যেন মজা পেয়েছে সবাই - ‘...কে যেন হাততালি দিল। এতক্ষণে চমক ভাঙ্গিল কুবেরের। লাফাইয়া দাওয়া হইতে নামিয়া গাল দিতে দিতে সকলকে সে বাড়ির বাহির করিয়া দিয়া আসিল। তারপর নিজের একখানা কাপড় আনিয়া দিল মালাকে।’ মালা তার নিজের স্ত্রী। সে যা কিছু বলার অধিকার রাখে তা বলে অন্য লোকে বললে কুবেরের বুকে বাজে। 
এর কিছুদিন পর হোলি উপলক্ষে কপিলা বাপের বাড়িতে আছে জেনে ফের কুবের তাকে দেখার অছিলায় শ্বশুরবাড়ি গেল। সেখানেও নানা ঘটনায় উদ্‌ভ্রান্ত হলেও কপিলার রহস্যজনক কথাবার্তার কোন তল খুঁজে পেল না। সেখানে পৌঁছোনোর - ‘‘...একটু পরে কপিলা একখানা পাখা আনিয়া দিল। কুবের খুশি হইয়া বলিল, ‘আছস কিবা কপিলা ?’
‘কিবা দেখ ?’
‘কাহিল য্যান লাগে তোরে।’
‘হ, কাহিল হইসি।’
কুবের ব্যাগ্রকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে, ‘ক্যান রে কপিলা, অসুখ নি করছে তর ?’
‘মনডার অসুখ মাঝি, তোমার লাইগা ভাইবা ভাইবা কাহিল হইছি।’
বলিতে বলিতে আঁচলের আড়াল হইতে হাত বাহির করিয়া এক ভাঁড় চুনহলুদ কপিলা কুবেরের গায়ে ঢালিয়া দেয়...।’’
রং খেলা শেষে গা ধোয়ার উদ্দেশে কুবের পুকুরে যায়। পিছন পিছন আসে কপিলা, পা পিছলে পড়ে গেলে কলস গড়িয়ে যায় জলে। কুবের কপিলাকে ধরতে গেলে কপিলা বলে - ‘‘ধর মাঝি কলস ধর।’ 
বলে, ‘আমারে ধর ক্যান ? কলস ধর।’
হ, ভীত চোখে চারিদিকে চাহিয়া কলসীর মতোই আলগোছে কপিলা ভাসিয়া থাকে... চোখের পলকে বুকে কাপড় টানিয়া হাসিবার ভান করিয়া কপিলা বলে, ‘কথা যে কও না মাঝি ?’
কুবের বলে, ‘তর লাইগা দিবারাত্র পরানডা পোড়ায় কপিলা।’
কপিলা চোখ বুজিয়া বলে, ‘ক্যান মাঝি কেন ? আমারে ভাব ক্যান ? সোয়ামীর ঘরে না গেছি আমি ? আমারে ভুইলো মাঝি - পুরুষের পরান পোড়ে কয়দিন ? গাঙের জলে নাও ভাসাইয়া দূর দ্যাশে যাও মাঝি, ভুইলো আমারে। ছাড়, মানুষ আহে।’’ কুবের নিজেই তার হৃদয়ের তল খুঁজে পায় না। তার একুল ওকুল দুকুল যেন ছন্নছাড়া হয়ে যায়। বিকেলেই ফিরে আসে নিজের ঘরে। মালা ও কপিলার মাঝে কুবের যেন নিজেকে এক দিগ্‌ভ্রান্ত পুরুষ হিসেবে আবিষ্কার করে। 
হোসেন মিয়ার চতুরতার বলি হয় কুবের। মিথ্যা চুরির অপবাদে দোষী সাব্যস্ত হয় কুবের। হোসেন মিয়ার নির্দেশে ময়নাদ্বীপই হয়ে ওঠে তার চিরতরে চলে যাবার অনিবার্য গন্তব্য। শেষটায় ঔপন্যাসিক মানিক পর্দা সরিয়ে দেন যাবতীয় ধোঁয়াশার -
‘‘ঘাটের খানিক তফাতে হোসেনের প্রকাণ্ড নৌকাটি নোঙর করা ছিল। একজন মাঝি ঘুমাইয়াছিল নৌকায়। তাকে ডাকিয়া তুলিলে সে নৌকা তীরে ভিড়াইল। কুবের নীরবে নৌকায় উঠিয়া গেল। সঙ্গে গেল কপিলা। 
ছইয়ের মধ্যে গিয়া সে বসিল। কুবেরকে ডাকিয়া সে বলিল, ‘আমারে নিবা না মাঝি লগে ?’
হ, কপিলা চলুক সঙ্গে। একা অতদূরে কুবার পাড়ি দিতে পারবে না।”
সম্পর্কের জটিল ব্যতিক্রমী সমীকরণের সমাধানে একাকী পড়ে রইল কুবেরের বিবাহিত জীবনের চিরসঙ্গী, পঙ্গু মালা।  

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

(উপন্যাস থেকে উদ্ধৃত অংশের বানান যথাসম্ভব অবিকৃত রাখা হয়েছে)

Comments

Popular posts from this blog

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...