একটি কাব্যগ্রন্থ সব সময় বিষয়ভিত্তিক নাও হতে পারে। একগুচ্ছ কবিতা - যাকে বলে পাঁচমিশেলি, সব মিলিয়ে দিব্যি তা হতেই পারে। কিন্তু গ্রন্থের নিবিড় পাঠে অবধারিতভাবেই উঠে আসে এক নিশ্চিত নির্যাস। অন্তর্নিহিত এক বিষয় ভাবনা। উত্তরপূর্বের কবি ঋতা চন্দের সাম্প্রতিকতম পঞ্চম কাব্যগ্রন্থটি আবার প্রকাশিত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান থেকে। এতেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। বিশ্বায়নের যুগে বরঞ্চ এটাই স্বাভাবিক।
গ্রন্থনামে ‘জীবন’ শব্দটি রয়েছে এবং অবধারিতভাবেই উঠে এসেছে কবির জীবনভিত্তিক এক স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। কবিতায় কবিতায় কবি নিজেকেই করেছেন উদ্ভাসিত। নানা আঙ্গিকের, নানা বিষয়ের উপর আলোকপাত করতে গিয়ে যে ভাবনাটি মূর্ত হয়েছে স্পষ্টতর অনুষঙ্গে তা হচ্ছে কবির জীবনের দু:খসুখের, হতাশার, ক্ষোভের আবার প্রাপ্তিসুখেরও বহি:প্রকাশ, মুখবন্ধে যা নিজেই করেছেন ব্যক্ত। কোনো এক ‘তুমি’কে উদ্দেশ করে ‘আমি’র নির্ঘোষ বয়ানে ধরা আছে সেইসব অনুভূতি - পঙ্ক্তির পর পঙ্ক্তি জুড়ে। এসব নিয়েই কিংবা এসব ছাড়াও রয়েছে জীবনবোধ, অভয়া, করোনা, জুবিন গর্গ, ভাষা শহিদ, অপ্রাপ্তির বেদনা, উপত্যকার বিভেদ, নাগরিকত্বের বিড়ম্বনা আদি প্রসঙ্গ। আসলেই কবিমন দূরে থাকতে পারে না বিক্ষিপ্ত সময়ের বিচ্ছিন্ন ঘটনাবলির থেকে। তাই থাকে এবং রয়েছে প্রতিবাদ। সাহসী উচ্চারণে রয়েছে তীব্র শ্লেষ - অপবাদ, অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে -
‘আমি মরি নাই গো আমি মরি নাই’/ ...গলা টিপে মেরেছে আমায় ধর্ষণের পর।/ তোমার ছত্রছায়ায় প্রধান দুর্নীতিবাজ/ কাদম্বিনীরা মরবে এভাবে একে একে/ বেঁচে বর্তে থাকবে তোমার জঙ্গলরাজ। (কবিতা - কাদম্বিনীরা আজো কাঁদে।) কিংবা - ‘...কাঁটাতার পেরিয়ে আসাকে ভীরুতার তকমা দিয়ে/ ব্যঙ্গ করে গেছো ক্রমাগত দুর্বাক্যে.../ সেসব কি গায়ে লাগে না আমার, আমাদের...?/ যেমন করে এখন গায়ে বিঁধছে তোমার ? তোমার ছোড়া ঢিলগুলো ফিরেছে পাটকেল হয়ে/ নিক্ষিপ্ত বাক্যবাণ কখন হয়ে গেছে বুমেরাং !... (কবিতা - শত্রু/মিত্র।)
কবিতার অবয়বে কোথাও এভাবে বিষয় হয়ে উঠেছে প্রধান - কাব্যিকতাকে পিছনে ফেলে আবার কোথাও কাব্যময় পঙ্ক্তি কিংবা অন্ত্যমিলের প্রয়োগও বিরল নয় -
কাদাখোঁচা ময়ূর সাজে/ ফাঁদে দিসনি পা বিনোদিনী রাই গো/ ভালোবাসা বিকিকিনি হয় যেখানে/ সেই হাটের কোনো ঠিকানা নাই গো। (কবিতা - নামহীন)
অস্ত্রহীনের দাবি ছিল, মানতে হবে ভাষা আইন/ কতটা গভীর আবেগ ছিল, জেনেছে রেল লাইন। (কবিতা - আমি কমলা হবো।)
এমনিধারায় রয়েছে ফেলে আসা দিন ও বর্তমানের নিরিখে আরব্ধ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একাধিক মনমাতানো কবিতা। যার মধ্যে বিশেষোল্লেখে রাখতে হয় - সময় হয়েছে খাঁচা বদলের, দেখা হোক আবার জন্মান্তরে, চপলার বৃষ্টস্নান, প্রাপ্তি, নির্যাস, নামহীন, একটা মেয়ের সাধ, আমার সৌরস্নান, পুনর্জন্ম, আষাঢ়ের প্রথম দিনে... ইত্যাদি।
‘কবিতা’কে নিয়ে কবি গড়ে তুলেছেন এক আস্ত কোলাজ। অসংখ্য কবিতা আছে কবিতাবিষয়ক। যেমন - কবিতা তোমায়, কবিতা তোমার কাছেও আমার অসীম ঋণ, বিশ্বস্ত সাথি ইত্যাদি। একইভাবে নিজেকে নিয়ে বিস্তর কাটাছেঁড়া করেছেন কবি তাঁর ‘মানুষ আর আমি’, ‘ভাসমান শৈবাল’, ‘জমাখরচ’ ইত্যাদি কবিতায়। সব মিলিয়ে বোধসঞ্জাত ভাবনার একগুচ্ছ প্রতিভাস সব কবিতা।
গ্রন্থের অভ্যন্তরে কাগজের মান, বাঁধাই, স্পষ্ট ছাপা, যথাযথ অক্ষরবিন্যাস প্রতিভাত হলেও বানান বিভ্রাটের যে বাহুল্য তাতে একটি প্রশ্ন উঠতেই পারে - পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত একটি গ্রন্থে কেন এমন হয় ? এক্ষেত্রে প্রকাশকের কি কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না, যেখানে এ অঞ্চলের কবি লেখকদের সাহিত্যমান নিয়ে আকছার প্রশ্ন ওঠে ওখানে ? বিশেষ করে রং, গোরু, কাচ, ভাঙা, শূন্য, সাথি... এসব বানান আগাগোড়া ভুল কেন ছাপা হয় ? এছাড়াও নি/না-এর ভুল সংস্থাপন, টি/টা-এর অনুপযুক্ততাও ভাবনার বিষয়।
তবে গ্রন্থাদির পাঠকের এই আকালের দিনে এ সমস্ত কিছুকে দূরে সরিয়ে রাখলে নিবিড় পাঠে নিশ্চিতই উঠে আসে অনুভব, অনুভূতিসঞ্জাত একপ্রস্থ আবেগ তথা ভালোবাসা। মাঝখানে পাঠশেষের কোনো সুযোগ অন্তত রাখেননি কবি। এ কথা বলা যায় হলফ করে। ৬৮টি কবিতায় সমৃদ্ধ ৬৪ পৃষ্ঠাযুক্ত গ্রন্থটির নান্দনিক প্রচ্ছদের সৌজন্যে ঋদ্ধি। গ্রন্থারম্ভে ‘শুভেচ্ছা বার্তা’ লিখেছেন ছান্দসিক, কবি সুব্রত পৈড়া। গ্রন্থটি কবি উৎসর্গ করেছেন তাঁর প্রিয় বান্ধবী ও কবি মধুমিতা চক্রবর্তীকে।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
বনসাই জীবন - ঋতা চন্দপ্রকাশক - ঘোষ পাবলিকেশন, পশ্চিম বর্ধমান
মূল্য - ২৫০ টাকা।

Comments
Post a Comment