Skip to main content

ধারাবাহিকতায় প্রকাশিত উত্তর ত্রিপুরার দুটি ছোটপত্রিকা


একটি পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ করা বড় সহজ কথা নয় গুচ্ছের কাঠখড় পুড়িয়ে অলাভজনক এই প্রক্রিয়ায় লেগে থাকা - সে এক গভীর মননশীলতা ও গরজের আন্তরিক প্রয়াস নি:সন্দেহে এবং স্বভাবতই প্রশংসার্হ ত্রিপুরার সাহিত্য জগতে অন্যান্য স্থানের পাশাপাশি উত্তর ত্রিপুরা জেলা থেকেও নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে একাধিক সাময়িকী সংশ্লিষ্ট সম্পাদকদের নিরলস সাধনা ও সাহিত্যমনষ্ক তাগিদকে কুর্ণিশ জানাতেই হয় সম্প্রতি একই দিনে প্রকাশিত হয়েছে বিদ্যুৎ নাথ সম্পাদিতজ্যোতিপত্রিকার ১ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা এবং মধুমঙ্গল সিনহা সম্পাদিতমঙ্গলদীপপত্রিকার ২২তম বর্ষ ১ম সংখ্যা ক্ষীণতনু উভয় পত্রিকায় ধরা আছে ভাষাসাহিত্যের প্রতি এক নিরলস দায়বদ্ধতা।
 
জ্যোতি
পৃষ্ঠাসংখ্যার হিসেবে প্রথমেই আসে ‘জ্যোতি’ পত্রিকাটি। সরসপুর, কদমতলার জীবন জ্যোতি ক্লাবের সভাপতি হচ্ছেন এই এক ফর্মার স্যাডল স্টিচ পত্রিকার সম্পাদক বিদ্যুৎ নাথ। পত্রিকাটি একাধারে ক্লাবের মুখপত্রও বটে। স্বভাবতই দুটি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পত্রিকায় লিপিবদ্ধ হয়েছে দুটি প্রতিবেদন। ক্লাব প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা ও জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপের বিষয়ে তুলে ধরা হয়েছে - সভাপতির কলমে। পক্ষান্তরে সম্পাদকীয়তে তিনি লিখছেন নবীন ও প্রবীণদের সমন্বয়ে সাহিত্য সংস্কৃতির পথ ধরে সমাজের অবক্ষয়জনিত পতনের বিরুদ্ধে একজোট হওয়ার কথা। এছাড়াও রয়েছে ক্লাব সম্পাদক প্রদীপ চন্দের তরফেও একটি প্রতিবেদন।
সূচিপত্রহীন সংখ্যাটির পাতা ওলটালে একে একে আসছে ধর্মনগর জেলা হাসপাতালে কর্ম রত জনদরদি ডাক্তার প্রসূন ভট্টাচার্যকে নিয়ে ও তাঁর সেবামূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে সম্পাদক বিদ্যুৎ নাথের একটি প্রতিবেদনধর্মী রচনা। সমাজের নানা স্তরে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে জীবনে সাফল্য কেড়ে আনা একাধিক ব্যক্তির সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন নিশ্চিতই এক ব্যতিক্রমী সংযোজন। এই পর্বে এই সাফল্যের ভিতরকথা লিখেছেন সমাজসেবী নিরঞ্জন নাথ, মৃৎশিল্পী কল্লোল মালাকার ও ক্রীড়াবিদ অমলকান্তি নাথ।      
প্রতিষ্ঠিত থেকে উঠতি প্রজন্মের কবি - নানা স্বাদের একগুচ্ছ কবিতা লিখেছেন মন্টু দাস, আলাল উদ্দিন, নিবারণ নাথ, অরূপ কুমার, হিমাংশু মোহন্ত, অরিজিৎ নাথ, ডা: বিধায়ক ভট্টাচার্য (পিটি), সুবল চক্রবর্তী, হেমকান্তি নাথ, দীপঙ্কর সেনগুপ্ত, পঙ্কজ নাথ (বাংলাদেশ), অনিমেষ ঋষি দাস, আলপনা নাথ, সিদ্ধার্থ নাথ ও দ্বিজব্রত নাথ। সর্বশেষ সংযোজন হিসেবে নীলেন্দ্র কুমার নাথের প্রবন্ধ ‘ঋষিকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব’ নিঃসন্দেহে সংখ্যাটির সাহিত্য বিভাগের শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
সব মিলিয়ে স্বল্প পরিসরে এক যথাসাধ্য সুষম আয়োজন। কিছু বানানের বাইরে ছাপা, অক্ষর বিন্যাস, রিষিতা নাথের প্রচ্ছদ সবই যথাযথ। পরবর্তী সংখ্যাসমূহে সাহিত্য বিভাগের বর্ধিত আয়োজনে পত্রিকা হয়ে উঠবে অধিকতর সমৃদ্ধ - এমন প্রত্যাশা জাগাতে সফল এক আয়োজন আলোচ্য সংখ্যা - ‘জ্যোতি’।
মূল্য - ৫০ টাকা  
 
মঙ্গলদীপ
২২তম বর্ষে পদার্পণ একটি পত্রিকার পক্ষে বিশাল এক অর্জন। কতটা ধৈর্য, গরজ, দায়বদ্ধতা থাকলে এই কৃতিত্বের অধিকারী হওয়া যায় তা সহজেই অনুমেয়। সম্পাদক মধুমঙ্গল বিশ্বাস সাহিত্যপথের এক নিরলস যাত্রী।
সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার বিশ্ব কবিতা দিবস - ২০২৬ সংখ্যাএক ফর্মার পত্রিকায় মূলত কবিতাই স্থান পেয়েছে যদিও শেষ পাতায় রয়েছে একটি অণুগল্পও। সম্পাদকীয়তে এর কিছুটা আভাসও পাওয়া যায়। ক্ষীণতনু কেন এই প্রশ্নের কোনো ব্যাখ্যা না থাকলেও রয়েছে সাহিত্যের প্রতি দায়বদ্ধতার এক আন্তরিক বাখান  - ‘...এ সংখ্যায় আমরা বিশেষ ভাবে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি, বাংলা ও অসমিয়া (আসামি নয়) ভাষার (বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি অনুবাদ) রচনাকে স্থান দিয়েছি - এই তিন ভাষার সাহিত্যরস ও ঐতিহ্যকে একত্রে ধারণ করার প্রয়াসে। বহুভাষিকতার মধ্য দিয়ে ঐক্যের যে সুর ধ্বনিত হয়, মঙ্গলদীপ তারই প্রতিধ্বনি হতে চায়...।’ নিঃসন্দেহে এক মহৎ প্রচেষ্টা। এই সহিতে পথ চলার আধারই তো সাহিত্য। পারস্পরিক ভাষার মেলবন্ধনে গড়ে ওঠে মৈত্রীর এক অটুট সেতু।
বাংলা বিভাগে যাঁদের কবিতা রয়েছে তাঁরা হলেন - মিলনকান্তি দত্ত, শিউলি শর্মা, নিবারণ নাথ, হেমন্ত দেবনাথ, জয়ত্রী চক্রবর্তী, জিতেন্দ্র নাথ, সঞ্চয়িতা রায়, পিনাক গোস্বামী, তাপস দত্ত, নিয়তি দাস, যজ্ঞেশ্বর দেবনাথ, অমলেন্দু চৌধুরী, লিপিকা চক্রবর্তী, মধুমিতা ভট্টাচার্য, মিলন দেব, হৃষিকেশ নাথ, অনিমেষ ঋষি দাস ও শুক্লা রানি দাস। বর্তমান সময়ে অসমিয়া ভাষার প্রতিষ্ঠিত কবি নীলিম কুমারের কবিতার বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষায় অনুবাদ করেছেন শশীকান্ত সিংহ। নিজের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি কবিতা ও তার বাংলা অনুবাদ করেছেন সম্পাদক মধুমঙ্গল সিনহা। এছাড়া বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার কবিতা লিখেছেন সমরজিৎ সিংহ ও সুপমা সিনহা।
কথাকার দিব্যেন্দু নাথ লিখেছেন অণুগল্প ‘মণির খোঁজে’ যা গড়িয়েছে সূচিপত্রহীন সংখ্যাটির শেষ প্রচ্ছদ অবধি। কবিতার ছোঁয়া থাকা পরাবাস্তব ও প্রেমের অনন্য যুগলবন্দি এই গল্পটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্পের শিরোপা পাওয়ার যোগ্য। তবে নায়কের নাম নিশীথ হবে নীশিথ নয়।
এরকমই কিছু বানান বিভ্রাটের বাইরে ভেতরের পৃষ্ঠার পরিচ্ছন্নতা, ছাপা, অক্ষর বিন্যাস আদি যথাযথ। মিলনকান্তি দত্তের প্রাসঙ্গিক প্রচ্ছদচিত্র ও গোবন্দ ধরের অনবদ্য নামলিপি যথাযথ প্রকাশিত হল না প্রচ্ছদের কাগজ অনুপযুক্ত বলে। পরবর্তী সংখ্যাসমূহ এইসব দৈন্য কাটিয়ে অধিকতর সুসজ্জিত ও সমৃদ্ধতর হওয়ার প্রত্যাশা পাঠকের অধিকার হিসেবে বিবেচিত হতেই পারে।

মূল্য - ২০ টাকা।  

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

Comments

Popular posts from this blog

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...