Skip to main content

পঞ্চাশটি অণুগল্পের অনবদ্য নিবেদন - ‘দোপাতা’


বাংলা ভাষা-সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশেও সমগ্র রাজ্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তরতরিয়ে এগিয়ে চলেছে উত্তর ত্রিপুরা জেলা নৈসর্গিক জম্পুই পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই জেলার একটি প্রত্যন্ত শহর কাঞ্চনপুর সেখানেই বাস কিছু নিমগ্ন কবি-লেখকের যাঁরা প্রতিনিয়ত চাষাবাদ করে চলেছেন ভাষাসাহিত্যের কথাকার দিব্যেন্দু নাথ তাঁদেরই একজন পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে নিহিত সৌন্দর্য ও তার গা বেয়ে নেমে আসা জলধারার প্রেমে আকণ্ঠ মজ্জিত এই মানুষটি শুধুই কথাকার নন, একজন কবিও তাঁরই সম্পাদিত পত্রিকা - ‘দোপাতা’, যার ট্যাগলাইন হচ্ছে - ‘দোপাতা একটি পাহাড়ি ছড়াবহতা জীবনের ভাষাপাখির গান…’ এখানে ছড়া অর্থে নিশ্চিতই ক্ষীণতনু জলধারার কথাই বলা হচ্ছে
সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার নবম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা ২০২৬ বিশেষ অণুগল্প সংখ্যা সম্পাদকীয়তে এ নিয়ে আছে কিছু মনোরম কথাবাক - ‘…জম্পুই পাহাড়-এর নীল দুহিতা, প্রকৃতির সিংহাসনে বসে শিক্ষায়-দীক্ষায় রাজরানি সে আলো শুষে নিলে কাঞ্চনপুরের আলো কমে যায় শব্দও যেন নাদ হয়ে হাঁটে পাহাড়ঢালে তার সুরেলা গন্ধ বেয়ে যে ক্ষীণধারাগুলি উপত্যকার খোঁজে নেমে আসে, সেই অণুধারারই এক শাখা আমাদের ছোট্ট দোপাতা আমরা ছোট মানে তুচ্ছ নই, ক্ষুদ্র মানে ক্ষীণ নয় অণু মানেই সীমাবদ্ধতা নয়; ঘনীভবন সময়ের দ্রুত স্রোতে, তথ্যের অতিবাহুল্যে শব্দের কোলাহলে আজকের পাঠক থামে খুব অল্পক্ষণ এই অল্পক্ষণে স্পর্শ করতে পারে যে রচনা, সেটির অন্যতম অণুগল্প
আহা ! কী অনুপম শব্দমহিমাবিজড়িত সম্পাদকীয় অণুগল্পের প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা নিয়ে আরও আছে কথা যা পরিসরের অভাবে তুলে দেওয়া সম্ভব হল না পাঠক যদি সংগ্রহ করে নেন পত্রিকাটি তাহলে ঠকবেন না মোটেও, ঋদ্ধ হবেন নিশ্চিত
সরাসরি ভেতরের পাতায় চলে যাওয়ার আগে প্রচ্ছদে থাকা রাজন্য ত্রিপুরার ভাষা-সাহিত্যের নিদর্শনযুক্ত অনুপম চিত্র ও নামলিপির কথা না লিখলেই নয়। এর সৌজন্যে যশস্বী কবি, শিল্পী মিলনকান্তি দত্ত। ৫৬ পৃষ্ঠার সংখ্যাটির ৫২ পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে ৫০টি অণুগল্প। রাজ্য ও বাইরের নামিদামি লেখকদের পাশাপাশি রয়েছেন তরুণ প্রজন্মও। বিন্যস্ত সূচিপত্রে তারই হদিশ দেওয়া আছে যথাযথ। বিস্তৃত বিষয় ভাবনায় সন্নিবিষ্ট গল্পগুলি। বিস্তৃত তার আঙ্গিক। প্রতিটি গল্পের জন্য দুলাইন আলোচনারও পরিসর যেহেতু নেই তাই যেসব গল্পের উল্লেখ প্রথমেই করতে হয় সেগুলোই নাহয় করা হোক। ‘অসম্ভব ভালো’ থেকে ‘মোটামোটি ভালো’ সব গল্পের পাশাপাশি কিছু গল্প হয়তো সেভাবে গল্প হয়ে জমে ওঠেনি তবে কিছু বার্তা অবশ্যই খুঁজে পাওয়া যায় সেখানেও। সরাসরি বলতে গেলে লিটল ম্যাগাজিনের ক্ষেত্রে সম্পাদকীয় বাধ্যবাধকতার কথাটি উড়িয়ে না দিয়ে যাঁদের গল্প বিশেষোল্লেখের তালিকায় রাখতেই হয় - গল্পের শর্ত অনুযায়ী একটি অনুপম সমাপন, বিষয়, ভাষা ও শব্দের, সংলাপ ও বুনোটের যথাযথ প্রয়োগ ও সংমিশ্রণে সুলিখিত - তাঁদের নামের তালিকাও ছোট নয় মোটেও। এই তালিকায় থাকা গল্পগুলি লিখেছেন - অশোকানন্দ রায়বর্ধন, অপাংশু দেবনাথ, অমলকান্তি চন্দ, অনুরাগ ভৌমিক, অরুণ চাকমা মাত্তচ্যা, গোপাল চন্দ্র দাস, গৌতমেন্দু নন্দী, চিরশ্রী দেবনাথ, ছন্দা দাম, জহর দেবনাথ, নিবারণ নাথ, বিমলেন্দু চক্রবর্তী, প্রগতি দে চৌধুরী, বকুল দেব, মধুমিতা ভট্টাচার্য, মাধুরী লোধ, মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম, মধু মঙ্গল সিনহা, রাখাল মজুমদার, রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ, শ্যামাপদ চক্রবর্তী, শান্তনু মজুমদার, শ্রীমান দাস, সংহিতা চৌধুরী, সঞ্জয় পুরকায়স্থ, সুস্মিতা দেবনাথ, সুমিতা বর্ধন ও সুমিতা দেব।
এর বাইরেও নানা আঙ্গিকের গল্প লিখেছেন আলপনা নাথ, কল্যাণ দেববর্মণ, গোবিন্দ ধর, জয়ত্রী চক্রবর্তী, দিব্যেন্দু নাথ, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, পৃথ্বীশ দত্ত, বিল্লাল হোসেন, ভুলু কুমার দেববর্মা, মিলনকান্তি দত্ত, মন্টু দাস, মাহফুজ রিপন, মণিলাল নাথ, রতন চন্দ, শিবজ্যোতি দত্ত, শশাঙ্কশেখর পাল, সঞ্চয়িতা রায়, সজল চক্রবর্তী, সিদ্ধার্থ নাথ, সুজিত দেব, হৃষিকেশ নাথ, হারাধন বৈরাগীপ্রতিটি গল্পই গ্রহণযোগ্য নিশ্চিত। কোথাও খানিক খেই হারানো, কোথাও পরিচিত ও বহুল ব্যবহৃত থিম, কোথাও ভাষা - বুনোট - সংলাপ - বোধগম্যতায় কিছু জটিলতা, পুনঃপ্রকাশিত গল্প, কোথাও গল্পের অভাব পরিলক্ষিত হলেও প্রতিটি গল্পই পাঠযোগ্য
কি ও কী / ড় ও র-এর জটিলতা, যতিচিহ্নের কিছু ডামাডোল, কিছু বানান বিভ্রাট এসবের বাইরে কাগজের মান, ছাপার স্পষ্টতা, অক্ষরবিন্যাস সবকিছুই যথাযথ। সবকিছু ছাপিয়ে যে বিষয়টি সবচাইতে বেশি প্রণিধানযোগ্য তা হল পঞ্চাশটি অণুগল্পকে একত্রিত করে একটি সংখ্যা প্রকাশের যে শ্রম, অধ্যবসায়, প্রচেষ্টা ও গরজ তার কোনো বিকল্প হতে পারে না। সেদিক দিয়ে ‘দোপাতা’র পাতায় পাতায় থাকা নিবেদনই শেষ কথা।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

মূল্য - ১০০ টাকা

যোগাযোগ - ৯৮৬২৬০৩৬৪০

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...