দশকের পর দশক
ধরে উত্তর ত্রিপুরার ধর্মনগর, কদমতলা ও অন্যান্য স্থান থেকে প্রকাশিত
হয়ে আসছে বহু ছোটপত্রিকা। এক সময় ‘কবির শহর’ বলেই পরিচিত ছিল ধর্মনগর। সেখান
থেকেই এবছর মে মাসে পনেরোটি লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকদের আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে একযোগে
উন্মোচিত হয়েছে একাধিক পত্রিকা। এক অনন্য
ঘটনা নি:সন্দেহে। সেই
ধর্মনগর থেকেই একসময় প্রকাশিত হতো প্রাবন্ধিক মন্টু দাস সম্পাদিত ‘কিরাতভূমি থেকে’ পত্রিকাটি।
মাঝে বহুদিন বন্ধ থাকার পর এই অনুষ্ঠানে ফের প্রকাশিত হয়েছে পত্রিকাটির ‘বিশেষ
রবীন্দ্র সংখ্যা ১৪৩৩’। একই সাথে কবি নাট্যকার নিবারণ নাথ সম্পাদিত পত্রিকা
‘নীলকণ্ঠ’-এর ১৯শে মে ২০২৬ সংখ্যাটিও প্রকাশিত হয়। আলোচনার টেবিলে একযোগে উঠে এল
পত্রিকাদুটি নিয়ে সংক্ষিপ্ত অবলোকন।
কিরাতভূমি থেকে
হিন্দু পুরাণ ও মহাভারত তথা বিভিন্ন গেজেট অনুযায়ী, কিরাতভূমি বলতে মূলত পূর্ব হিমালয় ও নেপালের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে নির্দেশ করা হয়েছে। এর মধ্যে নেপালের কাঠমান্ডু উপত্যকা, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল (যেমন আসাম, ত্রিপুরা) এবং উত্তরবঙ্গের কিছু অংশ (যেমন জলপাইগুড়ি, প্রাচীন দিনাজপুর ইত্যাদি) ও রংপুর অঞ্চল প্রাচীনকালে কিরাতভূমি হিসেবে পরিচিত ছিল। ত্রিপুরার ধর্মনগর থেকে সদ্য নবকলেবরে প্রকাশিত এই পত্রিকা এবার ‘বিশেষ রবীন্দ্র সংখ্যা’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল।
৩৮ পৃষ্ঠার পত্রিকাটির সম্পাদকীয়তে আছে - ‘...বিশ্বব্যাপী মানবতার চরম সংকট ও দিশেহারা লক্ষ্যহীন নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে নিয়ে শঙ্কিত হলেও রবীন্দ্রনাথের বাণী আমাদের ভরসা দেয়...।’ সংখ্যাটিতে সন্নিবিষ্ট হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন ও কর্ম বিষয়ক মোট ১৭টি নিবন্ধ যার অধিকাংশই অণুনিবন্ধ। নিবন্ধে ধরা আছে বহু ব্যতিক্রমী বিষয় যা কবিগুরুকে অনেকের কাছেই নতুব রূপে আবিষ্কৃত করতে সহায়ক হবে। প্রথম নিবন্ধ লক্ষ্মণ কর্মকারের ‘রবীন্দ্রনাথ যখন ছদ্মনামে’। রবীন্দ্রনাথের কী কী ছদ্মনাম ছিল তা অনেকের জানা থাকলেও কোন প্রেক্ষিতে, কোন রচনায় তার প্রয়োগ সেই বিষয়টিকে প্রাঞ্জল ও গুরুত্বপূর্ণ আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন নিবন্ধকার। গুণেন শীলের নিবন্ধ ‘রবীন্দ্রনাথের হয়রানি ও লাইটপোস্ট’ শিরোনামে কবিগুরুর একটি চিঠিকে উপলক্ষ করে এক ব্যতিক্রমী রচনার রত হয়েছেন নিবন্ধকার। দস্তুরমতো এক গবেষণাধর্মী রচনা। একাধারে সুখপাঠ্যও। ‘গীতবিতান আমার কাছে কেবলমাত্র গানের সংকলন নয়। মনে হয় এটি যেন আমার মানব জীবনের অখণ্ড অনুভূতির এক কাব্যিক দলিল...।’ - অশোকানন্দ রায়বর্ধন আবার ‘সকল অহংকার হে আমার...’ শিরোনামে চিঠির আদলেই কবিগুরুকে লিখেছেন ‘গীতবিতান’ নিয়ে তাঁর অসামান্য নস্টালজিক অনুভূতি। এও সুখপাঠ্য নি:সন্দেহে। হৃষিকেষ নাথ-এর ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও পিরালী ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়’ নিবন্ধে যৌক্তিক গবেষণালব্ধ আঙ্গিকে তুলে এনেছেন কবিগুরুর বংশ পরিচয় ও তৎসঙ্গে পিরালি/কুশারি সম্প্রদায়ের ইতিবৃত। নিবিড় পাঠের উপযুক্ত নিবন্ধ। রবীন্দ্রনাথের বহু লেখালেখি ও রচনার উল্লেখে সঞ্জীব দে কল্পনায় তুলে ধরেছেন আজকের অস্থির সময়ে কেমন হতো কবিগুরুর ভাবনা তার এক নির্মোহ বিশ্লেষণ। অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটি রচনা।
ভিন্নতর আঙ্গিকে কৃষি ও গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে জমিদার রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী কর্মকাণ্ড, কৃষি বিপ্লবের সূচনা ও বর্ণভেদের বিরুদ্ধে পথপ্রদর্শক রবীন্দ্রনাথের পরিচয় প্রাঞ্জলভাবে তুলে ধরেছেন সম্পাদক মন্টু দাস তাঁর ‘অন্য এক রবীন্দ্রনাথ’ নিবন্ধে। একটি অবশ্যপাঠ্য নিবন্ধ। ‘আমার প্রাণের মাঝে সুধা আছে...’ গান ও ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতার আন্তরিক বিশ্লেষণ করেছেন যথাক্রমে অমিত চট্টোপাধ্যায় ও নিবারণ নাথ। নান্দনিক আবহে সুখপাঠ্য দুটি অণুনিবন্ধ। শ্রীভূমি ও গৌহাটিতে রবীন্দ্রনাথের আগমন উপলক্ষে প্রাসঙ্গিক দুটি অণুনিবন্ধ লিখেছেন যথাক্রমে নারায়ণ মোদক ও বিদ্যুৎ চক্রবর্তী। হেমন্ত দেবনাথের ‘রবীন্দ্রনাথের ব্রাত্যজন ভাবনা’, মধুমিতা ভট্টাচার্যের ‘রবীন্দ্র ভাবনায় নারী - সাহিত্যে ও বাস্তবতায়’ এবং অনিমেষ ঋষি দাস-এর ‘ছায়ার অন্তরালে আলো-আঁধারি : মৃণালিনী দেবী ও রবীন্দ্রনাথের মনস্তাত্ত্বিক বিনির্মাণ’ নিবন্ধগুলি পত্রিকার অন্যতম সম্পদ - রচনাশৈলী ও প্রাসঙ্গিক তথ্যের সন্নিবেশে।
‘ত্রিপুরায় রবীন্দ্রনাথ’ একটি বহুচর্চিত বিষয়। তারই সম্যক পরিচিতি ভিন্নতর আঙ্গিকে লিখেছেন রতন চন্দ। দিব্যেন্দু নাথ-এর ‘উপন্যাসের প্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথ’, মধুমঙ্গল সিনহার ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আধ্যাত্মিক দর্শনের স্বরূপ’ ও হারাধন বৈরাগীর ‘রবীন্দ্রনাথ’ - এই তিনটি অণুনিবন্ধ যথেষ্ট তাৎপর্যময়।
প্রতিটি নিবন্ধের শেষে সচিত্র লেখক পরিচিতি ও শেষ পাতায় কিছু সাংস্কৃতিক সংবাদ সম্পাদকের মননশীলতার পরিচায়ক। ছাপা, অক্ষর বিন্যাস যথাযথ। কিছু বানানবিভ্রাটের বাইরে আদ্যোপান্ত একটি রবীন্দ্রবিষয়ক সংখ্যা। নান্দনিক প্রচ্ছদের সৌজন্যে রতন চন্দ। পত্রিকাটির ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখা একান্ত প্রয়োজন।
মূল্য - ৮০ টাকা
যোগাযোগ - ৭০০৫৩৯৬৬৩৯
নীলকণ্ঠ
উত্তর ত্রিপুরার কদমতলার সাংস্কৃতিক ঐক্যমঞ্চ থেকে নিয়মিত প্রকাশিত ‘নীলকণ্ঠ’ পত্রিকার আলোচ্য সংখ্যাটি হচ্ছে ৩৬তম বর্ষের ১ম সংখ্যা। স্বভাবতই অনুমেয় কতটা ধারাবাহিকতা, কতটা নিবেদন অন্তরে ধরে রেখে সাহিত্য সাধনা ও সৃষ্টির পথে নিজেকে জড়িত রেখেছেন সম্পাদক নিবারণ নাথ ও তাঁর সহযাত্রীরা। ২০ পৃষ্ঠার ক্ষীণতনু সংখ্যাটি মূলত বরাক উপত্যকার ১১ জন শহিদের ভাষার নিমিত্তে আত্মবলিদানের স্মরণেই প্রকাশিত হয়েছে। তবে প্রতিটি রচনা যে ভাষাবিষয়ক তা নয়। সাহিত্য রচনাই তো আসলে এক ভাষাতর্পণ। সম্পাদকীয়তে তাই লেখা আছে - ‘...জাতির অস্তিত্ব ভাষা ও সংস্কৃতি। তা যে কোন ভাষাই হোক, যে কোন সংস্কৃতি হোক তা স্বত:স্ফুর্ত শেকড়। আমরা অস্তিত্ব জানান দিই প্রতি মুহূর্তে, প্রতিক্ষণে। প্রভুত্বশীল প্রণালীতে ভাষার প্রতি অবদমন কারো অধিকারে নেই। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে মাতৃভাষা রক্ষার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত...।’
পত্রিকার শুরুতেই রয়েছে একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং হৃদয়স্পর্শী শ্রদ্ধাঞ্জলি। ছয় থেকে নয়ের দশকের সাড়া জাগানো কবি জালাল উদ্দিন আহমেদ-এর প্রতি এই শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রকৃতার্থেই এক যথার্থ স্মৃতিতর্পণ। সংখ্যাটিতে একটি পাঠ প্রতিক্রিয়ার বাইরে মূলত সন্নিবিষ্ট হয়েছে কবিতা। নানা ভাষার, নানা আঙ্গিকের কবিতায় সত্যিকার অর্থেই সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে সংখ্যাটি।
প্রথমেই রয়েছে কবিতাপর্ব। শুরুতেই আছে ‘অখিলবন্ধু ঘোষের বাড়ি’ শীর্ষক কবিতার পাণ্ডুলিপির ছবি। কবি সম্ভবত মিলনকান্তি দত্ত (ব্র্যাকেটে ছাপা অক্ষরে নাম দেওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল)। ভাষা বিষয়ক ও অন্যান্য বাংলা কবিতা লিখেছেন সেলিম মোস্তাফা, নিবারণ নাথ, রসরাজ নাথ, মন্টু দাস, মাহফুজ রিপন, অরূপ কুমার, সন্তোষ রায়, বিল্লাল হোসেন, রতন চন্দ, জয়ত্রী চক্রবর্তী, দরবেশ কুমার, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, সিদ্ধার্থ নাথ, হিমাংশু মোহন্ত, জয়ন্তী কর্মকার, হেমন্ত দেবনাথ, আলাল উদ্দিন, হারাধন বৈরাগী, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, পরিমল কর্মকার, মধুমিতা ভট্টাচার্য, তমালশেখর দে ও দিব্যেন্দু নাথ।
রয়েছে অন্যান্য ভাষার বেশ কিছু কবিতা। পাশাপাশি রয়েছে তার বাংলা অনুবাদ। নিজের মগ ভাষার একটি কবিতার বাংলা অনুবাদ করেছেন উভয় ভাষার প্রতিষ্ঠিত কবি ক্রাইরী মগ চৌধুরী। একটি ইংরেজি কবিতা লিখেছেন হৃষিকেশ নাথ। রয়েছে অরুণ চাকমা (মাত্তচ্যা)র একটি চাকমা ভাষার কবিতা, সঙ্গে স্বকৃত বাংলা অনুবাদ। বাংলা আঞ্চলিক ভাষায় একটি কবিতা লিখেছেন অনিমেষ ঋষি দাস। স্বকৃত বাংলা অনুবাদ সহ রয়েছে শুভ্রাংশু দাম ও অনিতা চন্দ-এর হিন্দি কবিতা, মধুমঙ্গল সিনহার বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি কবিতা। ড. নীলিমা গোস্বামী শর্মার অসমিয়া কবিতার বাংলা অনুবাদ করেছেন মীনাক্ষী চক্রবর্তী। রয়েছে স্বকৃত বাংলা অনুবাদ সহ সুধন্য ত্রিপুরার ককবরক ভাষার কবিতা। গোবিন্দ ধরের একটি বাংলা কবিতার চাকমা ভাষায় অনুবাদ করেছেন মৃত্তিকা চাকমা। ছিলোমিলো ভাষায় কবিতা লিখেছেন বিপ্লব উরাং। গোবিন্দ ধরের বাংলা কবিতার নেপালি ভাষায় অনুবাদ করেছেন ভক্ত সিং ঠাকুর। হালাম কবিতা লিখেছেন যশোয়া হালাম। সাথে রয়েছে কবিকৃত বাংলা অনুবাদ। কবিকৃত বাংলা অনুবাদ সহ ডিমাসা কবিতা লিখেছেন বিশ্বজ্যোতি দাওলাগজাউ বর্মন।
দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ এই কবিতাপর্বের শেষে একমাত্র গদ্য হিসেবে রয়েছে রয়েছে কবি মিলন দেব-এর ‘মা’ কাব্যগ্রন্থের উপর কবি মধুমিতা ভট্টাচার্যের বিস্তৃত ও নির্মোহ পাঠ প্রতিক্রিয়া তথা আলোচনা। শেষের পাতায় রয়েছে বিজন কুমার দেবনাথ ও সুজন মাঝির দুটি সংক্ষিপ্ত সাংস্কৃতিক প্রতিবেদন। সব মিলিয়ে সংক্ষিপ্ত পরিসরেই এক অসামান্য আয়োজন ভাষা জননীর শ্রদ্ধার্ঘ্য স্বরূপ। অনুবাদ সহ এই বিশাল সংখ্যক কবিতার আয়োজন বড় সহজ কথা নয়। এখানেই সম্পাদক ও আয়োজক গোষ্ঠীর সাফল্য। নামাঙ্কন ও পরাবাস্তববাদী চিত্রকলাযুক্ত প্রচ্ছদের সৌজন্যে মিলনকান্তি দত্ত। কাগজ ও ছাপার মান যথার্থ হলেও কবিনামে ভিন্ন ফন্ট পঠনবান্ধব হয়ে ওঠেনি। গভীর গরজ ও নিবেদনের এক অনন্য প্রয়াস আলোচ্য সংখ্যা ‘নীলকণ্ঠ’।
কিরাতভূমি থেকে
হিন্দু পুরাণ ও মহাভারত তথা বিভিন্ন গেজেট অনুযায়ী, কিরাতভূমি বলতে মূলত পূর্ব হিমালয় ও নেপালের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে নির্দেশ করা হয়েছে। এর মধ্যে নেপালের কাঠমান্ডু উপত্যকা, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল (যেমন আসাম, ত্রিপুরা) এবং উত্তরবঙ্গের কিছু অংশ (যেমন জলপাইগুড়ি, প্রাচীন দিনাজপুর ইত্যাদি) ও রংপুর অঞ্চল প্রাচীনকালে কিরাতভূমি হিসেবে পরিচিত ছিল। ত্রিপুরার ধর্মনগর থেকে সদ্য নবকলেবরে প্রকাশিত এই পত্রিকা এবার ‘বিশেষ রবীন্দ্র সংখ্যা’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল।
৩৮ পৃষ্ঠার পত্রিকাটির সম্পাদকীয়তে আছে - ‘...বিশ্বব্যাপী মানবতার চরম সংকট ও দিশেহারা লক্ষ্যহীন নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে নিয়ে শঙ্কিত হলেও রবীন্দ্রনাথের বাণী আমাদের ভরসা দেয়...।’ সংখ্যাটিতে সন্নিবিষ্ট হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন ও কর্ম বিষয়ক মোট ১৭টি নিবন্ধ যার অধিকাংশই অণুনিবন্ধ। নিবন্ধে ধরা আছে বহু ব্যতিক্রমী বিষয় যা কবিগুরুকে অনেকের কাছেই নতুব রূপে আবিষ্কৃত করতে সহায়ক হবে। প্রথম নিবন্ধ লক্ষ্মণ কর্মকারের ‘রবীন্দ্রনাথ যখন ছদ্মনামে’। রবীন্দ্রনাথের কী কী ছদ্মনাম ছিল তা অনেকের জানা থাকলেও কোন প্রেক্ষিতে, কোন রচনায় তার প্রয়োগ সেই বিষয়টিকে প্রাঞ্জল ও গুরুত্বপূর্ণ আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন নিবন্ধকার। গুণেন শীলের নিবন্ধ ‘রবীন্দ্রনাথের হয়রানি ও লাইটপোস্ট’ শিরোনামে কবিগুরুর একটি চিঠিকে উপলক্ষ করে এক ব্যতিক্রমী রচনার রত হয়েছেন নিবন্ধকার। দস্তুরমতো এক গবেষণাধর্মী রচনা। একাধারে সুখপাঠ্যও। ‘গীতবিতান আমার কাছে কেবলমাত্র গানের সংকলন নয়। মনে হয় এটি যেন আমার মানব জীবনের অখণ্ড অনুভূতির এক কাব্যিক দলিল...।’ - অশোকানন্দ রায়বর্ধন আবার ‘সকল অহংকার হে আমার...’ শিরোনামে চিঠির আদলেই কবিগুরুকে লিখেছেন ‘গীতবিতান’ নিয়ে তাঁর অসামান্য নস্টালজিক অনুভূতি। এও সুখপাঠ্য নি:সন্দেহে। হৃষিকেষ নাথ-এর ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও পিরালী ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়’ নিবন্ধে যৌক্তিক গবেষণালব্ধ আঙ্গিকে তুলে এনেছেন কবিগুরুর বংশ পরিচয় ও তৎসঙ্গে পিরালি/কুশারি সম্প্রদায়ের ইতিবৃত। নিবিড় পাঠের উপযুক্ত নিবন্ধ। রবীন্দ্রনাথের বহু লেখালেখি ও রচনার উল্লেখে সঞ্জীব দে কল্পনায় তুলে ধরেছেন আজকের অস্থির সময়ে কেমন হতো কবিগুরুর ভাবনা তার এক নির্মোহ বিশ্লেষণ। অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটি রচনা।
ভিন্নতর আঙ্গিকে কৃষি ও গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে জমিদার রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী কর্মকাণ্ড, কৃষি বিপ্লবের সূচনা ও বর্ণভেদের বিরুদ্ধে পথপ্রদর্শক রবীন্দ্রনাথের পরিচয় প্রাঞ্জলভাবে তুলে ধরেছেন সম্পাদক মন্টু দাস তাঁর ‘অন্য এক রবীন্দ্রনাথ’ নিবন্ধে। একটি অবশ্যপাঠ্য নিবন্ধ। ‘আমার প্রাণের মাঝে সুধা আছে...’ গান ও ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতার আন্তরিক বিশ্লেষণ করেছেন যথাক্রমে অমিত চট্টোপাধ্যায় ও নিবারণ নাথ। নান্দনিক আবহে সুখপাঠ্য দুটি অণুনিবন্ধ। শ্রীভূমি ও গৌহাটিতে রবীন্দ্রনাথের আগমন উপলক্ষে প্রাসঙ্গিক দুটি অণুনিবন্ধ লিখেছেন যথাক্রমে নারায়ণ মোদক ও বিদ্যুৎ চক্রবর্তী। হেমন্ত দেবনাথের ‘রবীন্দ্রনাথের ব্রাত্যজন ভাবনা’, মধুমিতা ভট্টাচার্যের ‘রবীন্দ্র ভাবনায় নারী - সাহিত্যে ও বাস্তবতায়’ এবং অনিমেষ ঋষি দাস-এর ‘ছায়ার অন্তরালে আলো-আঁধারি : মৃণালিনী দেবী ও রবীন্দ্রনাথের মনস্তাত্ত্বিক বিনির্মাণ’ নিবন্ধগুলি পত্রিকার অন্যতম সম্পদ - রচনাশৈলী ও প্রাসঙ্গিক তথ্যের সন্নিবেশে।
‘ত্রিপুরায় রবীন্দ্রনাথ’ একটি বহুচর্চিত বিষয়। তারই সম্যক পরিচিতি ভিন্নতর আঙ্গিকে লিখেছেন রতন চন্দ। দিব্যেন্দু নাথ-এর ‘উপন্যাসের প্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথ’, মধুমঙ্গল সিনহার ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আধ্যাত্মিক দর্শনের স্বরূপ’ ও হারাধন বৈরাগীর ‘রবীন্দ্রনাথ’ - এই তিনটি অণুনিবন্ধ যথেষ্ট তাৎপর্যময়।
প্রতিটি নিবন্ধের শেষে সচিত্র লেখক পরিচিতি ও শেষ পাতায় কিছু সাংস্কৃতিক সংবাদ সম্পাদকের মননশীলতার পরিচায়ক। ছাপা, অক্ষর বিন্যাস যথাযথ। কিছু বানানবিভ্রাটের বাইরে আদ্যোপান্ত একটি রবীন্দ্রবিষয়ক সংখ্যা। নান্দনিক প্রচ্ছদের সৌজন্যে রতন চন্দ। পত্রিকাটির ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখা একান্ত প্রয়োজন।
মূল্য - ৮০ টাকা
যোগাযোগ - ৭০০৫৩৯৬৬৩৯
নীলকণ্ঠ
উত্তর ত্রিপুরার কদমতলার সাংস্কৃতিক ঐক্যমঞ্চ থেকে নিয়মিত প্রকাশিত ‘নীলকণ্ঠ’ পত্রিকার আলোচ্য সংখ্যাটি হচ্ছে ৩৬তম বর্ষের ১ম সংখ্যা। স্বভাবতই অনুমেয় কতটা ধারাবাহিকতা, কতটা নিবেদন অন্তরে ধরে রেখে সাহিত্য সাধনা ও সৃষ্টির পথে নিজেকে জড়িত রেখেছেন সম্পাদক নিবারণ নাথ ও তাঁর সহযাত্রীরা। ২০ পৃষ্ঠার ক্ষীণতনু সংখ্যাটি মূলত বরাক উপত্যকার ১১ জন শহিদের ভাষার নিমিত্তে আত্মবলিদানের স্মরণেই প্রকাশিত হয়েছে। তবে প্রতিটি রচনা যে ভাষাবিষয়ক তা নয়। সাহিত্য রচনাই তো আসলে এক ভাষাতর্পণ। সম্পাদকীয়তে তাই লেখা আছে - ‘...জাতির অস্তিত্ব ভাষা ও সংস্কৃতি। তা যে কোন ভাষাই হোক, যে কোন সংস্কৃতি হোক তা স্বত:স্ফুর্ত শেকড়। আমরা অস্তিত্ব জানান দিই প্রতি মুহূর্তে, প্রতিক্ষণে। প্রভুত্বশীল প্রণালীতে ভাষার প্রতি অবদমন কারো অধিকারে নেই। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে মাতৃভাষা রক্ষার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত...।’
পত্রিকার শুরুতেই রয়েছে একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং হৃদয়স্পর্শী শ্রদ্ধাঞ্জলি। ছয় থেকে নয়ের দশকের সাড়া জাগানো কবি জালাল উদ্দিন আহমেদ-এর প্রতি এই শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রকৃতার্থেই এক যথার্থ স্মৃতিতর্পণ। সংখ্যাটিতে একটি পাঠ প্রতিক্রিয়ার বাইরে মূলত সন্নিবিষ্ট হয়েছে কবিতা। নানা ভাষার, নানা আঙ্গিকের কবিতায় সত্যিকার অর্থেই সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে সংখ্যাটি।
প্রথমেই রয়েছে কবিতাপর্ব। শুরুতেই আছে ‘অখিলবন্ধু ঘোষের বাড়ি’ শীর্ষক কবিতার পাণ্ডুলিপির ছবি। কবি সম্ভবত মিলনকান্তি দত্ত (ব্র্যাকেটে ছাপা অক্ষরে নাম দেওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল)। ভাষা বিষয়ক ও অন্যান্য বাংলা কবিতা লিখেছেন সেলিম মোস্তাফা, নিবারণ নাথ, রসরাজ নাথ, মন্টু দাস, মাহফুজ রিপন, অরূপ কুমার, সন্তোষ রায়, বিল্লাল হোসেন, রতন চন্দ, জয়ত্রী চক্রবর্তী, দরবেশ কুমার, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, সিদ্ধার্থ নাথ, হিমাংশু মোহন্ত, জয়ন্তী কর্মকার, হেমন্ত দেবনাথ, আলাল উদ্দিন, হারাধন বৈরাগী, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, পরিমল কর্মকার, মধুমিতা ভট্টাচার্য, তমালশেখর দে ও দিব্যেন্দু নাথ।
রয়েছে অন্যান্য ভাষার বেশ কিছু কবিতা। পাশাপাশি রয়েছে তার বাংলা অনুবাদ। নিজের মগ ভাষার একটি কবিতার বাংলা অনুবাদ করেছেন উভয় ভাষার প্রতিষ্ঠিত কবি ক্রাইরী মগ চৌধুরী। একটি ইংরেজি কবিতা লিখেছেন হৃষিকেশ নাথ। রয়েছে অরুণ চাকমা (মাত্তচ্যা)র একটি চাকমা ভাষার কবিতা, সঙ্গে স্বকৃত বাংলা অনুবাদ। বাংলা আঞ্চলিক ভাষায় একটি কবিতা লিখেছেন অনিমেষ ঋষি দাস। স্বকৃত বাংলা অনুবাদ সহ রয়েছে শুভ্রাংশু দাম ও অনিতা চন্দ-এর হিন্দি কবিতা, মধুমঙ্গল সিনহার বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি কবিতা। ড. নীলিমা গোস্বামী শর্মার অসমিয়া কবিতার বাংলা অনুবাদ করেছেন মীনাক্ষী চক্রবর্তী। রয়েছে স্বকৃত বাংলা অনুবাদ সহ সুধন্য ত্রিপুরার ককবরক ভাষার কবিতা। গোবিন্দ ধরের একটি বাংলা কবিতার চাকমা ভাষায় অনুবাদ করেছেন মৃত্তিকা চাকমা। ছিলোমিলো ভাষায় কবিতা লিখেছেন বিপ্লব উরাং। গোবিন্দ ধরের বাংলা কবিতার নেপালি ভাষায় অনুবাদ করেছেন ভক্ত সিং ঠাকুর। হালাম কবিতা লিখেছেন যশোয়া হালাম। সাথে রয়েছে কবিকৃত বাংলা অনুবাদ। কবিকৃত বাংলা অনুবাদ সহ ডিমাসা কবিতা লিখেছেন বিশ্বজ্যোতি দাওলাগজাউ বর্মন।
দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ এই কবিতাপর্বের শেষে একমাত্র গদ্য হিসেবে রয়েছে রয়েছে কবি মিলন দেব-এর ‘মা’ কাব্যগ্রন্থের উপর কবি মধুমিতা ভট্টাচার্যের বিস্তৃত ও নির্মোহ পাঠ প্রতিক্রিয়া তথা আলোচনা। শেষের পাতায় রয়েছে বিজন কুমার দেবনাথ ও সুজন মাঝির দুটি সংক্ষিপ্ত সাংস্কৃতিক প্রতিবেদন। সব মিলিয়ে সংক্ষিপ্ত পরিসরেই এক অসামান্য আয়োজন ভাষা জননীর শ্রদ্ধার্ঘ্য স্বরূপ। অনুবাদ সহ এই বিশাল সংখ্যক কবিতার আয়োজন বড় সহজ কথা নয়। এখানেই সম্পাদক ও আয়োজক গোষ্ঠীর সাফল্য। নামাঙ্কন ও পরাবাস্তববাদী চিত্রকলাযুক্ত প্রচ্ছদের সৌজন্যে মিলনকান্তি দত্ত। কাগজ ও ছাপার মান যথার্থ হলেও কবিনামে ভিন্ন ফন্ট পঠনবান্ধব হয়ে ওঠেনি। গভীর গরজ ও নিবেদনের এক অনন্য প্রয়াস আলোচ্য সংখ্যা ‘নীলকণ্ঠ’।
মূল্য - ৫০
টাকা
যোগাযোগ - ৯৮৬২৬৭৭৭৫২
যোগাযোগ - ৯৮৬২৬৭৭৭৫২
বিদ্যুৎ
চক্রবর্তী

Comments
Post a Comment