Skip to main content

অণুকবিতার অনন্তপথে প্রত্যয়িত প্রকাশ


‘শৈবাল দিঘিরে বলে উচ্চ করি শির
লিখে রাখো একফোঁটা দিলেম শিশির’
কিংবা -
রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধুমধাম
ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম
পথ ভাবে আমি দেব, রথ ভাবে আমি
মূর্তি ভাবে আমি দেব, হাসে অন্তর্যামী।
১১০টি কবিতার সন্নিবেশে রবীন্দ্রনাথের ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থ আস্তই এমন সব অণুকবিতার রসে ভরপুর। স্বল্প কথায় গভীর ভাবের ব্যঞ্জনাই হল অণুকবিতার বিশেষত্ব। কবির ‘স্ফুলিঙ্গ’ ও ‘লিপিকা’ও এমনই। অণুকবিতার এমন সুললিত রূপ বাঙালি এর আগে কোথাও দেখেছে কিনা জানা নেই। তবে এর শুরু কিন্তু বহু আগেই। সংস্কৃত প্রাচীন ধর্মগ্রন্থাদি এবং খ্রিস্টিয় অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী জুড়ে লিখিত চর্যাপদে এমন অসংখ্য পদ আছে যা অণুকবিতারই ধরন বহন করে। এর অনেক পদই মাত্র দুই বা তিন পঙ্‌ক্তির ছিল, যা রূপকের আশ্রয়ে গভীর জীবনবোধ প্রকাশ করত। জাপানি ‘হাইকু’ তথা ‘লিমেরিক’ও সমগোত্রীয় বললে অত্যুক্তি হয় না।
ষাটের দশকে বাংলা সাহিত্যে হাংরি আন্দোলন ও অন্যান্য নতুন ধারার হাত ধরে প্রচলিত ছন্দের বাঁধন ভেঙে অণু কবিতা নতুন রূপ পায়। কবিরা দীর্ঘ কবিতার পরিবর্তে চার বা ছয় লাইনে গভীর ভাব প্রকাশে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। একুশ শতকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অণু কবিতার জনপ্রিয়তা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমান সময়ের বহু কবি মাত্র দুই থেকে চার লাইনের মধ্যে প্রেম, প্রকৃতি, ও সমসাময়িক বাস্তবতার মতো জটিল বিষয়গুলো ফুটিয়ে তুলছেন। সংক্ষেপে, রূপকধর্মী লোকজ ছড়া থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথের 'স্ফুলিংগ', ‘কণিকা’ পেরিয়ে আজকের বিবর্তিত বাংলা কবিতার ধারায় অণুকবিতা এখন এক স্বতন্ত্র ও পরিচিত কাব্যধারা হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
উত্তরপূর্বও পিছিয়ে নেই এই ধারায় কাব্যসৃষ্টিতে যদিও সংকলন প্রকাশের তেমন তথ্য নেই। এমন এক সময়ে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তরুণ কবি চান্দ্রেয়ী দেব-এর আলোচ্য কাব্যগ্রন্থটি। ১১২ পৃষ্ঠার পাকা বাঁধাই গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট হয়েছে মোট ১০০টি আধুনিক অণুকবিতা। বিষয় ব্যাপক, ধরন বিস্তৃত। ৪ থেকে ১২ পঙ্‌ক্তির সব কবিতায় ধরা রয়েছে কবির অনুভবসঞ্জাত বহু প্রকাশ। গ্রন্থের শুরুতেই রয়েছে কবি, সাহিত্যিকদের তরফে দু’দুটি শুভেচ্ছাবার্তা। ড. দেবাশীষ গুহঠাকুরতা ও পম্পা গুহঠাকুরতা একত্রে লিখছেন - ‘...চান্দ্রেয়ী দেব বর্তমান প্রজন্মের একজন বিশিষ্ট কবি, যার সৃজনশীল সত্তা এবং একনিষ্ঠ সাধনা কবিতার জগৎকে সমৃদ্ধ করে চলেছে নিরন্তর...।’ ভূমিকায় কবি, সম্পাদক নারায়ণ মোদক লিখছেন - ‘...অণুকবিতা কম কথায় গুছিয়ে লেখার একটা মুনশিয়ানা আছে কবির...।’
কবিতার ধরন কিংবা কবিতার মধ্যে লুকিয়ে থাকা ভাবনাকে খুঁজতে গেলে আশ্রয় নিতে হয় প্রকাশিত কবিতারই। নানা অনুষঙ্গে লেখা অসংখ্য কবিতার মধ্য থেকেই নিতে হবে তার নির্যাস। এমনই কিছু পঙ্‌ক্তি কবির কবিতা থেকে -
... একবার ঝিনুকের বুকে কান পেতে শুনে দেখো
অবশ্যই শুনতে পাবে ভালোবাসার কণ্ঠস্বর। (কবিতা - ঝিনুকের বুকে)
...বুকের পাঁজরের মধ্যিখানে
দেহের শিরায় শিরায়
অদেখা চাবুকের প্রহার
মুহুর্মুহু বাঁচতে শেখায়
প্রতিক্ষণ রোজ দুই বেলা
এই যুদ্ধ আমার সঙ্গে আমার। (কবিতা - যুদ্ধ)
উত্তরের জানালার সমীপে দাঁড়াও এসে আজও
খেয়ালিপনায় আবৃত ছোট ঘরে তার অবাধ বিচরণে
আমার পাঠানো সমীরণে হয়তো
আমাকেই খোঁজো কোলাহলের আত্মগোপনে। (কবিতা - সমীরণ)
এটি কবির তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ হলেও অণুকবিতার এটাই প্রথম। কবিতায় ছন্দের - বিশেষ করে অন্ত্যমিলের উপস্থিতি অণুকবিতার ক্ষেত্রে অনিবার্য না হলেও সুখদায়ক হয়। কবি সেদিকে হাঁটেননি সামান্য কিছু কবিতা ছাড়া। সেক্ষেত্রে কিছু পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে যেতে সুর-তাল-লয়ে যদি কোথাও চ্যুতি এসে থাকে তাকে ভুল না বলে শুদ্ধতার সোপান বলে অভিহিত করাই সমীচীন হবে। এমন ইঙ্গিত ভূমিকায়ও রেখেছেন কবি নারায়ণ মোদক। একশোটি অণুকবিতার সংকলন এক সাহসী পদক্ষেপ নিশ্চিতই। এবং সেই সাহস দেখাতে পারার মতো এলেম আছে বলেই অগণিত বয়ান, অসংখ্য অনুভূতিকে সঙ্গে নিয়ে আসরে পদার্পণ কবি চান্দ্রেয়ীর।
গ্রন্থের কাগজের মান, ছাপার স্পষ্টতা, অক্ষরবিন্যাস আদি যথাযথ হলেও বাঁধাই ও প্রচ্ছদ মানসম্পন্ন হয়নি। দেবোপম গুহঠাকুরতার প্রচ্ছদচিত্র নান্দনিক। শেষ প্রচ্ছদে রয়েছে সচিত্র কবি-পরিচিতি। নির্ভুল বানান গ্রন্থের অন্যতম সম্পদ নিশ্চয়ই। মুদ্রক - শ্রীদুর্গা প্রেস, শ্রীভূমি। গ্রন্থে প্রকাশকের নাম থাকাটা কিন্তু বাধ্যতামূলক, যা নেই এক্ষেত্রে। সব মিলিয়ে ভিন্নতর আঙ্গিকের কবিতাকে সঙ্গে নিয়ে কবি চান্দ্রেয়ীর এই পথ চলার আরম্ভ কিন্তু ভবিষ্যতের যাত্রাপথে এক শুভারম্ভ হিসেবেই আখ্যায়িত করা যায়।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
‘অণু অনন্ত’ - চান্দ্রেয়ী দেব  
মূল্য - ২০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩৫৫৯৬০০১

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...