দ্বিশততম বর্ষে আজও নমস্য ও সমান প্রাসঙ্গিক হয়ে আছেন কবি ও গদ্যকার রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বিশেষত একটি কালজয়ী কবিতার জন্য। ‘স্বাধীনতা-সঙ্গীত’ শিরোনামে যে কবিতাটি তিনি লিখে গেছেন তাতে একাধারে নিহিত রয়েছে স্বাধীনতার যন্ত্রণা, মন্ত্র ও স্পৃহা।
বস্তুত স্বাধীনতা এমন এক শব্দ যার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে তাবৎ বিশ্বের প্রাণীকুলের মনন-চিন্তনে থাকা এক অদম্য স্পৃহা, আপন ইচ্ছা অনুযায়ী বেঁচে থাকার মন্ত্র। ব্যক্তিগত জীবনে যেমন প্রতিটি প্রাণীই স্বাধীনতাস্পৃহ তেমনি সামাজিক জীবনেও স্বাধীনতা এক অপরিহার্য প্রাপ্তি। আর সামাজিক স্বাধীনতা তখনই আসে যখন নিজ যাপনভূমি স্বাধীন থাকে।
আমাদের স্বাধীন ভারতবর্ষের বয়স খুব বেশি নয়। এই স্বাধীনতা ছিল বিদেশি ইংরেজ শাসনের থেকে মুক্তির স্বাধীনতা। দীর্ঘ প্রায় দুশো বছরের পরাধীনতার গ্লানি, দুর্ভোগ ও অত্যাচার সইতে হয়েছে ভারতবাসীকে। কত প্রাণ ঝরে গেছে অকালে। এই পরাধীনতা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজে যেমন রাজরোষে পড়েছিলেন অনেক অনেক সংগ্রামী, বিপ্লবী, কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী তেমনি অকথ্য অত্যাচারের বলি হয়েছেন অগণিত সাধারণ মানুষ। স্বাধীনতা একদিনে আসেনি। দীর্ঘকালের লড়াইয়ের ফসল এই স্বাধীনতা। আজ অনেকেই স্বাধীনতার দুঃখ ভুলে গেছেন। পরাধীনতার যন্ত্রণা না সওয়া দিকভ্রষ্ট কিছু উদ্ধত তরুণ প্রজন্ম আজ দস্তুরমতো খিল্লি ওড়ায় স্বাধীনতাকে নিয়ে। এ সবই ধ্বস্ত মানসিকতার ফল।
ভুক্তভোগী কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় আজ থেকে প্রায় দেড়শো বছর আগে তাঁর বিখ্যাত ‘পদ্মিনী’ উপাখ্যানে লিখে গেছেন -
স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়?
দাসত্ব-শৃঙ্খল বল কে পরিতে চায় হে, কে পরিতে চায়।…
কবিতার শেষদিকে একটি স্তবকে কবি আহ্বান জানিয়েছেন স্বাধীনতার লক্ষ্যে জীবনপণ সংগ্রামের -
...অতএব রণভূমে চল ত্বরা যাই হে, চল ত্বরা যাই
দেশহিতে মরে যেই, তুল্য তার নাই যে তুল্য তার নাই।...
স্বাধীনতার ব্যঙ্গবিদ্রুপ তো নিছক এক স্বার্থপরতা, দেশমাতৃকার এক অনাকাঙ্ক্ষাকিত সন্তানই পারে এমন কাজ করতে। স্বাধীনতার মূল্যই যদি কেউ বুঝতে না পারে, দেশাত্মবোধই যদি না থাকে তাহলে এই মানবজন্মই বৃথা।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

Comments
Post a Comment