Skip to main content

সার্ধশতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি ভাষা-সাহিত্য বিষয়ক আত্মসমীক্ষায় কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


যুগ যুগ ধরে চিরন্তন বাঙালি পাঠক সমাজে কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় একচ্ছত্রভাবে যে সিংহাসনে আসীন হয়েছিলেন এবং অবস্থান করছেন সেই উচ্চতায় আজও কেউ পৌঁছোতে পারেননি, এ কথা বলা যায় হলফ করে। গত একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে ভাষা পালটেছে, বানান, গদ্যরীতি সবই পালটেছে তবু নিমগ্ন পাঠককূলের হৃদয়তন্ত্রের প্রতিটি ঝংকারে গল্পকার, উপন্যাসকার শরৎচন্দ্রের অমর সাহিত্যকীর্তি প্রতিক্ষণে অনুরণিত হয় - আজও, আবহমান কাল ধরে। নিখাদ সরল বাক্যের সমন্বয়ে রচিত তাঁর সব অমর কীর্তি বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে এক অমূল্য সম্পদ। সমকালিক সমাজ ব্যবস্থাকে বাচনশৈলীর আঙ্গিকে তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন যা চিরকালীন। তাঁর সৃষ্ট একাধিক চরিত্র আজও অক্ষয় হয়ে আছে বাংলা সাহিত্যের নিমগ্ন পাঠকের মনমানসে। তাঁর ‘মহেশ’ গল্পের গফুর চরিত্রের শেষ সংলাপ আজও অশ্রূভারাক্রান্ত করে তোলে পাঠককে। 
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমসাময়িক সাহিত্যিক হিসেবে শরৎচন্দ্র আপন সাহিত্য রচনায় যে অসাধারণত্ব এবং স্বাতন্ত্র্যের সৃষ্টি করে গেছেন তা যুগ যুগ ধরে প্রতিটি বাঙালির সাহিত্য উপলব্ধি এবং সাহিত্য সাধনার ক্ষেত্রটিকে পরিপূর্ণতায় ভরিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এখনও অ্যাভারেজ বাঙালির কাছে সাহিত্যিক হিসেবে শরৎচন্দ্রই সবচাইতে কাছের। তাঁর অমর সৃষ্টি উপন্যাসসমূহ (নামোল্লেখ নিষ্প্রয়োজন) আজও দুঃখসুখের দোলায় দোলায়িত করে অগণিত পাঠক হৃদয়। আজও ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয় তাঁর সৃষ্টি সমূহ।
কেউ একজন নাকি শরৎচন্দ্রকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, সাধারণ পাঠক কেন রবীন্দ্রনাথকে কিংবা বঙ্কিমচন্দ্রকে সেভাবে বুঝতে পারেন না অথচ শরৎচন্দ্র কেন এত সহজভাবে পড়া যায় ? উত্তরে শরৎচন্দ্র নাকি মুচকি হেসে জবাব দিয়েছিলেন - ‘বাপু হে, আমি লিখি তোমাদের জন্য, আর ওঁরা লিখেন আমাদের জন্য।’ আসলে তথাকথিত বোদ্ধা, সমালোচকরা সহজ সরল ভাষায়, কথায় রচিত সাহিত্যকে সেভাবে মর্যাদা দিতে কুণ্ঠা বোধ করেন। এই সত্য চিরকালীন। ফলত শরৎচন্দ্রকে নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা সেভাবে হয়নি। তাই হয়তো আজ সার্ধশতবর্ষেও শরৎচন্দ্রকে নিয়ে কোনও হইচই দেখা যায় না। সে অর্থে শরৎচন্দ্র এক নীরব সাহিত্য-পূজারি যিনি নীরবেই অন্তরের ধন হয়ে চিরবিরাজিত অগণন সাহিত্যপ্রেমীর মননে, চিন্তনে।
সহজ, সাবলীল ভাষায় সৃষ্ট এমন সাহিত্যকর্মের জন্যই শরৎচন্দ্র আজও স্বমহিমায় চিরভাস্বর। তাঁর নিজের সাহিত্যকর্মের ব্যাপারে তাঁর নিজের ধারণাও খুবই সরল, সপাট ও স্বচ্ছ। সাহিত্যের রস-কলা নিয়ে তাঁর বক্তব্য খুবই স্পষ্ট ও ধারালো ছিল। এ নিয়ে এমনকী গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেও তাঁর বিভিন্ন বিষয়ে মতানৈক্যের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু শরৎচন্দ্র কখনও কোন রাখঢাক করেননি। গুরুদেবের প্রতি যথাসম্ভব সম্ভ্রম বজায় রেখে তিনি আপন বক্তব্য অত্যন্ত সরাসরি ও সাবলীল বয়ানে প্রকাশ করে গেছেন।
শরৎচন্দ্রের সাহিত্যকর্ম নিয়ে তাঁর নিজস্ব যে ধারণা তা নিয়েই এই নিবন্ধে সম্যক আলোচনার এই প্রয়াস। বিভিন্ন সভা-সমিতিতে পঠিত তাঁর অভিভাষণসমূহ কিংবা বিদগ্ধজনদের কাছে তাঁর লিখিত পত্রসমূহে এ বিষয়ে যথেষ্ট আলোকপাত তিনি করে গেছেন বিভিন্ন সময়ে।
পরিবর্তিত সাহিত্যধারা নিয়ে ১৩৩১ বাংলা সনের চৈত্র মাসে মুন্সিগঞ্জে সাহিত্যসভার সভাপতির ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘‘বঙ্গ সাহিত্যের অনেকগুলি বিভাগ - দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস। সেই সেই বিভাগীয় সভাপতিদের পাণ্ডিত্য অসাধারণ। বুদ্ধি তীক্ষ্ণ এবং মার্জিত। তাঁদের কাছে আপনারা অনেক নব নব রসের সন্ধান পাবেন, কিন্তু আমি সামান্য একজন গল্পলেখক। গল্প লেখার সম্বন্ধেই দু-একটা কথা বলতে পারি, কিন্তু পাণ্ডিত্যের দরবারে তার কতটুকুই বা মূল্য? কিন্তু সেটুকু মূল্যও আমি আপনাদের নির্বিচারে দিতে বলিনে, কোন দিন বলিনি, আর বলবও না। এ শুধু আমার নিতান্তই নিজের কথা। যে কথা সাহিত্য সাধনার দশ বৎসর কাল আমি নি:সংশয়ে, অকুণ্ঠচিত্তে ধরে আছি।’’
“…বঙ্কিমচন্দ্র ও তাঁর চারিদিকের সাহিত্যিকমণ্ডলী একদিন বাংলার সাহিত্যাকাশ উদ্ভাসিত করে রেখেছিলেন। কিন্তু মানুষ চিরজীবী নয়, তাঁদের কাজ শেষ করে তাঁরা স্বর্গীয় হয়েছেন। তাঁদের প্রদর্শিত পথ, তাঁদের নির্দিষ্ট ধারার সঙ্গে নবীন সাহিত্যিকদের অনৈক্য ঘটেছে - ভাষা, ভাব ও আদর্শে। এমন কি প্রায় সকল বিষয়েই। এইটেই অধ:পথ কি না তা ভেবে দেখবার।”
“আর্ট-এর জন্যই আর্ট, একথা আমি পূর্বেও কখনও বলিনি, আজও বলিনে। এর যথার্থ তাৎপর্য আমি এখনও বুঝে উঠতে পারিনি। এটা উপলব্ধির বস্তু, কবির অন্তরের ধন। …সাহিত্যের আরেকটা দিক আছে, সেটা বুদ্ধি ও বিচারের বস্তু। যুক্তি দিয়ে আরেকজনকে তা বোঝানো যায়। …আমরা গল্পের মধ্য থেকে কিছু একটা শিক্ষালাভ করতে চাই। এ প্রায় আমাদের সংস্কারের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে। এদিকে কোনো ত্রুটি হলে আর আমরা সইতে পারিনে।”
১৩৩০ সালের ১৬ আষাঢ় হাওড়ায় টাউন হলে অনুষ্ঠিত শিবপুর ইন্সটিটিউশনের সাহিত্য সভায় পঠিত ভাষণে শরৎচন্দ্র বলেছেন - “সম্প্রতি একটা কলরব উঠিয়াছে যে, আধুনিক উপন্যাস লেখকেরা বঙ্কিম সাহিত্যকে ডুবাইয়া দিল। বঙ্কিম সাহিত্য ডুবিবার নয়। সুতরাং আশঙ্কা তাহাদের বৃথা। কিন্তু ঔপন্যাসিকদের বিরুদ্ধে এই যে নালিশ - ইহারা বঙ্কিমের ভাষা, ভাব ধরন-ধারণ, চরিত্রসৃষ্টি কিছুই আর অনুসরণ করিতেছে না, সুতরাং অপরাধ এদের অমার্জনীয়, ইহার একটা জবাব দেওয়া প্রয়োজন। আমি বয়সে যদিও প্রাচীন হইয়াছি, কিন্তু সাহিত্য-ব্যবসায়ে আজও আমার বছর দশেক উত্তীর্ণ হয় নাই। অতএব আধুনিকদের পক্ষ হইতে উত্তর দিই ত বোধ করি অন্যায় হইবে না।
অভিযোগ ইহাদের সত্য, আমি তাহা অকপটে স্বীকার করিতেছি। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা আমাদের কাহারও অপেক্ষা কম নয়, এবং সেই সশ্রদ্ধার জোরেই আমরা তাঁহার ভাষা, ভাব পরিত্যাগ করিয়া আগে চলিতে দ্বিধা বোধ করি নাই। মিথ্যা ভক্তির মোহে আমরা যদি তাঁহার সেই ত্রিশ বৎসর পূর্বেকার বস্তুই শুধু ধরিয়া পড়িয়া থাকিতাম, ত কেবল গতির অভাবেই বাংলা সাহিত্য আজ মরিত। দেশের কল্যাণে এতদিন তিনি নিজে প্রচলিত ভাষা ও পদ্ধতি পরিত্যাগ করিয়া পা বাড়াইতে ইতস্তত করেন নাই, তাঁহার সেই নির্ভীক কর্তব্য বোধের দৃষ্টান্তকেই আজ যদি আমরা তাঁহার প্রবর্তিত সাহিত্য-সৃষ্টির চেয়েও বড় করিয়া গ্রহণ করি, ত সে তাঁহার মর্যাদা হানি করা নয়। এবং সত্যই যদি তাঁহার ভাষা, ধরন-ধারণ, চরিত্র সৃষ্টি প্রভৃতি সমস্তই আমরা আজ ত্যাগ করিয়া গিয়া থাকি ত দু:খ করিবারও কিছু নাই।”
সাহিত্য, বিশেষ করে কথাসাহিত্য সম্পর্কে শরৎচন্দ্রের কিছু নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। ১৩৩৪-এর ‘বঙ্গবাণী’র আশ্বিন সংখ্যায় তিনি লিখেছেন - “হৃদয়ের সত্যিকার অনুভূতি আনন্দ ও বেদনার আলোড়ন অলঙ্কৃত বাক্যে বিকশিত হইয়া না উঠিলে সে সাহিত্য পদবাচ্য হয় না।
কাব্য সাহিত্য ও কথা সাহিত্য এক বস্তু নয়। আধুনিক উপন্যাস সাহিত্য ত নয়ই। ‘সোনার তরী’র যা লইয়া চলে ‘চোখের বালি’র তাহাতে কুলায় না। …ইহাদের ধর্মও এক নয়, ধর্মের সীমানাও এক নয়। এবং মানুষের বোধের ক্ষুধা ও আত্মার ক্ষুধার জাতিভেদ এতই গভীর ও বিস্তৃত যে, বৈজ্ঞানিক মনোভাব-নিয়ন্ত্রিত কল্পনাকে বিসর্জন দিলে ইহাদের অর্থই প্রায় থাকে না।”
কথাসাহিত্যিকের ভাষায় - “অনুরাগের সঙ্গে বিরাগ, প্রশংসারের সঙ্গে তিরস্কার, ভালো-কথার সঙ্গে মন্দ-কথাও যে গল্প-সাহিত্যের অপরিহার্য অঙ্গ। প্রতি সাহিত্য-সাধকের অন্তরেই বাস করে দুজনে, তার একজন হলেন লেখক, সে করে সৃষ্টি, আর অন্যজন হলো তার সমালোচক, সে করে বিচার। অল্প বয়সে লেখক থাকে প্রবল পক্ষ, অপরকে সে মানতে চায় না। একজন পদে পদে যতই হাত চেপে ধরতে চায়, কানে কানে বলতে থাকে, পাগলের মতো লিখে যাচ্ছো কি, থামো একটুখানি - প্রবল পক্ষ ততই সবলে হাত-দুটো তার ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে চালিয়ে যায় তার নিরঙ্কুশ রচনা। বলে, আজ ত আমার থামবার দিন নয়, আজ আবেগ ও উচ্ছ্বাসের গতিবেগে ছুটে চলার দিন। সেদিন খাতার পাতায় পুঁজি হয় বেশি, স্পর্ধা হয়ে উঠে অভ্রভেদী। সেদিন ভিত থাকে কাঁচা, কল্পনা হয় অসংযত, উদ্দাম, মোটা গলায় চেঁচিয়ে বলাটাকেই সেদিন যুক্তি বলে ভ্রম হয়। সেদিন বইয়ে পড়া ভালো লাগা চরিত্রের পরিস্ফীত বিকৃতিকেই সদম্ভে প্রকাশ করাকে মনে হয় নিজেরই অনবদ্য মৌলিক সৃষ্টি।
হয়ত, সাহিত্য সাধনায় এইটিই হচ্ছে স্বাভাবিক বিধি। আমার সাহিত্য সাধনা চিরদিন স্বল্প পরিধিবিশিষ্ট। হয়ত এ আমার ত্রুটি, হয়ত এ-ই আমার সম্পদ, আপনাদের স্নেহ ও প্রীতি পাবার সত্য অধিকার। হয়তো আপনাদের মনের কোণে এই কথাটা আছে - এর শক্তি কম, তা হোক, কিন্তু এ কখনও অনেক জানার ভান করে আমাদের অকারণ প্রতারণা করেনি।”
ভাষা ও সাহিত্য সম্বন্ধেও শরৎচন্দ্রের বক্তব্য অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য। ১৩২১ সালের ‘যমুনা’ পত্রিকার আষাঢ় সংখ্যায় ‘অনিলা দেবী’ ছদ্মনামে শরৎচন্দ্র ‘মাতৃভাষা এবং সাহিত্য’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তার অংশবিশেষ এরকম - “ভাব ও চিন্তা যেমন ভাষার জন্মদান করে, ভাষাও তেমনি চিন্তাকে নিয়ন্ত্রিত, সুসংবদ্ধ ও শৃঙ্খলিত করে। ভাষা ভিন্ন ভাবা যায় না। একটুখানি অনুধাবন করিলেই দেখিতে পাওয়া যায় যে, কোনো একটা ভাষা মনে মনে আবৃত্তি করিয়াই চিন্তা করে - যেখানে ভাষা নাই, সেখানে চিন্তাও নাই। ভাষা-বিজ্ঞানবিদেরা বলেন, মানুষের কোন অবস্থায় তাহার প্রথম সাহিত্য সৃষ্টি তাহা বলিবার জো নাই। খুব সম্ভব যেদিন হইতে তাহার ভাষা, সেইদিন হইতে তাহার সাহিত্য। সেদিন হইতে তাহার হত দলপতির বীরত্ব কাহিনী যুদ্ধক্ষেত্র হইতে ফিরিয়া আসিয়া বলিয়াছিল, যেদিন হইতে প্রণয়ীর মন পাইবার অভিপ্রায়ে সেদিন সে নিজের মনের কথা ব্যক্ত করিয়াছিল, সেই দিন হইতেই তাহার সাহিত্য। …ভাষা থাকিলেই সাহিত্য থাকা সম্ভব; তা সে যাহারই হোক এবং যেখানেই হোক। অনুভূতির পরিণতি যেমন ভাব ও চিন্তা, ভাষার পরিণতিও তেমনি সাহিত্য। ভাব প্রকাশ করিবার উপায় যেমন ভাষা, চিন্তা প্রকাশ করিবার উপায়ও তেমনি সাহিত্য। জাতির সাহিত্যই শুধু জানাইয়া দিতে সম্ভব যে, জাতির চিন্তাধারা কোন দিকে, কোথায় এবং কত দূরে গিয়া পৌঁছিয়াছে। দর্শন, বিজ্ঞান, আয়ুর্বেদ এমনকি যুদ্ধবিদ্যার জ্ঞান ও চিন্তাও দেশের সাহিত্যই প্রকাশ করে।
একবার বলিয়াছি, ভাষা ছাড়া চিন্তা করা যায় না। তাই জগতে যাঁহারা চিন্তাশীল বলিয়া খ্যাত, তা সে চিন্তার যে কোন দিকই হোক, মাতৃভাষায় দেশের সাহিত্যে তাঁহারা ব্যুৎপন্ন এ কথা বোধ করি অসংশয়ে বলা যায়।”
সাহিত্যে এত সফলতা, এত জনপ্রিয়তার পরেও শরৎচন্দ্র তাঁর নিজের সম্বন্ধে যখনই কিছু বলতে গিয়েছেন তখনই তাঁর বক্তব্যে যথেষ্ট বিনয় ও নম্রতা ফুটে উঠেছে। রাধারাণী দেবীকে লেখা এক বক্তব্যে শরৎচন্দ্র জানাচ্ছেন - “আমার ভাষার উপরে অধিকার সত্যিই কম। এ আমার যথার্থই মনের কথা। ভাষার উপরে দখল এতই অল্প যে দুছত্র কবিতা পর্যন্ত মেলাতে পারিনে। কথা খুঁজে পাইনে। তাই যে কেউ যেমন তেমন কবিতা লিখলেও বিস্মিত হয়ে যাই। নবীন লেখকদের প্রতি আমার আন্তরিক স্নেহ এবং টান আছে। তাদের ভুলচুক হয় জানি। কিন্তু তাই বলে তাদের লোকসমাজে অশ্রদ্ধেয় প্রতিপন্ন করলে আমার অত্যন্ত ব্যথা লাগে।”
কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের সার্ধশতবর্ষ শ্রদ্ধার্ঘ্যে ইতি টানব তারই ভাষায়। ১৩৩৫ সনের ভাদ্র মাসে ৫৩তম জন্মদিন উপলক্ষে প্রদত্ত ভাষণে তিনি বলেছিলেন - ‘…এই যে অনুরাগ, এই যে আমার জন্মতিথিকে উপলক্ষ করে আনন্দ প্রকাশের আয়োজন - আমি জানি এ আমার ব্যক্তিকে নয়। দরিদ্র গৃহে আমার জন্ম। এই ত সেদিনও দূর প্রবাসে তুচ্ছ কাজে জীবিকা অর্জনেই ব্যাপৃত ছিলাম। সেদিন পরিচয় দিবার আমার কোন সঞ্চয়ই ছিল না। তাই ত বুঝতে আজ বাকি নাই  - এ শ্রদ্ধা নিবেদন কোন বিত্তকে নয়, বিদ্যাকে নয়, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কোন অতীত দিনের কোন গৌরবকে নয়, এ শুধু আমাকে অবলম্বন করে সাহিত্যলক্ষ্মীর পদতলে ভক্ত মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদন। সাহিত্যের দিক দিয়েই এই যোগ্যতা কি আমি সত্যিই অর্জন করেছি? কিছুই করিনি এ কথা আমি বলছি না। কারণ এতবড় অতিবিনয়ের অত্যুক্তি দিয়ে উপহাস করতে আমি নিজেও চাইনে, আপনাদেরও না। কিছু আমি করেছি। অনাগত ভবিষ্যতে আমার লেখার মূল্য থাকবে কি থাকবে না সে আমার চিন্তার অতীত। এই প্রার্থনাই জানাই যে আমার দেশে, আমার ভাষায় এতবড় সাহিত্যই জন্মলাভ করুক যার তুলনায় আমার লেখা যেন একদিন অকিঞ্চিৎকর হয়ে যেতে পারে।”
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
(সূত্র - শরৎ সমগ্র দ্বিতীয় খণ্ড, ১৯৮৯। কোটেশনের মধ্যেকার বক্তব্যের ভাষা ও বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।)

Comments

  1. B.Deb নমস্কার দাদা

    ReplyDelete
  2. নমস্কার।
    ঠিক চিনতে পারলাম না।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...