Skip to main content

নদীর শিয়রে বৃষ্টির মতো দু:খ ঝরে অহর্নিশ... দুঃখগাথার যতনে কাব্যসুখের প্রকাশ


কিছু দু:খ সারাটি জীবনকে যেন পুড়িয়ে নি:শেষ করে। বিস্মৃতির গর্ভে ফেলে দিতে চাইলেও তা সম্ভব হয় না। ফিরে ফিরে আসে আসে ভিন্ন ভিন্ন আবহে। কিছু দু:খ ভুলে যাওয়া যায় নতুনতর প্রাপ্তির আনন্দে। আবার কিছু দু:খ যত্ন করে তুলে রেখে দিতে হয় স্মৃতির ঝাঁপিতে কারণ সেই ঝাঁপি মাঝে মাঝে খুলে নিয়ে সেইসব দু:খগাথাকে বারবার আত্মস্থ করে নিতে ইচ্ছে হয় সুখের পরশ পেতে। এ বড়ই বিচিত্র এক অনুভূতি যেখানে দু:খের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সুখের আকর।
বাংলাদেশের সমৃদ্ধ বাংলা সাহিত্য জগতে পুলিন রায় একটি পরিচিত নাম। একাধারে কবি, গদ্যকার ও সিলেট থেকে প্রকাশিত স্বনামধন্য ‘ভাস্কর’ পত্রিকার সম্পাদক তিনি। ইতোমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ছয়টি কাব্যগ্রন্থ। স্মৃতিময় দু:খ আর দু:খের স্মৃতি নিয়ে তাঁর আবেগ-আসক্তি আছে, আছে প্যাশন। স্মৃতিকাতরতা আর দু:খব্যথা পাশাপাশি চলে তাঁর কবিতায়-
...মেঘলার চোখে কেবল দু:খজল
ডানা ঝাপটায় গুলিবিদ্ধ রঙিন এক পাখি,
যত্ন করে দু:খ পুষি মেঘলার হাসিমুখ দেখার অপেক্ষায়।
৪৮ পৃষ্ঠার গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট ৪০টি কবিতায় এভাবেই ফিরে ফিরে এসেছে স্মৃতিকাতরতা আর দু:খব্যথার অনুষঙ্গ। জীবনের ফেলে আসা পথ, কবির অত্যন্ত নিজস্ব পরিসর, তাঁর গ্রাম, জনপদ, নদী-খাল-বিল তাঁকে অহরহ ভাবায়, কাঁদায় আবার এভাবেই তার প্রকাশে এনে দেয় স্বস্তিসুখ। প্রথম কবিতা থেকেই তার আভাস -
বন ঘেরা পথ পেরোলেই/ সুদূরে ভাসে -/ চিত্রলেখার চোখ/ নদীতট উন্মুখ/ বসন্তবাউরীর ঠোঁটে/নীলাভ্র মেঘ,/ ওলো সই, ঘুঙুর কেন এত বাজে?/ বাঁশি কেন ডাকে?/ ...বনঘেরা পথ পেরোলেই/ সুরমার কল্লোল ধ্বনি এবং/ তার বুকের তানপুরা নিনাদ। (কবিতা - বন ঘেরা পথ পেরোলেই)। শব্দের উপযুক্ত ব্যবহার এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
হেমন্তে কি দু:খ ভেসে ওঠে মনমাঝারে? নাহলে এত এত হেমন্তকবিতা কেন গ্রন্থ জুড়ে। মনে হয় কবির আত্মগাথা, স্মৃতিগাথা হেমন্তেই সেজে ওঠে প্রকট হয়ে - অনবদ্য স্মৃতিমেদুর পঙ্‌ক্তি হয়ে -
হেমন্তমাঠে এখন জনকলরোল/ সোনার প্রলেপে মোড়া বিস্তীর্ণ খেত/ ...শিল্পিত আবহ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি/ পাকাধানের সায়রে।/ নদীর শিয়রে যেমন বৃষ্টি ঝরে/ তেমনি আমার মনেও অবিরল ঝরছে স্মৃতিবৃষ্টি/ ...চাষির ফসল কাটার দৃশ্যে হারিয়ে যাই/ ...শুকনো পাতানাচ আর ধান কাটার শব্দে সচকিত হলে/ বনজ ফুলের সুবাস নিয়ে গাছে ডালে ঝুলিয়ে রাখি প্রত্নইতিহাস।/ দূরে দেখা যায় হিজলের বন.../ দাঁড়িয়ে আছি পাকা ধানের সায়রে হেমন্তের রোদেলা দুপুরে। (কবিতা - হেমন্তের রোদেলা মাঠে)
এভাবেই নানা দৃশ্যকল্পে ভেসে আসে অগণিত দৃশ্যপট আর কপাট খুলে যায় এক এক করে স্মৃতিবাতায়নের। দেশ ও জাতির প্রতি ভালোবাসায় অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে ‘আমরা জেগে আছি’ কবিতায় যেমন কবি বাংলার সুখ দু:খে পাশে থাকার বার্তা জানিয়ে লিখেন - ওইখানে - ওই উর্বর সরোবরে/ বাসা বেঁধেছিল যে পাখি/ স্তব্ধ হয়ে গেছে তার গান/ আমাদের সমৃদ্ধ ইতিহাসের সড়ক থেকে/ মুছেনি রক্তের দাগ...বাঙালির কান্নার রোল ধ্বনিত হবেই চিরকাল/ ...আমরা জেগে আছি/ লক্ষ কোটি তোমার সন্তান/ বাংলা ভরে তুলবোই সোনার ফসলে/ আমরা জেগে আছি... তেমনি ‘বসন্তবাউরি’ কবিতায় দেশের মাটিকে ভালোবেসে কবি লিখেন - ভোরের কুয়াশা সরে সরে জাগে গ্রাম.../ স্বপ্নডানায় ভর করে কুড়াই জীবনের নুড়িপাথর,/ বাউল সন্ন্যাস আমি.../ পাতাঝরা শব্দে সচকিত হয়ে দেখি/ বুক ভরে আছে সুখ-দু:খের টানাপোড়েন...।
‘বেলাশেষে’ শীর্ষক শেষতম কবিতায় কবি যেন গ্রন্থের সমস্ত নির্যাস একত্রিত করেছেন সার্বিক অনুভূতির চমৎকার প্রকাশে -
ধু ধু প্রান্তরে কুড়াই পাখিগান, ফুলরেণু
বেলাশেষে নীল পাখিদল ধরে গান
কুয়াশা জড়ানো রৌদ্রছায়ায়
দখিনা বাতাস ছুঁয়েছে হৃদয়
বলাকার চোখে ঝরে সরস আবেগ
রঙিন পালকে আঁকা হয় প্রেমের চিত্র
মাঠের ওপারে মাঠ আর শস্য
করে কোলাকুলি
এই বেলাশেষে ইছাবায় দেখি
জলের নতুন নৃত্য।
এই কবিতায় কবি একসূত্রে গেঁথেছেন তাঁর ফেলে আসা দিনের যাবতীয় সঞ্চিত আবেগ - প্রেম, প্রকৃতি, রোদ-হাওয়া-কুয়াশা আর শস্যপ্রান্তর ও তাঁর অতি আপন ইছাবা নদীর জলধারায় এক নতুন জীবনের স্বপ্ন। এ যেন কবির কবিতাযাত্রার এক নিপুণ চিত্রাঙ্কন, এক নতুন কাব্যপথের দিশায় অগ্রগমন। 
পুরো গ্রন্থ জুড়েই অগণিত সরল, নান্দনিক ও স্মৃতিবিহ্বল পঙ্‌ক্তিমালা আর শব্দব্রহ্মের নান্দনিক কারিকুরি। ফ্ল্যাপে বিশিষ্ট কবি ও সমালোচক তৈমুর খান যথার্থই লিখেছেন - কবি ‘...কবিতায় অযথা আস্ফালন ও কল্পনাবিলাসকে প্রশ্রয় দেননি। বিষয়হীন গিমিক বা জটিল না-কবিতায় যেতে চাননি। নিজ সংস্কৃতি, আবহাওয়া আর ভৌগোলিক ভূখণ্ডকেই কবিতার উৎসমূলে রেখে দিয়েছেন। সেখান থেকেই মানবীয় চেতনার আলোয় উদ্ভাসিত করতে চেয়েছেন সত্তাকে। পানকৌড়ির মতো জীবনের সুখ-দু:খে ডুব মেরেছেন...।’
গ্রন্থের নান্দনিক প্রচ্ছদের সৌজন্যে আল নোমান। সাথে মানানসই নামলিপি। কাগজ, ছাপার স্পষ্টতা, অক্ষরবিন্যাস যথাযথ। তবে গ্রন্থের বাঁধাই, কিছু বানান ও কিছু পঙ্‌ক্তিবিন্যাসে হয়তো অধিকতর উৎকর্ষের পরিসর ছিল। পরিসর ছিল গ্রন্থকারের একটি ভূমিকারও। কবি আলোচ্য গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন ‘অনির্বেদ রায় প্রহর’কে। কবির এই বংশপ্রদীপকে উপলক্ষ করেই আছে একটি কবিতা - ‘নতুন জীবন’ - ‘...নতুন জীবনে আসুক পাথরে ফুল ফোটার মোহনীয় গান।’
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
‘যত্ন করে দুঃখ পুষি’     
পুলিন রায়
প্রকাশক - ভাস্কর প্রকাশন
মূল্য - ২০০ টাকা (বাংলাদেশ)

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত স্মরণ সংখ্যা ‘আলোহাওয়া’

একটি লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটপত্রিকা হচ্ছে সমাজের সাহিত্যদর্পণ । শুধুই সমকালিক নয়। যুগান্তরের ভাষাসাহিত্য ও তার যুগন্ধর স্রষ্টাদের সঙ্গে সমকালকে পরিচিত করে দেওয়ার এক প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম। আর একের পর এক এই লক্ষ্যেই উৎকৃষ্টতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি শহর থেকে প্রকাশিত ‘ সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক ’ পত্রিকা ‘ আলোহাওয়া ’ । রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার ১৯তম সংখ্যা - ২৫তম বর্ষ , পৌষ ১৪৩২ - ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যা । কবি জিতেন্দ্র নাথ সম্পাদিত এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যিক ‘ তুষারকান্তি নাথ স্মরণ সংখ্যা ’ হিসেবে । তুষারকান্তি নাথ এমন একজন সাহিত্যিক যাঁকে আখ্যায়িত করা যায় একজন সার্বিক সাহিত্যিক হিসেবে। ধারে ও ভারে তাঁর সৃষ্টি শুধু বরাক উপত্যকাতেই নয় এর বাইরেও সমাদৃত। তাঁর লেখনী রত্নপ্রসবা। পক্ষান্তরে এটাও বলা যায় যে ঘরে বাইরে কিছু স্বীকৃতি , কিছু প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকলেও তাঁর লেখালেখি ও নানাবিধ সৃষ্টিকর্মের গভীরতার মূল্যায়ন যতটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল ততটা কিন্তু হয়নি। আসলে প্রান্তিকতা সততই লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের পরিচিতির পথে এক বৃহৎ অন্তরা...

প্রখর গরজ ও শ্রদ্ধায় নিবেদিত একটি ‘সুকান্ত সংখ্যা’ - শতদল

হাতে নিলে আর পাঁচটা নিয়মিত সংখ্যা পত্রিকার মতো মনে হলেও উত্তর ত্রিপুরার চুড়াইবাড়ী থেকে কবি, লেখক রতন চন্দ সম্পাদিত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ‘শতদল’ পত্রিকার সম্প্রতি প্রকাশিত ২৯তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, বৈশাখ ১৪৩৩, মে-২০২৬ (কবি সুকান্ত জন্মশতবর্ষ সংখ্যা) সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রমী। সেই মাত্র ৪২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক সংস্করণ হলেও প্রচ্ছদ থেকে শেষ পৃষ্ঠা অবধি যতন, গরজ ও উৎকর্ষের এক সম্ভার বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না মোটেও। বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র স্থান ধরে আছেন অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর সময়কাল থেকে আজ অবধি এবং আগত-অনাগত চিরকালীন এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী এই কবি মূলত একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেই সাহিত্যবিশ্বে পরিচিত হলেও তাঁর কবিতায় এর বাইরেও যে রয়ে গেছে বহুমাত্রিক এক বোধ, ভাষ্য - বোধ করি তার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি আজও। তবে যতই তাঁকে নিয়ে চর্চা হবে ততই এক এক করে খুলবে বিস্ময়ের ঝাঁপি এ কথা অনস্বীকার্য। এবং তারই এক নির্মোহ প্রয়াস ও প্রকাশ আলোচ্য সংখ্যাটি। সুসজ্জিত কবি-প্রতিকৃতিযুক্ত একটি নান্দনিক প্রচ্ছদ - সজ্জায়, বর্ণ সংস্থাপনে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য পাঠকের। সৌজন্যে মুদ...