Skip to main content

স্বরচিত সাহিত্য ও আত্মোপলব্ধির অনবদ্য পুনরাবলোকন


১৫৬ পৃষ্ঠার গ্রন্থটির টাইটেল ভার্সো পেজে-এ বলা হয়েছে - ‘হৃদয়ে সঞ্চিত জীবনের আরব্ধ বাস্তব অভিজ্ঞতা ও কাল্পনিক আখ্যানসমৃদ্ধ সুচিন্তিত রচনাসমূহের সংকলন।’ আসলে গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট অধ্যায় বা বিষয়সমূহকে স্পষ্ট দুটি ভাগে শ্রেণিবদ্ধ করা যায় - স্মৃতিকথা ও স্বরচিত গল্প। গ্রন্থকারের ভাষায় একটি প্রবন্ধ/গল্প সংকলন।
লেখক নির্মলেন্দু চট্টোপাধ্যায়, গুয়াহাটির পাণ্ডুস্থিত বিদ্যামন্দির উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যক্ষ। একজন শিক্ষকের জীবন অভিজ্ঞতা ও মূল্যবোধ অপরিমেয়। প্রকৃতার্থেই তাঁরা ‘মানুষ গড়ার কারিগর’। আর এই মানুষ গড়তে গিয়েই জীবনের বিচিত্র সব ঘটনা, পরিঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকেন তাঁরা। তারই এক উৎকৃষ্ট নিদর্শন আলোচ্য গ্রন্থটি। অশীতিপর এই জ্ঞানতপস্বী বড়ই যত্ন করে ধরে রেখেছেন তাঁর জীবনের কখনও ভুলতে না পারা মুহূর্তের বহু ছবি - স্মৃতিমূলক নিবন্ধে, গল্পের ছলে।
শুরুতেই ভূমিকায় গ্রন্থের নির্যাস তথা প্রয়োজনীয় তথাদি সংযোজন করে পাঠের খেই ধরিয়ে দিয়েছেন বিশিষ্ট লেখক, সম্পাদক প্রমোদ রঞ্জন সাহা। গ্রন্থকার সম্পর্কে কিছু কথা এখান থেকে - ‘…কর্মজীবনে তিনি ছিলেন একজন কৃতী শিক্ষক। …অবসর প্রাপ্তির পর হাতে তুলে নিয়েছেন ‘লেখনী’। অন্তরের ভাব-ভাষা এতদিনকার শিক্ষকতাজীবনের অভিজ্ঞতাপূর্ব ধ্যান ধারণা, ভালো-মন্দ ইত্যাদি নিয়ে যখন যা তাঁর লেখনীতে উঠে এসেছে, তারই একাংশ নিয়ে বর্তমান ‘খেয়ালি কলম’ গ্রন্থটি…। আলোচ্য গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট রচনাগুলো পাঠ করলে বোঝা যায় তিনি লেখার নামে বা সাহিত্যের অছিলায় মোটেই শৌখিন মজদুরি করেননি…।’
গ্রন্থকারের নিবেদনে লেখক লিখছেন - ‘…১৯৬১ সাল থেকে ২০০০ সাল… চারদশকের চাকরি জীবনে বিভিন্ন ভাষাভাষী ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকবৃন্দকে খুব কাছে থেকে দেখা ও জানার সুযোগ হয়েছিল। আজ আমার ছাত্রছাত্রীরা বড় হয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিত…। মানুষের জীবনে সুখ-দু:খ পর্যায়ক্রমে আসে। আমিও তার ব্যতিক্রম নই…এইসব নিয়ে আমার জীবন-অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরে উঠেছে…। আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত বিদ্যামন্দির স্কুল সাহিত্য পত্রিকা ‘সবুজপত্র’… এই ১৯৬১ সালে প্রকাশিত ‘সবুজপত্র’ই সমগ্র উত্তর পূর্বাঞ্চল থেকে প্রকাশিত প্রথম সাহিত্য পত্রিকা যা আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল…। এই গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট লেখাগুলো প্রায় সবই বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। লেখাগুলোর বিষয়বস্তু যথাসম্ভব অপরিবর্তিত রেখে কাহিনি ও গল্পের স্বার্থে স্থান, কাল ও পাত্র পরিবর্তন করা হয়েছে। এই সাহিত্য পত্রিকাগুলো হল যথাক্রমে - সাত সমুদ্দুর, পাণ্ডু রেস্ট ক্যাম্প শারদীয় সংখ্যা স্মরণিকা, বাংলা সাহিত্য সভা, অসম-এর মুখপত্র সংযোগ, খারুপেটিয়া থেকে প্রকাশিত দ্বিভাষিক সাহিত্য পত্রিকা ঐকতান, চেতনা, ফিরে দেখা, বৃহত্তর পাঞ্জাবাড়ি সাহিত্য সভা, বরপেটা রোড থেকে প্রকাশিত  কিঞ্চিৎ, বৈশাখী ইত্যাদি।…
গ্রন্থে অনেকগুলো অধ্যায় এবং বেশ কিছু গল্প রয়েছে যার প্রতিটির বিশদ আলোচনার পরিসর নেই। সূচিপত্র ধরে এগোলে প্রবন্ধ-নিবন্ধ-স্মৃতিকথায় রয়েছে - ‘আমার স্কুলজীবন - স্মৃতি সততই মধুর’ অধ্যায়ে সন্নিবিষ্ট ৩টি সুখপাঠ্য রচনা। ‘বিদ্যামন্দির - আমার কর্মজীবনের আঁতুড়ঘর’ অধ্যায়ে ৫টি, ‘খারুপেটিয়া - উজ্জ্বল মনের মণিকোঠায়’ অধ্যায়ে ২টি, ‘ওই মহামানব আসে’ অধ্যায়ে ৬টি, ‘বিচিত্র প্রবন্ধ : ডায়ারির ঝরা পাতা’ অধ্যায়ে ৩টি - মোট উনিশটি সুলিখিত, সুপাঠ্য ও সুখপাঠ্য নিবন্ধ/রচনা। একট রচনা ইংরেজিতে।
‘বিচিত্র গল্প - কলমের আঁকিবুঁকি’ অধ্যায়ে সন্নিবিষ্ট হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে লেখা মোট ১৩টি গল্প। প্রতিটি গল্পের মধ্যেই নিহিত রয়েছে এক গভীর সমাজ-সচেতনতা, সম্পর্ক ও সিদ্ধান্তের বার্তাবহ কাহিনি। অধিকাংশ গল্পই পিতৃমাতৃর প্রতি প্রতিষ্ঠিত (বিশেষ করে নামিদামি চিকিৎসক) পুত্রসন্তানের অনাদর ও অবহেলার এক করুণ চিত্র। রয়েছে এর বিপরীতে অনাত্মীয়েরও আত্মীয় হয়ে ওঠার মতো সদ্ভাবনার বার্তা, কালো মেয়ের বিড়ম্বনা ও অধ্যবসায়ের গুণে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার গল্প। প্রতিটি গল্প এতটাই প্রাঞ্জল ও সারকথাসংবলিত যে এক পঠনে শেষ না করে ওঠা সম্ভব নয়। ভাষাসাহিত্য, অলংকার নয় - গল্পের ভিতর নিহিত বিষয় ও বার্তাকেই প্রধান উপজীব্য করেছেন লেখক। রয়েছে অসমিয়ে ভাষায় লেখা একটি গল্পও। সব মিলিয়ে এক সুখপঠনের সার্বিক গ্রন্থ - ‘খেয়ালি কলম’।
গ্রন্থের ছাপার স্পষ্টতা, অক্ষরবিন্যাস, বাঁধাই সবই যথাযথ। কিছু বানান ও কিছু ছাপাবিভ্রাট সহজেই পরিহার্য। নান্দনিক প্রচ্ছদ ও নামকরণের সৌজন্যে প্রদ্যোৎ চক্রবর্তী। লেখক গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর পিতা পণ্ডিত কিরণময় চট্টোপাধ্যায় ও মাতা অমিয়প্রভা চট্টোপাধ্যায়কে। প্রাসঙ্গিক কিছু ছবি ও অলংকরণ গ্রন্থের মর্যাদা বাড়িয়েছে।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
‘খেয়ালি কলম’ - নির্মলেন্দু চট্টোপাধ্যায়
মূল্য - সৌজন্য
প্রকাশক - চায়না চট্টোপাধ্যায়

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...