তত্ত্ব ও তথ্যের যথেষ্ট জ্ঞান বা সম্ভার না থাকলে প্রবন্ধ সাহিত্যের অঙ্গনে অন্তর্ভুক্ত হওয়া বড় সহজ কথা নয়। বিষয়ভিত্তিক তথ্যের উপর যথোচিত প্রজ্ঞা এক্ষেত্রে এক অতি আবশ্যকীয় মাপকাঠি। আর প্রবন্ধ সংকলন যাঁর প্রকাশিত হয় তাঁর চর্চা ও মেধা কতটুকু বিকশিত হলে এমন কার্য সম্পন্ন হয় তা অতি সহজেই বোধগম্য।
কবি, লেখক গোপাল চন্দ্র দাসের সদ্যপ্রকাশিত প্রবন্ধ সংকলনটি উপর্যুক্ত যাবতীয় মাপকাঠিকে ছাড়িয়ে গেছে অনায়াসে। লোকসংস্কৃতি বিষয়ক ৮টি প্রবন্ধযুক্ত ১২৮ পৃষ্ঠার সংকলন গ্রন্থে এমন একটি প্রবন্ধ আছে যার ব্যাপ্তি ৪৮ পৃষ্ঠা। অর্থাৎ বলা যেতে পারে একটি তিন ফর্মার একক গ্রন্থই হয়ে উঠতে পারত এই প্রবন্ধটি। বিশেষ করে আজকের দিনে যখন দেখা যায় ৪৮ পৃষ্ঠার কবিতা কিংবা অণুগল্পের সংকলন প্রকাশিত হচ্ছে আকছার।
ব্লার্বের প্রথম ফ্ল্যাপে অত্যন্ত গোছানো এবং সার্বিক একটি লেখক পরিচিতি থাকলেও ব্লার্বের দ্বিতীয় ফ্ল্যাপ ও শেষ প্রচ্ছদ খালি থেকে গেছে। কোথাও প্রকাশকের তরফে গ্রন্থ সম্পর্কিত তথ্যাদি সন্নিবিষ্ট করা যেত। অবশ্য এর পরিবর্তে গ্রন্থের নান্দীমুখেই রয়েছে ‘প্রকাশকের কথা’ - যেখানে বিশিষ্ট লেখক অমিত চট্টোপাধ্যায় লিখছেন - ‘...লেখার মধ্যে তথ্য ও তত্ত্বের মিশ্রণ যথেষ্টই বিদ্যমান...।’ আবার রয়েছে ‘লেখকের কথা’ও যা থেকে জানা যায় কিছু প্রবন্ধ পূর্ব প্রকাশিত। গ্রন্থে তা সন্নিবিষ্ট হতেই পারে। এতে দোষের কিছু নেই। লেখক লিখছেন - ‘...প্রবন্ধগুলো আমার চিন্তাভাবনা এবং বিভিন্ন সময়ের অনুভূতি ও গবেষণার প্রতিফলন...।’
একে একে যে নিবন্ধগুলি রয়েছে সেগুলি হচ্ছে - ঊনকোটি উত্তর ত্রিপুরা, বরাক ও মৌলভীবাজার অঞ্চলের প্রাচীন লোক-চিকিৎসা ও তন্ত্র-মন্ত্র সাহিত্য’, ‘হাসন রাজা : এক রাজর্ষি বাউলের সংগীত দর্শন ও সম্প্রীতির মর্মপাঠ’, ‘লোককবি রাধারমণ দত্ত : সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও লোকসংগীতের জীবন্ত কিংবদন্তি’, ‘রবীন্দ্রনাথ : রাস-নৃত্য ও কুমারঘাটের নীলেশ্বর মুখার্জী’, ‘হারিয়ে যাওয়া কয়েকটি ব্রত-পূজা’, ‘লোকায়ত ঘাটু গান’, ‘লোকায়ত জাগগান’ ও ‘প্রেম-সাধক বৈষ্ণব কবি দীন ভবানন্দ’। সহজেই অনুমেয় যে প্রতিটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং লোকায়ত সংস্কৃতির আরক। অধিকাংশই বর্তমানে হারিয়ে-যাওয়া। স্বভাবতই এসবের তথ্যাদি সংগ্রহ অত্যন্ত কঠিন কাজ। এবং এই দুরূহ কাজটিই করেছেন গবেষক নিবন্ধকার। প্রতিটি অধ্যায়েই বর্ণিত আছে যথেষ্ট তথ্যাদি যার আহরণ বস্তুত এক একটি আবিষ্কার হিসেবেই গণ্য হতে পারে। অধ্যয়ন ও ক্ষেত্রসমীক্ষা এক্ষেত্রে অবশ্যকর্তব্য। সেই কাজটিই সুচারু রূপে করার যথাসম্ভব প্রচেষ্টা অনুধাবন করা যায় অধ্যায়গুলির অধ্যয়নে। হাসন রাজা ও লোককবি রাধারমণ দত্ত পূর্ববঙ্গ ও বর্তমান উত্তরপূর্ব ভারতে বহুশ্রুত ও বহুনন্দিত ব্যক্তি। তাঁদের অবদান লোকসাংস্কৃতিক ক্ষেত্রকে উজ্জ্বল করেছে। আজও এই ধারা প্রবহমান। বৈষ্ণব কবি দীন ভবানন্দ বলা যায় এতদিন অনাবিষ্কৃতই ছিলেন। বর্তমান সময়ে তাঁর বহু কর্মের সন্ধান পাওয়া যা শুধু বিস্ময় নয়, যুগপৎ আগ্রহের সৃষ্টি করে চলেছে গবেষকদের। বিস্মিত হতে হয় তাঁর জীবন ও সৃষ্টিসম্ভারের ব্যাপকতায়। গ্রন্থের সর্ববৃহৎ অধ্যায় তাঁকে নিয়েই লিপিবদ্ধ করেছেন লেখক প্রাঞ্জলভাবে।
লেখকের স্বস্থান কুমারঘাটের নীলেশ্বর মুখার্জীর কর্মকাণ্ডকে লেখক তুলে এনেছেন বিস্তৃত পরিসরে। কবিগুরুর অত্যন্ত স্নেহভাজন ছিলেন এই নৃত্য-গীত গুরু নীলেশ্বর মুখার্জী। চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্যে অর্জুনের সহচর হিসেবে অসাধারণ অভিনয় করে কবিগুরুর সনেহভাজন হতে পেরেছিলেন তিনি। ত্রিপুরার কুমারঘাটের মশাউলি গ্রামে আজও তাঁর বাড়িতে প্রতি বছর আয়োজিত হয় অনুষ্ঠান। গ্রন্থকার লিখছেন - ‘...বিশ্বের ললিত কলাবিদদের দরবারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্রাটের মতো পৌঁছে দিয়েছেন মণিপুরি নৃত্যকে। তাঁর পার্ষদ রূপে নীলেশ্বর মুখার্জী খুবই সুনিপুণভাবে পালন করেছেন নিজ ভূমিকা। মণিপুরি নৃত্যনাট্যের সফল রূপায়ন নীলেশ্বর মুখার্জীকে বাদ দিয়ে মোটেই চিন্তা করা যাবে না...।’
গ্রন্থের কাগজের মান ও ছাপার স্পষ্টতা যথাযথ হলেও বেশ কিছু বানান ও কিছু ছাপার বিভ্রাট রয়েছে। উমা মজুমদারের প্রচ্ছদ নান্দনিক হলেও জ্যাকেট মানসম্পন্ন হয়নি। সব মিলিয়ে বহিরঙ্গকে বাদ দিলে অন্তরঙ্গতা ও আন্তরিকতায়, আয়োজনে, উদ্যোগে অনবদ্য একটি গ্রন্থ, যা উৎসর্গ করা হয়েছে ‘জাতীয় লোকসংস্কৃতি পরিষদের সকল সদস্য/সদস্যাকে’। গ্রন্থাভ্যন্তরের কথা আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় বিস্মৃত অতীতে - আজও, এই দু:সময়েও যার রসাস্বাদনে নন্দিত, বন্দিত হয় হৃদয় - তাই হয়তো এই সার্থক গ্রন্থনাম। সার্বিক লোকসংস্কৃতি বিষয়ক প্রবন্ধের নি:সন্দেহে এক সংগ্রহযোগ্য সংকলন।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
‘দু:সময়ের উত্তরীয়’ - গোপালচন্দ্র দাসপ্রকাশক - কালজয়ী, হাওড়া।
মূল্য - ২৫০ টাকা।

Comments
Post a Comment