Skip to main content

আমরা মুখোমুখি মোমবাতি আর বিচারের বিস্মিত দূরত্বে... পরাবাস্তব কবিতায় বাস্তবের পোস্টমর্টেম


কার আবেগ কার অন্ত্যমিলে হাত বুলাই
কার পথের পাশে সন্ধ্যাকে টেনে নামিয়ে
দাঁড়িয়ে থাকি অনন্ত অপেক্ষার মতো

পেপারব্যাকের ফিসফিস শব্দ কানে আসে
অসংখ্য নগর বন্দর অরণ্য নদী
আমার উপকূলে নোঙ্গর তোলে

লোহার শেকল জোনাকি হয়ে রাত জাগে
পোতাশ্রয় চুপ করে থাকে (কবিতা - নীরবতার রং কালো)
সহস্র কথা-ব্যথা-উচ্চারণের অভীপ্সা নিয়ে চুপ করে থাকে পোতাশ্রয়। কবিও কি তেমনই ? এমনই প্রশ্নের সামনে কবি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন সমবেত পাঠকমণ্ডলীকে। ছত্রে ছত্রে, স্তবকে পঙ,ক্তিতে অগুনতি হ্যালুসিনেশন আর পরাবস্তুবতাকে মিশিয়ে দিয়ে কবিতার নতুন সংজ্ঞা গড়তে চেয়েছেন কবি মধুমিতা ভট্টাচার্য। তাঁর সাম্প্রতিকতম কাব্যগ্রন্থ ‘পোতাশ্রয়’-এর প্রতিটি কবিতার প্রতিটি লাইন এক একটি জিজ্ঞাসা, এক একটি সত্যান্বেষণ, এক একটি ট্যাগলাইন হয়ে উঠেছে, যারা আঙুল উঁচিয়ে প্রশ্ন করে যায় সমবেত নাগরিককে। বস্তুত গ্রন্থের অন্তর্গত প্রতিটি কবিতা নিয়ে এক একটি আলাদা আলোচনা হতে পারে, হতে পারে এক একটি স্তবক কিংবা পঙ্‌ক্তি নিয়েও। আধুনিক কবিতার অবোধ্যতা কিংবা শব্দের নিষ্ফল মাথা কুটে মরার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি কোথাও, বরং প্রতিটি কবিতাই বিঁধে যায় মননে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে। হ্যালুসিনেশন গড়তে গড়তে কবি আস্ত একটি কবিতাই লিখে ফেলেছেন ‘হ্যালুসিনেশন’ শিরোনামে। তুলে দেওয়া যায় অনায়াসে কারণ কোনো কবিতাই এতটা দীর্ঘ নয়। স্বল্প কথায়, হ্যালুসিনেশনে কবি মিশিয়ে দিয়েছেন মেসমেরাইজেশন -
আমার চায়ের কাপে সমুদ্রের চুমুক/ নদী আঁকা ঝরনা আঁকা/ তুমি রেখেছ পেয়ালা ভরে/ চুমুকে মদিরতা আঁকা/ তোমার লাঞ্চ বাক্সের উপর যে মেয়েটির ছবি/ সে কখনো চোখ মেলায়নি/ কাটা চামচে/ তার বুক এঁকেছ/ সে মেয়েটি আমি নই/ শুধু চোখগুলো আমার...।
হ্যালুসিনেশন কিংবা সুরারিয়্যালিজম বজায় থাকলেও কবি হেঁটেছেন বহুদূর। পৃথিবীর যত জঞ্জালকে আক্রমণ করেছেন, আঘাত করেছেন শব্দবাণে। কবি গেয়েছেন ভাষার গান, উন্মোচিত করেছেন নিজের ব্যথার জায়গা। করেছেন জন্মদাতা ও জন্মদাত্রীর নির্মোহ উপস্থাপন, ‘মেয়েবেলার বান্ধবী’দের স্মরণ। পরমুহূর্তেই আবার বাস্তবকে মহিমামণ্ডিত করেছেন পরাবাস্তবের মোড়কে। প্রতীকবাদ ও প্রতিবাদ মুহুর্মুহু ঝরে পড়েছে কবিতায় - ফরাসি কবি বোঁদলেয়ারের আদলে -
...কখন প্রতিবাদের পা মিছিল ছাড়িয়ে/ আগুন হয়ে উঠবে/ সে অপেক্ষায় আমি ধর্ষিতার চোখে তাকাই না/ শব ঢাকি না সাদা কাপড়ে/ রক্ত ঝরছে ঝরতে থাকুক/ আরো ঝরবে/ দেশ নগ্ন হচ্ছে হতে থাকুক/ আরো নগ্নতা বাকি/ গণহারে ধর্ষণ করে যে দেশে ধর্ষক জনগণ হয়ে ওঠে/ প্রতিটি ধর্ষণ শেষে পতাকার গায়ে রক্ত মোছে/ সে দেশে প্রতিবাদের হাত পা/ মোমবাতির আলোয় বেলিড্যান্স করছে (কবিতা - প্রতিবাদ হচ্ছে)। কবি মধুমিতা দেখেছেন সমাজের কলুষতা, লেখনীকে করেছেন হাতিয়ার। শ্লেষ, প্রতিবাদ ও বিদ্রোহের পঙ্‌ক্তি লেখা হয় অবিরল। থেমে থাকা তাঁর কর্ম নয়। তাই কোনো কবিতায় দাঁড়ি নেই, আছে বড়জোর কমা। নিজের হৃদয় জুড়ে অবস্থান করা নানা সত্তাকে উন্মোচিত করে কবিতার গায়ে প্রোথিত করেন পঙ্‌ক্তিমালা। তাই তো অসংখ্য ট্যাগলাইনে মুখরিত তাঁর কবিতা -
রাত মৃত্যুর মতো সুন্দর...
শহরশুদ্ধ লোক রাত জাগলে আমার কী...
আমি অন্ধকারের মুখোশে ঢাকা ঝরা পাতা...
আকাশ ভেঙে পড়ার আগে সমর্পিত সূর্যের কাছে নতজানু হতে হয়...
উর্বর জমিতে যুবক আত্মহত্যার বিষ নিয়ে পালিয়ে গেলে বাবা তার মুখে তুলে দেয় ড্রাগসের মন্ত্রপূত আয়ু...
শহরের নখ লম্বা হতে হতে বাবাদের বুকপকেট ছিঁড়ে ফেলে...
ঘামের রং লাল হয়ে এলে দেশজ উৎসবে বাসন্তী পোলাও হবে...
ধানের চিতাভস্মে আঁকা হয় মাইল ফলক...
পৃথিবীর জন্মদিনে জেগে উঠুক গতরাতে মৃৎ বিশ্বাসের ধূসর ফার্ন...
গুলিবিদ্ধ হবার পূর্ব মুহূর্তে আমাকে ডেকে দিও অপূর্ণ পঙ্‌ক্তিগুলো লিখে ফেলি...
যে জলকবুতরের চোখে আমি নদীর শব্দ শুনেছি তার বুকের ভেতর মৃৎ মাছেদের ফসিল...
শহর গড়িয়ে ক্ষুধা নেমে এলে দেশে আত্মহত্যার আয়োজন হয়... এবং আরও আরও বহু।
রয়েছে স্রোতের বিপরীতে বহু কথা ও কবিতা। কিছু সটান, কিছু ইঙ্গিতপূর্ণ (যেমন কবিতা - অনুবাদ, কবিতার শরীরে ক্ষত ইত্যাদি)। আবার কখনও নেমে আসে হতাশার ছায়া। যেমন কবিতা - গাছেদের ঘর। এভাবেই কবি যেন নিজেকেই করেছেন কাটাছেঁড়া। কিছু সাহসী উচ্চারণ পাওয়া যায় কিছু কবিতার অন্দরে। যেমন - নেরিয়াম, তোমাকে চিনেছি, অকালমৃত্যু, চুপ থাকতে দাও ইত্যাদি। অধিকাংশ কবিতাই সুখপাঠ্য, সুপাঠ্য হিসেবে বিবেচিত হতে বাধ্য।
৬৪ পৃষ্ঠার পাকা বাঁধাই গ্রন্থের ৫৮ পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে ৫৫টি কবিতা। এর মধ্য থেকে আলাদা করে উল্লেখের কোন পরিসর নেই। বাছাই করার জো নেই শ্রেষ্ঠ কবিতাকে। প্রতিটি কবিতা আখরে, শব্দে, আবেদনে, এক একটি হৃদিকথা হয়ে উঠেছে। গ্রন্থের ছাপার স্পষ্টতা, বাঁধাই, কাগজের মান যথযথ। নান্দনিক প্রচ্ছদের সৌজন্যে গীতশ্রী চ্যাটার্জি। জ্যাকেট কভার ব্লার্বের প্রথম ফ্ল্যাপে পরিসর ছিল প্রকাশকের তরফে গ্রন্থবিষয়ক সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরার। আধুনিক বানানের প্রয়োগ পরিলক্ষিত হয়েছে যদিও থেকে গেছে কতিপয়। সব মিলিয়ে এক গহিন পঠনের কাব্যগ্রন্থ, যার প্রতিটি কবিতা - ‘না পড়লেই নয়’।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
‘পোতাশ্রয়’ - মধুমিতা ভট্টাচার্য
প্রকাশক - স্রোত প্রকাশনা, ত্রিপুরা
মূল্য - ২০০ টাকা

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...