উত্তরবঙ্গের বাসিন্দা, কবি উৎপলেন্দু পাল। চিত্রকল্পের কবি। আগরতলার দৈনিক বজ্রকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক, কবি রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ দ্বারা প্রকাশিত উৎপলেন্দুর সাম্প্রতিকতম ভূমিকাবিহীন, সূচিপত্রবিহীন এই কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ। ৪৮ পৃষ্ঠার স্যাডল স্টিচ কাব্যগ্রন্থে রয়েছে ৫ থেকে ১৬ পঙ্ক্তির মোট ৪৪টি কবিতা। শেষ প্রচ্ছদে ব্লার্ব হিসেবে প্রকাশক লিখছেন - ‘…কবি তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে বর্তমান সময়ের বিমূর্ত চিত্র আঁকার চেষ্টা করেন। মানুষ যে স্বাধীনতা নিয়ে জন্মায় ক্রমশ তা হারিয়ে ফেলে একটা ক্ষুদ্র বৃত্তের ভেতর গুটিয়ে যায়…।’
সম্ভবত এই ভাব ও বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে এমন গ্রন্থনাম। প্রকৃতার্থে প্রতিটি কবিতাতেই যেন ভেসে উঠেছে এক একটি বিচিত্র চিত্রকল্প। আর সেইসব অনিয়ম, বেহাল সমাজচিত্র থেকে বেরিয়ে আসার এক তীব্র প্রয়াস। প্রথম কবিতাতেই এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায় - চলো একবার ধ্যান করতে বসি/ ক্লান্ত যাপনের ক্ষতচিহ্নগুলি ফেলে এসে/ শরীরকে টেনে নিয়ে বসাই কোনো নির্জন উপদ্বীপে.../ মুণ্ডিত মস্তকে ডুব দিই কালের ত্রিবেণীসঙ্গমে/ চলো অন্তত একবার ধ্যান করতে বসি। (কবিতা - চলো ধ্যান করতে বসি)।
আসলে কবি নিজেই কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত তাঁর কবিতাসৃষ্টিতে। কবিতার ছবি নাকি ছবির কবিতা? শেষ কবিতায় তারই উত্তর খোঁজার এক মরিয়া প্রয়াস। কবি লিখেন -
কাল সকালের দিকে
ঘাসের উপর লেগেছিল কিছু রক্তের দাগ
দুপুর পর্যন্ত তাকে মাড়িয়ে গেছে
কতো চেনাঅচেনা ঘামগন্ধী মানুষের পা
সন্ধের ঠিক আগে কে যেন
একটা সাদা ফুল ছুঁড়ে দিয়েছিল ওখানে
তারপর রাত বাড়তেই
ঝমঝম ধারাপাতে ভেসে গেছে সেই ফুল
ধুয়ে গেছে সব রুধিরের দাগ
আজ সকালে সেটা শুধুই একটা মনছবি।
(কবিতা - মনছবি)
আসলে সবই মনছবি, জলছবি শুধু। মানুষ এটাই এঁকে যায় জীবনভর। আর কবি সেই ছবিকেই অক্ষরে জীবন্ত করে তোলেন। তাই সৃষ্টি হয় এক একটি মনমাতানো কবিতা, এক একটি সমকালিক ভাবনার উপর যুক্তিপূর্ণ কবিতা। এমনই কিছু কবিতা রয়েছে এই গ্রন্থে। যেমন - ‘ভাত ও কবিতা’, ‘এখন উলঙ্গ হওয়ার সময়’, ‘যাপনশৈলী’, ‘প্রতিবাদ’, ‘ছায়াযোদ্ধা’ ইত্যাদি। তাই তো কবির কলমে উঠে আসে কিছু অনাবিল পঙ্ক্তি -
আমি কবিতার গন্ধে মাতাল হয়েছি শুধু/ ভাতের গন্ধে চেতনা ফিরেছে পুনর্বার...
আমাকে একটা জ্বলন্ত শ্মশানের ছবি এঁকে দিও/ সেটাকে যত্ন করে টাঙিয়ে রাখব আমার সিথানের দেওয়ালে...
পথগুলো চিরকাল বয়ে চলে নীরব নিরলস/ কোনো না কোনো ঠিকানাবিহীন রাজপথের খোঁজে...।
এভাবেই সবগুলো কবিতায় সমকালের ছবি এঁকেছেন কবি।
কবিতা কঠিন নয়, নির্ভীক কবি উৎপলেন্দুর কবিতায় আছে কিছু কঠিন শব্দের বহুল ব্যবহার। এতে পাঠসরলতা কিছু ব্যাহত হতে পারে। কিছু কবিতা সরলপথে শুরু হয়েও নদীর মতো আঁকাবাঁকা হয়ে গেছে আনমনে। মনে হয় যেন ঝটিতি লেখা। আছে কিছু বানান বিভ্রাট। এসব কাটিয়ে কবিতায় বাস্তব ও কল্পনার এক সবাকচিত্র এঁকেছেন কবি তাঁর অধিকাংশ কবিতায়। ছাপার স্পষ্টতা, অক্ষরবিন্যাস যথাযথ হলেও ফন্ট পঠনবান্ধব নয়। তাছাড়া ভূমিকা ও শিরোনাম কিন্তু একটি গ্রন্থের অপরিহার্য অঙ্গ। এসব বাদ দিলে চলবে কেন? অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টের নান্দনিক প্রচ্ছদ। কাগজের মান যথেষ্ট ভালো। কবি গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর ‘স্বর্গীয় পিতৃদেব মুকুল চন্দ্র পালকে’।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
‘বৃত্তের ভেতর গুটিয়ে গেছে জীবন’ - উৎপলেন্দু পালপ্রকাশক - রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ, দৈনিক বজ্রকণ্ঠ, আগরতলা
মূল্য - ১৩০ টাকা

Comments
Post a Comment