Skip to main content

ধারাবাহিকতার এক প্রত্যয়িত নিদর্শন - ‘সীমান্তরশ্মি’ - ১২শ সংখ্যা


মনোলোভা রঙে চিত্রিত অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টের নান্দনিক চিত্র সংবলিত একটি প্রচ্ছদ প্রথমেই নজর কেড়ে নেয় পাঠকের। ছিমছাম একটি পত্রিকা সংখ্যা হাতে তুলে নিতে দ্বিধা কাটিয়ে তোলে নিমেষে। শ্রীভূমি থেকে নিয়মিত প্রকাশিত ‘সীমান্তরশ্মি’ পত্রিকার দ্বাদশ সংখ্যার এই অপূর্ব প্রচ্ছদের সৌজন্যে মানস ভট্টাচার্য।
৭২ পৃষ্ঠার ১/৪ ট্যাবলয়েড রেগুলার সাইজের পত্রিকার অভ্যন্তরেও যে নান্দনিকতা নেই তা বলা যাবে না মোটেও। ছোটপত্রিকার সম্পাদকের দায়বদ্ধতা ও বাধ্যবাধকতার পাশাপাশি সামান্যকে অসামান্য করে তোলার সম্পাদকীয় প্রচেষ্টা অক্ষুণ্ণ রেখেছেন সম্পাদক। গদ্য ও পদ্যের সমাবেশে পদ্যেরই পাল্লা ভারী অন্যান্য সংখ্যারই মতো। তবে ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়নি, বিশেষ করে কিছু ভিন্নধর্মী কবিতার সন্নিবেশে। সম্পাদকীয়তে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আত্মোপলব্ধি রয়েছে যার সম্যক উল্লেখ প্রাসঙ্গিকতার দাবি রাখে - ‘...আমরা খুব কম সংখ্যক লোক একটি বৃহৎ নৌকার সওয়ার, তবে আমরা এক গোষ্ঠীভুক্ত নই, আমরা বিভক্ত... বিচ্ছিন্ন এবং আত্মম্ভরি মানসিকতা নিয়ে ছোট নৌকার সওয়ার হয়ে বিশাল সাহিত্য নামক নদী পার হওয়া শুধু কঠিন নয়, অসম্ভবও। ...আমরা নিজের মুখ আয়নায় দেখি না। আমাদের অহং নিজেকে স্বঘোষিত মহান করার যত আয়োজন... জানি না আমাদের চেতনা কবে হবে। তারই সন্ধানে দিনাতিপাত করছি...।’ 
সেই চেতনার সন্ধানে সৃষ্টিমূলক এই সংখ্যাটির অন্দরে এক এক করে এগোলে প্রথমেই দেখা যায় সূচিপত্রে ভৌগোলিক অবস্থানগত বিভাগবিন্যাসে বিন্যস্ত রয়েছে বিষয়সমূহের খতিয়ান। একদিকে যদিও কবি লেখকদের ভৌগোলিক অবস্থান আজকের দিনে ততটা মানে রাখে না অন্যদিকে আবার পাঠকের প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় এই বিন্যাসে। সুতরাং পরীক্ষামূলকভাবে চলতেই পারে এই অভিনব বিন্যাস। স্বভাবতই প্রকাশস্থান শ্রীভূমির কবি লেখকদের এখানে পাল্লা ভারী। এছাড়া শিলচর, হাইলাকান্দি, গুয়াহাটি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গের একগুচ্ছ কবি লেখকদের সমাগমে সেজে উঠেছে সংখ্যাটি। তবে আলোচনার সুবিধার্থে গদ্য ও পদ্য এই দুই ভাগেই নাহয় এগনো যাক।
গদ্য বিভাগের সম্ভারে বিশেষোল্লেখে রাখতে হয় যেগুলো তার মধ্যে রয়েছে চান্দ্রেয়ী দেব-এর একটি অনন্য অণুগল্প ‘লাইভ পোট্রেট’ ও ড. গীতা সাহার প্রবন্ধ ‘বিশ্বের গর্ব - রবীন্দ্রনাথ’। এছাড়া গদ্য বিভাগে কলম ধরেছেন সুমি দাস, গীতা মুখার্জি ও জয়ন্তী নাথ। যতি চিহ্নের অপব্যবহারে ও বিশেষণের অভাবে বিধস্ত হয়েছে সুমির সুন্দর অণুগল্প। জয়ন্তীর গবেষণাধর্মী লেখাটি নিশ্চয়ই গবেষণাপত্রের পর পুনঃপ্রকাশিত। ছোটপত্রিকায় প্রবন্ধাকারে লেখা রচনাই কাঙ্ক্ষিত। সম্পর্কের ভাঙাগড়ার আবহে গীতা মুখার্জির বাহবাযোগ্য অণুগল্প বড়ই সটান। আরও খানিকটা পরিপার্শ্ব যুক্ত হলে নান্দনিক হয়ে উঠত।
কবিতা বিভাগটি বিস্তৃত। বিস্তৃত ভাবনার বুনোটে নানা আঙ্গিকের কবিতায় বিন্যস্ত হয়েছে সংখ্যাটি। বিশেষোল্লেখে যাঁদের রাখতে হয় - সুদীপ ভট্টাচার্য, রঞ্জিতা চক্রবর্তী, ছন্দা দাম, নারায়ণ মোদক, শতদল আচার্য, রাণা চক্রবর্তী, শঙ্করী চক্রবর্তী, অনামিকা শর্মা, ঋতা চন্দ, দেবলীনা সেনগুপ্ত, গীতশ্রী ভট্টাচার্য, গীতাঙজলি রায়, গোপালচন্দ্র দাস, অভীক কুমার দে প্রমুখ। আরণ্যক বসু, বরুণ চক্রবর্তী, পার্থ বসু ও চাতক বিদ্যুতের কবিতার আঙ্গিক ভিন্নধর্মী। কবিতায় নিরীক্ষা সততই স্বাগত। এছাড়াও রয়েছে যাঁদের কবিতা তাঁরা হলেন - গৌতম চৌধুরী, সমীরণ চক্রবর্তী, শিবানী গুপ্ত, প্রতিমা শুক্লবৈদ্য, বন্দনা সেনগুপ্ত (দুটি কবিতা), পরিমল কর্মকার, শর্বরী পাল, ক্ষিতীশ চন্দ্র নাথ, জয়শ্রী ভট্টাচার্য, শমিতা ভট্টাচার্য, জয়ন্তী দত্ত, সুখেন দাস, শিপ্রা শর্মা, বাহারুল ইসলাম মজুমদার, ধ্রুবজ্যোতি দাস, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, বিমলেন্দু চক্রবর্তী, মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম, ডালিয়া সিংহ, সুমন্ত ব্যানার্জী, পিনাক মাঝি, অশোক বার্মা, সুবল চক্রবর্তী, রাজকুমার ধর, অরূপ কুমার ভুঞ্যা, অকেলা মধুশ্রী ডি., শঙ্করীপ্রভা আচার্য ও শিখা দাশগুপ্ত। অনেকেরই কবিতায় ‘আমি’ ও ‘আমরা’ এসেছে অগুনতি। কোন কোন কবিতা বিশ্লেষকের মতে এটা পারতপক্ষে বর্জনীয়। বাহারুলের কবিতায় দুটি পরস্পরবিরোধী পঙ্‌ক্তি লক্ষণীয়। সব মিলিয়ে কবিতার এক জমজমাট আসর বলা যায়।
কাগজ, ছাপার মান, অক্ষরবিন্যাস যথাযথ হলেও সেই বানানবিভ্রাট রয়ে গেছে - কমে এলেও। সুমির গল্পটি অসম্পাদিত বলেই মনে হয়েছে। এসব কাটিয়ে ধারাবাহিকতার এক প্রত্যয়িত নিদর্শন আলোচ্য সংখ্যাটি।
 বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
‘সীমান্তরশ্মি’ - ১২শ সংখ্যা
সম্পাদক - নারায়ণ মোদক
মূল্য - ১০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩৫০৭৬০৬৯

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...