কবিতা শুধু
লেখার নয়। পড়ার এবং হৃদয়ঙ্গম করারও। লিখতে যেমন জানতে হয় তেমনি পড়তেও জানতে হয়।
লিখতে গিয়ে যতিচিহ্নগুলির ব্যবহার যেমন জানতে হয় তেমনি পড়তে গিয়ে যতিচিহ্নের
ঠিকঠাক ব্যবহার না করলে ঠকতে হয়, হরেকরকমবা হয়। কবি ও পাঠকের মধ্যে তৈরি হয় না
যোগসূত্র। ফলত রসকষহীন এক ব্যর্থ পঠনে পর্যবসিত হয় কবিতা। মেলবন্ধন বিহনে
হৃদয়ঙ্গমও হয় না। এক্ষেত্রে দায় উভয় পক্ষেরই। কবির যেমন কবিতাকে সর্বজনগ্রাহ্য করে
তোলায় সচেষ্ট থাকা উচিত তেমনি পাঠকও নিবিড়তায়, নিমগ্নতায় কবিতা পাঠে রত হওয়া উচিত।
কবি
শ্রাবন্তী দাশ পুরকায়স্থ স্বল্পশ্রুত এক নাম। অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না।
উত্তরপূর্বের কাব্যভুবনে এই তরুণী কবি তাঁর একান্ত নিজস্ব কাব্য-আঙ্গিকে
একমেবাদ্বিতীয়ম। এটা বলা যায় হলফ করেই। কিন্তু তাঁর কবিতা হৃদয়ঙ্গম করতে হলে নিমগ্নতায়
ডুব দিতে হবে তাঁর কবিতার গভীরে। আবছা পঠনে পাঠক হয়তো তল খুঁজে পাবেন না কবিতার।
৬৪ পৃষ্ঠার আলোচ্য কাব্যগ্রন্থে সন্নিবিষ্ট হয়েছে মোট ৪৭টি কবিতা। এর মধ্যে রয়েছে ‘অলৌকিক একাকিত্ব’ সিরিজের একাধিক কবিতা। শুরু হোক গ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘অভিসার’ দিয়ে।
(১)
মহাপথ।...
গ্যালাক্সি মায়া
ক্রশ বিদ্ধ করে ছেড়ে যেতে হয়। …
তন্দ্রালোক, বরফাবৃত কোটি হিমালয় নষ্ট হয়।
সবাই আজ পাথর ছোড়ে; থাপ্পড়ই এসে
দেবীশরীর রচিত
করে; মৃত্তিকা্।…
(২)
বহু নীচে বান্ধব এসে নামিয়ে দিয়ে গেছে
বরমাল্য দিয়ে গেছে তাকে রাজ্যসিংহাসন
আমার নীচ ওপর, ওপর নীচ হতে ক্ষণিক কাল।
লিফটবোতামের হলুদ সবুজ লাল রং বদলায়।
শ্যাম্পেন খোলে
দশদিক।
নরকের বমিদৃশ্য ছেপে বেরোয় গোরোক্ষনাথ
গীতাপ্রেসে। …
স্পষ্টতই প্রথাগত
ধ্রুপদি আঙ্গিকের বাইরে শ্রাবন্তীর কবিতা। গ্রন্থ
জুড়ে এবং তাঁর অপরাপর সমস্ত প্রকাশ জুড়ে। কথনরূপে
গদ্যের স্বাভাবিক রূপকেই পদ্যে ব্যবহার করে কবিতার সৃষ্টি করেন শ্রাবন্তী। শব্দ
ও পঙ্ক্তির বিন্যাসে কোনও বাধ্যবাধকতা নেই, নেই
কোনও শৃঙ্খল, নিয়ম। কবি
আপন খেয়ালে শব্দ নিয়ে কাটাকুটি খেলেন। এই খেলার
মধ্যে রয়েছে বাস্তব পৃথিবীর সাথে অবচেতন মনের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। যেমন
উপর্যুক্ত দুটি কবিতাবিভাগের ‘গ্যালাক্সি মায়া’ ও ‘লিফটবোতাম’যুক্ত লাইনদুটি। মুক্তক
গদ্যরীতির এই কবিতার প্রচ্ছন্নে রয়েছে এক প্রতিষ্ঠানবিরোধী, অন্তরবিরোধী ভাবের প্রকাশ। মনে
করিয়ে দেয় হাংরি কবিতার পঙ্ক্তিসমূহ।
শেষের দিকের একটি কবিতা - ‘ঘুম’। কবি লিখছেন - ‘অদ্ভুত আঁধার এক’/ সে তোমার কালো টিপ/ কাল মহাযাত্রার…/ আদিম গুহাচিত্রে থেকে গেছে সে চিহ্ন/ আমি পথের উপর পথ ঢেলে/ সিঁড়ি করি; আকাশনীলে পেয়ালা ভরি/ স্বচ্ছ জলে। এখানে সরাসরি জীবনানন্দকে আমরা খুঁজে পাই প্রথম পঙ্ক্তিতেই। জীবনানন্দেরই মতো এখানে ইতিহাসচেতনা ও পরাবাস্তব রূপকের আভাস।
এভাবেই প্রতিটি কবিতায় এক ভিন্নধর্মী আবহে ফুটে উঠেছে ব্যতিক্রমী শব্দ/পঙ্ক্তির মেলবন্ধন যা আমাদের এই স্থানিক কবিতাভুবনে নিতান্তই বিরল। নিমগ্ন পাঠে জটিলতার আবহ থেকে বেরিয়ে এক নির্মোহ, নিদারুণ কাব্যসুখের আকর হয়ে উঠতে পারে শ্রাবন্তীর এই ব্যতিক্রমী কাব্যগ্রন্থ। গ্রন্থনামে ‘ভার্সেস’-এর জায়গায় ‘ভার্সাস’ হয়তো উপযুক্ত হতো। কারণ উচ্চারণ নয়, বানান এখানে প্রতিপাদ্য। গ্রন্থের কাগজের মান, ছাপার স্পষ্টতা, অক্ষর বিন্যাস যথাযথ হলেও দুর্বল বাঁধাই, হাতে গোনা কিছু বানানবিভ্রাট, কিছু অপ্রয়োজনীয় যতিচিহ্ন (বিস্ময়কর ভাবে অধিকাংশ দাঁড়িই বিস্ময়সূচক চিহ্নে পরিবর্তিত হয়েছে) ও কিছু পঙ্ক্তির জটিল বিন্যাসের বাইরে এক মোহনীয়, হৃদয় ছোঁয়া কবিতার সম্ভার আলোচ্য গ্রন্থটি।
৬৪ পৃষ্ঠার আলোচ্য কাব্যগ্রন্থে সন্নিবিষ্ট হয়েছে মোট ৪৭টি কবিতা। এর মধ্যে রয়েছে ‘অলৌকিক একাকিত্ব’ সিরিজের একাধিক কবিতা। শুরু হোক গ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘অভিসার’ দিয়ে।
(১)
মহাপথ।...
সবাই আজ পাথর ছোড়ে; থাপ্পড়ই এসে
বহু নীচে বান্ধব এসে নামিয়ে দিয়ে গেছে
বরমাল্য দিয়ে গেছে তাকে রাজ্যসিংহাসন
আমার নীচ ওপর, ওপর নীচ হতে ক্ষণিক কাল।
লিফটবোতামের হলুদ সবুজ লাল রং বদলায়।
শ্যাম্পেন খোলে
দশদিক।
নরকের বমিদৃশ্য ছেপে বেরোয় গোরোক্ষনাথ
গীতাপ্রেসে। …
শেষের দিকের একটি কবিতা - ‘ঘুম’। কবি লিখছেন - ‘অদ্ভুত আঁধার এক’/ সে তোমার কালো টিপ/ কাল মহাযাত্রার…/ আদিম গুহাচিত্রে থেকে গেছে সে চিহ্ন/ আমি পথের উপর পথ ঢেলে/ সিঁড়ি করি; আকাশনীলে পেয়ালা ভরি/ স্বচ্ছ জলে। এখানে সরাসরি জীবনানন্দকে আমরা খুঁজে পাই প্রথম পঙ্ক্তিতেই। জীবনানন্দেরই মতো এখানে ইতিহাসচেতনা ও পরাবাস্তব রূপকের আভাস।
এভাবেই প্রতিটি কবিতায় এক ভিন্নধর্মী আবহে ফুটে উঠেছে ব্যতিক্রমী শব্দ/পঙ্ক্তির মেলবন্ধন যা আমাদের এই স্থানিক কবিতাভুবনে নিতান্তই বিরল। নিমগ্ন পাঠে জটিলতার আবহ থেকে বেরিয়ে এক নির্মোহ, নিদারুণ কাব্যসুখের আকর হয়ে উঠতে পারে শ্রাবন্তীর এই ব্যতিক্রমী কাব্যগ্রন্থ। গ্রন্থনামে ‘ভার্সেস’-এর জায়গায় ‘ভার্সাস’ হয়তো উপযুক্ত হতো। কারণ উচ্চারণ নয়, বানান এখানে প্রতিপাদ্য। গ্রন্থের কাগজের মান, ছাপার স্পষ্টতা, অক্ষর বিন্যাস যথাযথ হলেও দুর্বল বাঁধাই, হাতে গোনা কিছু বানানবিভ্রাট, কিছু অপ্রয়োজনীয় যতিচিহ্ন (বিস্ময়কর ভাবে অধিকাংশ দাঁড়িই বিস্ময়সূচক চিহ্নে পরিবর্তিত হয়েছে) ও কিছু পঙ্ক্তির জটিল বিন্যাসের বাইরে এক মোহনীয়, হৃদয় ছোঁয়া কবিতার সম্ভার আলোচ্য গ্রন্থটি।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
ভিড় ভার্সেস
অলৌকিক একাকিত্ব - শ্রাবন্তী দাশ পুরকায়স্থ
প্রকাশক - দৌড় প্রকাশনা, কলকাতা
মূল্য - ১৫০ টাকা।

Comments
Post a Comment