উত্তর পূর্বের বাংলা সাহিত্য (পর্ব ১) নিয়ে প্রকাশিত
গবেষণাধর্মী ছোট পত্রিকা ‘প্রবাহ’
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
তবু এই বিশাল সৃষ্টির বিষয়ে পাঠকের দরবারে সম্ভাব্য পরিচিতি তুলে ধরার মহান উদ্দেশ্য নিয়ে ধারাবাহিক হিসেবে এগিয়ে এসেছে প্রবাহ। এ দায় বোধ করি শুধু ‘প্রবাহ’ই মেটাতে পারে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়জনিত বাস্তব এবং ব্যস্ততা ও সময়াভাবে লেখকদের পক্ষে সময়মতো লেখা পাঠানোর অসুবিধেজনিত প্রেক্ষাপটে এই দায়বদ্ধতার উল্লেখ রয়েছে সম্পাদকীয়তেও।
পত্রিকায় বিষয়ভিত্তিক নিবন্ধ আছে মোট ৮ টি। প্রথম নিবন্ধ - ‘ত্রিপুরার কথাসাহিত্যে উপন্যাস’। লেখক বিমল চক্রবর্তী। শুরু থেকে ২০১৮ অবধি ত্রিপুরার উপন্যাসশিল্পের এক রূপরেখা তুলে ধরেছেন লেখক। ইতিহাসকে ছুঁয়ে তাঁর তথ্যসমৃদ্ধ ভূমিকা এই প্রবন্ধটিকে এক আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। দীর্ঘ বাইশ পৃষ্ঠার এই প্রবন্ধে লেখক পরিমলকুমার ঘোষ থেকে শুরু করে অশোক দেব অবধি উপন্যাস এবং ঔপন্যাসিকের যতখানি সম্ভব পরিচিতি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন যদিও পাঠকের দরবারে তা ‘সংক্ষিপ্ত’ হয়েই থাকবে। কারণ আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় প্রবন্ধ সঞ্জীব দে’র ‘ত্রিপুরার ছোটগল্পের সংক্ষিপ্ত রূপরেখা’। নিবন্ধে লেখক নিজেই ‘সংক্ষিপ্ত’ শব্দটি সুচিন্তিত ভাবেই উল্লেখ করেছেন। এর বাইরে কোনও উপায়ও ছিল না। এখানেও সূচনাপর্ব থেকে হালের গল্পকারদের এক পরিচিতি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন লেখক। কিন্তু স্বল্প পরিসরে সবটুকু জুড়তে গিয়ে যথাযথ বিন্যাসের সম্যক অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। অভীক কুমার দে’র রূপকধর্মী একটি সম্পূর্ণ অণুগল্প এই স্বল্প পরিসরে সন্নিবিষ্ট করে লেখক লিখেছেন - ‘এই গল্পটিতে অভীক সমসাময়িক ত্রিপুরার চিত্র খুব সূক্ষ্মভাবে তোলে ধরার চেষ্টা করেছেন।’ পাঠকের মননে এত সূক্ষ্ম বোধ কতখানি প্রকাশিত হয়েছে তা সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়। সেক্ষেত্রে কয়েকটি শব্দে তৎকালীন ত্রিপুরার চিত্রের খানিকটা আভাস দিলে হয়তো তা সহজ হয়ে যেত।
পরবর্তী নিবন্ধ ‘ত্রিপুরার প্রবন্ধ সাহিত্যের ইতিহাস ও তিন প্রধান ব্যক্তিত্ব’। প্রাবন্ধিক সেবিকা ধর ত্রিপুরার প্রবন্ধ সাহিত্যের উপর তথ্যপূর্ণ আলোকপাতের শেষে লিখেছেন তিন প্রবন্ধকার রমাপ্রসাদ দত্ত, বিকচ চৌধুরী ও মঞ্জরী চৌধুরীকে নিয়ে। সমৃদ্ধ একটি ভূমিকা সহ তিনজন প্রবন্ধকারেরই যাবতীয় সাহত্যকর্মের হদিশ দিয়েছেন প্রবন্ধকার। একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নিবন্ধ নিঃসন্দেহে।
সুপরিচিত কবি চিরশ্রী দেবনাথ লিখেছেন - ‘ত্রিপুরার বাংলা কবিতা...আবহ এবং প্রবহমানতা’। ত্রিপুরার কাব্যসাহিত্য এক বিশাল মহাসাগর। এই সাগরে সংক্ষিপ্ত সন্তরণ সম্ভব নয়। তবু যতটুকু সম্ভব সবকিছু তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন লেখক। এ ধরণের লেখায় সাধারণত লেখক নিজেকে যুক্ত করতে অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন এবং ফলে লেখা থেকে যায় অসম্পূর্ণ। কিন্তু চিরশ্রী এমনটা করেননি। নিজের উল্লেখটুকু করে এক সম্পূর্ণ নিবন্ধ লেখার চেষ্টা করেছেন এবং ধারাবাহিকতার সূত্রে বহুলাংশেই তিনি সফল। তবে এসব রচনায় কিছু নাম অজান্তেই অনুল্লেখিত থেকে যায়। এখানেও হয়েছে। নিবন্ধের এক জায়গায় তিনি লিখছেন - ‘...একদিকে উদবাস্তু মানসিকতা, অন্যদিকে রাজনৈতিক ভয়, ত্রিপুরার কবিদের স্পষ্টবাদীতায় ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। তাই কবিতায় এসেছে ভাষার সৌকর্য, ভাব, নান্দনিকতা ইত্যাদি।’ কবির কবিতায় স্পষ্টবাদিতা ও ভাব-ভাষা-নান্দনিকতা কি বিপরীতধর্মী ? ঠিক বোঝা গেল না। তবু বলা যায় চিরশ্রীর এই নিবন্ধ ভবিষ্যতের এক সংগ্রহযোগ্য খতিয়ান।
গল্পকার সুবিমল রায়ের গল্প সংকলন ‘যাত্রী’র উপর এক আলোচনামূলক প্রবন্ধ লিখেছেন সমকালীন ত্রিপুরার অন্যতম দক্ষ আলোচক সৌম্যদীপ দেব। শিরোনাম - ‘সুবিমল রায়ের ‘যাত্রী’ - এক বিশ্লেষণাত্মক অধ্যয়ন’। অশীতিপর এই গল্পকারের গল্প সংকলন নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন সৌম্যদীপ। সচরাচর সাহিত্যের আঙিনায় জীবিত কবি-সাহিত্যিকদের সার্বিক সাহিত্যকৃতি নিয়ে আলোচনা দেখা যায় না। এক্ষেত্রে এই বর্ষীয়ান গল্পকারকে বৃহত্তর পাঠক সমাজে পরিচিত করিয়ে দেওয়া এক মহৎ প্রচেষ্টা বলে অভিহিত করা যায় নিশ্চিতভাবেই। তবে এই সংকলনের সবক’টি গল্পের অতি সংক্ষিপ্ত এক আভাস তুলে ধরতে পারলে আরো ভালো হতো নিঃসন্দেহে।
লেখক শুভেন্দু দাস-এর ‘শ্যামল ভট্টাচার্যের ‘লোদ্রভার কাছাকাছি’ এবং উত্তরকথন’ এক উৎকৃষ্ট পরিবেশনা। ত্রিপুরার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথা সাহিত্যিক শ্যামল ভট্টাচার্য এবং তাঁর এই উপন্যাস সমকালীন বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় এক উল্লেখযোগ্য নাম। উপন্যাসের পটভূমিকা থেকে শুরু করে সাহিত্যিক শ্যামল ভট্টাচার্যের যাবতীয় সাহিত্যকর্মকে নান্দনিক ভাবে পাঠকের দরবারে পরিবেশন করে এক অসাধারণ দায়বদ্ধতার নিদর্শন তুলে ধরলেন প্রাবন্ধিক।
শঙ্কু চক্রবর্তীর প্রবন্ধ - ‘মেঘালয়ের বাংলা কথাসাহিত্য - একটি আলোকপাত’। মূলত শিলংকেন্দ্রিক বাংলা লেখালেখির এক ঐতিহাসিক সুলুক সন্ধান। ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে হাল আমলের বাংলা সাহিত্যের যতটুকু সম্ভব উল্লেখিত হয়েছে নিবন্ধে। রয়েছে একটি মূল্যবান ভূমিকা এবং কবি-সাহিত্যিকদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতিও। নিশ্চিত ভাবেই এক সংগ্রহযোগ্য তথ্যনির্ভর প্রবন্ধ।
‘গারো পাহাড়ে বাংলা সাহিত্য চর্চার ইতিহাস’। লেখক নীতিশ বর্মন। মেঘালয়েরই এক ভিন্ন ভৌগোলিক পরিসরে অবস্থিত গারো পাহাড়ে বাংলা লেখালেখির ইতিহাসও বড় কম সমৃদ্ধ নয়। তারই এক বিস্তৃত বাখান তুলে ধরেছেন প্রাবন্ধিক। প্রত্যেক সাহিত্যব্যক্তিত্বকে দেওয়া হয়েছে যথাযোগ্য মর্যাদা। প্রকৃতার্থে এসব প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাহিত্যকর্ম প্রকারান্তরে এক শৈল্পিক সমর বললেও অত্যুক্তি হয় না। এতসব প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে গরজ ও দায়বদ্ধতার চরম উৎকর্ষতা প্রদর্শন করেছেন এই সব সাহিত্যব্যক্তিত্ব। তাঁদের এই অক্লান্ত সেবাকে যথাযোগ্য মর্যাদায় লিপিবদ্ধ করে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে অত্যন্ত সুচারু বিন্যাসে।
কিছুটা বিষয়বহির্ভূত ভাবেই একটি বিশেষ নিবন্ধ স্থান পেয়েছে এ সংখ্যায়। দীপঙ্কর সেন-এর ‘অমলের ইচ্ছাপত্র’। আবৃত্তিকার, নাট্যব্যক্তিত্ব সাঁওলি মিত্রের জীবনের খুঁটিনাটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে লিপিবদ্ধ করেছেন প্রবন্ধকার। দলিলসদৃশ এই প্রবন্ধটি এক সংগ্রহযোগ্য সাহিত্যকৃতি যদিও কিন্তু এর স্থলে যদি ত্রিপুরার বাংলা ছোটপত্রিকা বিষয়ক একটি নিবন্ধ সন্নিবিষ্ট করা যেত তাহলে এই পর্বটি যথার্থ ভাবে এক সম্পূর্ণতা অর্জন করত, কারণ সাহিত্য ও লেখালেখির ক্ষেত্রে ছোট পত্রিকার অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিপরীতে মেঘালয়ের সাহিত্য চর্চায় এই ব্যাপারটি যথাযথ গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রবন্ধ বিভাগের এখানেই সমাপ্তি। এর পর যুক্ত হয়েছে ছয়টি গল্প। রয়েছে ব্যতিক্রমী চিন্তাধারার এক সুলিখিত গল্প ‘সেই শূন্য ঘরটা’। গল্পকার মুসা আলি। এরপর কৃতী গল্পকার নীলদীপ চক্রবর্তীর গল্প ‘লোকালয়ের পোকামাকড়’। আধুনিক ধাঁচের শৈলীতে অপ্রচলিত শব্দের ব্যবহার এবং ভাষার সৌকর্য নীলদীপের গল্পের সম্পদ। এখানেও ব্যতিক্রম হয়নি তার। তবে গল্পটিতে বেশ কিছু বানান ভুল রয়ে গেছে। শর্মিলী দেবকানুনগোর গল্প ‘আপন পর’। পারিবারিক সংস্কারবোধের উপর লিখা একটি মানবিক আহ্বানের গল্প। শর্মিলীর গল্পের সরল চলন এখানেও পরিলক্ষিত হয়। এর পরের গল্প ‘সন্দেহের জামা’। গল্পকার ডঃ বাহারুল ইসলাম। বিদেশি গল্পের আবহে একটি জমজমাট গল্প যদিও বড্ড তাড়াহুড়োয় সমাপ্ত হয়েছে মনে হয়। খানিকটা আরোও প্রসারিত হলে যথার্থ সমাপ্তি হতো। এক নতুনত্ব আছে গল্পে।
‘মধুরেণ সমাপয়েৎ’ হিসেবে একেবারে শেষে সন্নিবিষ্ট হয়েছে প্রাবন্ধিক, গবেষক প্রসূন বর্মণের প্রবন্ধ - ‘উত্তর পূর্বের বাংলা উপন্যাস - গোড়ার কথা’। ইতিহাসকে ছেঁকে সংক্ষেপে খেই ধরিয়ে দিয়েছেন বিষয়ের। এক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা।
সুপর্ণা নাথ প্রকাশিত এই সংখ্যাটির দৃষ্টিনন্দন এবং প্রাসঙ্গিক প্রচ্ছদ এঁকেছেন অজিত দাশ (বাংলাদেশ)। ঝকঝকে ছাপাইয়ের কৃতিত্ব কোয়ালিটি গ্রাফিক্স, শিলচর-এর। সম্পাদক এ সংখ্যাটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর সদ্যপ্রয়াত মাতৃদেবীকে।
পত্রিকার রন্ধ্রে রন্ধ্রে সম্পাদকের প্রখর নজরদারি স্পষ্ট। দায়বদ্ধতার খামতি নেই কোথাও। শুধু কিছু বেয়াড়া বানান লেখক, প্রকাশক, মুদ্রক, সম্পাদক - সবাইকে বোকা বানিয়ে থেকেই যায় অন্দরে। এসব বিন্দুকে বাদ দিলে প্রবাহের এবারের সংখ্যাও তত্ত্ব ও তথ্যের এক সিন্ধু এবং যথারীতি এক দলিলসম সংগ্রহ।
সম্পাদক - আশিসরঞ্জন নাথ
মূল্য - ২০০ টাকা
যোগাযোগ - ৮৮১১০১০৫৪০

যথাযথ আলোচনা । সাহিত্যিক বিদ্যুৎ চক্রবর্তী অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে এই কাজ করে চলেছেন ।
ReplyDeleteধন্যবাদ নীলদীপ
ReplyDelete