Skip to main content

দেড়শো কবিতার অনবদ্য সম্ভার - ‘ভালোবাসার এক নাম কবিতা’


উত্তর পূর্বের লেখালেখির জগতে গদ্য ও পদ্য উভয় শাখাতে যেসব কবি, লেখকরা প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন তাঁদের মধ্যে এক উল্লেখযোগ্য নাম ঋতা চন্দ উত্তর পূর্ব কথাটি ইচ্ছে করেই উল্লেখ করা হল কারণ এখানে, এই বাংলা সাহিত্যের কর্ষণ ক্ষেত্রের ভৌগোলিক গণ্ডির মধ্যে বসবাস করে উত্তর পূর্বের বাইরে কারো কারো কিছু সাহিত্যকর্ম হয়ত প্রকাশিত হয় কিংবা প্রশংসিতও হয় সাময়িক কিন্তু প্রসিদ্ধি লাভের ব্যাপারটা দূর অস্ত্হিসেবেই থেকে যায় অথচ বাইরের বহু লেখালেখির তুলনায় এ অঞ্চলে যে উৎকৃষ্টতর বহু সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি হয়েছে তাও অবিদিত নয় তবু এই দুর্লঙ্ঘ্য দূরত্ব আজও বজায় আছে তার অন্তর্নিহিত কারণ সহজেই বোধগম্য যদিও এই কারণ অনুসন্ধান এখানে উপপাদ্য নয়
ভালোবাসার এক নাম কবিতাকাব্যগ্রন্থে কবি ঋতা চন্দ উজাড় করে দিয়েছেন তাঁর কাব্যধারার রস ফলে ফুলে বিকশিত হয়েছে তাঁর কাব্যপ্রতিভা ১৩৪ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট হয়েছে ১৫০টি ‘এক লাইনের’ কবিতা থেকে শুরু করে ‘আড়াই পৃষ্ঠা জোড়া’ দীর্ঘ কবিতা বিষয় বৈচিত্র্যে, কাব্য ধারায় বিচিত্র হয়ে উঠেছে কাব্যগ্রন্থ বিচিত্র সব বিষয় সন্নিবিষ্ট হয়েছে কবিতায়। গ্রন্থনামে উল্লেখিত ভালোবাসা শব্দটি দ্যোতনা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে বারবার। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী মানবিক প্রেম ভালোবাসার কবিতা কিন্তু এখানে বিরল। গ্রন্থনামের গূঢ় ভাবার্থের যথার্থ প্রতিফলন কিন্তু রয়েছে অধিকাংশ কবিতা জুড়ে। কবিতার প্রতি ভালোবাসা, জীবনের প্রতি ভালোবাসাই এখানে মূল উপপাদ্য, ভালোবাসার কবিতা নয়। ‘আমার কথা’ শিরোনামে ভূমিকায় এ কথাটিই সোচ্চারে ব্যক্ত করেছেন কবি। পেরিয়ে আসা কৈশোর আর বালিকা বেলার স্মৃতি কবিকে নাড়া দিয়ে যায় বার বার। সেখানে থরে থরে আছে শীত গ্রীষ্ম বর্ষা বসন্ত - আছে প্রকৃতি, আছে নদীর প্রতি অমোঘ ভালোবাসার উচ্চারণ।
...... রঙিন প্রজাপতি - নীলকণ্ঠ পাখির পালক,
মেঠো পথে মন কেমন করা বাঁশির সুর,
বিষণ্ণ নদীর বুকে দূরগামী নৌকো - সব কিছু ছুঁয়ে
আয় বৃষ্টি আমাকে ভিজিয়ে দে
তুমুল ভালোবাসায়।
আমি ভালোবাসব জীবনকে
ভীষণভাবে ভালোবাসব এবার
বাঁচব - ভালোবাসারই জন্য।
(প্রথম কবিতা - ভালোবাসার জন্য)
কবি বার বার ছুঁয়ে গেছেন তাঁর কবিতায় - নদী ও প্রকৃতি, নারী হৃদয়ের যাপন কথা, বিপন্ন অস্তিত্বের কথা। এগারো শহিদের দেশের কবি স্বভাবতই সোচ্চার হয়েছেন ভাষা বিষয়ক কবিতায়। তবে সব চাইতে বেশি করে ব্যক্ত করেছেন অনুভব অনুভূতির কথা, অতীত জোড়া মননকথা -
অনন্যা, সমুদ্র গহনে
কী সুখ তুলে আনো
একা একা দিগ্‌বলয়ে
ছড়াও কি সম্মোহনী ধুন ?
তোমার দেখায় সব না দেখা
ঢেকে যায়; তবু দু’চোখে অবজ্ঞা
আর গহনে আগুন।
আমি তো প্রাচীন বৃক্ষ এক
যার অস্তিত্বে ঘুণ আর শেকড়ে পরাজয়।
আমাকে শুধু শুধু কেন খর্ব করো
আমি তো কখনোই ছুঁব না
ওই দিগ্‌বলয়।
(কবিতা - প্রাচীন বৃক্ষ)।
এমনি সব অনন্য পঙ্‌ক্তির সমাহার কবির অনুভব বিষয়ক কবিতায়। উল্লেখ্য - অভিশপ্ত, শব্দের ডানা আর ঝালমশলা, জগৎ মেলা প্রাঙ্গণে, জীবন দর্শন, চক্রব্যূহ, বেনোজল আদি। নারী বিষয়ক কবিতায় উল্লেখযোগ্য অরুণা - দুঃখ করো না, নই অর্ধেক মানবী, সত্যি বিভীষিকা, হাসুক দলিতা আদি। দীর্ঘ কবিতার সারিতে আছে লক্ষ্মীমাসির ঘরসংসার, বাংলা ভাষা ও মহান উনিশে, শীত, দুঃখ-বিলাস, জেগে ওঠো পুরুষ, সুরভারতী সংগীত বিদ্যালয় ইত্যাদি কবিতা।
অসংখ্য কবিতা আছে ছন্দে গাঁথা। বেশির ভাগই ছড়ার ধাঁচে অন্ত্যমিলের কবিতা।
যার সাথে হয় না দেখা, গহন জুড়ে থাকে
পাথর ভাঙা, শস্য ফোটায় শব্দ ছবি আঁকে।
নদীর বশে নেই তো নদী, স্পর্শে শুধু ভাঙন
সাগর শুকোয় এই ভয়ে তার অতল জুড়ে কাঁপন।
একদিকে তার সবুজ আঁচল, অন্যদিকে চড়া
মুক্ত দেয়াল সবুজ কুঁড়ির, চড়াউ খুঁটির বেড়া।
আয় পাখি আয়, ধান খেয়ে যা, ছড়িয়ে দিলাম এই
ডুবুক নৌকো, দুঃখ কী রে, তীর তো সামনেই।
শাসন-তোষণ হার মেনে যায়, খায় না পাখি দানা
নীল আকাশে রইল আঁকা - শঙ্খ চিলের ডানা।
(কবিতা - ভাঙা ছবি)
এই পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য কবিতারা হল - যাত্রা, মুঠোয় ধরা আকাশ ছিল, আমার শৈশব, ও মেয়ে তুই কাঁদিস না ইত্যাদি। কিছু টুকরো কথায় অনন্ত বার্তা বয়ে আনা কবিতা গ্রন্থটির মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছে নিঃসন্দেহে। এই পর্বে বৃন্ত, ভুল, সেয়ানা, লুব্ধক, অশুচি আরোপ, পোড়ো, সুখের ঘরে সুখ নেই - কবিতারা আপন স্বকীয়তায় ভাস্বর হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে এক বিশাল কাব্য সম্ভার এই গ্রন্থ। আধুনিক বানান অনুসরণ করা হয়েছে যদিও সংখ্যায় নগণ্য হলেও কিছু বানান ভুল এড়ানো সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কিছু পঙ্‌ক্তি বিন্যাসেও রয়ে গেছে অসামঞ্জস্য। এক একটি শব্দ যেন দলছুট হয়ে চলে গেছে পরের বাড়ি (সারি)তে। এ বিড়ম্বনাও নগণ্যই।
প্রচ্ছদ শিল্পী কবি নিজেই। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে কবির ‘প্রয়াত অগ্রজ স্বপন চন্দের উদ্দেশে’। এত বিশাল সংখ্যক কবিতাকে স্থান করে দিতে স্বভাবতই এক পৃষ্ঠায় সন্নিবিষ্ট করতে হয়েছে একাধিক কবিতা। তবু এতে গরিমা লঙ্ঘিত হয়নি এতটুকু মূলত অক্ষর ও শব্দ বিন্যাসের যাথার্থ এবং ফন্ট সাইজের পরিমিতির জন্য।
যেতে যেতে কবিতায় শেষ কথা বলে যান কবি অনবদ্য কিছু শব্দের সমাহারে -
... ক্যাকটাস শুকিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ...
ফুলের নৌকো তৈরি হচ্ছে আমার জন্য।
যাব যখন একেবারে চৌকাঠ ডিঙিয়ে
তুমি দেখে নিয়ো ফুলের গয়নায় সেজে
অনায়াসে চলে যাব হাসতে হাসতে।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

‘ভালোবাসার এক নাম কবিতা’
ঋতা চন্দ
মূল্য - ১০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩৫৫৭৮৯৭১

Comments

  1. অভিনব আলোচনা ও কাব্যরস। ভালোবাসা রেখে গেলাম

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...