স্তবক শব্দটির মূল অর্থ ‘গুচ্ছ’, ‘থোকা’, ‘গ্রন্থাদির অধ্যায়’, ‘শ্লোক বা মন্ত্রের বিভাগ’ ইত্যাদি হলেও প্রচলিত অর্থে তা কবিতার সংঘবদ্ধ চরণের সমষ্টিকেই চিহ্নায়িত করে। সেদিক থেকে দেখলে আলোচ্য গ্রন্থনাম গদ্য ও পদ্যের মিশ্রণে বেশ প্রাসঙ্গিক হয়েছে বলাই যায়। মোট ২১টি সন্দর্ভ অর্থাৎ রচনা বা প্রবন্ধের সংকলন এই গ্রন্থটির প্রণেতা হেমন্ত দেবনাথ একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক - যা জানা যায় ব্লার্বের দ্বিতীয় ফ্ল্যাপে। প্রথম ফ্ল্যাপে যথারীতি রয়েছে গ্রন্থবিষয়ক এক সংক্ষিপ্ত পরিচিতি। দুটি সচিত্র ফ্ল্যাপের পর নিয়ম মেনে রয়েছে উৎসর্গ, সংক্ষিপ্ত একটি মুখবন্ধ ও বিন্যস্ত সূচিপত্র। অর্থাৎ সবকিছুই একেবারে ‘ব্যাকরণসম্মত’ যদিও শূন্য শেষ-মলাট খানিক বিসদৃশ হয়ে ওঠে। তবে সেই রিক্ততা পূর্ণ করে দেয় চিত্রশিল্পী অহীন্দ্র দাসের অবয়বধর্মী জ্যামিতিক অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টের অপূর্ব প্রচ্ছদ।
নানাবিধ বিষয়ের উপর লেখা মোট ২১টি প্রবন্ধের সংকলন এই গ্রন্থটি। একজন সাধারণ মানুষের চোখে দেখা হালহকিকত, একজন বিশ্লেষকের চোখে দৃশ্যমান ঘটনাবলি ও চিন্তার ফসল প্রতিটি নিবন্ধ - যেখানে রয়েছে ভাষা-সাহিত্য, ভ্রমণ, বিজ্ঞান, অধ্যাত্মবাদ, মনীষীস্মরণ তথা দেশ-বিশ্ব- সমাজ বিষয়ক কিছু তত্ত্ব ও তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনা। তবে বিষয়সমূহকে আলাদা করে বিভাগযুক্ত না করে বিক্ষিপ্ত ভাবে সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে। এতে আর যাই হোক পাঠগত একঘেয়েমির সুযোগ থাকেনি একেবারেই।
প্রথম প্রবন্ধ ‘বাংলা ভাষার সংকট নিরসনের ভাবনা’। অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও সময়োচিত ভাবনার উপর লেখা। সংকটের বেশ কিছু নিগূঢ় কারণ দেখিয়েছেন প্রবন্ধকার এবং সাথে সেইসব কারণসংবলিত অনুচ্ছেদের শেষ লাইনে এর থেকে মুক্তির সম্ভাব্য পথের দিশাও দিয়েছেন। ছুঁয়ে যাননি শুধু, গভীরতা যথেষ্ট তবে দু-একটি তথ্যগত বিসংগতি হয়তো থেকে গেছে। পৃথিবীর বাংলাভাষীদের তথ্যে শুধু ভারতের কয়েকটি রাজ্যের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে আবার প্রধান বাংলাভাষী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের উল্লেখ নেই।
দ্বিতীয় নিবন্ধ ‘রাখিবন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ’। অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, ঐতিহাসিক ও জনপ্রিয় একটি বিষয়। অজস্র নিবন্ধ ও লেখা এ নিয়ে রচিত হয়েছে। বহুপঠিত ও বহুচর্চিত এই বিষয়ের উপর লেখায় নতুন করে লেখার কিছু থাকে না। স্বভাবতই আলোচ্য নিবন্ধটিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথাদির উল্লেখ করে সংক্ষিপ্ত পরিসরেই সমাপ্তিরেখা টেনেছেন লেখক। পরবর্তী নিবন্ধ - ‘‘লালিত ভীরু’ শিশুরাই জেগে উঠবে ‘আকাশের ডাকে’’। শিশুশ্রম ও শিশুদিবস প্রসঙ্গে একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন। এখানে শিশুদের বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিলের সূচনা প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর আমলে শুরু হয়েছিল বলে লেখা আছে যদিও সম্ভবত এটি একটি তথ্যগত ত্রুটি। চতুর্থ নিবন্ধ - ‘মানবতার যাত্রাপথে শ্রীচৈতন্যের পদধ্বনি’। অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সুলিখিত নিবন্ধ। সমাজ, ধর্ম আন্দোলন, সাহিত্যে শ্রীচৈতন্যদেবের বহুমুখী অবদানের নির্মোহ ও সারগর্ভ আলোচনা। পঞ্চম নিবন্ধ - ‘ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন ও শিক্ষক দিবস’। বিষয়ভিত্তিক একটি বিস্তৃত নিবন্ধ। তথ্যে, তত্ত্বে, উপস্থাপনায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিবন্ধ। পরবর্তী অধ্যায় - ‘সত্যের পথে - ভারতীয় দর্শনের অগ্রগতি’। জটিল ও উচ্চমার্গের বিষয়। গ্রন্থের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই নিবন্ধে লেখক সাবলীলভাবে আস্তিক ও নাস্তিক দর্শনের রূপরেখা সহ প্রাঞ্জল ও তাত্ত্বিক বর্ণনা করেছেন বিষয়ের।
লেখকের স্বভূম ত্রিপুরা রাজ্যের নানাবিধ বিষয়ভিত্তিক বেশ কয়েকটি নিবন্ধ রয়েছে গ্রন্থে। প্রতিটি বিষয়েরই যথাসাধ্য গভীরে প্রবেশ করে অধ্যায়গুলোকে পাঠোপযোগী করেছেন নিবন্ধকার। প্রবন্ধগুলি হল - ‘ত্রিপুরায় সমন্বয়ী জীবনচেতনার অনন্য আধার - লোকসংস্কৃতি’, ‘ত্রিপুরার উপজাতীয় জনগোষ্ঠী, তাদের জীবনধারা ও সংস্কৃতি প্রসঙ্গে’, ‘প্রতিবেদন - পাহাড়ি জনপদ দশদার কিছু কথা’, ‘ত্রিপুরার উপজাতি ‘উচই’ জনগোষ্ঠীর জীবন ও সংস্কৃতি প্রসঙ্গে’, ‘প্রসঙ্গ - রৌয়া অভয়ারণ্য’ ও ‘ত্রিপুরার গ্রাম-পাহাড়ের লোকসাহিত্য ও লোকসংস্কৃতি’। কিছু সংক্ষিপ্ত, কিছু বিস্তৃত। ত্রিপুরার ক্ষুদ্রতম অভয়ারণ্য - রৌয়া অভয়ারণ্যের নৈসর্গিক বর্ণনা ভ্রমণপিপাসুদের জন্য উপযোগী। রাজ্যের পাহাড়-সমতল জুড়ে ইতিহাস কথা বলে। তাই লোককথা ও লোকসংস্কৃতির আকর বললেও দ্বিধা নেই। তারই উন্মোচন হয়েছে নিবন্ধগুলিতে।
‘কবিদের ভাবনায় বর্ষা ও বর্ষামঙ্গল’ একটি অনবদ্য বিষয় ও রচনা। খুবই মনোগ্রাহী করে সাজিয়েছেন প্রবন্ধকার। ‘বেরিয়ে পড়লাম সবুজের নেশায়’ একটি ভ্রমণমূলক প্রতিবেদন যদিও তথাদি ও গুণগত সৌকর্যে সুখপাঠ্য। বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক বোমার ত্রাস - সেকাল থেকে একাল, রাষ্ট্রনেতাদের অদূরদর্শিতা ও মানবকল্যাণে পরমাণু শক্তির প্রয়োজনীয়তা এসবের উপর ভারসাম্য বজায় রেখে লেখা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ ‘ক্রমাগত চোখ রাঙিয়ে রাঙিয়ে যারা হয়ে গেছে অন্ধ’। পাশাপাশি রয়েছে সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক দুটি প্রবন্ধ - ‘শতবর্ষের আলোকে বহুমুখী প্রতিভায় উদ্ভাসিত নজরুল’ ও ‘পথের দিশারি রবীন্দ্র-সুকান্ত-নজরুল’। দুটিই বিস্তৃত এবং তত্ত্ব ও তথ্যাদির সুনিপুণ প্রয়োগে সুখপাঠযোগ্য হয়ে উঠেছে যদিও কিছু অংশ উভয় প্রবন্ধেই হুবহু উঠে এসেছে। ‘মননে চিন্তনে শারদোৎসব’ দুর্গাপূজা বিষয়ক এক ভিন্ন আঙ্গিকের নিবন্ধ। এখানে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের ভাষ্যে আলাপচারিতার মাধ্যমে উঠে এসেছে হৃদয়ের কথা। অন্যতম একটি সম্পদ এই নিবন্ধ।
প্রবন্ধ - ‘জলের সংকট - তার সমস্যা সমাধান’। বিশাল সমস্যার গভীরে প্রবেশ করে শুধু সমস্যার কথা লিখেই ক্ষান্ত থাকেননি নিবন্ধকার। এটাই তাঁর বিশেষত্ব। গ্রন্থের অন্যতম বিস্তৃত নিবন্ধ - ‘আলোর দিশারি চিরপ্রণম্য বিদ্যাসাগর’। বিশাল জীবন ও কর্মরাজির যথার্থ মূল্যায়ন। ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ প্রবন্ধে এর যাথার্থ্য যথেষ্ট নৈপুণ্যে লিপিবদ্ধ হয়েছে।
সব মিলিয়ে বিস্তৃত বিষয়ভাবনার উপর যথেষ্ট শ্রমসাধ্য লেখার সমন্বয় আলোচ্য গ্রন্থটি। ১০৪ পৃষ্ঠার পাকা বাঁধাই গ্রন্থের ছাপা, বাঁধাই, অক্ষরবিন্যাস যথাযথ। কিছু বানানবিভ্রাট রয়ে গেছে তবে সংখ্যায় তা স্বল্প হলেও কোথাও তা এসে গেছে শিরোনামেও। এসবের বাইরে এক সুসংহত ও সুখপাঠ্য সংকলন।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
‘সন্দর্ভস্তবক’
হেমন্ত দেবনাথ
প্রকাশক - দিগন্ত প্রকাশনী
মূল্য - ২২০ টাকা
যোগাযোগ - ৬০০৯৯৫৩২০১
Comments
Post a Comment