হাতে নিলে আর পাঁচটা নিয়মিত সংখ্যা পত্রিকার মতো মনে হলেও উত্তর ত্রিপুরার চুড়াইবাড়ী থেকে কবি, লেখক রতন চন্দ সম্পাদিত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ‘শতদল’ পত্রিকার সম্প্রতি প্রকাশিত ২৯তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, বৈশাখ ১৪৩৩, মে-২০২৬ (কবি সুকান্ত জন্মশতবর্ষ সংখ্যা) সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রমী। সেই মাত্র ৪২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক সংস্করণ হলেও প্রচ্ছদ থেকে শেষ পৃষ্ঠা অবধি যতন, গরজ ও উৎকর্ষের এক সম্ভার বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না মোটেও।
বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র স্থান ধরে আছেন অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর সময়কাল থেকে আজ অবধি এবং আগত-অনাগত চিরকালীন এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী এই কবি মূলত একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেই সাহিত্যবিশ্বে পরিচিত হলেও তাঁর কবিতায় এর বাইরেও যে রয়ে গেছে বহুমাত্রিক এক বোধ, ভাষ্য - বোধ করি তার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি আজও। তবে যতই তাঁকে নিয়ে চর্চা হবে ততই এক এক করে খুলবে বিস্ময়ের ঝাঁপি এ কথা অনস্বীকার্য। এবং তারই এক নির্মোহ প্রয়াস ও প্রকাশ আলোচ্য সংখ্যাটি।
সুসজ্জিত কবি-প্রতিকৃতিযুক্ত একটি নান্দনিক প্রচ্ছদ - সজ্জায়, বর্ণ সংস্থাপনে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য পাঠকের। সৌজন্যে মুদ্রক সংস্থা সত্যম প্রিন্টার্স, ধর্মনগর। মিলনকান্তি দত্তের নামলিপিও তদ্রুপ। সীমিত আয়োজনে ধরে রাখা হয়েছে বহু মূল্যবান ও উৎকৃষ্ট রচনাসম্ভার। বিন্যস্ত সূচিপত্রে যথাযথ রয়েছে তার বর্ণনা। বিষয়ভাবনাযুক্ত প্রবন্ধ-নিবন্ধের বাইরেও গল্পে, অণুগল্পে এবং বৈচিত্রময় কবিতায় সেজে উঠেছে সংখ্যাটি। তার আগে খানিক চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক সম্পাদকীয়তে। সম্পাদক লিখছেন - ‘...আমরাও চাই না বারবার নেতিবাচক কথা বলতে। কিন্তু অস্থির সময়কে উপেক্ষা করি কী করে ? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকার ক্ষত যেখানে আজও বহন করে চলেছে সভ্যতা, তখন আবার যুদ্ধ যুদ্ধ অমানবিক খেলায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে কিছু শক্তি। আর এর শিকার হচ্ছেন বিশ্বের সাধারণ নাগরিক, নিরস্ত্র নারী, শিশু, বৃদ্ধ। তখন মানবিক দায়বদ্ধতা অস্বীকার করতে পারি না আমরা। যুদ্ধ না করেও এমরা এক নীরব যুদ্ধে অবতীর্ণ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা যখন বেজে উঠেছিল, বিশ্ব জুড়ে অস্থিরতা, শুরু হয়েছিল মানবতার হাহাকার তখন এক কিশোরের শব্দ পেয়েছিল প্রতিবাদের ভাষা। বিপ্লবী চেতনায় শাণিত ছিল তাঁর লেখনী। তিনি, খুব অল্প জীবনে বাংলা সাহিত্যে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যাওয়া কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। ...এই সময়ে তাঁকে স্মরণ করা মূলত সংকটময় পরিস্থিতির এক বিপ্লবী চেতনাকে উপলব্ধি করা...।’
সংখ্যাটিতে সন্নিবিষ্ট হয়েছে ভিন্নতর আঙ্গিকের মোট পাঁচটি প্রবন্ধ। প্রথম প্রবন্ধের লেখক সঞ্জীব দে। শিরোনাম - ‘সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতায় স্বদেশ-ভাবনা’। কবি সুকান্তকে নিয়ে লেখালেখি এতটাই হয়েছে যে নানা বিষয়ে তাঁর রচনার অগুনতি কাটাছেঁড়া হয়েছে কালাবধি। তবু এই নিবন্ধের লেখক তাঁর রচনায় এক স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখতে সচেষ্ট এবং সফল হয়েছেন। একাধিক উদ্ধৃতি ও কবির কবিতাংশের উল্লেখে বিষয়ভাবনাকে ফুটিয়ে তুলেছেন যথাযথভাবে। তিনি লিখছেন - ‘...যদিও সুকান্তের কবিতায় দেশপ্রেম তীব্র, তা সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ নয়। .. তাঁর স্বদেশ-ভাবনা আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতির সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ তাঁর কাছে স্বদেশপ্রেম মানে মানবমুক্তির বৃহত্তর লড়াই...।’ সম্পাদক রতন চন্দের নিবন্ধ ‘শতবর্ষে শ্রদ্ধার্ঘ্য : মানবতার কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য’ একটি অসাধারণ রচনা। তুলনামূলকভাবে এক সংক্ষিপ্ত পরিসরেই বলতে গেলে কবির জীবনী ও জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত সহ তাঁর রচনাবিষয়ক এক অত্যন্ত গোছালো ও সার্বিক একটি নিবিড় অধ্যয়নসঞ্জাত নিবন্ধ যেখানে কবির বহু কবিতার অংশবিশেষ উদ্ধৃত করে তিনি ছুঁয়ে গেছেন ব্যক্তি ও কবি সুকান্তকে।
মূলত কবির সংগ্রামী চেতনা ও প্রতিবাদী সত্তাকেই নানা রচনার উদ্ধৃতি সহ তুলে ধরেছেন লেখক, নিবন্ধকার সজল পাল তাঁর দুই পৃষ্ঠার নিবন্ধ - ‘সৃষ্টির আকাশে এক বিস্ময়ান্বিত নক্ষত্র : কবি সুকান্ত’য়। নিবন্ধকার অমিত চট্টোপাধ্যায় এক ভিন্নধর্মী আঙ্গিকে কিশোর কবির প্রতিভাকে সমক্ষে তুলে ধরেছেন যদিও ‘ইয়ং নজরুল’ শিরোনামাঙ্কিত নিবন্ধে একটিবারের জন্যও নজরুলের নাম আসেনি। অকালপ্রয়াত সূত্রে ইংরেজ কবি কিটস্-এর প্রসঙ্গের মতোই নজরুলের বিপ্লবী চেতনার প্রসঙ্গে সুকান্তের রচনাসমূহের সম্যক উল্লেখ থাকলে শিরোনাম অধিকতর প্রাসঙ্গিক হতো বলে বোধ হয়। বিষয়বহির্ভূত নিবন্ধ কবি, গবেষক, নিবন্ধকার মন্টু দাস-এর ‘প্রসঙ্গ : কবি ও কবিতা’ এই বিভাগের তথা গোটা পত্রিকারই শ্রেষ্ঠ সম্পদ হয়ে উঠেছে। এগারো পৃষ্ঠাব্যাপী এই নিবন্ধটি লেখকের একই শিরোনামের বৃহৎ নিবন্ধের একটি অংশ। এখানে দেশি বিদেশি কবি ও তাঁদের কবিতার প্রেক্ষাপটে কবিতার সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করেছেন নিবন্ধকার যা এক গবেষণাভিত্তিক রচনা হিসেবেই গণ্য করা যেতে পারে।
গল্প বিভাগে প্রথমেই রয়েছে একটি ছোটোগল্প ‘প্রস্থান পর্বের পর’। লেখক মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম। গৃহ পরিচারিকাদের নিয়ে বাংলা সাহিত্যে অনেক গল্পই লেখা হয়েছে। এও এমনই যদিও বুনোটে টানটান হয়ে উঠেছে গল্পটি। দারিদ্র্য ও নৈতিক স্খলনের জেরে একটি পরিবারের উচ্ছন্নে যাওয়াকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিষয়ে ন্যূনতম সংলাপে সমৃদ্ধ গল্পের সমাপ্তি কিন্তু সহসাই নেমে এসেছে মনে হতে পারে। এরপর ক্রমান্বয়ে রয়েছে চারটি অণুগল্প। দিব্যেন্দু নাথ-এর ‘বিশ্বাস, সময়, অনুভূতি’। শুরুটা এভাবে - ‘রমলা ভাবে, প্রেম তো একবার জন্মালে নিজেই নিজেকে টিকিয়ে রাখে। সে কেবল গ্রহণ করবে, আর রতন দেবে। তিন বছর ধরে এই একতরফা বৃষ্টি ঝরেছে। রতনের হাতভর্তি মেঘ, রমলার আকাশভর্তি অভিমান। কিন্তু সম্পর্ক কি একমুখী রোদে বাঁচে ? একটি সুন্দর সম্পর্ক তাওয়ার রুটির মতো। দুদিকে সমান উত্তাপ না পেলে একপাশ পুড়ে যায়, অন্য পাশ কাঁচাই থেকে যায়। রমলার রাগ ছিল আগুনের মতো তীব্র, অথচ ভেতরটা ছিল শিশিরছোঁয়া কোমল...।’ ভালোবাসার এক ভিন্নতর স্বরূপ। বিষয়ে, বুনোটে, ভাষায় শৈলীতে একটি অনবদ্য গল্প। শুধু যতিচিহ্নের অধিক ব্যবহার অনুভূত হয়েছে। শিরোনাম ভিন্ন হতে পারত। মধুমিতা ভট্টাচার্যের গল্প ‘ব্রেস্ট ফিডিং’। এখানে এর চাইতে ভালো শিরোনাম আবার হওয়ার সুযোগ ছিল না। একেবারেই এক ব্যতিক্রমী বিষয়ে একটি অসম্ভব ভালো গল্প। মাতৃত্বের এক ভিন্নধর্মী চিত্র। ‘ছেলের সুমতি’ গল্পে গল্পকার আলপনা নাথ মা ও সন্তানের মধ্যেকার সম্পর্কের একটি সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণজনিত চিত্র তুলে ধরেছেন। সন্তানের স্বার্থপরতাজনিত স্খলনের গল্পটি সংলাপে, বুনোটে এগিয়েছে ভালোই তবে সরল পঠনের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতায় খানিক স্পষ্টতার অভাব বোধ হতে পারে। সঞ্চয়িতা রায়ের গল্প ‘বিলাস ঘোষ’। ঝড়ের গতিতে পুরো প্রজন্মের গল্প অণুগল্পে রূপান্তর করেছেন। ঘটনার ঘনঘটায় ছুটতে থাকা গল্পের শেষলাইনে এক অনবদ্য প্রশ্নচিহ্ন রেখে শেষ হয়েছে গল্পের ছুটে চলা। ভালোমন্দের সংমিশ্রণ, স্নেহ-ভালোবাসার সূক্ষ্ম অনুভূতি।
কবিতা বিভাগটি অপেক্ষাকৃত সমৃদ্ধতর। রয়েছে একগুচ্ছ কবিতা। কিছু অনবদ্য, কিছু যথাযথ ব্যঞ্জনাযুক্ত কবিতা। এখানে বিষয়ভিত্তিক একটি কবিতার কিয়দংশ তুলে ধরা হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না -
ধানখেতের ভোরে লাল আলো জ্বলে ওঠে -
আকাশের গায়ে কে যেন আগুনের অক্ষরে
লিখে গেছে একটি নাম -‘সুকান্ত’।
...বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে আছ তুমি
সময়ের অঙ্গনে।
আমরা পথ হারালে বটবৃক্ষের ছায়ায় এসে দাঁড়াই,
ফুল পাতায় নত হয়ে আজও
দেশ বলে - তুমি আমাদের অম্লান পথের দিশা।
(কবিতা - মননে সুকান্ত - হেমন্ত দেবনাথ)
কবি সুকান্ত ও নানা বিষয়ে নানা আঙ্গিকের কবিতা যাঁরা লিখেছেন তাঁরা হলেন - মিলনকান্তি দত্ত, গোপালচন্দ্র দাস, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, হেমন্ত দেবনাথ, সেলিম মোস্তাফা, সন্তোষ রায়, হৃষিকেশ নাথ, বিজন বোস, নিবারণ নাথ, হারাধন বৈরাগী, গোবিন্দ ধর, প্রদীপ চক্রবর্তী, নারায়ণ মোদক, সন্দীপ সাহু, নিভা চৌধুরী, আলাল উদ্দিন, নির্মল দেবনাথ, শশাঙ্কশেখর পাল, জয়ত্রী চক্রবর্তী, চান্দ্রেয়ী দেব, মাম্পী দাস ও সিদ্ধার্থ নাথ। বিশেষোল্লেখেই রাখা যায় অধিকাংশ কবিতাকে।
কাগজ ও ছাপার মান, অক্ষর বিন্যাস, অলংকরণ, বর্ণ সংস্থাপন যথাযথ। দু-একটির বাইরে শুদ্ধ বানান সম্পাদকীয় সতর্কতার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত। একটি প্রশ্ন উঠতেই পারে আজকাল যে বহু পত্রিকার নিয়মিত সংখ্যা প্রকাশিত হচ্ছে ধারাবাহিকতা মেনে উদ্দীপনায়, উৎকৃষ্টতায়। কিন্তু সেসব কি পাঠকের দরবারে পৌঁছোয় সঠিক ? আলোচ্য পত্রিকার মতো সংখ্যা পড়লে যে আপামর পাঠক একাধারে উজ্জীবিত ও উৎসাহিত হয়ে উঠতেন তা বলা যায় নিশ্চিত করে। সব মিলিয়ে গভীর যত্ন ও নিবেদনের ছবি স্পষ্ট অনুভব করা গেছে আলোচ্য সংখ্যা ‘শতদল’-এ।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
প্রকাশক - শতদল সাংস্কৃতিক সংস্থামূল্য - ৫০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৮৬২৬১৭৬৮৩

Comments
Post a Comment