Skip to main content

রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত স্মরণ সংখ্যা ‘আলোহাওয়া’


একটি লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটপত্রিকা হচ্ছে সমাজের সাহিত্যদর্পণ। শুধুই সমকালিক নয়। যুগান্তরের ভাষাসাহিত্য ও তার যুগন্ধর স্রষ্টাদের সঙ্গে সমকালকে পরিচিত করে দেওয়ার এক প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম। আর একের পর এক এই লক্ষ্যেই উৎকৃষ্টতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি শহর থেকে প্রকাশিত ‘সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক’ পত্রিকা ‘আলোহাওয়া’। রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার ১৯তম সংখ্যা - ২৫তম বর্ষ, পৌষ ১৪৩২ - ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যা। কবি জিতেন্দ্র নাথ সম্পাদিত এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যিক ‘তুষারকান্তি নাথ স্মরণ সংখ্যা’ হিসেবে।
তুষারকান্তি নাথ এমন একজন সাহিত্যিক যাঁকে আখ্যায়িত করা যায় একজন সার্বিক সাহিত্যিক হিসেবে। ধারে ও ভারে তাঁর সৃষ্টি শুধু বরাক উপত্যকাতেই নয় এর বাইরেও সমাদৃত। তাঁর লেখনী রত্নপ্রসবা। পক্ষান্তরে এটাও বলা যায় যে ঘরে বাইরে কিছু স্বীকৃতি, কিছু প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকলেও তাঁর লেখালেখি ও নানাবিধ সৃষ্টিকর্মের গভীরতার মূল্যায়ন যতটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল ততটা কিন্তু হয়নি। আসলে প্রান্তিকতা সততই লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের পরিচিতির পথে এক বৃহৎ অন্তরায়। এখানেই আসে ভুবনায়নের প্রসঙ্গ যা প্রয়াত যশস্বী কবি ও সাহিত্যিক বিজিৎকুমার ভট্টাচার্যও সমর্থন করতেন।
তুষারকান্তির জন্ম ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে। প্রয়াণ ২০২৪। সদ্যপ্রয়াত এই কবির প্রয়াণকে নির্দ্বিধায় অকাল প্রয়াণ বলে অভিহিত করা যায় এজন্যই যে তাঁর অধিকতর আয়ুষ্কাল উপত্যকা তথা সমগ্র বাংলা সাহিত্যবিশ্বকেই মহিমান্বিত করত অধিকতর উৎকর্ষে। আলোচ্য সংখ্যায় সম্পাদক জিতেন্দ্র নাথ তুষারকান্তির সাহিত্যচর্চা ও সার্বিক ব্যক্তিত্বের উপর আলোকপাত করার কোনও ত্রুটি রাখেননি। পত্রিকায় কলম ধরেছেন একের পর এক বরেণ্য লিখিয়েরা। সম্পাদকের ভাষায় - ‘...তুষারদা অমর অক্ষয় একটি বৃক্ষের নাম।’ ১৪৪ পৃষ্ঠার সংখ্যার দুই পৃষ্ঠাব্যাপী আন্তরিক সম্পাদকীয়তে পত্রিকা প্রকাশের প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি রয়েছে ব্যক্তি ও সাহিত্যিক তুষারকান্তির সম্যক পরিচিতি। পরবর্তী অংশে এ নিয়ে বিস্তৃত লেখা রয়েছে লেখকদের লেখনীতে। কিছু কথা সম্পাদকীয় থেকে তুলে ধরাটা প্রাসঙ্গিক - ‘…এই সংখ্যায় গুণী ব্যক্তিত্ব কবি সম্পাদক উপাধ্যক্ষ লেখক প্রাবন্ধিক লোকসাহিত্য ও লোকসংস্কৃতিবিদ তথা পুথিগবেষক তুষারকান্তি নাথ ও তাঁর জীবনের সমস্ত কর্মকাণ্ড তুলে ধরার প্রয়াস করা হল। …বরাক উপত্যকার অন্যতম প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বের নাম প্রয়াত তুষারকান্তি নাথ। প্রচারবিমুখ নম্র ভদ্র বিনয়ী ব্যক্তিত্ব। তাঁর হস্তাক্ষর ছাপা অক্ষরের মতো পরিষ্কার… এই উপত্যকার বাংলা ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য চর্চায় তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। …প্রতিভা প্রকাশের পরিধি তাঁর বহুধা বিস্তীর্ণ। বিশেষ করে এখানকার সমাজ-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য-ইতিহাস-প্রত্নতত্ত্ব-ভাষা ও সাহিত্যের নানা ক্ষেত্রে তাঁর অবাধ বিচরণ। পুথি গবেষণার ক্ষেত্রে একটা নিজস্ব জায়গা করে নিয়েছিলেন… তাঁর গবেষণামূলক অজস্র প্রবন্ধ নিবন্ধ বৃহৎবঙ্গের বিদগ্ধ পণ্ডিতমহলে তাঁকে এনে দিয়েছে প্রতিষ্ঠা, পরিচিতি ও স্বীকৃতি।’ আবারও বলা যায় এই স্বীকৃতি হয়ত যথেষ্ট নয়।  
সূচিপত্র অনুযায়ী এগোলে প্রথমেই রয়েছে আলোচ্য পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত তুষারকান্তির কবিতাসমূহ। দুই পর্বের গদ্য বিভাগে উদ্দিষ্ট ব্যক্তি/সাহিত্যিককে নিয়ে কলম ধরেছেন জীবন নাথ, উষারঞ্জন ভট্টাচার্য, অমলেন্দু ভট্টাচার্য, আবিদ রাজা মজুমদার, বিমলেন্দু নাথ, নীতিশ ভট্টাচার্য, সঞ্জীব দেবলস্কর, দীপঙ্কর চন্দ, আশিসরঞ্জন নাথ, বিশ্বজ্যোতি বর্মন, আশুতোষ দাস, তৈমুর রাজা চৌধুরী, গৌতম প্রসাদ দত্ত, মলয় দেব, মিলন উদ্দিন লস্কর, মাশুক আহমেদ, স্মৃতি পাল নাথ, জসিম উদ্দিন লস্কর, বিজয় নাথ, স্নিগ্ধা নাথ, গায়ত্রী নাথ, রফি আহমেদ মজুমদার, তপনকান্তি নাথ, নিবারণ নাথ, মঙ্গলা নাথ, সত্যজিৎ নাথ, চিরশ্রী দেবনাথ, তমোজিৎ সাহা, সুদীপ্তা নাথ ও জিতেন্দ্রকুমার নাথ।
কবিতা বিভাগে তুষারকান্তিকে নিয়ে লিখেছেন দিলীপকান্তি লস্কর, ভক্ত সিং, জালাল উদ্দিন লস্কর, স্মৃতি পাল নাথ, হাসনা আরা শেলী। রয়েছে তুষারকান্তি নাথের লেখা দুটি প্রবন্ধ, কিছু চিঠিপত্র ও তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি। জীবনপঞ্জিতে রয়েছে প্রয়াত সাহিত্যিকের ব্যক্তিজীবন, শিক্ষা, সাহিত্যকর্মের খতিয়ান ও নানাবিধ সম্মান ও পুরস্কারের উল্লেখ যদিও তাঁর বিবাহিত জীবনের উল্লেখ নেই। অন্যান্য গদ্য থেকে অবশ্য তা পাওয়া যায়। প্রচ্ছদ ও ভিতরের পাতায় তাঁর চিঠিপত্রের ছবি থেকে তুষারকান্তির সুন্দর হস্তাক্ষরের পরিচয় পাওয়া যায়। পত্রিকাটির শেষ পর্যায়ে রয়েছে তুষারকান্তি নাথ সম্পাদিত সাড়া জাগানো ‘জাতিঙ্গা’ পত্রিকার পনেরোটি সংখ্যা নিয়ে প্রকাশিত জিতেন্দ্রকুমার নাথের একটি আলোচনার পুনঃপ্রকাশ।  
আলোচ্য সংখ্যাটির ছাপা, অক্ষরবিন্যাস, বানান, অলংকরণ, প্রচ্ছদ (সৌজন্যে আশু চৌধুরী), সবই যথাযথ ও নান্দনিক। সব মিলিয়ে এক যুগন্ধর ব্যক্তিকে নিয়ে ‘আলোহাওয়া’র এক নিশ্চিত শ্রদ্ধাঞ্জলি ও মূল্যায়ন এবং এক উন্নত মানের পত্রিকা সংখ্যা নিঃসন্দেহে।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

মূল্য - ২৫০ টাকা

যোগাযোগ - ৯৩৬৫১৬০৭৩৩

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...