ত্রিপুরা রাজ্যের উত্তরাংশ অথবা বলা যায় অবিভক্ত উত্তর ত্রিপুরা জেলার সঙ্গে অসমের বরাক উপত্যকা ও বাংলাদেশের অবিভক্ত সিলেট সহ সংলগ্ন কিছু অঞ্চল মিলিয়ে যে ভূখণ্ড, একত্রবাসের সূত্রে তার ইতিহাস, সংস্কৃতি, জনপ্রবাহ, লোকাচার আদি আঙ্গিকের এক অসাধারণ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এটাই স্বাভাবিক। দুর্ভাগ্যবশত দেশভাগ ও রাজ্যভাগের ফলে বর্তমানে আর্থ-রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে এক বৈসাদৃশ্যের চিত্র পরিলক্ষিত হয় যদিও মানসিক ভাবে এই অঞ্চলের অধিবাসীরা চিরকালই সমমনোভাবাপন্ন এবং তাদের জীবনশৈলী, আচার ব্যবহার, ভাষা সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এক অমলিন সাদৃশ্যের প্রভাব আজও বিদ্যমান। এই অঞ্চলের সাহিত্য, সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্মাচার আদি তাই স্বভাবতই এক সূত্রে গাঁথা। মানুষে মানুষে এক নাড়ির টান, সৌহার্দ বিরাজিত আবহমান কাল ধরে। ত্রিপুরার উত্তরাংশে মনু নদী এবং বরাক উপত্যকার প্রধান নদী বরাকের অববাহিকা অঞ্চলে বসবাসরত মানুষের দৈনন্দিন জীবনচর্চা ও ভাষার সমানতা মূলত অবিভক্ত সিলেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সুবাদে শুধু আত্মীয়তা নয়, লোকাচার-আঙ্গিকেও এক সূত্রে বাঁধা।
লোক গবেষক তথা ত্রিপুরা সরকার কর্তৃক ‘অদ্বৈত মল্লবর্মন স্মারক সম্মানে ভূষিত লেখক মন্টু দাস এই অঞ্চলের বাসিন্দা হওয়ার সূত্রে স্বক্ষেত্রের লোকায়ত সংস্কৃতির গবেষণায় বহুদিন থেকেই নিজেকে জড়িত রেখেছেন। ইতোমধ্যে তাঁর ‘মনু-বরাকের প্রাচীন জনপ্রবাহ’ শিরোনামাঙ্কিত গ্রন্থে তিনি এই বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ‘মনু-বরাকের নকশি-কাঁথা ও অন্যান্য প্রবন্ধ’ গ্রন্থটি। গ্রন্থের সূচনায় ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মলয় দেব তাঁর ভূমিকায় লিখছেন - ‘...বর্তমানে সংস্কৃতির ভূমণ্ডলীকরণের ফলে লোকায়ত সংস্কৃতি ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। ঐতিহ্যানুগ এই সংস্কৃতির প্রতি আন্তরিক দরদ রয়েছে মন্টু দাসের। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক লেখালেখিতে নিমগ্ন। ...যাপিত ভূগোল ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ ও অনুসন্ধানের ফসল শ্রী দাসের ‘মনু-বরাকের নকশি-কাঁথা ও অন্যান্য নিবন্ধ’ গ্রন্থটি। স্থানিক উপাদানের সামগ্রিক মূল্যায়নের এই যে উদ্যোগ তাতে বুঝতে অসুবিধা হয় না সংস্কৃতির অধ্যয়ন ভূগোলের নির্দিষ্ট সীমানায় আবদ্ধ নয়...।’
আলোচ্য গ্রন্থটিতে গ্রন্থকার সন্নিবিষ্ট করেছেন সাহিত্যতত্ত্ব, লোকসংস্কৃতি ও জীবনী বিষয়ক মোট দশটি প্রবন্ধ। এক এক করে এগোলে প্রথমেই রয়েছে শিরোনামভিত্তিক নিবন্ধ - ‘মনু-বরাকের নকশিকাঁথা’। দশ পৃষ্ঠাব্যাপী এই নিবন্ধে একটি সুচয়িত লোকশিল্পকে অত্যন্ত মনোগ্রাহী করে তুলে ধরেছেন লেখক। গাত্রাবরণে সূচিশিল্পের অপরূপ সৃষ্টি নিয়ে গভীর অধ্যয়ন ও ক্ষেত্রনিরীক্ষার ফল এই নিবন্ধ যা নিশ্চিতই আলোচ্য গ্রন্থের অন্যতম সম্পদ এবং নিবিড় পাঠের উপযোগী। আজকের বয়স্ক পাঠক নিশ্চিতই এই বস্তুটির সঙ্গে সুপরিচিত। তাই নিজেকে ফিরে পাবেন স্মৃতিচারণের আনন্দে। পরের অধ্যায় পরাবাস্তববাদ বিষয়ক। ডাডাইজম থেকে সুররিয়ালিজমের দীর্ঘ যাত্রার বর্ণনায় লেখক উদ্ঘাটন করতে চেয়েছেন বিষয়ের গভীরতাকে। উনিশ পৃষ্ঠার দীর্ঘ নিবন্ধ ‘শ্রীহট্ট ও বরাক-ত্রিপুরার ভট্টসংগীত’। বিস্তৃত অঞ্চলকে নিবন্ধে আহৃত করে বহু তত্ত্ব ও তথ্যের এক অসামান্য পাঠ। বিলীয়মান এক সংস্কৃতির উজ্জ্বল অতীত ও অন্ধকার ভবিষ্যতের খতিয়ান। বহু অজানা তথ্য ভেসে আসে পাঠকের চোখে। শ্রীহট্ট, বরাক ও উত্তর ত্রিপুরায় বাঘাই সেবা বিষয়ক আরও একটি নিবন্ধ গ্রন্থের অন্যতম সম্পদ। বহু তথ্যের সন্নিবেশ এখানেও। বস্তুত এ জাতীয় নিবন্ধ পাঠে অতীত যেন মূর্ত হয়ে ওঠে চোখের সামনে। অনুরূপ পরবর্তী নিবন্ধ ‘ডরাই বিষহরি পূজা ও গুরমার নাচ’। এটিও যথেষ্ট বিস্তৃত তথা তথ্যভিত্তিক। বর্তমানে লুপ্তপ্রায় এই শিল্প স্বচক্ষে দর্শনের অভিজ্ঞতা রয়েছে আলোচক সহ অনেকেরই। পূজার সৃষ্টি থেকে এর রূপকৌশলাদির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণে সুখপাঠ্য হয়ে ওঠে নিবন্ধ।
পরের অধ্যায়টি লোকসংস্কৃতি বিষয়ক নয়। ‘ত্রিপুরার বাংলা কবিতা’য় লেখক উদ্ধৃতি সহ সচরাচর উপলব্ধ তথ্যের বাইরেও তাঁর নিবন্ধকে সম্প্রসারণ করেছেন। এই বিষয়ে এও এক প্রণিধানযোগ্য ইতিহাস। রয়েছে কাব্যদুর্গা বা ‘কাব পূজা’ বিষয়ক দুই পৃষ্ঠার একটি নিবন্ধ যার অধিক অধ্যয়নের সুযোগ হয়তো রয়েছে। উল্লিখিত অঞ্চলসমূহে এই পূজা এখনও হারিয়ে যায়নি। তথ্যানুযায়ী ২০২২ ইংরেজিতেও উত্তর ত্রিপুরার পানিসাগরে এই পূজা অনুষ্ঠিত হতে দেখা গেছে।
‘অমরেন্দ্র শর্মা : এক বর্ণময় জীবন’। এই অধ্যায়ে লেখক প্রাঞ্জল ভাবে তুলে ধরেছেন ত্রিপুরার একজন ব্যক্তিকে যিনি লেখকের ভাষায় - ‘একটি প্রতিষ্ঠান। সমগ্র রাজ্যে একটি অতি পরিচিত সাহিত্য সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব - যিনি অনায়াসে তাঁর সময়কে অতিক্রম করেছেন।’ একটি অত্যন্ত মনোগ্রাহী প্রতিবেদন এবং স্বভাবতই অবশ্যপাঠ্য। ‘ভোলা সংক্রান্তি’ আজও যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয় এতদঞ্চলে। তারই এক মনোরম ব্যাখ্যা উঠে এসেছে পরবর্তী অধ্যায়ে অধিকতর তথ্যাদির সন্নিবেশে। গ্রন্থের শেষ অধ্যায় - ‘ভট্টকবি প্রেমেন্দ্রনাথ বাউল’। এক অঙ্গে কত রূপ তার এক অপূর্ব নিদর্শন। লেখকের কথায় - ‘ভারত ও বাংলাদেশ এই দুই দেশের জীবিত প্রবীণ ভট্টকবিদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হেমেন্দ্রনাথ বাউল - যিনি একাধারে ভট্টকবি, তরজা গানের বিখ্যাত শিল্পী, সংগীত রচয়িতা, পদ্মাপুরাণের গুর্মি, সুরকার, বাউল ও অসংখ্য দেহতত্ত্ব গানের স্রষ্টা। তিনি একজন সমাজকর্মীও বটে। সেই সাথে ভেষজ বিদ্যায় অভিজ্ঞ এক কবিরাজ।’ হিন্দু-মুসলিম শাস্ত্র ও দর্শন সম্পর্কে অসাধারণ এক বোদ্ধা ও পণ্ডিত মানুষ। এমন এক কবি, সুরকার তথা বহুমুখী ব্যক্তিত্বের সঙ্গে লেখকের সাক্ষাৎকার এই গ্রন্থের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ নি:সন্দেহে।
পাকা বাঁধাইয়ে ১০৪ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটি অনায়াসে এক প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে অভিহিত করা যায়। গবেষণার ক্ষেত্রে এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচ্য হতে পারে, যেমন লেখক তাঁর নিবন্ধসমূহে লিখিত তথ্যাদির সূত্র উল্লেখ করেছেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে। বাকিটা লেখকের নিবিড় ক্ষেত্র অধ্যয়ন ও শ্রমের ফসল। স্পষ্ট ছাপা ও অক্ষর বিন্যাস। কিছু বানানবিভ্রাট রয়েছে যদিও সামগ্রিকভাবে একটি মূল্যবান গ্রন্থ এতে সন্দেহ থাকার কথা নয়। প্রাসঙ্গিক ও নান্দনিক প্রচ্ছদের সৌজন্যে চিত্রশিল্পী অহীন্দ্র দাস। প্রথম ব্লার্বে প্রকাশকের তরফে গ্রন্থবিষয়ক বয়ান কাঙ্ক্ষিত ছিল। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে ‘ড. নির্মল দাশের করকমলে...’। এমন একটি গ্রন্থ আইএসবিএনযুক্ত হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
‘মনু-বরাকের নকশি-কাঁথা ও অন্যান্য প্রবন্ধ’
মন্টু দাস
প্রকাশক - মৌমিতা প্রকাশনী, আগরতলা
মূল্য - ৩৬০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩৬১২৭৯২১
মন্টু দাস
প্রকাশক - মৌমিতা প্রকাশনী, আগরতলা
মূল্য - ৩৬০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩৬১২৭৯২১

Comments
Post a Comment