‘কথা’ শব্দটির প্রায়োগিক অর্থ দুরকম হতে পারে। যখন ‘কথা ও কবিতা’ বলা হয় তখন কথা শব্দের অবধারিত অর্থ হয়ে দাঁড়ায় গদ্য। অর্থাৎ ‘গদ্য ও পদ্য’। আবার গানের ক্ষেত্রে আকছার বলা হয় - ‘এই গানের কথা - অমুক, সুর - অমুক’। এখানে কথা অর্থে গানের কথা বা লিরিক। এই লিরিক কিন্তু গদ্য নয়। ‘কথা’ নিয়ে এই ভূমিকার কারণ হচ্ছে আলোচ্য গীতিকবিতা সংকলনটিকে অভিহিত করা হয়েছে ‘কথা সংকলন’ হিসেবে অথচ ভিতরের পৃষ্ঠায় কবিতা দেখে পাঠকমনে স্বভাবতই এক দ্বিধার উদ্রেক হতেই পারে। সেক্ষেত্রে ‘গীতিকবিতা সংকলন’ হিসেবে আখ্যায়িত হলে দ্বিধাহীন হতো নির্দ্বিধায়।
গ্রন্থনাম - ‘রৌদ্রস্নাত গোধূলি চুম্বন’। কিছু জটিলতা, কিছু ধোঁয়াশা এখানেও। গ্রন্থনাম সরল, তৎসম শব্দ বর্জিত হলে সহজবোধ্য ও আকর্ষণীয় হয় পাঠকের দরবারে। আলোচ্য গ্রন্থটি একই শিরোনামের দ্বিতীয় সংকলন। এ নিয়ে কথামুখ হিসেবে গ্রন্থকার জানাচ্ছেন - ‘...রৌদ্রস্নাত গোধূলি চুম্বন প্রথম খণ্ডটি ১১৭টি গীতিকবিতায় সাজানো হয়েছিল। ২য় খণ্ডটিতে রয়েছে ১৭৯টি কবিতা...। বিভিন্ন আঙ্গিকের কথা রয়েছে এই ২য় খণ্ডটিতে...।’ (এখানেও সেই কথা ও কবিতার জটিলতা বিবেচ্য।) মোট ১০৪ পৃষ্ঠার পাকা বাঁধাই গ্রন্থটির ৯২ পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে এইসব নানা স্বাদের গীতিকবিতাগুলি। এই প্রয়াস নি:সন্দেহে ব্যতিক্রমী। গীতিকবিতা বা গান, তাও আবার রাশি রাশি… সচরাচর বিরল। মূল বিভাগে কবিতাগুলিকে সংখ্যা সংখ্যা দ্বারা চিহ্নায়িত করা হলেও ৬ পৃষ্ঠাব্যাপী দীর্ঘ সূচিপত্রে প্রতিটি কবিতার আলাদা শিরোনামও রয়েছে যেগুলো মূলত গানের/কবিতার প্রথম লাইন।
বিশাল এই সম্ভারে জীবনের নানা দিক, নানা অনুভব ও অনুভূতি উঠে এসেছে গান হয়ে, কবিতা হয়ে। প্রেম-ভালোবাসা, সমাজ, বেঁচে থাকার প্রতিবন্ধকতা, ঋতুসংলাপ, ভাষা-সাহিত্য, কালের বিবর্তন, রাজনীতি, শ্লেষ ও প্রতিবাদ, প্রকৃতি, ভাব ও ভক্তি, উৎসব ও পুজো, প্রার্থনা আদি দিনযাপনের প্রতিটি অনুষঙ্গ যেন ধরা আছে গানে, কবিতায়। সুরের অপেক্ষায় থাকা এইসব সৃষ্টি যেন ‘কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিতে’ উদ্গ্রীব হয়ে আছে।
গীতিকবিতাসমূহ পড়লে বোঝা যায় স্রষ্টা যথাসাধ্য গেয় করে তুলতে সচেষ্ট হয়েছেন প্রতিটি রচনায়। কিছু উপমা লক্ষণীয় -
মনে রং
শরীরে আগুন
মাসটা যে ফাগুন।
আবির টানে
মন ভরা গানে
স্বপ্ন বাসন্তী প্রাণে।
মান অভিমান ভুলে যাও
বসন্তের গান গাও
আবির রাঙা হয়েছে এ মন।
(সংখ্যা - ১৫৭)
ফুটিছে ফুল শেফালি পদ্ম
আকাশে ফুটিছে মেঘ বকুল
প্রকৃতি সাজিয়াছে তোমার বরনে
এসো হে এসো
রাত্রির আঁধারে তুমি করেছো যাত্রা
তোমার পাদস্পর্শে হয়েছে আলো
অসুর করিছে দেখো কত হুংকার
এসো হে এসো……।
(সংখ্যা - ১৭৩)
দাদা বলেন বেকার ভাই
আমার দলের বিকল্প নাই।
এসো আমাদের সনে।।
খাইতে দেব মাংস ভাত
বসতে দেব রাজ্যপাট
কোন দুঃখ রইবে না মনে
এসো আমাদের সনে…।
(সংখ্যা - ২৮৩)
বেশ কিছু গীতিকবিতা রয়েছে যেগুলো জনপ্রিয় গানের প্রচলিত সুরের উপযোগী করে লেখা। বিষয়ে প্রেম-ভালোবাসার প্রাধান্য রয়েছে যদিও অন্যান্য বিষয়ের উপরেও রয়েছে বহু কবিতা।
কবিতার ছন্দ ও গানের ছন্দ এক নয়। তাল ও সুরের উপর নির্ভর করে শব্দের প্রয়োগ নির্ভর করে। সেই দায় সুরকারের। গীতিকবিতার এই সম্ভার থেকে কোনও সুরকার অনায়াসে পছন্দ করে নিতে পারেন তার কাঙ্ক্ষিত গানটি।
রয়েছে আঞ্চলিক ভাষার বহু গীতিকবিতাও। রয়েছে স্বভূম, স্ব-সমাজের পরিচিত শব্দাবলি সংবলিত বেশ কিছু কবিতা। সব মিলিয়ে এক ভিন্নতর ভাবনার প্রতিফলন এইসব সৃষ্টি। গ্রন্থের ছাপা, বাঁধাই, অক্ষরবিন্যাস যথাযথ হলেও বানানবিভ্রাট রয়েছে বেশ কিছু। এমনকী গ্রন্থনামে, গীতিকবিতার শিরোনামে (প্রথম লাইনে)ও। পরবর্তী সংকলনে এদিকে অধিকতর নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে বইকী। ব্লার্বের দুটি ফ্ল্যাপই খালি রয়ে গেছে যা দৃষ্টিনন্দন নয়। তবে গ্রন্থের ইঙ্গিতবাহী নান্দনিক প্রচ্ছদ নিশ্চিতই প্রলুব্ধ করবে পাঠককে। সৌজন্যে পুষ্পল দেব। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে কবি, নাট্যকার ও গীতিকার নিবারণ নাথকে।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
রৌদ্রস্নাত গোধূলি চুম্বন’
হৃষিকেশ নাথপ্রকাশক - মুক্তধারা পাবলিকেশনস
মূল্য - ৩৫০ টাকা
যোগাযোগ - ৮৪১৩০৯৩১১৪

Comments
Post a Comment