আড্ডায় আজ অভয়ের
মুখ ভার। প্রথমে বোঝা না গেলেও ক্রমশ তা প্রকাশ্যে
এল সকলেরই। কেমন যেন উদাস উদাস ভাব অভয়ের। সান্ধ্য
আড্ডা বসেছে যদিও নিয়ম মেনে কিন্তু কথা যেন ঠিক জমছে না অন্যদিনের মতো। তায়
বিরাজও এদিন অনুপস্থিত। ঝিমোনো আড্ডাকে
কী করে সচল করা যায় তা সব থেকে বেশি জানে বিরাজই। তবু
একে একে উপস্থিত সবারই নজরে এল অভয়ের ব্যাপারটা। সুজনই
প্রথমে জিজ্ঞেস করল -
– কী রে অভয়, ঝিমোচ্ছিস যে? কথা নেই
আজ?
যেন ঘোর থেকে বেরোল অভয়। সামান্য একটু কেশে নিয়ে বলল -
– মন ভালো নেই রে।
চমকে উঠল সবাই। ব্যাচেলরের আড্ডায় মনখারাপির খবর তো বড় সাধারণ কথা নয়। অভয়, বিরাজ, সুজন, হারাধন, সঞ্জয় ও শংকর - একসাথে একই অফিসে জয়েন করেছে বছর হতে চলল। নানা দিক থেকে এসে জড়ো হয়েছে সবাই। পোস্টিং হয়েছে এই আধাশহরে, একই পোস্টে। স্বভাবতই একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে একাত্ম হতে সময় লাগেনি খুব। প্রথমে ভেবেছিল কোথাও মেস করে একই সাথে থাকবে। কিন্তু সেরকম বাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়নি বলে থাকাটা আলাদা হয়েছে বটে তবে এই নিয়মিত আড্ডা যেন একে অপরের সাথে জুড়ে রেখেছে নিত্যদিন। অনিলকাকুর চায়ের দোকানে বসার জায়গাটা বেশ ছোট ছিল আগে। এই এক ঝাঁক তরুণের নিয়মিত আড্ডার সুবাদে তাঁরও দিন বদলাতে শুরু হল ক্রমশ। চা-বিস্কুটের পাশাপাশি চানাচুর এমনকী কয়েক পদ মিষ্টিও রাখতে শুরু করলেন অনিলকাকু। আড্ডায় কে কখন কী চাইবে তার কোন ঠিকানা নেই, তাই রাখতে হয় সবকিছু। এ তাঁর হাতের লক্ষ্মী, পায়ে ঠেলার কোন সুযোগ নেই তাঁর কাছে। ফলত বসার পরিসরটাও বাড়াতে হয়েছে খানিক।
সব মিলিয়ে দিন যাচ্ছিল তরতরিয়ে। এমন দিনে আজকের আড্ডায় হঠাৎ করে এই ছন্দপতন স্বভাবতই এক বিস্ময়ের পরিবেশ সৃষ্টি করল। অভয়ের বাইরে সবাই নানা চিন্তায় নিমগ্ন হল নিমিষে। এই বিদেশ বিভুঁইয়ে এসে অভয় না কোন কেলেঙ্কারি বাঁধিয়ে ফেলে। দুশ্চিন্তার বিষয় বটে। এর ফল হতে পারে মারাত্মক। সবারই এতে সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনা। বিশেষত নারীঘটিত কোন ব্যাপার হলে তো কথাই নেই। কপালে দুঃখ আছে সবার। এ নিশ্চিত। ব্যাপারটা খোলসা না হওয়া পর্যন্ত এক উশখুশ সবার ভিতরে।
এরই মধ্যে বিরাজ এসে ঢুকল। সবাই একযোগে নীরব চাউনিতে বিরাজের দিকে তাকিয়ে বসার ইঙ্গিত করল। হতভম্ব বিরাজ কিছু আঁচ করতে না পেরে চুপচাপ বসে পড়ল। শেষ পর্যন্ত মুখ খুলল সঞ্জয়। এসব ব্যাপারে, কোন সমস্যার সমাধানে সঞ্জয় এর আগে অনেক জায়গায় পরিপক্কতার প্রমাণ দিয়েছে। তাই সঞ্জয়কে বলতে শুরু করা মাত্র বাকি সবাই চুপটি করে হাঁ করে তাকিয়ে রইল সঞ্জয়ের দিকে।
– ‘ব্যাপার কী ভাই? একটু বুঝিয়ে বলবি? হঠাৎ করে মন খারাপ রোগটা কী করে বাঁধিয়ে ফেললি তা জানার জন্য আমরা ব্যাকুল হয়ে রয়েছি যে।
শংকর কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল - হাতের ইশারায় তাকে থামতে বলল হারাধন। শংকর ঢোঁক গিলল। সবাই উন্মুখ হয়ে তখন অভয়ের দিকে তাকিয়ে। বছর ছাব্বিশের অবশিষ্ট পাঁচ তরুণ তুর্কির পাঁচ জোড়া চোখ যেন আস্ত গিলে খেতে চাইছে অভয়কে।
– আচ্ছা তোরা বল তো আমাদের অফিসের ঠিক সামনের বাড়ি থেকে রোজ বিকেলে টুইশন করতে সেজেগোজে বেরিয়ে যায় যে মেয়েটি তার বয়স কত?
চোখেমুখে করুণরসের আভা ফুটিয়ে এইমাত্র নিক্ষিপ্ত অভয়ের এই কথা তো কথা নয় শুধু, যেন ছোটখাটো একটি অ্যাটম বম বিস্ফোরিত হল এইমাত্র, এই আড্ডাসভার ঠিক মাঝখানে। এই মুহূর্তে - ‘সবার হৃদয়ে সেই মেয়েটি, চেতনায় অভয়’। বিরাজ ভাবছে - শ্লা, তলে তলে এত? এতদিন ধরে চোখে চোখে রাখছিলাম কাউকে কিছু না জানিয়ে। এ তো দেখছি ঘর শত্রু বিভীষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। …এবং এই মুহূর্তে বিরাজ যা ভাবছে বাকি চারটি হৃদয়েও যেন তারই নহবত। কে দেবে এই কঠিন প্রশ্নের উত্তর? কার বুকের পাটা এতটা যে অভয় ও ওই মেয়েটির অবৈধ সম্পর্ক নিয়ে কিছু বলে? বলতে গিয়ে কি ভেঙে খানখান হয়ে যাবে না এই ক্ষুদ্র হৃদয়? অভয় যে ইতোমধ্যেই এক অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে তা বুঝতে আর বাকি রইল না কারও। অথচ সবাই ভাবছে - আমার সাথে হলে অন্তত খারাপ হতো না ব্যাপারটা। বাকি সবাই এই মেয়ের যোগ্য হতেই পারে না।
হয়তো এই প্রথমবারের মতো ছয় বন্ধু একে অন্যের প্রতি সন্দিহান হয়ে উঠল, ছয়ের এক হয়ে উঠল অবশিষ্ট পাঁচের প্রতিদ্বন্দ্বী। সৃষ্টি হল এক বিভাজন রেখা - তবে একে অন্যের অগোচরে। কারণ কেউই জানে না যে বাকি চারজনও তারই মতো চিন্তাকে সঙ্গী করে বসে আছে তারই সামনে। এ ওর মুখের দিকে তাকানোরও ইচ্ছে যেন হারিয়ে ফেলেছে। সময় অতিবাহিত হল অনেকটাই। হঠাৎ করে ফের শংকর কিছু একটা বলতে যেতেই ফের একবার হাতের ইশারায় থামিয়ে দিল হারাধন। দ্বিতীয়বার প্রত্যাখ্যাত হয়ে শংকর খানিকটা বিরূপই হল হারাধনের প্রতি। তবু পরিস্থিতি বুঝে সামলে নিল নিজেকে। আর ঠিক তখনই সরাসরি অভয়ের দিকে তাকিয়ে আচমকা সুজন বলে উঠল -
– কেন বল তো?
– আহ্, বল না। - অভয় জানতে চাইল।
– ধরা যেতে পারে ষোলো থেকে আঠারো। - সুজন বলল।
– আমাদের বয়স কত? - দ্বিতীয় প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল অভয়।
এবার সমস্বরে হলেও কেউ বলল পঁচিশ, কেউ ছাব্বিশ।
– ঠিক তাই। - টেবিলের উপর হাত চাপড়ে খানিকটাই জোরের সঙ্গেই সহমত পোষণ করল অভয়। এবং এরপরই চুপ মেরে দিল। যেন বাকি সব কথাবার্তা, চিন্তাভাবনা সবকিছুর দায় এবার অন্যদের।
কিন্তু এতে কী? সমস্যার কি সমাধান হয়ে গেল? এটুকুই কি আজকের আড্ডার সারকথা?
অনিলকাকু এতক্ষণ
চুপ করে সব শুনছিলেন। আজ আড্ডার পরিবেশ
খানিকটা অন্যরকম। কেমন এক সুনসান রহস্যময় পরিস্থিতি। খাওয়াদাওয়ার
কথা যেন ভুলেই গেছে সবাই। কিন্তু তিনি
তো তা ভুলতে পারেন না। এমনিত অনিলকাকু
খুব বিশ্বস্ত এবং সবারই বন্ধুর মতো। আজ অবধি
কোন কথা অনিলকাকুর মাধ্যমে বাইরে ছড়ায়নি এটা বলা যায় হলফ করে। এতটা
ঠিক আছে, কিন্তু আড্ডা হবে আর চা-বিস্কুট কিংবা মিষ্টি হবে না এটা তিনি
কী করে মেনে নিতে পারেন? সুতরাং আচমকাই আসরে নেমে পড়লেন তিনি
-
– কী গো বাবুরা। আজ চা-মিষ্টিটা হবে না? ইচ্ছে করেই চা-বিস্কুট না বলে চা-মিষ্টি বললেন। কেন
কীজানি? কিছু কি আঁচ করতে পারলেন? নাকি ফায়দা ওটাতেই
বেশি বলে? তা তিনি ভাবতেই পারেন। কারণ
ব্যাবসা বলে তো একটা কথা আছে।
রহস্য কিংবা
উত্তেজনা যখন চড়ছে তরতরিয়ে তখনই শংকর অন্য কারও দিকে না তাকিয়েই, এমনকী অনিলকাকুর দিকেও, আচমকা বলে উঠল -
– ষোল হলেই বা কী আর আঠেরো হলেই বা কী? খোলসা করে বলবি
তো তোর মনখারাপির কারণটা কী। আর… বাকিটা বলার আগেই এবার সঞ্জয় এগোতে দিল না শংকরকে। অবশিষ্ট
অংশটুকু নাহয় থাকুক যার যার অন্তরেই। ব্যর্থ
শংকর আরও একবার চুপ করতে বাধ্য হল। তবে
আড্ডার এই আপাত নিস্তব্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হল না। অভয়
এবার মোক্ষম প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল সবার দিকে তাকিয়ে।
– গতকাল বন্ধবারের বিকেলে আমি যখন একা একাই পাড়ার মোড়ের স্যালুনে দাড়ি কাটাবো বলে বেরিয়েছি তখন গেট খুলে একেবারে আচমকাই সামনাসামনি হতে মেয়েটি তাহলে কেন আমাকে জিজ্ঞেস করল - ‘ক’টা বাজে আঙ্কল? আমি হাতঘড়ি পরতে ভুলে গেছি।’
হাসিকান্নার
গুচ্ছ গুচ্ছ অনুভূতি এসে যেন বসন্তের দমকা হাওয়ার মতো অভয়ের বাইরে অন্য পাঁচটি হৃদয়কে
একে একে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে ফিরে গেল অজানার দিশে। অনিলকাকু
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন কেমন বিচিত্র মুখচ্ছবি নিয়ে হাঁ করে বসে আছে আড্ডাসভার সদস্যরা।
###
কবেকার সেই কথা। এরপর কত জল বয়ে গেছে সিংলা, লঙ্গাই, বরাক, ব্রহ্মপুত্র দিয়ে। সুখ-দু:খের বারতা নিয়ে কত হাওয়ার ঝাপটা বয়ে গেছে দোহালিয়া, বড়াইল, নীলাচল পাহাড় পেরিয়ে। আড্ডাসভার সব সদস্যরা নানা জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে অবসরে কালাতিপাত করছেন। অভয় অবশ্য স্বেচ্ছা অবসরেই আছেন কয়েক বছর ধরে। অন্যথা আরও বছর দুয়েক বাকি ছিল তাঁর। অনেকেরই পরবর্তী প্রজন্ম শিক্ষাদীক্ষায় রত। কারও কারও সন্তানেরা সদ্য চাকরিতেও ঢুকেছে। যোগাযোগ আছে সবার মধ্যেই। ফেলে আসা দিনের যাবতীয় স্মৃতি বুকে ধরে যার যার ঘর সংসার নিয়েই দিন কাটে সবার। সেই আড্ডাসভা, সেই ষোড়শী কিংবা অষ্টাদশীও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে বাস্তব যা তা হল কালেভদ্রেই মোবাইলে যেটুকু কথা হয়। সবারই হৃদয়ে ভাবনার সূত্রপাত হয় শুধু মাঝে মাঝেই - এরই নাম কি স্বার্থপরতা? নাকি মর্মভেদী বাস্তব?
###
অভয়ের একমাত্র পুত্রের চাকরি হয়েছে দিল্লিতে। দ্বারকা সেক্টর ১০-এ একটি ফ্ল্যাট নিয়ে সপরিবার অভয় এখন সেখানেই থিতু হয়েছেন। ছেলের বারো ঘণ্টার চাকরি। সকালেই বেরিয়ে যায়। স্বামী-স্ত্রী দুজনে সারা দিন কত আর কথা বলা যায় - বলা ভালো খুঁজে পাওয়া যায়? সকালের ব্রেকফাস্ট সেরে তাই থলে হাতে খানিক ঘুরে আসেন মান্ডি থেকে। এখানে বাজারকে মান্ডিই বলে। বাইরেই কাটিয়েছেন পুরো কর্মজীবন। বাহির তাই অহরহ টানে অভয়কে। সংসার বেড়াজালে আটকে থেকেও তাই ফুরসত খুঁজেন বাইরে কিছুটা হলেও সময় কাটাতে। পায়ে পায়ে এগিয়ে যান অভয় সবজি মান্ডির দিকে। রাস্তাঘাট সব এখানে পাকা। ঝকঝকে। পরিচ্ছন্ন। রাজধানী শহর বলে কথা। একের পর এক গগনচুম্বী আবাসনগুলো খুবই পরিকল্পনামাফিক তৈরি করা হয়েছে। রাস্তায় লোকজনের চলাফেরা খুবই সীমিত। তার চাইতে বরং গাড়িঘোড়ার চলাই বেশি।
নিজের জন্মভূমির কথা মনে পড়ে বারবার। কিছুই পরিকল্পিত ছিল না। ছন্নছাড়া পরিবেশেই মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছিলেন অভয়ের
ছিন্নমূল পূর্বপুরুষ। সেখানেই জন্ম অভয়ের। চারিদিকে প্রকৃতির অনুপম মমতা। মালিকানার কড়াকড়ি ছিল না মোটেও। যখন যেখান থেকে খুশি কুড়িয়েছেন প্রকৃতির দান লতাপাতা, ফলমূল। সারগর্ভ মাটি অকাতরে বিলিয়েছে জীবন ধারণের ফসল। উদ্দাম ছিল ছুটে বেড়ানো। যখন যেদিকে খুশি। কর্মজীবনেও এভাবেই একের পর এক অচেনাকে করেছেন চেনা সাথি। প্রাণে প্রাণে হয়েছে সখ্য, মনে মনে গড়ে উঠেছে অবিচ্ছেদ্য বন্ধন - এমন, যেন কত জনমের। এখানে বেশ একটা বড়লোক বড়লোক ব্যাপার। কেউ কারও নয়। অযাচিত কথাবার্তা, সমাগম কেউ পছন্দ করে না।
ফুটপাথ ধরে এগিয়ে সবজি বাজারে প্রবেশ করলেন অভয়। চেনা সবজিওয়ালা ছেলেটির বয়স কত হবে - বড়জোর চল্লিশ। খুব ভালো ব্যবহার। কথা বলে আপনজনের মতো। দেখেই বলল -
– আইয়ে আঙ্কল। ক্যায়সে হ্যাঁয় আপ?
– চল রহা হ্যাঁয় ভাই… জ্যায়সে ত্যায়সে। - কিছু চিন্তা ভাবনা না করেই আনমনে জবাব দিলেন অভয়।
– আঙ্কল, বুরা মত পাইয়েগা। ভাই মত কহিয়ে হমকো। আপ মুঝে বেটা বোল সকতে হো। য়া, মেরা নাম পুষ্কর হ্যাঁয়। নাম লেকে পুকার সকতে হ্যাঁয়।
চমকে উঠলেন অভয়। সত্যিই তো বয়সের ফারাকটা তো দেখতে হবে এবার। এতদিন যেভাবে সম্বোধন করেছেন তা যে এবার পালটে ফেলার সময় হয়ে এসেছে তা তো খেয়ালেই আসেনি। তাছাড়া স্বেচ্ছা অবসরে থাকায় কখনও অবসরপ্রাপ্ত হওয়ার অনুভূতি তাঁকে ঘিরে ধরে ফেলতে পারেনি। যদিও আসলেই অবসরের বয়স হতে এখনও খানিক বাকি আছে। তবু সতর্কতা আগেই অবলম্বন করা উচিত ছিল, যা চিন্তায় আসেনি এতদিন। মনে পড়ল তাঁর হাইস্কুলে পড়ার সময় শিক্ষকমশাই একবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছুটি’ ছোটগল্পটি পড়াচ্ছিলেন। সেখানে এক জায়গায় গল্পের নায়ক ‘ফটিক’ সম্পর্কে বলা হয়েছে - ‘বিশেষত, তেরো-চৌদ্দ বৎসরের ছেলের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নাই। শোভাও নাই, কোনো কাজেও লাগে না। স্নেহও উদ্রেক করে না, তাহার সঙ্গসুখও বিশেষ প্রার্থনীয় নহে। তাহার মুখে আধো-আধো কথাও ন্যাকামি, পাকা কথাও জ্যাঠামি এবং কথামাত্রই প্রগল্ভতা। হঠাৎ কাপড়চোপড়ের পরিমাণ রক্ষা না করিয়া বেমানানরূপে বাড়িয়া উঠে; লোকে সেটা তাহার একটা কুশ্রী স্পর্ধাস্বরূপ জ্ঞান করে। তাহার শৈশবের লালিত্য এবং কণ্ঠস্বরের মিষ্টতা সহসা চলিয়া যায়; লোকে সেজন্য তাহাকে মনে মনে অপরাধ না দিয়া থাকিতে পারে না। শৈশব এবং যৌবনের অনেক দোষ মাপ করা যায়, কিন্তু এই সময়ের কোনো স্বাভাবিক অনিবার্য ত্রুটিও যেন অসহ্য বোধ হয়। সেও সর্বদা মনে মনে বুঝিতে পারে, পৃথিবীর কোথাও সে ঠিক খাপ খাইতেছে না ; এইজন্য আপনার অস্তিত্ব সম্বন্ধে সর্বদা লজ্জিত ও ক্ষমাপ্রার্থী হইয়া থাকে। অথচ এই বয়সেই স্নেহের জন্য কিঞ্চিৎ অতিরিক্ত কাতরতা মনে জন্মায়। এই সময়ে যদি সে কোনো সহৃদয় ব্যক্তির নিকট হইতে স্নেহ কিংবা সখ্য লাভ করিতে পারে তবে তাহার নিকট আত্মবিক্রীত হইয়া থাকে। কিন্তু তাহাকে স্নেহ করিতে কেহ সাহস করে না; কারণ সেটা সাধারণে প্রশ্রয় বলিয়া মনে করে। সুতরাং তাহার চেহারা এবং ভাবখানা অনেকটা প্রভুহীন পথের কুকুরের মতো হইয়া যায়।’ - সেই মুখস্থ শেখা অংশটি আজও হুবহু মনে আছে অভয়ের। লজ্জিত হয়েই বললেন -
– সরি বেটা। সহি বোলা তুম। ক্যা হ্যাঁয় কি, না তো তুম বেটা কহনে কা উমর মে হো, অউর উপর সে মেরা অওসর লেনে কা উমর অভি নহি হুয়া না? ইসলিয়ে পুরানা আদত রহ গয়া। - নিজের স্ট্যাটাস উপলব্ধির সাথে সাথে লোকের ছোট হয়ে থাকার লোভটাও ধরিয়ে দিলেন অভয়। জীবনের প্রায় তিন কুড়ি বছর বয়স তো আর তাঁর এমনি এমনি হয়নি। শুধু
তেরো-চৌদ্দ নয়, জীবনে বয়:সন্ধির প্রতিটি মোড়েই আসে এমন বিড়ম্বনা। শৈশব-কৈশোর,
কৈশোর-যৌবন, যৌবন-প্রৌঢ়ত্ব, প্রৌঢ়ত্ব-বার্ধক্য - প্রতিটি সন্ধিক্ষণে।
সবজি নিলেন ব্যাগ প্রায় ভর্তি করে। ‘বেটা’ খুব খুশি হল। অভয়ও খুশি মনে ঘরে ফিরলেন। গিন্নির সামনে বাজারের থলেটা রেখে নিজেদের একতলার ব্যালকনিতে এসে ফ্যান চালিয়ে চেয়ারে বসলেন আরাম করে। আয়েসে চোখদুটি বুজতেই অমনি কোথা থেকে মনের মুকুরে ভেসে এল এক পুরোনো ছবি। চোখ খুললেন অভয় - তাকিয়ে দেখলেন নীচে রাস্তার অপর দিকের বাড়ির গেট থেকে বেরিয়ে এসে তাঁর দিকে তাকিয়েই জিজ্ঞেস করছে সালোয়ার কামিজ পরিহিত একটি পূর্ণবয়স্ক যুবতি -
– ‘আঙ্কল, টাইম ক্যা হুয়া? মোবাইল লানা ভুল গয়ী।’
‘আঙ্কল? আঙ্কল?’... অভয় নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। নিজেকে যেন ছাব্বিশ বছরের যুবক মনে হতে লাগল তাঁর। না, এখনই একবার বিরাজদের ফোন না করলে নয়।
যেন ঘোর থেকে বেরোল অভয়। সামান্য একটু কেশে নিয়ে বলল -
চমকে উঠল সবাই। ব্যাচেলরের আড্ডায় মনখারাপির খবর তো বড় সাধারণ কথা নয়। অভয়, বিরাজ, সুজন, হারাধন, সঞ্জয় ও শংকর - একসাথে একই অফিসে জয়েন করেছে বছর হতে চলল। নানা দিক থেকে এসে জড়ো হয়েছে সবাই। পোস্টিং হয়েছে এই আধাশহরে, একই পোস্টে। স্বভাবতই একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে একাত্ম হতে সময় লাগেনি খুব। প্রথমে ভেবেছিল কোথাও মেস করে একই সাথে থাকবে। কিন্তু সেরকম বাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়নি বলে থাকাটা আলাদা হয়েছে বটে তবে এই নিয়মিত আড্ডা যেন একে অপরের সাথে জুড়ে রেখেছে নিত্যদিন। অনিলকাকুর চায়ের দোকানে বসার জায়গাটা বেশ ছোট ছিল আগে। এই এক ঝাঁক তরুণের নিয়মিত আড্ডার সুবাদে তাঁরও দিন বদলাতে শুরু হল ক্রমশ। চা-বিস্কুটের পাশাপাশি চানাচুর এমনকী কয়েক পদ মিষ্টিও রাখতে শুরু করলেন অনিলকাকু। আড্ডায় কে কখন কী চাইবে তার কোন ঠিকানা নেই, তাই রাখতে হয় সবকিছু। এ তাঁর হাতের লক্ষ্মী, পায়ে ঠেলার কোন সুযোগ নেই তাঁর কাছে। ফলত বসার পরিসরটাও বাড়াতে হয়েছে খানিক।
সব মিলিয়ে দিন যাচ্ছিল তরতরিয়ে। এমন দিনে আজকের আড্ডায় হঠাৎ করে এই ছন্দপতন স্বভাবতই এক বিস্ময়ের পরিবেশ সৃষ্টি করল। অভয়ের বাইরে সবাই নানা চিন্তায় নিমগ্ন হল নিমিষে। এই বিদেশ বিভুঁইয়ে এসে অভয় না কোন কেলেঙ্কারি বাঁধিয়ে ফেলে। দুশ্চিন্তার বিষয় বটে। এর ফল হতে পারে মারাত্মক। সবারই এতে সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনা। বিশেষত নারীঘটিত কোন ব্যাপার হলে তো কথাই নেই। কপালে দুঃখ আছে সবার। এ নিশ্চিত। ব্যাপারটা খোলসা না হওয়া পর্যন্ত এক উশখুশ সবার ভিতরে।
এরই মধ্যে বিরাজ এসে ঢুকল। সবাই একযোগে নীরব চাউনিতে বিরাজের দিকে তাকিয়ে বসার ইঙ্গিত করল। হতভম্ব বিরাজ কিছু আঁচ করতে না পেরে চুপচাপ বসে পড়ল। শেষ পর্যন্ত মুখ খুলল সঞ্জয়। এসব ব্যাপারে, কোন সমস্যার সমাধানে সঞ্জয় এর আগে অনেক জায়গায় পরিপক্কতার প্রমাণ দিয়েছে। তাই সঞ্জয়কে বলতে শুরু করা মাত্র বাকি সবাই চুপটি করে হাঁ করে তাকিয়ে রইল সঞ্জয়ের দিকে।
– ‘ব্যাপার কী ভাই? একটু বুঝিয়ে বলবি? হঠাৎ করে মন খারাপ রোগটা কী করে বাঁধিয়ে ফেললি তা জানার জন্য আমরা ব্যাকুল হয়ে রয়েছি যে।
শংকর কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল - হাতের ইশারায় তাকে থামতে বলল হারাধন। শংকর ঢোঁক গিলল। সবাই উন্মুখ হয়ে তখন অভয়ের দিকে তাকিয়ে। বছর ছাব্বিশের অবশিষ্ট পাঁচ তরুণ তুর্কির পাঁচ জোড়া চোখ যেন আস্ত গিলে খেতে চাইছে অভয়কে।
– আচ্ছা তোরা বল তো আমাদের অফিসের ঠিক সামনের বাড়ি থেকে রোজ বিকেলে টুইশন করতে সেজেগোজে বেরিয়ে যায় যে মেয়েটি তার বয়স কত?
চোখেমুখে করুণরসের আভা ফুটিয়ে এইমাত্র নিক্ষিপ্ত অভয়ের এই কথা তো কথা নয় শুধু, যেন ছোটখাটো একটি অ্যাটম বম বিস্ফোরিত হল এইমাত্র, এই আড্ডাসভার ঠিক মাঝখানে। এই মুহূর্তে - ‘সবার হৃদয়ে সেই মেয়েটি, চেতনায় অভয়’। বিরাজ ভাবছে - শ্লা, তলে তলে এত? এতদিন ধরে চোখে চোখে রাখছিলাম কাউকে কিছু না জানিয়ে। এ তো দেখছি ঘর শত্রু বিভীষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। …এবং এই মুহূর্তে বিরাজ যা ভাবছে বাকি চারটি হৃদয়েও যেন তারই নহবত। কে দেবে এই কঠিন প্রশ্নের উত্তর? কার বুকের পাটা এতটা যে অভয় ও ওই মেয়েটির অবৈধ সম্পর্ক নিয়ে কিছু বলে? বলতে গিয়ে কি ভেঙে খানখান হয়ে যাবে না এই ক্ষুদ্র হৃদয়? অভয় যে ইতোমধ্যেই এক অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে তা বুঝতে আর বাকি রইল না কারও। অথচ সবাই ভাবছে - আমার সাথে হলে অন্তত খারাপ হতো না ব্যাপারটা। বাকি সবাই এই মেয়ের যোগ্য হতেই পারে না।
হয়তো এই প্রথমবারের মতো ছয় বন্ধু একে অন্যের প্রতি সন্দিহান হয়ে উঠল, ছয়ের এক হয়ে উঠল অবশিষ্ট পাঁচের প্রতিদ্বন্দ্বী। সৃষ্টি হল এক বিভাজন রেখা - তবে একে অন্যের অগোচরে। কারণ কেউই জানে না যে বাকি চারজনও তারই মতো চিন্তাকে সঙ্গী করে বসে আছে তারই সামনে। এ ওর মুখের দিকে তাকানোরও ইচ্ছে যেন হারিয়ে ফেলেছে। সময় অতিবাহিত হল অনেকটাই। হঠাৎ করে ফের শংকর কিছু একটা বলতে যেতেই ফের একবার হাতের ইশারায় থামিয়ে দিল হারাধন। দ্বিতীয়বার প্রত্যাখ্যাত হয়ে শংকর খানিকটা বিরূপই হল হারাধনের প্রতি। তবু পরিস্থিতি বুঝে সামলে নিল নিজেকে। আর ঠিক তখনই সরাসরি অভয়ের দিকে তাকিয়ে আচমকা সুজন বলে উঠল -
– আহ্, বল না। - অভয় জানতে চাইল।
– ধরা যেতে পারে ষোলো থেকে আঠারো। - সুজন বলল।
– আমাদের বয়স কত? - দ্বিতীয় প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল অভয়।
এবার সমস্বরে হলেও কেউ বলল পঁচিশ, কেউ ছাব্বিশ।
– ঠিক তাই। - টেবিলের উপর হাত চাপড়ে খানিকটাই জোরের সঙ্গেই সহমত পোষণ করল অভয়। এবং এরপরই চুপ মেরে দিল। যেন বাকি সব কথাবার্তা, চিন্তাভাবনা সবকিছুর দায় এবার অন্যদের।
– গতকাল বন্ধবারের বিকেলে আমি যখন একা একাই পাড়ার মোড়ের স্যালুনে দাড়ি কাটাবো বলে বেরিয়েছি তখন গেট খুলে একেবারে আচমকাই সামনাসামনি হতে মেয়েটি তাহলে কেন আমাকে জিজ্ঞেস করল - ‘ক’টা বাজে আঙ্কল? আমি হাতঘড়ি পরতে ভুলে গেছি।’
###
কবেকার সেই কথা। এরপর কত জল বয়ে গেছে সিংলা, লঙ্গাই, বরাক, ব্রহ্মপুত্র দিয়ে। সুখ-দু:খের বারতা নিয়ে কত হাওয়ার ঝাপটা বয়ে গেছে দোহালিয়া, বড়াইল, নীলাচল পাহাড় পেরিয়ে। আড্ডাসভার সব সদস্যরা নানা জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে অবসরে কালাতিপাত করছেন। অভয় অবশ্য স্বেচ্ছা অবসরেই আছেন কয়েক বছর ধরে। অন্যথা আরও বছর দুয়েক বাকি ছিল তাঁর। অনেকেরই পরবর্তী প্রজন্ম শিক্ষাদীক্ষায় রত। কারও কারও সন্তানেরা সদ্য চাকরিতেও ঢুকেছে। যোগাযোগ আছে সবার মধ্যেই। ফেলে আসা দিনের যাবতীয় স্মৃতি বুকে ধরে যার যার ঘর সংসার নিয়েই দিন কাটে সবার। সেই আড্ডাসভা, সেই ষোড়শী কিংবা অষ্টাদশীও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে বাস্তব যা তা হল কালেভদ্রেই মোবাইলে যেটুকু কথা হয়। সবারই হৃদয়ে ভাবনার সূত্রপাত হয় শুধু মাঝে মাঝেই - এরই নাম কি স্বার্থপরতা? নাকি মর্মভেদী বাস্তব?
###
অভয়ের একমাত্র পুত্রের চাকরি হয়েছে দিল্লিতে। দ্বারকা সেক্টর ১০-এ একটি ফ্ল্যাট নিয়ে সপরিবার অভয় এখন সেখানেই থিতু হয়েছেন। ছেলের বারো ঘণ্টার চাকরি। সকালেই বেরিয়ে যায়। স্বামী-স্ত্রী দুজনে সারা দিন কত আর কথা বলা যায় - বলা ভালো খুঁজে পাওয়া যায়? সকালের ব্রেকফাস্ট সেরে তাই থলে হাতে খানিক ঘুরে আসেন মান্ডি থেকে। এখানে বাজারকে মান্ডিই বলে। বাইরেই কাটিয়েছেন পুরো কর্মজীবন। বাহির তাই অহরহ টানে অভয়কে। সংসার বেড়াজালে আটকে থেকেও তাই ফুরসত খুঁজেন বাইরে কিছুটা হলেও সময় কাটাতে। পায়ে পায়ে এগিয়ে যান অভয় সবজি মান্ডির দিকে। রাস্তাঘাট সব এখানে পাকা। ঝকঝকে। পরিচ্ছন্ন। রাজধানী শহর বলে কথা। একের পর এক গগনচুম্বী আবাসনগুলো খুবই পরিকল্পনামাফিক তৈরি করা হয়েছে। রাস্তায় লোকজনের চলাফেরা খুবই সীমিত। তার চাইতে বরং গাড়িঘোড়ার চলাই বেশি।
ফুটপাথ ধরে এগিয়ে সবজি বাজারে প্রবেশ করলেন অভয়। চেনা সবজিওয়ালা ছেলেটির বয়স কত হবে - বড়জোর চল্লিশ। খুব ভালো ব্যবহার। কথা বলে আপনজনের মতো। দেখেই বলল -
– আঙ্কল, বুরা মত পাইয়েগা। ভাই মত কহিয়ে হমকো। আপ মুঝে বেটা বোল সকতে হো। য়া, মেরা নাম পুষ্কর হ্যাঁয়। নাম লেকে পুকার সকতে হ্যাঁয়।
চমকে উঠলেন অভয়। সত্যিই তো বয়সের ফারাকটা তো দেখতে হবে এবার। এতদিন যেভাবে সম্বোধন করেছেন তা যে এবার পালটে ফেলার সময় হয়ে এসেছে তা তো খেয়ালেই আসেনি। তাছাড়া স্বেচ্ছা অবসরে থাকায় কখনও অবসরপ্রাপ্ত হওয়ার অনুভূতি তাঁকে ঘিরে ধরে ফেলতে পারেনি। যদিও আসলেই অবসরের বয়স হতে এখনও খানিক বাকি আছে। তবু সতর্কতা আগেই অবলম্বন করা উচিত ছিল, যা চিন্তায় আসেনি এতদিন। মনে পড়ল তাঁর হাইস্কুলে পড়ার সময় শিক্ষকমশাই একবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছুটি’ ছোটগল্পটি পড়াচ্ছিলেন। সেখানে এক জায়গায় গল্পের নায়ক ‘ফটিক’ সম্পর্কে বলা হয়েছে - ‘বিশেষত, তেরো-চৌদ্দ বৎসরের ছেলের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নাই। শোভাও নাই, কোনো কাজেও লাগে না। স্নেহও উদ্রেক করে না, তাহার সঙ্গসুখও বিশেষ প্রার্থনীয় নহে। তাহার মুখে আধো-আধো কথাও ন্যাকামি, পাকা কথাও জ্যাঠামি এবং কথামাত্রই প্রগল্ভতা। হঠাৎ কাপড়চোপড়ের পরিমাণ রক্ষা না করিয়া বেমানানরূপে বাড়িয়া উঠে; লোকে সেটা তাহার একটা কুশ্রী স্পর্ধাস্বরূপ জ্ঞান করে। তাহার শৈশবের লালিত্য এবং কণ্ঠস্বরের মিষ্টতা সহসা চলিয়া যায়; লোকে সেজন্য তাহাকে মনে মনে অপরাধ না দিয়া থাকিতে পারে না। শৈশব এবং যৌবনের অনেক দোষ মাপ করা যায়, কিন্তু এই সময়ের কোনো স্বাভাবিক অনিবার্য ত্রুটিও যেন অসহ্য বোধ হয়। সেও সর্বদা মনে মনে বুঝিতে পারে, পৃথিবীর কোথাও সে ঠিক খাপ খাইতেছে না ; এইজন্য আপনার অস্তিত্ব সম্বন্ধে সর্বদা লজ্জিত ও ক্ষমাপ্রার্থী হইয়া থাকে। অথচ এই বয়সেই স্নেহের জন্য কিঞ্চিৎ অতিরিক্ত কাতরতা মনে জন্মায়। এই সময়ে যদি সে কোনো সহৃদয় ব্যক্তির নিকট হইতে স্নেহ কিংবা সখ্য লাভ করিতে পারে তবে তাহার নিকট আত্মবিক্রীত হইয়া থাকে। কিন্তু তাহাকে স্নেহ করিতে কেহ সাহস করে না; কারণ সেটা সাধারণে প্রশ্রয় বলিয়া মনে করে। সুতরাং তাহার চেহারা এবং ভাবখানা অনেকটা প্রভুহীন পথের কুকুরের মতো হইয়া যায়।’ - সেই মুখস্থ শেখা অংশটি আজও হুবহু মনে আছে অভয়ের। লজ্জিত হয়েই বললেন -
সবজি নিলেন ব্যাগ প্রায় ভর্তি করে। ‘বেটা’ খুব খুশি হল। অভয়ও খুশি মনে ঘরে ফিরলেন। গিন্নির সামনে বাজারের থলেটা রেখে নিজেদের একতলার ব্যালকনিতে এসে ফ্যান চালিয়ে চেয়ারে বসলেন আরাম করে। আয়েসে চোখদুটি বুজতেই অমনি কোথা থেকে মনের মুকুরে ভেসে এল এক পুরোনো ছবি। চোখ খুললেন অভয় - তাকিয়ে দেখলেন নীচে রাস্তার অপর দিকের বাড়ির গেট থেকে বেরিয়ে এসে তাঁর দিকে তাকিয়েই জিজ্ঞেস করছে সালোয়ার কামিজ পরিহিত একটি পূর্ণবয়স্ক যুবতি -
– ‘আঙ্কল, টাইম ক্যা হুয়া? মোবাইল লানা ভুল গয়ী।’
বিদ্যুৎ
চক্রবর্তী

Comments
Post a Comment