মৃত্যু জীবনেরই এক অনিবার্য পরিণতি। বস্তুত মৃত্যুই জীবনকে করে তোলে সম্পূর্ণ। এই আপ্তবাক্য স্মরণে রেখেও কিছু মৃত্যু সহজে মেনে নেওয়া যায় না। আশির দোরগোড়ায় পৌঁছে ও সাহিত্য সৃষ্টি এবং সাহিত্যকর্মে কীভাবে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া যায় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ সদ্যপ্রয়াত গল্পকার, লেখক মিথিলেশ ভট্টাচার্য। আচমকাই যেন স্তব্ধ হয়ে গেল তাঁর যাবতীয় কর্মকাণ্ড। প্রকাশিতব্য নতুন গল্পের বই, তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা ‘পরম্পরা’ - সবকিছুকে ছেড়ে নীরবে পাড়ি দিলেন পরপারে। কিন্তু একজন সাধকের তো মৃত্যু হয় না। কথাকার, সাধক সাহিত্যিক মিথিলেশও তাই হারিয়ে যেতে পারেন না। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমেই। উত্তর পূর্ব তথা বাংলা সাহিত্যের গল্পবিশ্বে যে অবদান তিনি রেখে গিয়েছেন তার রেশ থেকে যাবে কাল থেকে কালান্তরে।
গল্প নির্মাণ ও গল্পভাবনায় মিথিলেশ ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। তাঁর একাকী জীবনে আপনজনের মতো যেন গল্পেরা নিজে থেকে এসে ধরা দিত তাঁকে পূর্ণতায় ভরিয়ে দিতে। এক সাধক মহাজীবনের নাক্ষত্রিক মহাপ্রস্থান। তাঁর জীবনচর্চা যেমন নিষ্কলুষ তেমনি তাঁর চিরবিদায়। নিয়মানুবর্তিতা, তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে যেমন ছিল তাঁর পারদর্শিতা ঠিক তেমনি তাঁর চলে যাওয়াটাও ব্যতিক্রমী। কোনও টানাপোড়েন নেই, নেই দীর্ঘদিন হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকার যন্ত্রণা। কোনও হইচই নেই, কাজের শেষে ঘরে ফেরার মতোই একাকী পথে যেন তাঁর এক রাজকীয় মহাপ্রস্থান।
তিনি বরাকভূম কিংবা উত্তরপূর্বের গল্পভুবনের অবিসংবাদিত সম্রাট মিথিলেশ ভট্টাচার্য। তাঁর কথায় - “আমার গল্পের চরিত্র সদা সর্বদাই সাধারণ মানুষ। চাকুরিজীবি থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, খেটেখাওয়া দিনমজুরজন সকলেই তাদের গল্প নিয়ে, কথা নিয়ে হাজির হন আমার কাছে। তাদের কথা লিখতে আমার বড্ড ভালো লাগে, আলাদা করে ওদের জীবনযাপন নিয়ে কোনো খোশগল্প তৈরির কথা কোনোদিন ভাবিনি। সাধারণ জীবনযাত্রার দৈনন্দিন স্বাভাবিক চালচিত্রই আমার গল্প লেখার প্রধান প্রেক্ষাপট। গল্পের রেশ আমাকে শেষ না করা পর্যন্ত আচ্ছন্ন করে রাখে। আর এই লেখার সময়টুকুতে বা বলা যায় যখন লেখার ভিতরে থাকি তখন যে আনন্দ হয় তা শুধুমাত্র সুষুপ্তির সঙ্গেই তুলনীয়।” এহেন এক ভিন্ন, স্বতন্ত্র মননের সর্বজনপ্রিয় কথাকারের চলে যাওয়ায় যেমন অপূরণীয় ক্ষতি সমাজের তেমনি তাঁর প্রস্থানে নিঃস্ব সাহিত্য জগতে ছড়িয়ে পড়ে সেই মোক্ষম বার্তা - ‘মিথিলেশদা নেই…।’
শিলচর থেকে লেখক, কবি অমিতাভ সেনগুপ্ত সম্পাদিত ‘ঈশান’ পত্রিকার ৩৭-৩৮ বর্ষ, সংখ্যা - ১-৪, জুন ২০২৬ (আষাঢ় ১৪৩৩) প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি বিশাল কলেবরে। পুরোটাই উৎসর্গিত মিথিলেশ ভট্টাচার্যকে নিয়ে। এ জাতীয় স্মৃতিসংখ্যা সততই বিরল, বিশেষ করে উত্তরপূর্বের গল্পবিশ্বে। কিংবা বলা যায় সাহিত্যবিশ্বে। ৬১৪ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটির প্রকাশ আসলে পূর্বনির্ধারিত ছিল, ছিল জীবিত অবস্থাতেই প্রকাশের কথা। কিন্তু নিয়তির নির্বন্ধে তা হয়ে গেল স্মৃতিসংখ্যা বা শ্রদ্ধাঞ্জলি সংখ্যা।
‘কথা-সুবর্ণবর্ষে মিথিলেশ ভট্টাচার্য’ শিরোনামে প্রকাশিত এই গ্রন্থে কলম ধরেছেন বরাক ও বহির্বরাকের একগুচ্ছ কবি, লেখক, আলোচক ও সমাজের বিভিন্ন শাখায় অধিষ্ঠিত গুণীজন। বস্তুত কারও লেখা থেকেই কোনো উদ্ধৃতি তুলে ধরা সম্ভব নয় আলোচনার পরিসরে। আকারে, আয়তনে, সম্ভারে, বৈচিত্রে এটি এতটাই সমৃদ্ধ যে শুধু লেখকদের নাম ও বিষয় তথা শিরোনাম লিখতে গেলেই তা ছাড়িয়ে যাবে পৃষ্ঠা। ‘মিথিলেশদা এমনই’ শিরোনামে ১২ পৃষ্ঠার আবেগিক সম্পাদকীয় লেখা শুরু হয়েছিল আগেই। যার শেষ হল কথাকারের আচমকা শেষনি:শ্বাস ত্যাগের পর। সেই সম্পাদকীয় থেকে শুরু করে প্রতিটি লেখাই যেন সহসা চলে যাওয়া মানুষটির প্রতি এক গভীর মন:কষ্ট ও আন্তরিক বিষাদের পরিচায়ক। ভূমিকা থেকে কিছু শব্দ - ‘…‘শেষের সেদিন ভয়ংকর’; তাঁর চলে যাওয়ার কিছুদিন পর তাঁর ডায়ারিতে লেখা এই শব্দ কয়টি পড়েছিলাম। তিনি কিন্তু এই ভয়ংকরের সাক্ষাৎ পাননি, মনে পড়ে, শেষের সেদিন আমাকে ডেকে বলেছিলেন, জানো অমিতাভ, কে যেন প্রাণে এসে শুধু বলে, মন চল নিজ নিকেতনে। তাঁর এই পার্থিব নিকেতনের আড়ম্বর ও আকর্ষণের পালা হয়তো শেষ হয়ে এসেছিল, তাই এই বাস পরিবর্তনে তাঁর হঠাৎ এত তাড়া। বুঝতে পারিনি কবে তুমি বাসবদল করে সেদিকে ছুটে যাচ্ছিলে, নইলে সব এমন এলোমেলো করে রেখে, যখন পৃথিবীতে পূর্ণ অমাবস্যা, যখন পৃথিবীর লোকেরা অমাবস্যা পাড়ি দিতে আলোর উৎসবে মেতে ওঠে, সে দিনটিকেই কেন তুমি বেছে নিয়েছিলে সবার অগোচরে, যেন নিজেকেই বলেছিলে, yes, I too have a plan, a plan to go mad… হয়তো স্বপ্ন দেখেছিলে, to go mad in the immense light, নিত্য যেখানে আলোর ধারা সেই অজানা আলোর জগতের স্বপ্ন দেখতে পেরেছিলে তুমি...।’ - যেন এক কল্পলোকের বাঙ্ময় সম্পাদকীয়। এমন আরও বহু বহু কথা রয়েছে এই নিবিড়, নিটোল সম্পাদকীয়তে।
সম্পাদকীয়র পরেই পৃষ্ঠাজোড়া শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করা হয়েছে সদ্যপ্রয়াত আরেক কৃতী লেখক তথা ব্যতিক্রমী, দুরন্ত কথাকার শেখর দাস-এর প্রতি। গ্রন্থের যাবতীয় লেখালেখি সুস্পষ্ট বিভাগ বিন্যাসে বিন্যস্ত। এবং যথাযথ আঙ্গিকে বিভাগপূর্ব বর্ণনায় রয়েছে বিভাগ-পরিচিতি। প্রথমেই আছে ‘মিথিলেশ ভট্টাচার্যের কবিতা’। এই পর্বে তাঁর লেখা ১১টি কবিতা সন্নিবিষ্ট হয়েছে। বলাই বাহুল্য এমন কৃতীজনের কবিতাও যে সুলিখিত, সুপাঠ্য হবে তার কোন ব্যত্যয় হওয়ার জো নেই মোটেও। ‘বিভিন্ন কোরাস’ বিভাগে সন্নিবিষ্ট হয়েছে গল্পকারের গদ্যাংশসমূহ যেগুলোকে একেকটি মোক্ষম কথাশিল্প হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। বস্তুত একজন লেখকের এইসব আনমনে লেখা গদ্যাংশেই তাঁদের অন্তর-বাহির প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে, তাঁকে উদ্ভাসিত করে দেয় পাঠকের দরবারে। মিথিলেশের এমন গদ্যাংশও তারই পরিচায়ক। কিছু উদ্ধৃতি সেখান থেকেই তুলে ধরা যাক, মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন - ‘আমাদের বাংলা সাহিত্যের অনেক প্রথম শ্রেণির লেখকের ‘প্রথম গল্প লেখার গল্প’ খুবই চমকপ্রদ। আর যারা উত্তর-পূর্বের লেখক, দেশভাগজনিত কারণে ভিটেমাটি লাজলজ্জা সব খুইয়ে এপারে এসে কোথাও মাথা গোঁজার ঠাঁই গেড়েছেন বা বসতভিটেতে আশ্রয় নিয়েছেন তাদের সকলের যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনে অন্য কোন চমক অবশিষ্ট থাকেনি এবং প্রথম গল্প লেখার আনন্দও সেভাবে উপভোগ করতে পারেননি। রাজনৈতিক, সামাজিক ও আর্থিক অভাব অনটনের তীব্র চাপে তারা অহর্নিশ পিষ্ট হয়ে যে বাস্তব সত্য রচনা করে থাকেন, তা অতীব নির্মম ও বেদনাদায়ক। এ অঞ্চলের লেখক কবির সাহিত্য সৃষ্টির ভাষা হয়েছে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের ভাষা। তাদের কলম অস্ত্রের চেয়েও হাজারগুণ সূচীতীক্ষ্ণ।’ (গদ্যাংশ - ‘সৃষ্টির সিন্ধুর বুকে আমি এক ঢেউ’ থেকে)। এভাবেই রয়েছে একের পর এক গদ্যাংশ - ‘‘শতক্রতু’-র দিনগুলি’, ‘রক্তিম পলাশের ছন্দ’, ’১৯ আমার আত্মপরিচয়’, ‘ষোড়শী-কথামালা’, ‘গল্পচ্ছলে গল্পকথা’, ‘জীবন পথের দুইধারে’, ‘’অনেক ঘুমের ঘোরে ভরিবে কি মন সেদিন তোমার’, ‘’নরকেও সূর্যোদয় হয়’ - পাঁকে পদ্ম ফোটানোর সংগীত’, ‘স্বপ্না ভট্টাচার্য - সময়ের অপরিহার্য কথাকার’, ‘ও ছেলে বাউল ছেলে’, ‘তোমার চাঁদের আলোয়’, ‘পূব আকাশের আলো’, ‘কয়েকটি কথা’, ‘একটি বাউটা বিড়াল এবং আমার বেদান্ত দর্শন’। ‘লেখার জীবন : পুনরিজ্জীবিতের জীবন’, ‘গল্প ভাবনা : গল্প লেখার ইতিবৃত্ত’, ‘দেখিবে সে মানুষের মুখ!’, ‘শতক্রতু : প্রস্তাবনা সংখ্যা’, ‘শিলচর : এক নিরাভরণা রূপসির খোঁজে’, ‘ঘাসশিশু’ ও ‘ফজলুকথা’। বলাই বাহুল্য প্রতিটি রচনাতেই যেন আঁকা রয়েছে তাঁর জীবনের সারমর্ম, অবিচ্ছিন্ন নির্যাস। বিশেষ করে ‘শতক্রতু’ পত্রিকার সঙ্গে জড়িত থাকার আবেগ, উচ্ছ্বাস, কাহিনি ও নিবিড় সংযোগের কথা।
‘গল্পচ্ছলে গল্পকথা’য় মিথিলেশ লিখছেন, যা নিতান্তই প্রাসঙ্গিক - ‘...সাহিত্য রচনা হচ্ছে আসলে ভাবের ব্যাপার। মনের ভিতর ভাব থাকা চাই। ওই যে এক ক্ষুদে কবি একদিন লিখেছিল, কবি কবি ভাব/ কবিত্বের অভাব। হ্যাঁ ভাবই আসল। ভাব না থাকলে না হবে কবিতা না হবে গল্প। ভাবটা বাইরের নয়, ভিতরের ব্যাপার। ভাবের সঙ্গে রসের যোগ অবশ্যম্ভাবী। ভাবের রসিক হতে হবে রসে চোবানো রসগোল্লার মতো। তবেই না কালজয়ী সৃষ্টি। রসাবৈ স:। সকল রসের রসিক সৃষ্টিকর্তা প্রজাপতি ব্রহ্মারই সমকক্ষ একজন কবি বা লেখক।’
পরবর্তী পর্ব - ‘মিথিলেশ ভট্টাচার্যের ৪০টি গল্প’। বিভাগপরিচয়ে সম্পাদক লিখছেন - ‘...বিভিন্ন সময়ে, ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে লেখা এই গল্পগুলি কেবল কিছু কাহিনির সংকলন মাত্র নয়; এ যেন তাঁর বিবর্তনশীল আন্তর্জাগতিক চৈতন্যের এক মলাটহীন দস্তাবেজ...। প্রতিটি গল্পের পরতে পরতে রয়েছে এক অদ্ভুত জলবায়ুর গন্ধ, ছকভাঙা আখ্যান আর জীবনের অমলিন কিছু কোলাজ... প্রতিটিতেই মিশে আছে তাঁর নিজস্ব জীবনবীক্ষার তীব্র কড়া নাড়ার শব্দ...।’ যথার্থ পরিচিতি। এই পর্বে যে গল্পগুলি রয়েছে সেসব হল - ‘অঘ্রানের কবি’, ‘রিপুজাতক’, ‘মধুচক্রের জীবন’, ‘রহস্যমদির পৃথিবী’, ‘পালই শাক’, ‘বাসস্টপে তিন মিনিট...’, ‘মায়ের চোখ’, ‘খেলার পুতুল’, ‘সন্তান-সন্ততি’, ‘জলরঙের ছবি, ‘চৈতালি’, ‘সমাজদেহ’, ‘উর্মিলা’, লাইপাতা শাক’, ‘ক খ গ ঘ - দের বন্যাস্নান’, ‘প্রথম প্রেমের পদ্য’, ‘অমলেন্দুর বিশ্ব’, ‘কুহকিনী’, ‘অথ বলি-কথা’, ‘রতন’, ‘একটি আষাঢ়ে গল্প’, ‘কবি ও ফুলওয়ালি’, ‘তবু অনন্ত জাগে’, ‘অতনুদের বাড়ি’, ‘ আরশি নগর’, ‘শান্তা-সাবিত্রী’, ‘যাত্রা’, ‘বেহালা’, ‘তুমি আসবে বলে’, ‘অভী: অভী:’, ‘ডায়েরি’, ‘পকেটমার’, ‘গোলাপের স্বপ্ন’, ‘বেঁচে থাক সুন্দর’, ‘নিরাময়’, ‘বানপ্রস্থ’, ‘নদীর নাম লোভাতুর’, ‘ক্ষয়রোগ’, ‘আট বছর আগের একদিন’, ও ‘ মৎস্যগন্ধা’। বলা বাহুল্য - ‘...এই বিভাগটি আসলে পাঠকের জন্য এক অনপনেয় আকর, যা মিথিলেশ ভট্টাচার্যের চেনা লেখালেখির গণ্ডি ছাড়িয়ে তাঁর সৃষ্টিপথের এক নতুন দিগন্তকে চিনে নিতে সাহায্য করে।’
তাঁর লেখালেখি, তাঁর সাহিত্যকর্ম তথা ব্যক্তিগত সুখদুঃখের জবানবন্দি নিয়ে যেসব চিঠিপত্র তিনি পেয়েছিলেন এবং সযত্নে রক্ষণ করেছিলেন সেসব নিয়ে সজ্জিত পরবর্তী বিভাগ - ‘পুরোনো দিনের চিঠি মিথিলেশের কাছে’। পত্র সাহিত্য সাহিত্যের এক বিশেষ বিভাগ। সেই পত্র বা চিঠির মধ্যে লুকিয়ে থাকে যেন যুগের, সময়ের, অনুভবের ফসল। এই বিভাগে বিশিষ্ট সাহিত্যিক তথা সখাসহচর তপোধীর ভট্টাচার্যের ৯টি অমূক্য চিঠির বাইরেও রয়েছে লেখক রণবীর পুরকায়স্থ, পৃথ্বীশ দেশমুখ্য, বিজয় ভট্টাচার্য, অখিল দত্ত, অজিতেশ ভট্টাচার্য, আশিসরঞ্জন নাথ, দেবব্রত দেব, বিজিৎ কুমার ভট্টাচার্য, দীপংকর কর, বিজয়কুমার ভট্টাচার্য, কপিশকান্তি দে ও পার্থ মুখোপাধ্যায়ের পত্র। সমকালের এক সাহিত্যযাত্রার অমলিন ছবি যেন সেইসব পত্রাবলি।
‘সৃষ্টির বহুমাত্রিক পাঠ’ শিরোনামে পরবর্তী বিভাগে মিথিলেশ ভট্টাচার্যকে নিয়ে কলম ধরেছেন কবি, লেখকবৃন্দ থেকে শুরু করে তাঁর কাছের মানুষেরা। বস্তুত তৃতীয় নয়ন দিয়ে দেখা এইসব লেখা থেকেই মিথিলেশের সার্বিক পরিচয় যেন মূর্ত হয়ে ভাসে পাঠকের চোখের সামনে। গভীর সান্নিধ্যে যাঁরা ছিলেন, সেই যশস্বী লেখক তপোধীর ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে বর্ষীয়ান কবি আশুতোষ দাস সহ মোট ১৮ জন ব্যক্তি তাঁদের কলমে ধরে রেখেছেন একটি অমূল্য জীবনের জীবন-গাথা। ৫টি অধ্যায়ে ১৭ পৃষ্ঠাব্যাপী সান্নিধ্য ও সৌকর্যের এক বহুমাত্রিক অনুভূতিসম্পন্ন প্রথম লেখাটি লিখেছেন লেখকবন্ধু তপোধীর ভট্টাচার্য। উন্মোচিত হয়েছে সখ্য, উৎকর্ষ ও গভীর মনব্যথা। এই পর্বে এভাবেই উন্মোচিত হয়েছেন প্রয়াত গল্পকার। আরও যাঁরা কলম ধরেছেন তাঁকে নিয়ে, তাঁরা হলেন - রণবীর পুরকায়স্থ, স্বপ্না ভট্টাচার্য, মৃন্ময় রায়, কিরণশঙ্কর রায়, মেঘমালা দে মহন্ত, আশিসরঞ্জন নাথ, প্রণব কান্তি দাস, সত্যজিৎ নাথ, শ্যামলী কর, সৌম্যদীপ দেব, নন্দিতা বসু, সমরজিৎ সিংহ, দীপক চক্রবর্তী, অশোক দাস, দেবাশিস ভট্টাচার্য ও রাহুল দাশগুপ্ত।
শেষ পর্যায়ে রয়েছে মিথিলেশ ভট্টাচার্যের দু’দুটি সাক্ষাৎকার। প্রকৃতার্থে সাক্ষাৎকার একজন ব্যক্তিকে তাঁর নিজস্ব আয়নায় প্রতিফলিত করে। ব্যক্তি নিজেকে কী চোখে দেখেন, কেমন তাঁর ভিতরকথা সেসবই উন্মোচিত হয় সাক্ষাৎকার পর্বে। প্রথম সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিদ্যুৎ চক্রবর্তী। শিরোনাম - ‘প্রত্যেক লেখকেরই লেখার পিছনে একটি নির্দিষ্ট দর্শন আছে, যা আমারও আছে। এক অতি সদর্থক দর্শন!... গল্পভাবনায় অকপট গল্পকার মিথিলেশ ভট্টাচার্য’। দ্বিতীয় সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সত্যজিৎ নাথ ও প্রণব কান্তি দাস। শিরোনাম ‘আমি সত্য ছাড়া কিছু লিখি না’ - একান্ত আলাপচারিতায় মিথিলেশ ভট্টাচার্য’। কিছু অকপট, কিছু সটান অভিব্যক্তি, কিছু সাহিত্যভাবনা, মনস্তত্ত্বের গূঢ়কথায় সমৃদ্ধ দুটি সাক্ষাৎকারে পাঠক নিশ্চিত নতুন ভাবনায় পরিচিত হবেন উত্তরপূর্বের গল্পবিশ্বে অনির্বাণ এই জীবনের সঙ্গে।
একটি ঐতিহাসিক সংকলন হিসেবে নির্দ্বিধায় অভিহিত করা যায় আলোচ্য এই সংখ্যাটিকে। ‘ঈশান’ বরাবরই এমনধারা সংকলনের প্রকাশে স্বতঃস্ফুর্ত যদিও আলোচ্য সংকলনের স্থান অবশ্যম্ভাবী রূপেই সর্বাগ্রে থাকবে এটা নিশ্চিত। কাগজে, ছাপায়, অক্ষর-শব্দ-বাক্য বিন্যাসে যথাযথ, বানানের প্রায় একশো শতাংশ নির্ভুলতায়, প্রচ্ছদে, নান্দনিকতায়, উৎকর্ষেও এমনই। ছিমছাম, প্রাসঙ্গিক প্রচ্ছদের সৌজন্যে সঞ্জয় বর্মণ। নামলিপি কিছু ভিন্ন ফন্টে অধিকতর স্পষ্ট ও হরফে বড় হলে হয়তো অধিকতর ঔজ্জ্বল্যে পরিস্ফুট হতো। এসব গৌণ বিষয় পরিহার করে অনায়াসে আলোচ্য সংকলটিকে এক অতি আবশ্যকীয় সংগ্রহযোগ্য সংকলন হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। একটি জীবনকথা যা নিয়ত আলোকের পথ দেখাতে সাহায্য করবে সাহিত্যপথের আগামী প্রজন্মকে। সংখ্যাটি ‘অন্বেষক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থার পক্ষে তরুণ গুহ কর্তৃক প্রকাশিত ও অক্ষরযাত্রা প্রকাশন-এর তত্ত্বাবধানে মুদ্রিত।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
‘কথা-সুবর্ণবর্ষে মিথিলেশ ভট্টাচার্য’‘ঈশান’ - জুন ২০২৬ সংখ্যা
সম্পাদক - অমিতাভ সেনগুপ্ত
মূল্য - ৬০০ টাকা।

Comments
Post a Comment