Skip to main content

অপর্ণা দেব-এর প্রবন্ধ সংকলন, বয়সের ‘ফরওয়ার্ড মার্চ’ - বার্ধক্যের এক পূর্ণাঙ্গ বাখান

 

অপর্ণা দেব-এর প্রবন্ধ সংকলন, বয়সের ‘ফরওয়ার্ড মার্চ’ - বার্ধক্যের এক পূর্ণাঙ্গ বাখান

- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -


“আমাদের দেশে আশি শতাংশ মানুষ অবসর নেওয়ার পর জীবন থেকে নির্বাসন নিয়েছেন -  মানসিক দিক থেকে ঠারেঠুরে এমনটাই বোঝেন”, “বিপুলা এ পৃথিবীতে রয়েছে এই ধরণের একা মানুষের মিছিল। কেউ স্বজন পরিবৃত হয়েও নির্জনে আর কেউ স্বজনহারা হয়ে নির্জনে”, “নবীন প্রজন্ম যখন পড়াশোনা শেষ করে রোজগারের উদ্দেশ্যে গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হয় তখন প্রবীণদের জীবনে নেমে আসে দুর্যোগের অধ্যায়”, “আইন প্রণয়ণ, বার্ধক্য বিজ্ঞান শিক্ষা এ সব কিছুর সাথে সাথে প্রবীণ নাগরিকদের মানসিক অবসাদ দূর করার দিকটি যে সম্পূর্ণ সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্যে পড়ে - এ বিষয় নিয়ে বহুধা চর্চা হওয়া উচিত। কারণ সমস্যার মূল জড় এখানেই”, “দীর্ঘ এই আলোকপাত বা আলোচনা আমাদের একটি বিন্দুতে এনে পৌঁছে দেয় যে মনের অদম্য ইচ্ছের কাছে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বা বয়েস হার মানে এবং বার্ধক্য বা বয়েস বলে আদৌ কিছু হয় না। বার্ধক্য মানে থেমে যাওয়া নয়, শরীরের বয়েস মনের বয়েসকে যেন স্পর্শ করতে না পারে” - এভাবেই জড় থেকে সমাধান সূত্রের স্পষ্ট হদিশ সাজিয়ে একগুছ অনবদ্য প্রবন্ধের মাধ্যমে বার্ধক্যের চুলচেরা বিশ্লেষণে সমৃদ্ধ হয়েছে লেখিকা ও সমাজসেবী অপর্ণা দেব-এর সদ্য প্রকাশিত প্রবন্ধ সংকলন - বয়সের ‘ফরওয়ার্ড মার্চ’। প্রকাশক ডাঃ মন্দার দেব। প্রচ্ছদ - সঞ্জীব গোঁহাই বরুয়া, প্রাক্তন জেলাশাসক, করিমগঞ্জ।
দুই প্রচ্ছদের ভেতরের দিকে লেখিকার কর্মজীবনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা আছে যদিও ‘সৃষ্টিকথা’ শিরোনামে আপন কথায় লেখিকা স্পষ্টতই জানিয়ে দিয়েছেন - “একজন লেখক-স্বীকৃতি পাওয়ার লক্ষ্যে এই গ্রন্থ পরিকল্পনা নয়। যে সাধনা, মেধাচর্চা ও প্রজ্ঞা একজন লেখকের জন্ম দেয়, আমি সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত। একজন শিক্ষার্থী হয়েই থাকতে চাইব”।
১০০ পৃষ্ঠার এই সংকলনে সংকলিত হয়েছে মোট আঠারোটি পূর্বপ্রকাশিত নিবন্ধ। বিগত ১২ বছর ধরে প্রবীণ নাগরিকদের প্রতি নিবেদিত ‘সেবা’ নামে একটি ছোট পত্রিকার সম্পাদনা এবং সমসাময়িক কালে ‘বেলাভূমি’ নামে একটি বৃদ্ধাবাসের দায়িত্ব সামলে যে সরেজমিন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন তারই প্রত্যক্ষ ফসল এই সরল-পাঠ্য নিবন্ধগুলি। বরিষ্ঠ নাগরিকদের প্রতি নিয়োজিত-প্রাণ আলোচ্য লেখিকার দায়বদ্ধতার একটি জ্বলন্ত প্রমাণ হলো এই যে উল্লিখিত গ্রন্থটির যাবতীয় বিক্রয় মূল্য ‘বেলাভূমি’ বৃদ্ধাবাসের খাতেই দান করা হবে বলে গ্রন্থটিতে উল্লেখ আছে।
শুরুতেই ‘কথামুখ’ শিরোনামে গ্রন্থটির খেই ধরিয়ে দিয়েছেন গল্পকার, প্রাবন্ধিক বিনোদলাল চক্রবর্তী (করিমগঞ্জ)। লিপিবদ্ধ করা হয়েছে চমৎকার একটি  শুভেচ্ছাবার্তাও। পাঠিয়েছেন কবি ও গল্পকার সজল পাল (গুয়াহাটি)।
আঠারোটি প্রবন্ধের বিস্তারিত আলোচনা এই স্বল্প পরিসরে সম্ভব নয়। কয়েকটি প্রবন্ধে বৃদ্ধাবস্থা, বৃদ্ধ দিবস ও বয়োজ্যেষ্ঠ্যদের প্রতি দায়িত্ব ইত্যাদি নিয়ে লেখিকা বিস্তারিত ভাবে খুলে দিয়েছেন তাঁর মনোজগৎ। ‘সমাজ, রাষ্ট্র ও প্রবীণ নাগরিক’ শীর্ষক প্রবন্ধে জেরন্টোলজি বা বার্ধক্য বিদ্যার বিষয়ে রয়েছে তার যাবতীয় ব্যাখ্যা। তত্ত্ব ও তথ্যের ভরপুর সংমিশ্রণে রাষ্ট্রীয় স্তরে প্রবীণ নাগরিকদের প্রতি নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপেরও রয়েছে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা। ‘বয়সের ফরওয়ার্ড মার্চ ও জেরন্টোলজি’ প্রবন্ধে মানুষের জীবন চক্র তথা সক্ষম বার্ধক্যের ধারণাটি চমৎকার ভাষায় বর্ণনা করেছেন লেখিকা। ‘বিপুলা এ পৃথিবীর কয়েকটি মানুষ’ প্রবন্ধে বর্ণিত হয়েছে বার্ধক্যজনিত সমস্যার কয়েকটি বাস্তব স্ন্যাপশট। ‘দেবু-দা প্রণাম নেবেন’ প্রবন্ধে প্রয়াত সাহিত্যিক দেবরঞ্জন ধরের জীবন ও বার্ধক্যবোধের উপর রয়েছে একটি আন্তরিক চর্চা।
‘থমকে যাওয়া সময়ের স্বপ্নে এবং দুঃস্বপ্নে, বৃন্দাবনী বিধবা - এক আলোড়িত উপাখ্যান’ শীর্ষক নিবন্ধটি বৃন্দাবনের বিধবাদের এক মর্মভেদী জীবন বীক্ষার বাস্তব প্রতিফলন। প্রতিবন্ধী জীবনে বার্ধক্যের অভিশাপ, ভুবনায়নের ফলশ্রুতিতে বরিষ্ঠ নাগরিকদের উপর তার প্রভাব, আন আর সি জনিত সমস্যায় জেরবার বৃদ্ধদের মনোবেদনা ইত্যাদি বহু বিষয়ে রয়েছে একাধিক নিবন্ধ। বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব অমিতাভ চৌধুরী এবং শ্যামল রঞ্জন দেবকে নিয়ে রয়েছে আন্তরিক দু’টি নিবন্ধ। “মুক্তচিন্তাঃ সেবা- একটি সংগঠন’ নিবন্ধে লেখিকা সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন বৃদ্ধাবাসের ধারণা। তাঁর লেখনীতে - “বৃদ্ধাবাস আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে শুধু এক ছাদের নীচে বাস করার সুবিধা নয়, সাথে সমবয়সীদের সঙ্গে থাকা এবং চিন্তা ভাবনা আদানপ্রদানেরও সুযোগ এনে দেয়। ব্যক্তিবিশেষের আত্মিক বিকাশের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে এবং অস্তিত্বের বন্ধনকে সুদৃঢ় করে।”
‘স্বপ্নপূরণে অদম্য ইচ্ছাশক্তির উপাখ্যান’ শীর্ষক নিবন্ধে লেখিকা পরম যত্নে তুলে এনেছেন দেশ বিদেশের কয়েকজন অশীতিপর ব্যক্তির অদম্য দক্ষতার উপাখ্যান। পঠনে পাঠকের হৃদয়ে ইচ্ছাশক্তির উত্তরণ অবধারিত। শেষ নিবন্ধ - ‘লক ডাউন, আনলক - ১, তাঁহাদের সরলরৈখিক জীবন’। করোনা কালে জ্যেষ্ঠ্য নাগরকিদের জীবন চর্চার এক গভীর অনুসন্ধানমূলক আলোচনা।
নিবন্ধ - ‘বয়েস একটি সংখ্যা মাত্র, প্রয়োজন গভীর জীবনবোধ ও মননশীলতা’ যেন শেষ কথ বলে যায় এই গ্রন্থটির। আগাগোড়া সাকারাত্মক দৃষ্টিভঙ্গিতে বার্ধক্যের চুলচেরা বিশ্লেষণে সমৃদ্ধ এই প্রবন্ধ সংকলনটি নিঃসন্দেহে প্রবীণ নাগরিকিদের প্রতি একটি অসামান্য উপহার। স্বভাবতই গ্রন্থটি নিবেদিত হয়েছে ‘আবিশ্ব ছড়ানো সমস্ত প্রবীণ নাগরিকদের উদ্দেশ্যে’। যাঁরা এখনো প্রৌঢ়ত্বের পথে পা বাড়াননি তাঁদের কাছে এই সংকলনটিকে বলা যায় জীবনকে জানার এক অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ। সময়ের দলিলে লিপিবদ্ধ থাকবে লেখিকার এই প্রয়াস - এটা অনস্বীকার্য।
 
বয়সের ‘ফরওয়ার্ড মার্চ’
অপর্ণা দেব।
দূরভাষ - ৯৪৩৫৫৯৬৭২০
মূল্য ১৫০ টাকা
(গ্রন্থ বিক্রিত মূল্য বৃদ্ধাবাস ‘বেলাভূমি’তে দেওয়া হবে)।
- - - - - - - বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত স্মরণ সংখ্যা ‘আলোহাওয়া’

একটি লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটপত্রিকা হচ্ছে সমাজের সাহিত্যদর্পণ । শুধুই সমকালিক নয়। যুগান্তরের ভাষাসাহিত্য ও তার যুগন্ধর স্রষ্টাদের সঙ্গে সমকালকে পরিচিত করে দেওয়ার এক প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম। আর একের পর এক এই লক্ষ্যেই উৎকৃষ্টতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি শহর থেকে প্রকাশিত ‘ সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক ’ পত্রিকা ‘ আলোহাওয়া ’ । রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার ১৯তম সংখ্যা - ২৫তম বর্ষ , পৌষ ১৪৩২ - ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যা । কবি জিতেন্দ্র নাথ সম্পাদিত এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যিক ‘ তুষারকান্তি নাথ স্মরণ সংখ্যা ’ হিসেবে । তুষারকান্তি নাথ এমন একজন সাহিত্যিক যাঁকে আখ্যায়িত করা যায় একজন সার্বিক সাহিত্যিক হিসেবে। ধারে ও ভারে তাঁর সৃষ্টি শুধু বরাক উপত্যকাতেই নয় এর বাইরেও সমাদৃত। তাঁর লেখনী রত্নপ্রসবা। পক্ষান্তরে এটাও বলা যায় যে ঘরে বাইরে কিছু স্বীকৃতি , কিছু প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকলেও তাঁর লেখালেখি ও নানাবিধ সৃষ্টিকর্মের গভীরতার মূল্যায়ন যতটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল ততটা কিন্তু হয়নি। আসলে প্রান্তিকতা সততই লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের পরিচিতির পথে এক বৃহৎ অন্তরা...

প্রখর গরজ ও শ্রদ্ধায় নিবেদিত একটি ‘সুকান্ত সংখ্যা’ - শতদল

হাতে নিলে আর পাঁচটা নিয়মিত সংখ্যা পত্রিকার মতো মনে হলেও উত্তর ত্রিপুরার চুড়াইবাড়ী থেকে কবি, লেখক রতন চন্দ সম্পাদিত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ‘শতদল’ পত্রিকার সম্প্রতি প্রকাশিত ২৯তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, বৈশাখ ১৪৩৩, মে-২০২৬ (কবি সুকান্ত জন্মশতবর্ষ সংখ্যা) সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রমী। সেই মাত্র ৪২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক সংস্করণ হলেও প্রচ্ছদ থেকে শেষ পৃষ্ঠা অবধি যতন, গরজ ও উৎকর্ষের এক সম্ভার বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না মোটেও। বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র স্থান ধরে আছেন অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর সময়কাল থেকে আজ অবধি এবং আগত-অনাগত চিরকালীন এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী এই কবি মূলত একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেই সাহিত্যবিশ্বে পরিচিত হলেও তাঁর কবিতায় এর বাইরেও যে রয়ে গেছে বহুমাত্রিক এক বোধ, ভাষ্য - বোধ করি তার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি আজও। তবে যতই তাঁকে নিয়ে চর্চা হবে ততই এক এক করে খুলবে বিস্ময়ের ঝাঁপি এ কথা অনস্বীকার্য। এবং তারই এক নির্মোহ প্রয়াস ও প্রকাশ আলোচ্য সংখ্যাটি। সুসজ্জিত কবি-প্রতিকৃতিযুক্ত একটি নান্দনিক প্রচ্ছদ - সজ্জায়, বর্ণ সংস্থাপনে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য পাঠকের। সৌজন্যে মুদ...