কবিতায় ভেসে থাক এই পৃথিবী
কবিই তো ভগবান ঈশ্বর কবি,
কবিতায় ভেসে থাক এই পৃথিবী।
যা কিছু সত্য শিব যা কিছু প্রিয়,
যত আছে ভালবাসা - প্রেম যাবতীয়।
গাঁথা হোক কবিতায় প্রকৃতি ছবি,
আঁধারিতে ইন্দু - দিবসে রবি।
কবিতায় ধরা থাক সব সুখ ছন্দ,
স্বপ্ন বিভোর আজ অধরা মন্দ।
যাবতীয় মন্দকে দূরে সরিয়ে রেখে কবিতায় ছন্দ বিভোর কবিই তো ঈশ্বরের
আরেক রূপ। একজন কবির পক্ষেই তো সম্ভব সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরের মতো একের পর এক অনাবিল
সৃষ্টিতে জীবনের যাপন বেলায় ভরে দিতে অনন্ত রূপ, রস, মাধুর্য। সেই ঈশ্বররূপী এক
নিরলস কবি, সাহিত্যের মগ্ন পূজারি আশুতোষ দাস-এর সাক্ষাৎ পেতে ভাষা দিবসের প্রাক
সন্ধ্যায় গিয়ে হাজির হয়েছিলাম তাঁর হাইলাকান্দিস্থিত বাসভবনে। বরাক উপত্যকার
সাহিত্য আকাশে একাধিক নক্ষত্রের মধ্যে আপন দীপ্তিতে দীর্ঘদিন ধরে ভাস্বর হয়ে আছেন
কবি আশুতোষ দাস।
সামাজিক মাধ্যমে একদিন ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন কবি - আমার সান্নিধ্য
পেতে তিনি উৎসুক। এ যেন এক বহতা অখ্যাত নদীকে সাগরের সাদর আহ্বান। সেই থেকে
সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম। আগের রাতে টেলিফোনের মাধ্যমে সময় স্থির হয় - বিকেল সাড়ে
চারটে। সেই অনুযায়ী ঘড়ির কাটা ধরে হাজির হয়েছিলাম তাঁর বাসভবনে। অপরিচিত অভ্যাগতের স্বাগত জানাতে যেন তৈরিই ছিলেন
ষাটোর্ধ প্রবীণ কবি। উত্তরীয় পরিয়ে বরণ করে নিলেন আমাকে। আমার সামনে তখন যেন এক ফলদায়ী বৃক্ষ আপন ফলভারে আনত। মনে পড়ে গেল সংস্কৃত শ্লোক -
তস্য পূজা বিধাতব্যা সর্বস্ত্বভ্যাগতো গুরু।
নমন্তি ফলিনো বৃক্ষা নমন্তি গুণিনো জনাঃ
শুষ্কং কাষ্ঠং চ মূর্খশ্চ ভিদ্যতে ন তু নম্যতে।
এরপর শুরু হলো আলাপচারিতা। সাহিত্যের জগতে অনন্ত সৃষ্টির অধিকারী
কবি কষ্ট পাচ্ছিলেন দাঁতের ব্যাথায়। কিন্তু কিছুক্ষণ আলাপাচারিতার পর নিজেই
জানালেন কথায় কথায় কখন যে দূর হয়ে গেছে ব্যথাজনিত কষ্ট তা নিজেই জানেন না। মনে পড়ে
গেল আবার -
সংসার
বিষবৃক্ষস্য দ্বে এব রসবৎ ফলে
কাব্যামৃতরসাস্বাদঃ
সঙ্গমঃ সজনৈঃ সহ।
কথা হলো অনেক। যত এগোচ্ছিল কথা ততই আমার বিস্ময়ের মাত্রা বাড়ছিল
তরতরিয়ে। এ যেন প্রজ্ঞার মূর্তিমান ভাণ্ডার। অশ্রুতপূর্ব, অকল্পনীয় কিছু কথার ধ্বনিতে
সাক্ষাৎকার স্থলের পরিবেশ হয়ে উঠেছিল পবিত্র মন্দিরসম উপাসনার স্থল। কবির কথায় -
“কবি তো ঈশ্বরের ছায়া মাত্র। কবিতার মার্গ দর্শনও তাই বলে। আসলে ভাবনা আর স্বপ্নই
কবিতার আদি ও ইতিকথা। বলা যায় সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ায় ভেসে আসা মেঘ - কবিতার
ইলশেগুড়ি বৃষ্টি।”
আশুতোষ দাসের কবিতায় ভালোবাসার মর্মকথা উঠে এসেছে বারবার। তাঁর
ভাষায় - “আমি কবিতায় বারবার ভালোবাসার কথা বলে এসেছি। বলা যেতে পারে আমার কবিতার
দর্শন তাই। আমার দৃষ্টিতে কবি একজন শুভ চিন্তন, মননের বার্তাবাহক, আরোও বৃহত্তর
অর্থে কবি ঈশ্বরের দোহার মাত্র।”
কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ - “জলে স্থলে ভালোবাসা”। এ যাবৎ সর্বশেষ
কাব্যগ্রন্থ - “মেঘে ওড়ে ভালোবাসার উত্তরীয়”। অর্থাৎ আগাগোড়া এই কঠিন পৃথিবী থেকে
কবি আপন ভাবনায়, আপন কৃতিত্বে কুড়িয়ে নিতে পেরেছেন ‘যা কিছু সত্য শিব, যা কিছু
প্রিয়’। এখানেই এই প্রতিভাধরের কাব্যিক সফলতা। তাঁর সার্বিক সাফল্যের খতিয়ান এই
স্বল্প পরিসরে লিপিবদ্ধ করার উপায় নেই। দীর্ঘ চার দশক ধরে সাহিত্যের বিভিন্ন
মাধ্যমে সফলতার সঙ্গে বিচরণ করে চলেছেন। উত্তর পূর্বাঞ্চলের সাহিত্য আকাশে তাঁর
বলিষ্ঠ আত্মপ্রকাশ ঘটলেও আজ তিনি ভৌগোলিক গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে দেশ বিদেশের পাঠক
মহলে সমাদৃত ও চর্চিত। অসমিয়া, হিন্দি সহ একাধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর সাহিত্য
সৃষ্টি।
এক উৎকৃষ্ট সাহিত্যময় পরিবেশে তথা পরিবারে তাঁর জন্ম ও বেড়ে উঠা।
পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে আজ অবধি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এক একনিষ্ঠ পূজারি হয়েই
গড়ে তুলেছেন নিজেকে তথা তাঁর পরবর্তী প্রজন্মকেও। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর মূল্যবান
অবদানের জন্য পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার। আন্তর্জাতিক সাহিত্য পত্র ‘সম্প্রীতি” থেকে
২০০০ সালে পেয়েছেন স্বর্ণপদক। প্রতিনিধিত্ব করেছেন আন্তর্জাতিক কবি সম্মেলন আগরতলা
ও আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক কবি সম্মেলন এবং সাহিত্য আকাদেমির অনুষ্ঠানে।
কবিতা ছাড়া আকাশবাণী থেকে পেয়েছেন পাণ্ডুলিপি নাট্য পুরস্কার। একাধিক নাটকের
রচনাকার হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছেন পর পর চারবার। দলিত সাহিত্য আকাদেমি, দিল্লি থেকে
পেয়েছেন ‘আম্বেদকর ফেলোশিপ’।
সৃষ্টি করেছেন একাধিক তথ্যচিত্র। উল্লেখযোগ্য - জঠর, বাঘনখ, যখন
ধানের গন্ধ ইত্যাদি। তথ্যচিত্র সম্প্রসারিত হয়েছে শিলচর দূরদর্শন ও অন্যান্য
চ্যানেলে। আসামের প্রথম মনোরঞ্জনমূলক কাহিনিচিত্র ‘পারদর্শিনীর কাহিনি ও গীত’ এর
রচনাকার তিনি। বেতার, মঞ্চ, দূরদর্শন, পথনাটক - সবখানে ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর কর্মমুখরতা।
রচনা করেছেন একাধিক গ্রন্থ। উল্লেখযোগ্য - এখানে ত্রিবেণী, চাঁদকে শিকল পরাতে
গেলে, এই শিশুদের বাগানে, কচি পাতার কোলাহল, একটি গুজবের রূপকথা, জেগে উঠার গান,
হৃদয়ে ফোঁটে পড়শির বকুল, ভালোবেসে বেঁধে দেই অনন্ত ঘুঙুর ইত্যাদি। গল্পগ্রন্থ ‘যখন
ধানের গন্ধ’ থেকে চয়িত একাধিক গল্প অনূদিত হয়েছে দেশ বিদেশের বিভিন্ন ভাষায়।
স্বনামধন্য পরিচালকদের পরিচালনায় প্রদর্শিত হয়েছে একাধিক টেলিফিল্ম। একাধিক সংকলনে
স্থান পেয়েছে তাঁর অজস্র গল্প, কবিতা। সম্পাদনা করেছেন ‘আসামের প্রথম বাংলা
কবিতাপত্র স্বপ্নিল’ সহ একাধিক গ্রন্থ। অবসৃত হয়ে সম্পাদনা করছেন ‘বেলাভূমি’
সাহিত্য পত্রিকার।
সাহিত্য, শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর দৃপ্ত পদচারণার মধ্যেও তিনি
যে মূলতঃ কবি সেটি কখনো তিনি বিস্মৃত হন না। বোধ করি সেজন্যই অনায়াসে বলতে পারেন -
“কবিতাই আমার সাতসকালের নিত্যপূজা। আমি ঘুম থেকে উঠে ধূপ জ্বালিয়ে প্রথমেই বসি
কবিতা রচনার মাধ্যমে ঈশ্বরের আরাধনায়”।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী শ্রী আশুতোষ দাস সত্যিকার অর্থেই এক
প্রতিরূপ - সেই ঈশ্বররূপী সৃষ্টিকর্তার যাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে নিত্য উদ্ভাসিত হয় এই
সুজলা সুফলা পৃথিবীর মাধুর্যময় রূপ, রস, গন্ধ।
গল্পে গল্পে কথার পৃষ্ঠে কথায় কেটে গেল এক দীর্ঘ যাপন বেলা। ক্ষণিক
পরিচয়ের সূত্র ধরেই আত্মীয়ের মর্যাদায় পরিচয় করিয়ে দিলেন ভালোবাসার ধন পুত্র,
কন্যা ও নিত্যসঙ্গী সহধর্মিণীর সাথে। ঘুরে ঘুরে দেখালেন তাঁর অপরূপ সৃষ্টি সম্ভার।
পাঠাগার, নাট্যশালা, সখের ফুল-বাগিচা। ঋদ্ধ, সমৃদ্ধ হয়ে উপহার স্বরূপ পাওয়া একাধিক
গ্রন্থ হাতে করে পা বাড়ালাম ফেরত পথে। সঙ্গে বেরিয়ে এলেন মূল রাস্তা অবধি - পথ
চলতি কথায় পরমাত্মীয়ের আন্তরিকতায়। বিদায়ের বিহ্বলতায় তখন আমার আন্দোলিত মননে বেজে
চলেছে একটিই কথা - “কবিই তো ভগবান - ঈশ্বর কবি, আঁধারিতে ইন্দু - দিবসে রবি”।

Comments
Post a Comment