স্বপ্না নাথ এর - ‘বিশ শতকের বাংলা উপন্যাসে নারী পরিসর’
ডঃ স্বপ্না নাথ জন্মসূত্রে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি জেলার প্রান্তিক জনপদ লক্ষ্মীনগর এর বাসিন্দা। প্রাথমিক থেকে মহাবিদ্যালয় স্তরের শিক্ষা দীক্ষার পর আসাম বিস্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ও পি এইচ ডি ডিগ্রি লাভ করে বর্তমানে ডিব্রুগড়ের কানৈ মহাবিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কাজে যুক্ত। একই কলেজের বাণিজ্য বিভাগের অধ্যাপক টঙ্ক প্রসাদ উপাধ্যায়ের সঙ্গে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হয়ে বর্তমানে তিনি ডিব্রুগড়ের বাসিন্দা। নারীর রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জীবন যাত্রার মান ও তাদের নিজস্ব পরিসর সন্ধান তাঁর গবেষণার বিষয়। নারী পুরুষ মিলিত সুস্থ সমাজে এক সামগ্রিক যুক্তিবাদী লিঙ্গন্যায়-এ বিশ্বাসী লেখিকা।
‘বিশ শতকের বাংলা উপন্যাসে নারী
পরিসর’ তাঁর একটি অনন্য সাধারণ প্রবন্ধ সংকলন। স্বল্প পরিসরে ২৪৮ পৃষ্ঠার এই বিশাল
সাহিত্য কর্মের আলোচনা খুবই দুরূহ। তাই এই আলোচনা হতে পারে শুধু মাত্র লেখিকার
সাহিত্য বিষয়ক মননশীলতাকে উপস্থাপন করার সম্যক প্রচেষ্টা মাত্র। মোট ছয়টি অধ্যায়ের
এই সংকলনে রয়েছে পাঁচজন উপন্যাসকারের একটি করে উপন্যাসের পর্যবেক্ষণ ও সার্বিক
বিশ্লেষণ।
প্রাককথনের সূচনাতেই লেখিকা
স্পষ্ট করে দিয়েছেন তাঁর উদ্দেশ্য। লিখছেন - “আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজ
ব্যাবস্থায় পুরুষ রয়েছে কেন্দ্রে, নারী প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে পরিধিতে। সমাজমানসের
কেন্দ্রে যে পুরুষেরা রয়েছেন, মূলতঃ ক্ষমতা এবং বেশির ভাগ বহির্বিশ্বটি তাদেরই।
নারী সেখানে ‘সত্ত্বা’র ‘অপর’ হিসেবে আসে। আমাদের ধর্ম, ইতিহাস, সমাজ, সাহিত্য,
সংস্কৃতি যুগ যুগ ধরে নারীসত্ত্বাকে ‘নিম্নমানের’ বলেই প্রতিপন্ন করেছে।
পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যবাদের ভাবনায় নারী তুলনামূলক ভাবে পুরুষ থেকে ‘হেয়’। নারীর
নিজস্ব মন বা মননও এই পুরুষ শাসিত বর্গচেতনার কালো পর্দার আড়ালে ঢেকে যায়। রুদ্ধ
হয়ে যায় তাদের ব্যক্তিচেতনার জানালাগুলি। তাই নারী চেতনাবাদী চিন্তাচর্চার জ্ঞান
ব্যতিরেকে নারী ঔপন্যাসিকদের চিন্তাধারা, তঁদের প্রতিবেদনে প্রতিফলিত
নারীচরিত্রদের আলোচনা বা পরিসর সন্ধান যুক্তিযুক্ত হয়ে উঠে না”। এই নারী চরিত্রের
আলোচনা ও পরিসর সন্ধানেই লেখিকার এই গ্রন্থের অবতারণা।
প্রথম অধ্যায় - ‘স্বাধীনতা
পরবর্তী বাংলা উপন্যাসে নারীচেতনার উন্মেষ পর্ব’। উপক্রমণিকায় লেখিকার কলম
সঠিক দিশায় পথ দেখিয়ে দেয় পাঠকের। বিষয়ের গভীরে প্রবেশের যথাযথ মুখবন্ধে
লিখেছেন - “উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে অন্তঃপুরের মেয়েরা যখন সামান্য অক্ষর পরিচয়টুকু সম্বল
করে, কাগজ কলমের নিষিদ্ধ আকর্ষণে একটু একটু করে চেতনার বদ্ধ দুয়ারে
আঘাত করছেন তখন তাঁরা আত্মজীবনী, স্মৃতিকথা কিংবা ডায়রি লিখছেন।
- - - - - যা যা লিখলে ভালো শোনায় কেবল সেইটুকুই লেখা, কিন্তু সময়ের রথচক্রে এগিয়ে চলে বিশ শতকের শেষের দিকের লেখক তসলিমা নাসরিন
একেবারে স্পষ্টবাদী। পিতৃতন্ত্রের খড়্গহস্তের সম্মুখে তাঁর
আত্মজীবনী ‘আমার মেয়েবেলা’ বাংলা ভাষায় তথা ভারতীয় সাহিত্যে আর দ্বিতীয়টি
নেই।
- - - - - - রামসুন্দরী দেবীর ‘আমার জীবন’
(১৮৭৬ খৃঃ)-এ পাই তার স্মৃতি হাতড়ে হাতড়ে শৈশবে
চেনা অক্ষর পরিচয়টুকু পুনরুদ্ধার করার আপ্রাণ চেষ্টা। রন্ধনশালায় নির্জন অবসরে একহাত ঘোমটার
তলায় লুকিয়ে ‘চৈতন্য ভাগবত’ পুঁথি পড়ার বর্ণনা - আমাদের নারীশিক্ষার অরুণোদয়ের মুহূর্তকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
এই অধ্যায়ে লেখিকা সন্নিবিষ্ট করেছেন
গিরিবালা দেবীর ‘রায়বড়ি’ উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা। লেখিকার
ভাষায় ‘রায়বাড়ি’ আত্মকথা এবং উপন্যাসের মেলবন্ধন। এছাড়াও
এই অধ্যায়ে জ্যোতির্ময়ী দেবী, আশাপূর্ণা দেবী, মহাশ্বেতা দেবী,
সাবিত্রী রায় ও সুলেখা সান্যালের উপন্যাসসমূহের সম্যক আলোচনার মাধ্যমে
পরবর্তী বিষয়বস্তুর দিকে এগিয়েছেন লেখিকা।
দ্বিতীয় অধ্যায় - ‘তসলিমা নাসরিনের
নান্দনিকবোধ ও শোধ উপন্যাসের বিশ্লেষণ’। এই পর্বে তসলিমা নাসরিনের সংক্ষিপ্ত
জীবনী ও তাঁর সাহিত্যকর্মের চর্চার বাইরে ও রয়েছে তাঁর নান্দনিক দিকসমূহের স্বচ্ছ অবলোকন। রয়েছে
বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে উপন্যাস ও উপন্যাসের ঝুমুর চরিত্রটির পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা। তার
নারী পরিসর, তার মূল্যবোধ, মাতৃত্ব এবং অবশেষে আশাপূর্ণা দেবীর সুবর্ণলতা
উপন্যাসের সঙ্গে শোধ উপন্যাসটি তুলনামূলক পর্যালোচনাও উঠে এসেছে লেখিকার কলমে।
তৃতীয় অধ্যায় - ‘বাণী বসুর নান্দনিকবোধ
ও গান্ধর্বী উপন্যাসের বিশ্লেষণ’। এই পর্বে বাণী বসুর ব্যক্তি পরিচয়
ও তাঁর নান্দনিকবোধ নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনার শেষে ‘গান্ধর্বী’ উপন্যাসটির
চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন লেখিকা। শিল্প, শিল্পী আর প্রকৃতির
আবহে উপন্যাসের যে মূল ভাবধারা তার এক নিখুঁত বর্ণনা অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় লিপিবদ্ধ
করেছেন ডঃ নাথ। প্রতিটি মুখ্য চরিত্রের আলাদা আলাদা পর্যালোচনা। চরিত্রের
একেবারে গভীরে প্রবেশ করে কুড়িয়ে এনেছেন উপন্যাসকারের মনোজগতের যাবতীয় ভাবনা। নারীর
মুক্ত পরিসরের এক অসামান্য বর্ণনা।
চতুর্থ অধ্যায় - ‘সুচিত্রা ভট্টাচার্যের
নান্দনিকবোধ ও দহন উপন্যাসের বিশ্লেষণ’। এই পর্বেও একই ধারায় মোট ৪১টি পৃষ্ঠা
জুড়ে উপন্যাসকার ও উপন্যাস তথা উপন্যাসকারের গভীর ভাবনার জগতটিকে অনাবিল শব্দছন্দে
তুলে ধরেছেন অত্যন্ত মুন্সিয়ানায়। লেখিকার দৃষ্টিভঙ্গীতে “সুচিত্রা ভট্টাচার্য
তাঁর উপন্যাসের নাম দেন ‘দহন’ - যে দহন
এইসব শারীরিক দহন নয়, নারীর অন্তর্দহন।”
‘দহন’ এর বাইরেও উল্লেখ রয়েছে উপন্যাসকারের ‘ভাঙনকাল’, ‘হেমন্তের পাখি’ এবং
‘আমি রাইকিশোরী’ উপন্যাসেরও। রয়েছে
‘দহন’
এর মুখ্য চরিত্র ঝিনুকের জীবনবোধের এক অসাধারণ মনোবিশ্লেষণ। ঝিনুক
লেখিকার কলমে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক প্রতিস্পর্ধী নারী পরিসর।
পঞ্চম অধ্যায় - ‘ভগীরথ মিশ্রের নান্দনিকবোধ
ও জানগুরু উপন্যাসের বিশ্লেষণ’। এই পর্বে উপন্যাসকারের নান্দনিকবোধের
পাশাপাশি সামঞ্জস্যপূর্ণ আদিবাসী লোককথা ও প্রকৃতির যে উপস্থিতি তাঁর উপন্যাসে সেখানটাতেই
আলোকপাত করেছেন লেখিকা। আসামে ডাইনি সাব্যস্ত হওয়া বিরুবালা দেবী ও তাঁর বক্তব্যকে
যথাযথ ভাবে উপস্থাপন করে উপন্যাসের যথার্থ পর্যালোচনায় মনোনিবেশ করা হয়েছে। কিঞ্চিৎ
আলোচনা অন্যান্য কুপ্রথা নিয়েও সেরে ফেলেছেন একই আঙ্গিকে। রয়েছে ভগীরথ মিশ্রের ‘আড়কাঠি’, ‘চারণভূমি’ ইত্যাদি উপন্যাসেরও গভীর পর্যালোচনা।
ষষ্ঠ তথা শেষ অধ্যায় - ‘সাধন চট্টোপাধ্যায়ের
নান্দনিকবোধ ও মাটির অ্যান্টেনা উপন্যাসের বিশ্লেষণ’। এখানে উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র টুনি
এবং পাশাপাশি তহমিনা চরিত্রের প্রতিটি দিক নিয়ে খুবই গভীর ও চুলচেরা বিশ্লেষণ দেখতে
পাওয়া যায়। পুরুষ
উপন্যাসকারের চিন্তায় নারী চরিত্রের সীমিত উপস্থাপন নিয়ে সরব হয়েছেন লেখিকা। তিনি
লিখেছেন - “সাধন চট্টোপাধ্যায় যেন টুনির পরিণতির ক্ষেত্রে বঙ্কিমচন্দ্রেরই উত্তরসূরি। তাঁর
টুনির পরিণতিও যেন রোহিণী বা কুন্দের মৃত্যুর মতোই। নারী পরিসর মুক্তির কোন আশানুরূপ ভাবনার
বার্তাবাহক নয়। তবুও
ফণী কামারের মতো লোকেরাও সমাজে রয়েছেন, যাদের কাছে টুনি-তহমিনারা
‘ভোরের পাখি’। সেই গাছ ও পাখিদের বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব
সমাজের।”
অধ্যায়ের শেষে সাধন চট্টোপাধ্যায়ের বিভিন্ন উপন্যাসের নারী চরিত্র নিয়েও
আছে নানা আলোচনা। কিন্তু লেখিকার মননে যে অতৃপ্তি, নারীচরিত্র রূপায়ণে
সমকালীন ঔপন্যাসিকদের যে সীমারেখা তার বিরুদ্ধে উগরে দিয়েছেন তার হতাশা।
- “সাধন চট্টোপাধ্যায়ের নারী চরিত্ররা শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা রাজিনীতির ক্ষেত্রেও সুস্থ চিন্তা চেতনার প্রতীক হয়ে আসে। তাঁর
দুলালী, অন্নপূর্ণা, টুনি বা তহমিনা - সবাই
নিজ নিজ সামাজিক অবস্থান থেকে শিক্ষা ও সচেতনতার মধ্য দিয়ে সমাজ পরিবর্তনে সক্রিয় ভূমিকা
নেয়। কিন্তু
লেখকের কলমে তাদের পরিণতি
- পরাজয়ের গ্লানি বা ভয়ঙ্কর মৃত্যুতে।
উপসংহারে লেখিকা লিখছেন - “নারীকে তার নিজের
জীবনচর্চার কথা, নিজের চোখে জগৎ ও জীবনকে দেখার অনুভব ও উপলব্ধির
কথা বলতে তাকে নিজের হাতেই কলম ধরতে হয়”। সেই উপলব্ধির কথা বলতে গিয়েই যে অসাধারণ
নৈপুণ্যে একের পর এক উপন্যাসের নারী চরিত্রসমূহের গভীর পর্যবেক্ষণ করেছেন লেখিকা তাতে
তাঁর লিখন শৈলী ও নান্দনিক বোধের পরিচয়টুকু ফুটে উঠেছে সুস্পষ্ট ভাবে।
বঙ্গীয় সাহিত্য সংসদ থেকে প্রকাশিত
এই গ্রন্থের শক্ত মলাটের ভিতরে নারী মনের কত যে কোমল রূপ, কত চারিত্রিক দৃঢ়তা,
কত অব্যক্ত অনুভূতি একের পর এক পৃষ্ঠা জুড়ে আপন খেয়ালে হয়েছে লিপিবদ্ধ
তার যেন কোনও লেখাজোখা নেই। চিত্রকল্পে প্রাসঙ্গিক প্রচ্ছদ এঁকেছেন
অতনু গাঙ্গুলী। মুদ্রক
অজন্তা প্রিন্টার্স,
কোলকাতা। হাতে গোণা কয়েকটি বানান ভুলের বাইরে
কোথাও অনুসন্ধিৎসু পাঠকের সরল পঠনে থেমে যাওয়ার জো নেই। নিটোল অক্ষর বিন্যাস ও স্পষ্ট ছাপাই
আকর্ষণীয় করে তুলেছে গ্রন্থটিকে। শেষ প্রচ্ছদে লেখিকার শিক্ষাগুরু তথা
তাঁর গবেষণা কর্মের পথদ্রষ্টা, বিশিষ্ট সাহিত্যিক তপোধীর ভট্টাচার্যের একটি বার্তায় বলা
হয়েছে ডঃ নাথ একজন নারীচেতনাবাদী পাঠ পাঠান্তরের কাতারের অক্লান্ত গবেষিকা।
ডঃ স্বপ্না নাথের এই গ্রন্থটি নিঃসন্দেহে উপত্যকা তথা এই অঞ্চলের সাহিত্য কর্মযজ্ঞে এক উল্লেখযোগ্য অবদান।

Comments
Post a Comment