Skip to main content

মনোগ্রাহী কবিতা সংকলন - ‘শুধু মল্লিকার জন্যে’


মনোগ্রাহী কবিতা সংকলন - ‘শুধু মল্লিকার জন্যে’

 

গুয়াহাটির ভিকি পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত কবি, সাহিত্যিক তথা কারুশিল্পী সজল পাল-এর কাব্য সংকলনটি হাতে এলো সম্প্রতি। কিছু বই প্রথম নজরেই দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়। ‘শুধু মল্লিকার জন্যে’ এরকমই একটি প্রকাশনা। আকর্ষণীয় প্রচ্ছদ - শিল্পী হীরকজ্যোতি বরুয়ার। প্রথম দু’টি পৃষ্ঠা ওল্টালেই উৎসর্গেও চমক। উৎসর্গ এমনও হয় ? এখানে হয়েছে। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে মুখ পুস্তিকার (ফেসবুক) সকল বন্ধুদের প্রতি, যাদের অভিমত কবিকে অনুপ্রাণিত করেছে।

নিটোল ছিমছাম ১১২ পৃষ্ঠার এই সংকলনে স্থান পেয়েছে মোট ৩২টি কবিতা। আত্মকথনে কবি খুব সংযত। কথা বলার দায় দিয়েছেন পাঠক-পাঠিকাকে। সবকিছুতেই তাঁর শৈল্পিক সত্ত্বার প্রকাশ। একটি সুসংহত পংক্তি যেমন একটি কবিতাকে পূর্ণতা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে তেমনি এই গ্রন্থের শুধুমাত্র একটি (প্রথম) কবিতাই গ্রন্থটিকে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে এক অনতিক্রম্য উচ্চতায়। কবিতাটির নাম ‘শুধু মল্লিকার জন্যে’। বলতে গেলে পুরো গ্রন্থের সুর-তান বেঁধে রেখেছে এই একটি মাত্র কবিতা। কল্পনার এক অসাধারণ চরিত্র চিত্রণ করেছেন কবি এই কবিতাটির মাধ্যমে। ‘মল্লিকা’র সাথে কথোপকথনের মাধ্যমে শিল্পী কবির যাবতীয় ধারণা, যাবতীয় অনুভব - সব যেন ধরা দিয়েছে মূর্ত হয়ে। অপূর্ব কাব্যিক মুন্সিয়ানায় শুধু মল্লিকার জন্যে - আজও বসন্ত নামে, কবিতায় শব্দেরা নেচে ওঠে, এখনও ছুটে ছুটে যায় মন ও শরীর, বহু দিন বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে - - - -। পুরো গ্রন্থের প্রতিটি কবিতাই ‘মল্লিকা’র সাথে কবির মগ্ন আলাপচারিতা। অনির্ণীত ছন্দেও যেন কল্পনার রঙ, রূপ, রস, ছন্দ অকৃপণ কলমের যাদুস্পর্শে উজাড় করে দিয়েছেন কবি।

৯ পৃষ্ঠা জোড়া দীর্ঘ কবিতা - ‘যে কথা হয়নি বলা’। বলতে গেলে তার সবটুকুই বাঁধভাঙা বাকচাতুর্যে বলে দেওয়ার সাহসটুকুও দেখাতে পেরেছেন কবি যা অনেকেই পারেন না। এর জন্যই কবি সজল পাল ব্যতিক্রমী। না বলা কথার হতাশা কবিতার গা বেয়ে ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চায় যেন -

এসো কথা বলি ভরা বর্ষার মতো
এমন কথা, যা
এত বেলা শেষেও তোমাকে
বলা হয়ে ওঠেনি, মল্লিকা।
মল্লিকা,
তোমাকে তো অনুভব করি আমি
- - - প্রথম কৈশোরের সেই অবুঝ অবুঝ
সবুজ সবুজ নরম ঘাসের মতো দিন থেকে - - -
কত কথাই তো বলেছি তোমায়
কতটুকু তার মনে রেখেছ তুমি
কতটুকুই বা তুমি শুনেছ ?

অনর্গল কথামালায় কবিতা এগিয়ে চলে আপন ছন্দমাধুর্যে। কবিতায় বিলীন হয়ে যায় রসিক পাঠক মন। একের পর এক অনাস্বাদিত আন্তরিকতার আলাপনে একের পর এক কবিতা যেন হয়ে ওঠে জীবন্ত এক একটি বাঙ্ময় জীবনচিত্র।

তুমি হঠাৎ এসো অপ্রত্যাশিত ধূমকেতুর মতো
থেকো আমার প্রদক্ষিণে
থেকো অন্তত কিছুটা সময়,
কিছুটা পথ হেঁটো পাশাপাশি
অন্তত ততটা সময়
যতটা সময় আমি জীবনে
মল্লিকাবিহনে
থেকেছি শূন্য, রয়েছি নিঃসঙ্গ।
যে মল্লিকার জন্য আমি
হাজার বছর ধরে
পৃথিবীর পথে হাঁটছি পথ
জেগে আছি বিনিদ্র রাত -- -
(কবিতা - প্রত্যাশা)

প্রতিটি কবিতার প্রতিটি ছত্রে ছত্রে ‘মল্লিকা’র প্রতি কবির এই একান্ত আলাপচারিতার ফাঁকে ছলকে উঠেছে এক নিখাদ প্রেমের অভিব্যক্তি যা পাঠক মনে সৃষ্টি করে এক অনাবিল ভালো লাগার পবিত্র অনুভব। পাঠক মনের এই অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়াটিও কবির অজানা নয়। তাই গ্রন্থের সূচনাতেই আত্মকথনে বলে দিয়েছেন স্পষ্ট করে - “যখন খুব ইচ্ছে করে কথা বলার অথচ কেউ থাকে না কাছে কথা বলার এবং শোনার তখন কথা হয় শুধু মল্লিকার সঙ্গে। এই নিয়েই কবিতা।”

হেঁয়ালিপনার পরতে পরতেই কবি নিপুণ শিল্পীর মতো সেরে নিয়েছেন তাঁর যাবতীয় আত্মকথন। আবাহনে আবাহনে কবি পুরোটা সময় জুড়েই অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন তাঁর জীবনজোড়া ভাবনার কথামালা। সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন কবিতার ডালি ভরে শুধুই তাঁর একান্ত আপন - “শুধু মল্লিকার জন্যে”।

গত একটি দশকে এ অঞ্চলের শ্রেষ্ঠ প্রেমের কবিতার সংকলন যদি বলা হয়ে থাকে এই গ্রন্থকে তাহলেও বোধ করি কোনওরকম অত্যুক্তি হবে না। নিখুঁত ছাপা, বাঁধাই ও অক্ষর বিন্যাসে বিন্যস্ত পরিপাটি এই কাব্য সংকলন নিঃসন্দেহে এক সংগ্রহযোগ্য সংকলন।

শেষের বেলায় আকুল আর্তির কাব্যসুষমায় মনে দাগ কেটে যায় এই অনবদ্য সৃষ্টি -

ইচ্ছে তো হয় না মল্লিকা
কী করে বলি তোমায় কথাটা
‘এখন তাহলে আসি,
এবার আমার বিদায় নেবার পালা’
শুধু হাত তোলো তুমি মল্লিকা
আমাকে দাও বিদায়।
এমনি করে যেন দেখা হয় প্রতিনিয়ত
- -  পার্থিবতায় না হোক
হোক কবিতায়।
 
- - - - - - - - - -

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।


Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত স্মরণ সংখ্যা ‘আলোহাওয়া’

একটি লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটপত্রিকা হচ্ছে সমাজের সাহিত্যদর্পণ । শুধুই সমকালিক নয়। যুগান্তরের ভাষাসাহিত্য ও তার যুগন্ধর স্রষ্টাদের সঙ্গে সমকালকে পরিচিত করে দেওয়ার এক প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম। আর একের পর এক এই লক্ষ্যেই উৎকৃষ্টতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি শহর থেকে প্রকাশিত ‘ সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক ’ পত্রিকা ‘ আলোহাওয়া ’ । রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার ১৯তম সংখ্যা - ২৫তম বর্ষ , পৌষ ১৪৩২ - ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যা । কবি জিতেন্দ্র নাথ সম্পাদিত এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যিক ‘ তুষারকান্তি নাথ স্মরণ সংখ্যা ’ হিসেবে । তুষারকান্তি নাথ এমন একজন সাহিত্যিক যাঁকে আখ্যায়িত করা যায় একজন সার্বিক সাহিত্যিক হিসেবে। ধারে ও ভারে তাঁর সৃষ্টি শুধু বরাক উপত্যকাতেই নয় এর বাইরেও সমাদৃত। তাঁর লেখনী রত্নপ্রসবা। পক্ষান্তরে এটাও বলা যায় যে ঘরে বাইরে কিছু স্বীকৃতি , কিছু প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকলেও তাঁর লেখালেখি ও নানাবিধ সৃষ্টিকর্মের গভীরতার মূল্যায়ন যতটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল ততটা কিন্তু হয়নি। আসলে প্রান্তিকতা সততই লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের পরিচিতির পথে এক বৃহৎ অন্তরা...

প্রখর গরজ ও শ্রদ্ধায় নিবেদিত একটি ‘সুকান্ত সংখ্যা’ - শতদল

হাতে নিলে আর পাঁচটা নিয়মিত সংখ্যা পত্রিকার মতো মনে হলেও উত্তর ত্রিপুরার চুড়াইবাড়ী থেকে কবি, লেখক রতন চন্দ সম্পাদিত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ‘শতদল’ পত্রিকার সম্প্রতি প্রকাশিত ২৯তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, বৈশাখ ১৪৩৩, মে-২০২৬ (কবি সুকান্ত জন্মশতবর্ষ সংখ্যা) সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রমী। সেই মাত্র ৪২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক সংস্করণ হলেও প্রচ্ছদ থেকে শেষ পৃষ্ঠা অবধি যতন, গরজ ও উৎকর্ষের এক সম্ভার বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না মোটেও। বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র স্থান ধরে আছেন অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর সময়কাল থেকে আজ অবধি এবং আগত-অনাগত চিরকালীন এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী এই কবি মূলত একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেই সাহিত্যবিশ্বে পরিচিত হলেও তাঁর কবিতায় এর বাইরেও যে রয়ে গেছে বহুমাত্রিক এক বোধ, ভাষ্য - বোধ করি তার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি আজও। তবে যতই তাঁকে নিয়ে চর্চা হবে ততই এক এক করে খুলবে বিস্ময়ের ঝাঁপি এ কথা অনস্বীকার্য। এবং তারই এক নির্মোহ প্রয়াস ও প্রকাশ আলোচ্য সংখ্যাটি। সুসজ্জিত কবি-প্রতিকৃতিযুক্ত একটি নান্দনিক প্রচ্ছদ - সজ্জায়, বর্ণ সংস্থাপনে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য পাঠকের। সৌজন্যে মুদ...