Skip to main content

এক রাতের সফরনামা ও অসহিষ্ণু ভারতবর্ষ

এক রাতের সফরনামা ও অসহিষ্ণু ভারতবর্ষ

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

 

একটি গ্রামে এক বর্ধিষ্ণু কৃষক পরিবার ছিল (কৃষক কিংবা পূজারি ব্রাহ্মন হলেই যে ‘দরিদ্র’ হতে হবে তার কোনও বাধ্যবাধকতা নেই)। পরিবার এক হলেও পৃথগান্ন ছিল। বড় ভাই বারীন্দ্র এবং ছোট ভাই গিরীন্দ্র। গ্রামের ঠিক মাঝামাঝি ছোট্ট একটি টিলার উপরে তাঁদের বাড়ি। বাড়ির ঠিক পিছনেই ঘন জঙ্গল। প্রায়শই শেয়াল, সজারু, গুইল সাপ, গন্ধগোকুল, খট্টাশ, বনমোরগ আদির দেখা মিলতো গ্রামের এদিক ওদিক। গ্রামে মানুষ এবং পশু পাখির শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।

বড় ভাই বারীন্দ্রের তিন ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে চাকুরিসূত্রে বাইরে থাকে। ছোট ভাই গিরীন্দ্রের দুই ছেলে এক মেয়ে। উভয় পরিবারের সন্তানরা শিক্ষাদীক্ষায় পটু। উচ্চ শিক্ষিত না হলেও ক অক্ষর গো মাংস নয় কেউই। অজ পাড়া গাঁয়ে কৃষক পরিবারে জন্ম নিয়ে শিক্ষার পথ না মাড়ালেও অশুদ্ধ হতো না কোনও মহাভারত। তবুও ওদের সবার শিক্ষিত হওয়ার পেছনে বড় ভাই বারীন্দ্রের অবদানটাই সব চাইতে বেশি। নিজের ছেলে মেয়েদের শিক্ষাদানের এই পরম্পরা যে শুরু করেছিলেন বারীন্দ্র, তা পুরোপুরি ইচ্ছে না থাকলেও এক প্রকার বাধ্য হয়েই বজায় রাখতে হলো গিরীন্দ্রের। বারীন্দ্র ছিলেন স্থিতধী পুরুষ। প্রতিদিন ভোরে নিয়ম করে কৃষিকাজে বেরিয়ে যাওয়ার অভ্যেস তাঁর চিরদিনের। পুঁথিগত তথা জাগতিক শিক্ষার পাশাপাশি ছেলেদের দিয়ে রেখেছেন চাষবাসেরও শিক্ষা। মেয়েও তাঁর যথেষ্টই শিক্ষিত। উভয় পরিবারের উত্তরণই ছিল তাঁর একমাত্র চিন্তা। এই নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন তিনি। সেই জন্য গ্রামবাসীদের সঙ্গে তাঁর সরাসরি যোগাযোগ যদিও ছিল খুবই কম কিন্তু তাঁর এই গুণাবলির সুবাদে একটা সম্মানের জায়গা কিংবা বলা যায় অলিখিত গ্রাম প্রধানের মতো একটা মর্যাদা তাঁর পাকা ছিল। পক্ষান্তরে গিরীন্দ্র ছিলেন অসহিষ্ণু প্রকৃতির। শিক্ষার অভাব তো ছিলই তার সাথে গায়ের জোরে এবং টাকাকড়ির প্রাচুর্যে অনেকটাই অহঙ্কারী হয়ে উঠেছিলেন তিনি। স্বভাবতই বড় ভাইয়ের সব কার্যপদ্ধতি এবং সুচারু নিয়মের ধারায় সংসার চালানোর পদ্ধতি তথা সর্বজনগ্রাহ্যতা তাঁর সর্বাংশে প্রিয় ছিল না। তিনি জানতেন যে গ্রামের এই সবচাইতে বিত্তশালী পরিবারের তিনি হচ্ছেন গিয়ে ছোটকর্তা। অন্তত গ্রামের আর পাঁচ জনের কাছে এটাই ধ্রুব সত্য। সবাই জানে বারীন্দ্রের তত্ত্বাবধানেই চলে উভয় পরিবার। অর্থাৎ কি না গিরীন্দ্রের সে রকম কোনও অধিকার কিংবা গুরুত্বই নেই সংসারে। তাই ছোটখাটো ব্যাপারেও বড় ভাইয়ের ত্রুটি খুঁজে বেড়ানোই ছিল তাঁর লক্ষ্য। এইসব আলোচনা তিনি মিথ্যের রঙ চড়িয়ে প্রায়শঃই গ্রামবাসীদের সঙ্গে করে বেড়াতেন। স্বাভাবিক ভাবেই গ্রামে বারীন্দ্রের বিরুদ্ধে একটা জনমত গড়ে উঠেছিল সহজেই। চাটুকার এবং সুযোগসন্ধানী গ্রামবাসীরা সহজেই নিজেদের স্বার্থে হাঁ-তে হাঁ মেলালেন গিরীন্দ্রের সঙ্গে।

এভাবেই চলছিল। গিরীন্দ্রের অসহিষ্ণুতা একসময় চরম আকার ধারণ করলো এবং এর ফলে বড় ভাইয়ের এই কর্তৃত্ব থেকে বেরিয়ে আসার জন্য নানা রকম ফন্দি আঁটতে শুরু করলেন। তাঁর পক্ষে একটা সময় এক বাড়িতে থাকাটা অসহ্যকর লাগছিল। আর ঠিক সেই সময়েই একটি মোক্ষম সুযোগও এসে গেল তাঁর সামনে। এক রাতে পেছনের জঙ্গল থেকে এক অজানা প্রাণী এসে গিরীন্দ্রদের গোয়াল ঘরে ঢুকে একটি হালের বলদকে আক্রমন করে মারাত্মক ভাবে আহত করে দেয়। রাতে গরুদের চিল চিৎকারে সবাই উঠে এলে পালিয়ে যায় প্রাণীটি। কিন্তু পলায়নরত জীবটিকে দেখে ফেলেন অনেকেই। এই ঘটনাটি ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। গ্রামবাসীরা জানতোই না যে ওই বনে কোনও অপরিচিত হিংস্র প্রাণী থাকতে পারে। এমন চিন্তা কারোও মাথায় আসেনি কখনো। এখনো অনেকেই বিশ্বাসই করতে পারছে না ঘটনাটি। অনেকেই বলছেন যে এই প্রাণীটি নির্ঘাৎ অন্য বন থেকে পালিয়ে এসে এই জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে। স্বভাবতই গ্রামে এ নিয়ে জোর আলাপ আলোচনা চলতে থাকলো। সবার হাতে অফুরান সময়। এমন অকল্পনীয় খবরে তাই গল্পগুজবের বহর বেড়ে গেল অনেকটাই। ওদিকে হালের বলদ হারিয়েও গিরীন্দ্র এই সুযোগের সদ্ব্যবহারে তৎপর হয়ে উঠলেন। নিজের স্বার্থপূরণের লক্ষ্যে এবং গ্রামবাসীদের নিজের পক্ষে টেনে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি সারা গ্রামে এই বলে রটনা ছড়াতে শুরু করলেন যে এই ঘটনাটি শুধুমাত্র বারীন্দ্রেরই অদূরদর্শিতার ফল। তিনি অনেকদিন ধরেই বারীন্দ্রকে বলে আসছিলেন যে গোয়ালঘরটি পাকা করা হোক। কিন্তু তাঁর কথা না শোনায় আজ এই অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হলো। গিরীন্দ্র আজ অসহিষ্ণুতার চূড়ান্ত শিখরে। এভাবে চলতে থাকলে তিনি কোনওদিনই গ্রামের মোড়ল কিংবা নিদেনপক্ষে বারীন্দ্রের মতো সর্বজনগ্রাহ্য মানুষ হতে পারবেন না। তাই অপপ্রচারের মাধ্যমেই খুঁজে নিতে হবে পায়ের নিচের মাটি। আজ গিরীন্দ্রের একটিই মন্ত্র - রাজা (পড়ুন দাদা) তুমি গদি ছাড়ো। (নিজের এলেমে তা সম্ভব নয় কোনওদিনই তাই তুমিই ছাড়ো নিজে থেকে)।

গিরীন্দ্রের এই অপপ্রচারটি পাঁচ কান হয়ে এসে পৌঁছায় বারীন্দ্রেরও কানে। বারীন্দ্র গ্রামবাসীকে জিজ্ঞেস করেন - এই গ্রামে কোনও দিন কোনও অজানা প্রাণীর আক্রমণ হবে কেঊ ভেবেছিল ? কোনোদিন হয়েছে কি তা ? গত পঞ্চাশ বছর ধরে তো দিব্যি বাঁশের ঘরে শান্তির নিদ্রা যাচ্ছিল আমাদের গোয়াল ঘরের গরুরা। কেউ তো আমাকে এ কথা বলেনি যে একদিন এমন হতে পারে তাই গোয়াল ঘর পাকা করো। আমিও ভাবিনি তেমন, কারণ যা নেই তার ভয়ে কেউ প্রয়োজনাতিরিক্ত কাজ করে না। তবে এবার নিশ্চয়ই করবো তবে গিরি বা কেউ যদি ভাবে একদিনেই গোয়াল ঘর পাকা হয়ে যাবে তাহলে তো ভুল। অপেক্ষা করতে হবে বৈকি। 

- সব বুঝে শুনে নিশ্চুপ থাকে গ্রামবাসীরা। কিন্তু স্বার্থের খাতিরে শেষে কেউ কেউ আবার সুর মেলায় গিরীন্দ্রেরই সুরে। অলক্ষ্যে থেকে অধিকাংশ ভদ্র, সমঝধার গ্রামবাসী সব দেখেও শুধু ভদ্রতার খাতিরে চুপ থেকে যায় বারীন্দ্রেরই মতো।

 

###

 

একাধারে ভীতি ও মানসিক দুঃখের ভারে ভারাক্রান্ত আমি বসে আছি ছুটন্ত বাসের জানালার কাছে। অন্তর তোলপাড় লাগাতার। জীবনের অর্ধ শতাব্দী পেরিয়ে এসেছি এতদিনে। সঞ্চয় বলতে শুধু কিছু সিদ্ধান্ত। যা যত্ন করে পোষে রেখেছিলাম এত দিন। সিদ্ধান্তের লালনে কম ত্যাগ, কম কষ্ট স্বীকার করতে হয়নি। আজ হঠাৎ করে এক লহমায় তাসের ঘরের মতোই যেন ভেঙে পড়লো ঝরঝর করে।

বহিঃরাজ্যে চাকুরিরত আমি এতদিন যার সঙ্গে একটি ঘর ভাগ করে নিয়েছিলাম সেটি মূলতঃ তাঁরই ঘর ছিল। আমিও একা থাকার সূত্রে তাঁর সঙ্গেই থাকতাম। ঘর আর কর্মক্ষেত্র সবখানেই একত্রবাসের দৌলতে একে অপরের সুখ দুঃখের নিরন্তর সাথী বহু বছর ধরে। ছোট থেকে শুরু করে বড় সমস্যাতেও একে অপরের সমব্যথী।

কাল দুপুরে হঠাৎ করেই সামান্য জ্বর জ্বর ভাব, সঙ্গে কাশি আর গায়ে ব্যথা তাঁর। আজকের এই ঘোর দুর্দিনে নির্ঘাৎ অশনি সংকেত। এই মূহুর্তে শরীর খারাপের যত লক্ষণ তার প্রায় সবকিছুই হাতিয়ে নিয়েছে ধুরন্ধর করোনা। অতিমারীর এই বিপদসংকুল দিনে আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। মুখে সাহস জুগিয়ে বলছি বটে - এখন তো সিজন চেঞ্জের একটা ব্যাপার আছে। তাই সম্ভবত ইনফ্লুয়েঞ্জা হয়েছে। সেরে যাবে দিন তিনেকের মধ্যেই। বলছি তো ঠিকই কিন্তু আসল ভয়টি তো দু’জনের ভিতরেই গেড়ে বসেছে ইতিমধ্যে। বললেন - একটা কাজ করুন, ফার্মাসি থেকে আপাততঃ কয়েকটি প্যারাসিটামল আর এন্টিবায়োটিক ট্যাবলেট নিয়ে আসুন। ছুটে গেলাম বাইরে। ইতিমধ্যে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছি অফিসে। খবর পেয়েই অফিস থেকে জানিয়ে দিয়েছে - সাবধান। অফিসে এসো না। কিছু দরকার হলে বলবে। পাঠিয়ে দেবো। পৃথিবী এখন এমনই চলছে। সঙ্গরোধের সঙ্কল্প। কেউ কারো নয় আর। সবাই এখন শুধু নিজের।

ওষুধের সঙ্গে কিছু ফল, কিছু খাওয়ার জিনিসপত্র একটি থার্মোমিটার, একটি অক্সিমিটার কিনে ঘরে এলাম। এদিকে আরেক মুশকিল হয়েছে যে আমি আবার রান্না করতে পারি না। শুধু ভাত, আলু সেদ্ধ আর ওমলেটেই আমার রান্নার দৌড় সমাপ্ত। তবে চা বানাতে পারি। কিন্তু বন্ধুটি তো রান্নায় পারদর্শী তাই এতদিন কোনও সমস্যাই হয়নি। এবং স্বভাবতই যেমন তেমন পদ আবার তাঁর মুখে রুচবেই না। অগত্যা অপেক্ষা কখন তাঁর জ্বর একটু কমবে তারপর তাঁর এক পদ রান্না আর আমার আলু সেদ্ধ দিয়ে এক বেলার উদরপূর্তি হবে। ইতিমধ্যে একটু পরে পরেই ছুটে যাচ্ছি তাঁর শোবার ঘরে। খবরাখবর নিচ্ছি। নিজের সিদ্ধান্ত আমার সব ভয় ভীতিকে যেন দূরে সরিয়ে দিয়েছে। এত কাছের লোকটিকে এভাবে এক লহমায় দূরে সরিয়ে দিতে পারি না। আমার শোবার ঘর হয়েই বাথরুমে যাবার রাস্তা। সুতরাং তিনিও বাধ্য হয়েই এদিকে আসছেন। আমার পাশ দিয়েই ঢুকছেন বাথরুমে। আমিও তাঁর কক্ষ পেরিয়েই আসা যাওয়া করছি রান্নাঘরে। এভাবেই রাত শেষ হলো। মাঝে মাঝেই চিন্তা এসে আচ্ছন্ন করে দেয় অন্তরাত্মা। শ্যাম রাখি না কূল ? দোটানায় অস্থির। পরদিন তাঁর শারীরিক অবস্থা আরোও একটু খারাপ হলো। কিছুই কমলো না। জ্বর, কাশি আরোও একটু বাড়লো। আমার মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ার উপক্রম। এভাবে তাঁকে, সুহৃদ সুজনটিকে রেখে পালিয়ে যাইই বা কী করে আর এভাবে নিশ্চিত সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচিই বা কী করে ? ইতিমধ্যে তো প্রায় ২৪ ঘন্টা পেরিয়ে গেছে। সত্যি সত্যি শারীরিক না কি শুধুই মানসিক চিন্তার ফলে আমার মনে হয় আমারও এই মুহূর্তে একটা জ্বর জ্বর ভাব, শরীরে যেন একটা ব্যাথার ভাব। অর্থাৎ - ‘আমি জেনেশুনে বিষ করেছি পান’। নীরবে আক্রান্ত হচ্ছি আমি।

দ্বিতীয় দিন দুপুরে অসুস্থ শরীর নিয়েই বন্ধুর রান্না করা একটি তরকারি এবং ফ্রিজে রেখে দেওয়া  দু’দিন আগের ডাল দিয়ে দু’মুঠো খেয়ে শুয়ে আছি বিছানায়। চিন্তায় চিন্তায় মগজ তোলপাড়। ঘুম আসছে না। এমন সময় অফিসেরই আরেক সহকর্মীর ফোন এলো। খবরাখবর নিলেন। দুর্ভাগ্যবশতঃ এই সহকর্মীটিও আপাতত ঘরে আছেন অসুস্থ হয়ে ঠিক আমার বন্ধুটিরই মতো।

প্রসঙ্গটা তিনিই পাড়লেন। বললেন - আপনি মিছিমিছি এখানে ফেঁসে গেছেন। পারলে বাড়ি চলে যান।

আমতা আমতা করে আমি বললাম - কিন্তু এ অবস্থায় ওঁনাকে ছেড়ে কী করে যাই বলুন তো ? এ তো নিতান্তই অমানবিক এবং কাপুরুষতা হবে।

উনি বললেন - আপনি থেকে তো ওঁনাকে রোগের হাত থেকে বাঁচাতে পারবেন না। উলটে আপনিও আক্রান্ত হবেন। তাই বলছিলাম বাড়ি চলে যান। এবার সিদ্ধান্ত আপনার।

কিংকর্তব্যবিমূঢ় আমি উঠে গিয়ে কথাটা জানালাম বন্ধুটিকে। সজ্জন বন্ধুও একই কথা বললেন। ইতিমধ্যে আমিও আরোও অন্যান্য জায়গায় কথাবার্তা সেরে মোটামুটি রাতেই বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিলাম। মনের মধ্যে থেকে থেকেই বেজে উঠছিল একটা অব্যক্ত যন্ত্রণার অনুরণন।

বেরিয়ে রাতের বাসের টিকেট কেটে আনলাম। সাথে বন্ধুর জন্য প্রয়োজনীয় আরোও কিছু সামগ্রী। বাসন কোসন ধুয়ে, জিনিসপত্র গুছিয়ে সন্ধের আগেই গিয়ে দাঁড়ালাম বাস আস্থানে। ভাগ্যিস  একটা অটোরিক্সা পেয়ে গেছিলাম। অন্যথা দুদুটো ব্যাগ নিয়ে এতটা পথ হেঁটে আসা প্রায় অসম্ভব ছিল। তখনও কিছুটা সময় বাকি ছিল বাস ছাড়তে। চারপাশের অবস্থা ভয়াবহ। এই জমজমাট হাটবাজারের সময় রাস্তাঘাট সব জনমানবশূন্য। খবরের কাগজ কিংবা টেলিভিশন নিউজ খুললেই করোনা অতিমারীর ভয়াবহতার খবর। মারণ রোগ ছড়াচ্ছে দ্রুত। নিত্যদিন হু হু করে বেড়ে চলেছে আক্রান্ত আর মৃতের সংখ্যা। একটা নিস্তব্ধতা, একটা ভীতি যেন গ্রাস কত্রে নিয়েছে বিশ্ব চরাচর।

একা বাসটা দাঁড়িয়ে রয়েছে রাস্তার পাশে। শুধু পাশে একটা আড়াল করা জায়গায় বসে তিন চারজন লোক মিলে জমিয়ে মদ খাচ্ছে। সাথে সিগারেট। কেমন বিসদৃশ যেন লাগলো পরিবেশটি। অচিরেই বুঝতে পারলাম এরা এই বাসেরই চালক এবং সহকারীর দল। জানতাম নাইট বাসের ড্রাইভাররা নাকি এমন এক আধটু সুরা পান করেই থাকে। তাই ও নিয়ে আর মাথা ঘামানো বন্ধ করে দিলাম। বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু ভার আর নেবো এই ক্ষুদ্র মাথায় ? এখন যথা সময়ে নিরাপদে গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছাতে পারলেই হয়। ভাবলাম ঠিক ছাড়ার আগে আগেই গিয়ে উঠবো বাসে। অযথা ভিড়ের মধ্যে গিয়ে বসে লাভ নেই। আবারো একবার হাত দিয়ে ঠিক মতো মাস্কের পজিশানটা ঠিক করে নিলাম। ডাবল মাস্ক পরে অস্বস্তি হয় বেশ। কিন্তু কিছু করার নেই। পরিস্থিতির শিকার আমরা। তবে একটাই স্বস্তি। বেশ কিছুদিন আগেই সরকারি ভাবে বাসের যাত্রীসংখ্যা অর্ধেক করার নির্দেশনা জারি হয়ে গেছে। দুপুরে টিকেট কাটতে এসে তাই ভাবছিলাম ছ’শো টাকার টিকিট নির্ঘাৎ বারোশো কিংবা হাজার টাকা হবে। কিন্তু টিকিটের দাম নিলো আটশো টাকা। ভাবলাম কর্তৃপক্ষ বেশ বিবেচক। ইচ্ছে করলেই হাজার টাকা নিতে পারতো।

যাই হোক নির্ধারিত সময়ের প্রায় আধঘন্টা পর মদের আসরের পাট চুকিয়ে চালক গোষ্ঠী বাসের দিকে এগিয়ে আসতেই বুঝলাম এবার বাস ছাড়ার সময় হয়ে এসেছে। তাই আমিও আমার হাতের দুই ব্যাগ নিয়ে উঠে পড়লাম বাসে। বাসে উঠেই আমার চক্ষু চড়কগাছ। এ তো যেন অন্য এক পৃথিবী। আগের সেই চেনা পৃথিবী। বাসের ভিতরে প্রতিটি আসনে যাত্রীরা বসে রয়েছে। কোথায় সেই অর্ধেক যাত্রীর দির্দেশনা ? আর কী আশ্চর্য - তাকিয়ে দেখলাম আমাকে ছাড়া প্রায় প্রত্যেক জন যাত্রীই হলো ১৮ থেকে ২৫ এর তরুণ যুবকরা। সবাই এক বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের। শুধু ভাষা শুনেই এদের চোখ বুজে শনাক্ত করা যায়। বছরের পর বছর ধরে এ আমার নিত্য অভিজ্ঞতা। ইদানীং তা বেড়ে গেছে অস্বাভাবিক হারে। দলে দলে এরা আসা যাওয়া করে। প্রতিটি বাস, ট্রেনে এরাই সংখ্যাগুরু যাত্রী। ভালো করে তাকালাম। মাত্র দু’জন যাত্রী দেখলাম একটু বেশি বয়সের। তরুণ তুর্কীরা সব খোশ গল্পে মত্ত। যেন রঙ্গ রসের আসর জমেছে। চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার মূল কারণ হলো এই ছেলে ছোকরাদের কারোরই মাস্ক ফাস্কের কোনও বালাই নেই। কয়েকজনের থুতনির নিচে এবং কয়েকজনের গলায় ঝুলছে মলিন মাস্ক। বোধ করি করোনার দ্বিতীয় ঢেউও সামলাচ্ছে এই একমেবাদ্বিতীয়ম মাস্ক। বুঝলাম কিছু বলে লাভ নেই। কারণ আমি নিতান্তই এক ভীত, কাপুরুষ অড মেন আউট। জানালার পাশে বসে তাই চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে থেকে কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনায় মরতে থাকি। সাধারণ পরিস্থিতিতে কী হতো ? বাইরে যাওয়ার নির্ধারিত কার্যক্রম বাদ দিতাম সহকর্মী, একত্রবাসের বন্ধুটির এমন শরীর খারাপের দিনে আর আজ শুধু তাঁর ওই শরীর খারাপের জেরেই যেন আমি পালিয়ে এসেছি তাঁকে একলা ফেলে রেখে। হায় রে স্বার্থপরতা, হায় রে মানবিকতা। কথায় আছে আপনি বাঁচলে বাপের নাম। আজ তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এই অধম আমি। ভেতরে ভেতরে অনুশোচনায় বিদ্ধ হচ্ছিলাম নিরন্তর।  

একদিকে এমনি সব মানসিক দ্বন্দের টানাপোড়েনে আমি বিধ্বস্ত আর অন্য দিকে বাসের ভেতরের কার্যকলাপ দেখে যুগপৎ স্তম্ভিত। তরুণ তুর্কীরা যেন তুর্কী নাচনে মগ্ন। পুলিশ চেকিং আসলেই গলার মাস্ক মুখে টেনে নিচ্ছে আর চেকিং পেরোলেই মাস্ক নামিয়ে একে অপরের সাথে গলাগলি করে খোশগল্পে মত্ত হয়ে পড়ছে। মাঝে মাঝে অন্য সিট থেকে উঠে এসে একসাথে তিনজন শরীরে শরীর মিশিয়ে মুখের উপর মুখ নিয়ে কত না হাসি ঠাট্টার গল্প। হায় রে সামাজিক দূরত্ব। সব যেন এক প্রহসন। দেখছি আর ওদিকে ডাবল মাস্কের টানে দুই কানের উপরটা ব্যাথায় টনটন করছে আমার। কী অসাধারণ বৈপরীত্য।

এমনি অবস্থায় সারা রাত ঠায় বসে থেকে গভীর রাত আড়াইটায় পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে। এত রাতে কী করে ঘরে যাব ভেবে বসে রইলাম বাস আস্থানেই। সেখানে রাতের গভীরে যেন আরেক পৃথিবী উন্মোচিত আমার অবাক দু’চোখের সামনে। এই অভাবনীয় দৃশ্যাবলি এর আগে কোনওদিন আমি এভাবে সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পাইনি। একের পর এক দৃশ্যপটে ভাবনার অতলে তলিয়ে যাচ্ছি যেন। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে পৌঁছাচ্ছে একের পর এক বাস। বাস এসে থামতেই দক্ষ শিকারির মতো নবাগত যাত্রীদের দিকে ছুটে যাচ্ছে অটো রিক্সা, ভ্যান চালকের দল। রাত তিনটেতেও লোকে লোকারণ্য অঞ্চল। আস্থানের বাইরে সারি সারি ভ্যান রিক্সা, অটো রিক্সা, স্থানীয় স্বল্প দূরত্বের বাস। দিন বা রাতের কোনও ফারাকই নেই এখানে। আমি একটি রেলিং-এর দেয়ালে আটোসাঁটো হয়ে বসে আছি। সঙ্গের ব্যাগদু’টোর দিকে যেন সবার শ্যেনদৃষ্টি। একটু বাদে বাদেই কেউ না কেউ এসে জিজ্ঞেস করছে - দাদা কোথায় যাবেন ? এখন যাবো না ভাই - বলে এড়িয়ে যাচ্ছি তাঁদের। কারণ আমি যেখানেই যাবো বলবো সেখানেই ওরা নিয়ে যেতে চাইবে। এদের দেখে কিছুটা হলেও ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো মন। এভাবে সারা রাত না ঘুমিয়ে শুধু জীবিকার খাতিরে এরা কত যে কষ্ট করছে। আমাদের মতো আপাতঃ স্বচ্ছল নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষেরা তো এই সময়ে নিজের সুখের ঘরে নাক ডাকিয়ে গভীর ঘুমেই মগ্ন থাকি অন্য দিন। আর ঘুম থেকে উঠার পর থেকেই কল্পনায় কাহিনি গড়ে বিনি পয়সার উপদেশ বিলি করে বেড়াই দিনভর।

এর বাইরেও চলছিল আরোও নানারকম ঘটনাবলি। আমার মনে হচ্ছিল এ যেন আজকের ভারতবর্ষের এক রেপ্লিকা আমি প্রত্যক্ষ করছি। বাস যেগুলো আসছে তার অধিকাংশ থেকেই নামছে একগাদা তরুণ। পরনে ছেঁড়া জিন্স, পায়ে চপ্পল কিংবা প্লাস্টিকের স্যাণ্ডাল আর পেছনে একটি ব্যাগ। প্রত্যেকের একই বয়স, একই ভাষা, একই রকম উচ্ছল চলন বলন - যেমনটি প্রত্যক্ষ করেছিলাম আমি আসা বাসটিতে। কাতারে কাতারে এরা এসে নামছে এবং শিকারিদের তৎপরতায় চলে যাচ্ছে পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। এই গভীর রাতেও। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলাম যে শিকারি এবং শিকার কারোও মুখেই মাস্ক নেই। বিন্দাস সব। দেশে কোনও রোগ শোক আছে বলে অন্তত মনে হচ্ছে না এদের দেখে। গায়ে গা লাগিয়ে চলছে, বসছে, দাঁড়াচ্ছে। মাঝে মাঝে ডাবল মাস্ক লাগানো আমার দিকে অবাক হয়ে তাকাচ্ছে। নিজেদের মধ্যে অনর্গল কথ্য ভাষায় ইয়ার্কি, ফাজলামি অর্থাৎ বয়সজনোচিত ব্যবহারে কেউ কেউ কাটিয়ে দিচ্ছে কিছুটা সময়। মাঝে মাঝে হঠাৎ করে এই রাতেও এসে হাজির হয় পুলিশ (কত কষ্টে এভাবে রাতভর ডিউটি করে এঁরা সমাজকে সুস্থ রাখার কাজে সঁপে দেয় নিজেকে)। মুহূর্তে রটে যায় সেই বার্তা। সবার মুখে উঠে আসে মাস্ক। পুলিশের চোখে ভেসে ওঠে এক আলাদা ভারতবর্ষ। আমার দেখা ভারতবর্ষের সাথে যার আশমান জমিন ফারাক। আমার চোখে গেঁথে যায় এক উশৃঙ্খল ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাদের হাত ধরে বেড়েই চলেছে দেশের অসুখ। কাতারে কাতারে মানুষ অসুস্থ হচ্ছে একমাত্র নিজেদেরই ভুলে। আমরা সরকারি নির্দেশ মানবো না, কালোবাজারি করবো চুটিয়ে আর দোষারোপ করবো সরকারের। ভিড় জমছে হাসপাতালে হাসপাতালে তাদেরই মাধ্যমে আর আমরা রাজনৈতিক স্বার্থ পূরণে পরিকাঠামোর অভাবের দোহাই দিয়ে কুবুদ্ধি ছড়াই দেশে। আমরা সেই গ্রামের গিরীন্দ্রেরই বংশধর যে সবাই। অসহিষ্ণু গিরীন্দ্রের মতোই পায়ের তলার মাটির খোঁজে বিষবাস্প ছড়াতে কোনও ছলাকলাই বাদ দিই না আমরা।

 

###

 

১৫০ কোটি জনগণের দেশ আমাদের। ৩৪ কোটির আমেরিকা, ৬ কোটির ইটালি, ৭ কোটির ব্রিটেন এবং ৭ কোটির ফ্রান্সের মতো উন্নত দেশও পরিকাঠামোর অভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। পড়েছিল কারণ করোনার আগমন অভাবনীয় ছিল। অন্যথা যথেষ্ট পোক্ত ছিল পরিকাঠামো। ওদের দুর্দশা দেখে এবং করোনার প্রথম ঢেউ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের দেশেও যে কিছু পরিকাঠামোর উন্নয়ন হয়নি তা কিন্তু নয়। কিন্তু বুঝতে হবে যে এই পোড়া দেশে হু হু করে বৃদ্ধি পাওয়া অশিক্ষিত, অবুঝ জনসংখ্যার নিরিখে কোনও পরিকাঠামোই এমন সুনামিকে রুখতে পারবে না। কখনো নয়। এছাড়া এমন তো আগে কখনো হয়নি যে অন্যান্য রোগে আক্রান্ত কোনও রোগী কোনও হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছে না শয্যার অভাবে। কিংবা কখনো কোনও রোগী মারা গেছে অক্সিজেন সিলিণ্ডারের অভাবে। অর্থাৎ কি না বারীন্দ্রের গোয়াল ঘর ঠিকই ছিল। অজানা অচেনা প্রাণীর আগমন বার্তা পাওয়া যায়নি যে আগে।

এই যে প্রতি রাতের এবং দিনেরও প্রতিটি বাসে ট্রেনে এক বিশেষ শ্রেনির অগণিত ঝাঁক ঝাঁক ছেলেরা কোনরকম সরকারি বিধি নিষেধের তোয়াক্কা না করে ছড়িয়ে দিচ্ছে মারণ রোগের ভাইরাস কে তার দায়ভার নেবে ? যুগ যুগ ধরে টিকাকরণের বিরোধিতা করে আসা এবং এবারও টিকা না লওয়ার পক্ষে সওয়াল করা এইসব দেশবিরোধীদের কথা কেউ কি ভেবে থাকেন - হে মহান দেশের মহান কুবুদ্ধিজীবীবৃন্দ ? নাগাড়ে সন্তান উৎপাদন করে দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে উৎসাহ দানের পক্ষে যাদের বক্তব্য হলো - সবই উপরওয়ালার মর্জি তাদের বোধোদয় ঘটাতে কেউ কি এগিয়ে আসবেন বা এগিয়ে আসার সাহস করে উঠতে পারবেন ? মোদ্দা উত্তর - না। অথচ ব্যতিক্রমও কি নেই ? নিশ্চয়ই আছে। অথচ জড়ের সন্ধানে কেউ এগোবেন না। সবাই চার দেয়ালে বসে দেশোদ্ধার করবেন শুধু। যখন দেশের এই বিপদের দিনে একতার খুবই প্রয়োজন তখন এই দুর্ভাগা দেশেই এটা সম্ভব যে দেশনায়কের আহ্বানকে মিথ্যের রঙ চড়িয়ে সমালোচনায় মেতে ওঠা। বিকৃত এদের মানসিকতা। এরা ‘রাজা তোমার কাপড় কোথায়’ - বলতে খুব উল্লসিত হয় অথচ জনসমক্ষে নিজেদের উলঙ্গ চেহারার প্রতিকৃতি দেখার মতো মানসিকতা এদের নেই।

আজ দেশ জুড়ে যখন সরকারি স্তরে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে স্বাস্থ্য পরিষেবাকে উন্নত করার এবং এই অতিমারী থেকে দেশকে বাঁচানোর তখন কোথায় সবাই একজোট হয়ে একে অন্যের পাশে থাকার চেষ্টা করবো তা নয় এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে গদি হাতানোর অপচেষ্টায় আমরা রত হয়েছি। অসহিষ্ণুতা চরমে পৌঁছেছে। গদিতে বসার তীব্র আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হওয়ার কোনও আশু আলো দেখতে না পেয়ে এখন কোটি টাকা ব্যয় করে আই টি সেলের মাধ্যমে মিথ্যে বেসাতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে আপামর জনগনের কাছে। স্বল্পশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত এবং অশিক্ষিত অগণিত ভারতবাসীর মাথায় সুপরিকল্পিত ভাবে ঢেলে দেওয়া হচ্ছে বিষ। বিরোধিতার কী অপূর্ব নিদর্শন।

আবোল তাবোল প্রচারে মত্ত হয়ে পড়েছেন অসহিষ্ণু কুবুদ্ধিজীবীদের দল। কত উদাহরণ। বলে শেষ করার নয়। যুক্তি, বুদ্ধির ধার দিয়েও এরা যান না। মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে হাতিয়ার করে সামাজিক মাধ্যমে বিষ ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন এরা। হঠাৎ করে মারণ রোগ এলো, অক্সিজেন এর ঘাটতি দেখা দিলো। একেবারেই অকল্পনীয় ঘটনা। যখনই ব্যাপারটা অনুভূত হলো সঙ্গে সঙ্গেই বিদেশ থেকে অক্সিজেন প্ল্যান্ট আনার ব্যবস্থা হতে লাগলো এবং অক্সিজেন সিলিণ্ডারের উপর ধার্য করা কর অনেকটাই কমিয়ে দেওয়া হলো যাতে সহজে উপলব্ধ হয়। এতে জ্বলে গিয়ে একজন লিখলেন - অক্সিজেন সিলিণ্ডারের উপর থেকে কর কমিয়ে মুদী (মোদী নয়) কোনও পুণ্য করেননি, কর চাপিয়ে আগেই পাপ করেছিলেন। বুঝুন ঠ্যালা। এই ব্যক্তি কিন্তু আগে কোনওদিন এসব পাপ পুণ্য নিয়ে একেবারেই মাথা ঘামাননি। ঘামানোর কথাও নয়, কারণ হাসপাতালে হাসপাতালে অবিক্রিত অক্সিজেন সিলিণ্ডারের পাহাড় জমে রয়েছিল। যেই না পরিস্থিতি বিগড়েছে অমনি চিল চিৎকার শুরু - অক্সিজেন নেই কেন - জবাব দাও সরকার, হাসপাতালে বেড নেই কেন - জবাব দাও সরকার। বলি জবাবটা কেন সরকারকেই দিতে হবে ? নিজে জানেন না ? কাড়ি কাড়ি বাচ্চা পয়দা করে ছেড়ে দেবেন ধর্মের নামে দেশের বোঝা বানিয়ে আর জবাব চাইবেন সরকার থেকে ? টিকা এলে টিকা নেবেন না, পরিবার পরিকল্পনার ধার না ধেরে, প্রজন্মকে শিক্ষিত করে না তুলে বসিয়ে দেবেন সরকার বিরোধীদের মেগা শোতে, কা’র বিরুদ্ধে ধরনায়। বলি কার কোন বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছে কা’ ? এক নামজাদা (পড়ুন কুনামজাদা বুদ্ধিজীবী যিনি আবার এসব উল্টো পথের কারবার করে করে দেশ জুড়ে অনেকটাই দুর্নাম কুড়োতে সক্ষম হয়েছেন) মহিলা আবার দেখলাম নতুন স্লোগান জুড়েছেন - গদি ছাড়ো রাজা। এবার আর কোনও যুক্তির ধারেকাছে না গিয়ে সোজাসুজি আবদার - গদি ছাড়ো। এ যেন মামা বাড়ির আবদার। কেন গো দিদিভাই ? দেশের মানুষ কি তোমার কথায় রাজাকে গদিতে বসিয়েছিল ? নাকি রাজা উড়ে এসে জুড়ে বসেছিল ? তোমাদের বস্তাপচা আদর্শ সহ সবাইকে কুপোকাৎ করে একচেটিয়া অধিকার নিয়েই রাজা গদিতে বসেছিল। আর দেশের মানুষও এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মতো একটি মানুষকেই পেয়েছিল যাঁকে রাজার গদিতে অভিষিক্ত করা যায়। তোমাদের হাতে দেশ ছাড়লে তো এতদিনে মানচিত্র থেকে মুছেই যেত দেশের নাম। কেউই যে আর বেঁচে থাকতো না আজ। আজ আমাদের রাজারই নেতৃত্বে সারা বিশ্বের মধ্যে অতিমারীর প্রতিষেধকের মাধ্যমে দেশের নাম উজ্জ্বল হয়েছে। সারা বিশ্বে ধন্যবাদার্হ হচ্ছি আমরা। নিজেদের সহ মানবতা তথা বিশ্বজনীন নিয়মাবলির সূত্রে বেশ কিছু দেশেও আমরা বাড়িয়ে দিয়েছি সাহায্যের হাত। সেই সূত্রেই আজ প্রয়োজনের সময় সারা বিশ্ব আমাদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে। দেশে আছে এক গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল। নিজের দলেই যার স্থান পাকা নয়। যেখানে যায় হেরে ভুত হয়ে ফেরে। সেও কিছু না জেনে না বুঝে টুইট করে রাজার বিরুদ্ধে। সত্তর বছরের রাজাগিরি স্বভাব কি আর সহজে যায় ? তার উপর পায়ের নিচে মাটি তো আর নেই। ভবিষ্যৎ বলতে কিছু নেই আর। এমতাবস্থায় আবোলতাবোল বলাটাই তো স্বাভাবিক। তবে তোমরা সবাই হলে গিয়ে সুযোগসন্ধানীর দল। তোমাদের ঠুলি পরা চোখে আর অসহিষ্ণু মননে মহৎ কাজ কিছুই ধরা দেবে না গো দিদিভাই। তোমাদের শুধু গদি চাই। তবে এভাবে হয় না। নিজের পায়ে নিজেরাই কুড়ুল মেরে যে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছো দেশ বিদেশ থেকে সে হুঁশ আছে ? উল্টোপথের রাজনীতি ছেড়ে সোজা পথের রাজনীতি করো। দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াও। কটাক্ষ করে তোমরা যাঁদের ভক্ত বলো তাঁরাই কিন্তু এই দুর্দিনে দেশের মানুষের, দেশের সরকারের পাশে আছে। জানো তো, যে ভক্ত সেই কিন্তু ভগবানকে পায়, সে তোমরা হিরণ্যকশিপুর দল আর কবেই বা ভক্ত প্রহ্লাদকে চিনতে পেরেছো বলো ? চার দেয়ালের মধ্যে থেকে বিপ্লবের বুলি আওড়ানো আর ১৫০ কোটির ভারতবর্ষকে সামলানো যে এক কথা নয় সে জ্ঞানটুকু তো তোমাদের থাকার কথাও নয়।

তবে সুযোগ তোমরাও পাবে দেখে নিও। একদিন এমনিই আসবে যখন প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার জেরে পরিবর্তন হবে সরকারের। একটু ধৈর্য ধরো। দেখছো না আমাদেরই এই রাজ্যে কেমন চোরাস্রোতে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা এসে জায়গা করেছে সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে ? নাহলে করোনার প্রথম ঢেউকে অসাধারণ তৎপরতার সঙ্গে মোকাবিলা করার পরেও শাসক দলের আসন সংখ্যা আগের বারের চেয়ে বাড়লো কই ? এভাবেই আসে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা। তাই অপেক্ষায় থাকো হে শ্যাম, যদু, মধুরা। শুধু একটাই চিন্তা - কে ধরবে হাল সেদিন ? এই বিশাল দেশটাকে সঠিক দিশায় এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো উপযুক্ত নেতা কি কেউ আছেন ? নাকি সেই মিথাচারী, অশিক্ষিত, অসহিষ্ণু, বিত্তের নেশায় মদগর্ব এবং সর্বোপরি ভ্রাতৃবিরোধী গিরীন্দ্রই হবে গ্রামের মোড়ল ?

 

- - - - - - - - - - - - - - -

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত স্মরণ সংখ্যা ‘আলোহাওয়া’

একটি লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটপত্রিকা হচ্ছে সমাজের সাহিত্যদর্পণ । শুধুই সমকালিক নয়। যুগান্তরের ভাষাসাহিত্য ও তার যুগন্ধর স্রষ্টাদের সঙ্গে সমকালকে পরিচিত করে দেওয়ার এক প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম। আর একের পর এক এই লক্ষ্যেই উৎকৃষ্টতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি শহর থেকে প্রকাশিত ‘ সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক ’ পত্রিকা ‘ আলোহাওয়া ’ । রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার ১৯তম সংখ্যা - ২৫তম বর্ষ , পৌষ ১৪৩২ - ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যা । কবি জিতেন্দ্র নাথ সম্পাদিত এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যিক ‘ তুষারকান্তি নাথ স্মরণ সংখ্যা ’ হিসেবে । তুষারকান্তি নাথ এমন একজন সাহিত্যিক যাঁকে আখ্যায়িত করা যায় একজন সার্বিক সাহিত্যিক হিসেবে। ধারে ও ভারে তাঁর সৃষ্টি শুধু বরাক উপত্যকাতেই নয় এর বাইরেও সমাদৃত। তাঁর লেখনী রত্নপ্রসবা। পক্ষান্তরে এটাও বলা যায় যে ঘরে বাইরে কিছু স্বীকৃতি , কিছু প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকলেও তাঁর লেখালেখি ও নানাবিধ সৃষ্টিকর্মের গভীরতার মূল্যায়ন যতটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল ততটা কিন্তু হয়নি। আসলে প্রান্তিকতা সততই লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের পরিচিতির পথে এক বৃহৎ অন্তরা...

প্রখর গরজ ও শ্রদ্ধায় নিবেদিত একটি ‘সুকান্ত সংখ্যা’ - শতদল

হাতে নিলে আর পাঁচটা নিয়মিত সংখ্যা পত্রিকার মতো মনে হলেও উত্তর ত্রিপুরার চুড়াইবাড়ী থেকে কবি, লেখক রতন চন্দ সম্পাদিত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ‘শতদল’ পত্রিকার সম্প্রতি প্রকাশিত ২৯তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, বৈশাখ ১৪৩৩, মে-২০২৬ (কবি সুকান্ত জন্মশতবর্ষ সংখ্যা) সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রমী। সেই মাত্র ৪২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক সংস্করণ হলেও প্রচ্ছদ থেকে শেষ পৃষ্ঠা অবধি যতন, গরজ ও উৎকর্ষের এক সম্ভার বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না মোটেও। বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র স্থান ধরে আছেন অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর সময়কাল থেকে আজ অবধি এবং আগত-অনাগত চিরকালীন এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী এই কবি মূলত একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেই সাহিত্যবিশ্বে পরিচিত হলেও তাঁর কবিতায় এর বাইরেও যে রয়ে গেছে বহুমাত্রিক এক বোধ, ভাষ্য - বোধ করি তার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি আজও। তবে যতই তাঁকে নিয়ে চর্চা হবে ততই এক এক করে খুলবে বিস্ময়ের ঝাঁপি এ কথা অনস্বীকার্য। এবং তারই এক নির্মোহ প্রয়াস ও প্রকাশ আলোচ্য সংখ্যাটি। সুসজ্জিত কবি-প্রতিকৃতিযুক্ত একটি নান্দনিক প্রচ্ছদ - সজ্জায়, বর্ণ সংস্থাপনে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য পাঠকের। সৌজন্যে মুদ...