Skip to main content

'করুণাঞ্জলি' - একটি আন্তরিক শ্রদ্ধাঞ্জলি

“তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি
বুঝতে নারি কখন তুমি দাও যে ফাঁকি।
ফুলের মালা, দীপের আলো, ধুপের ধোঁয়ার
পিছন হতে পাইনে সুযোগ চরণ ছোঁয়ার
স্তবের বাণীর আড়াল টানি তোমায় ঢাকি
দেখবো বলে এই আয়োজন মিথ্যা রাখি
আছে তো মোর তৃষ্ণাকাতর আপন আঁখি”।
বরাকের বাসিন্দা কল্লোল চৌধুরী বর্তমান সময়ে বাংলা সাহিত্য জগতে এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। তাঁর সাহিত্য চর্চা যদিও এখন আর শুধু বাংলা ভাষাতেই সীমাবদ্ধ নয়। ইংরেজি সাহিত্যেও তাঁর পদচারণা উল্লেখের দাবি রাখে। বিশ্ব কবি সম্মেলনে তাঁর এবং তাঁর একাধিক কবিতার গর্বিত উপস্থিতি আমাদের এই অঞ্চলটিকে এক আলাদা মর্যাদায় বিভূষিত করেছে। একাধারে তিনি কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও গবেষক। দেশ বিদেশের অগণিত সংকলনে স্থান পেয়েছে তাঁর সাহিত্যকৃতি।
কথায় আছে ‘বৃক্ষ ফলেন পরিচয়তে’। কবি, সাহিত্যিক কল্লোল চৌধুরীর এই কৃতিত্ব তাঁরই পিতৃসত্তার অকৃপণ স্রোতধারা। হাইলাকান্দি শহরের শিক্ষা, সাহিত্যে সমৃদ্ধ গ্রাম বোয়ালিপারের সুসন্তান কল্লোল চৌধুরীর সম্পাদনায় অতি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে প্রধান শিক্ষক করুণাকান্ত চৌধুরী স্মারকগ্রন্থ - ‘করুণাঞ্জলি’।
ভূমিকায় পিতৃতর্পণ করেছেন কল্লোল চৌধুরী। তার আগে ভেতরের প্রচ্ছদে দু’টি লাইন - “শিক্ষকতাই ছিল তোমার জীবনব্রত শিক্ষকতায় প্রাণ করেছ দান, তুমি জেগে আছো সবার হৃদয়ে তুমি আজও ভাস্বর আজও অম্লান”। প্রচ্ছদ ছবিটি যদিও সাজিয়েছেন শক্তিকুমার সিংহ কিন্তু গ্রন্থের শুরুতেই স্বর্গীয় করুণাকান্তের একটি স্কেচ এঁকেছেন দীপক সরকার। কল্লোল চৌধুরী মহাশয় যদিও গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর মা রুনু চৌধুরীকে কিন্তু শোকের কথা এই যে এই শ্রদ্ধাঞ্জলি গ্রন্থটি প্রকাশের পূর্বেই প্রয়াত হলেন তিনিও। এ নিশ্চিতই এক অপার শোকগাথা।
স্মৃতিগ্রন্থের প্রথমেই প্রয়াত করুণাকান্ত চৌধুরীর সংক্ষিপ্ত জীবনীর মাধ্যমে পাঠকের সাথে এই মহান শিক্ষাব্রতীর সম্যক পরিচিতি ঘটে। এর পর একের পর এক স্মৃতি চারণার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের উজ্জ্বল ব্যক্তিরা করুণাকান্তের জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে ব্যক্ত করেছেন আপন অনুভব। প্রয়াত গোবিন্দ দত্ত যেমন উদ্ভাসিত করেছেন করুণাকান্তের সাহিত্য প্রীতির অনুভব তেমনি সুলেখিকা অঞ্জু এন্দো, বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক তীর্থঙ্কর দাশ পুরকায়স্থ, প্রয়াত ব্রজেন্দ্র কুমার সিংহ, ডঃ ঊষারঞ্জন ভট্টাচার্য, আশুতোষ দাস প্রমুখ বিদ্বজনের স্মৃতিচারণায় পাঠকের দরবারে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে কৃতি শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষা অন্ত প্রাণ করুণাকান্ত চৌধুরীর উজ্জ্বল জীবনচরিত।
এছাড়াও সমাজের বিভিন্ন বর্গের মানুষ, সহকর্মী, আত্মীয়, ছাত্র - অনেকেই কলম ধরেছেন স্মৃতিচারণে। তাঁরা হলেন ডাঃ মনুজেন্দ্র শ্যাম, রণজিৎ কুমার বিশ্বাস, প্রাক্তন জনপ্রতিনিধি দীপক ভট্টাচার্য, শচীন্দ্র কুমার দেব, হরনাথ চক্রবর্তী, দিলীপ কুমার গোস্বামী, প্রশান্তসাধন চৌধুরী, বাদল দে চৌধুরী, আতনবাবু সিংহ, প্রমোদ চন্দ্র নাথ, জীবন কে দত্তগুপ্ত, বাহার উদ্দিন, মাশুক আহমেদ মজুমদার, সন্দীপ চৌধুরী এবং  বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য। এর বাইরে ইংরেজিতেও রয়েছে স্মৃতিচারণ। দিলীপ ভট্টাচার্যের স্মৃতিতে যেমন ধরা রয়েছে স্বর্গীয় করুণাকান্তের পূর্ণাঙ্গ জীবনছবি তেমনি বিশিষ্ট সব লেখকদের মধ্যে রয়েছেন প্রোফেসর কমলেন্দু ভট্টাচার্য, শিক্ষা বিভাগের প্রাক্তন ডাইরেক্টর হরেকৃষ্ণ গায়ন, প্রবীর চন্দ্র ভট্টাচার্য, কল্যাণময় নাথ এবং ডঃ আনোয়ারুদ্দিন চৌধুরী। গ্রন্থের শেষাংষে রয়েছে সরকারি পুরস্কারে ভূষিত আলোচ্য শিক্ষাবিদ প্রয়াত চৌধুরীর সারা জীবনের কৃতিত্বের পরিচায়ক বেশ কিছু প্রামান্য দলিল, শংসাপত্র আদির ছবি যা শুধু অমূল্যই নয় স্মৃতিপটে সযত্নে সংরক্ষিত রাখার মতো কিছু গর্বগাথা।
প্রতিজন লেখকের লেখনীর সূত্র ধরে হাইলাকান্দির বিখ্যাত সরকারি ভি এম হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক প্রয়াত করুণারঞ্জনের সার্বিক শুদ্ধসত্ব চরিত্রটি প্রাঞ্জল ভাবে প্রকাশিত হয়েছে পাঠকের কাছে। শিক্ষাকে যিনি জীবনের এক ও অদ্বিতীয় ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং তার জন্য অনেক ত্যাগও স্বীকার করেছিলেন তাঁর মৃত্যুটিও হয় আকস্মিক ভাবে বিদ্যালয়ে তাঁরই নির্দিষ্ট কক্ষে কর্মরত অবস্থায়। তিনি শুধু মাত্র ছাত্র গড়ারই কারিগর ছিলেন না, ছিলেন শিক্ষক গড়ারও কারিগর। এবং প্রাসঙ্গিক ভাবেই আপাদমস্তক এক বিদ্বান ব্যক্তির জীবনাবসান ঘটে বিদ্যায়তনেরই মধ্যে।
এই স্মারক গ্রন্থটি সংকলন করতে গিয়ে সম্পাদক, সংকলক কল্লোল চৌধুরীর নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পিতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের এক উৎকৃষ্ট নিদর্শন হয়ে রইল এই স্মৃতি স্মারক গ্রন্থটি। এবং স্বভাবতই আজকের পথভ্রষ্ট প্রজন্ম ও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে অবশ্যই এক শিক্ষণীয় আয়োজন।
 “ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচি
ন্নায়ং ভূত্বাহভবিতা বা না ভূয়ঃ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরানো
ন হন্যতে হন্যমান শরীরে।”
 
‘করুণাঞ্জলি’
মূল্য - ২০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৮৫৯৫২৮৭৯৮
- - - - - - - - - -
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।


Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত স্মরণ সংখ্যা ‘আলোহাওয়া’

একটি লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটপত্রিকা হচ্ছে সমাজের সাহিত্যদর্পণ । শুধুই সমকালিক নয়। যুগান্তরের ভাষাসাহিত্য ও তার যুগন্ধর স্রষ্টাদের সঙ্গে সমকালকে পরিচিত করে দেওয়ার এক প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম। আর একের পর এক এই লক্ষ্যেই উৎকৃষ্টতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি শহর থেকে প্রকাশিত ‘ সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক ’ পত্রিকা ‘ আলোহাওয়া ’ । রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার ১৯তম সংখ্যা - ২৫তম বর্ষ , পৌষ ১৪৩২ - ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যা । কবি জিতেন্দ্র নাথ সম্পাদিত এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যিক ‘ তুষারকান্তি নাথ স্মরণ সংখ্যা ’ হিসেবে । তুষারকান্তি নাথ এমন একজন সাহিত্যিক যাঁকে আখ্যায়িত করা যায় একজন সার্বিক সাহিত্যিক হিসেবে। ধারে ও ভারে তাঁর সৃষ্টি শুধু বরাক উপত্যকাতেই নয় এর বাইরেও সমাদৃত। তাঁর লেখনী রত্নপ্রসবা। পক্ষান্তরে এটাও বলা যায় যে ঘরে বাইরে কিছু স্বীকৃতি , কিছু প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকলেও তাঁর লেখালেখি ও নানাবিধ সৃষ্টিকর্মের গভীরতার মূল্যায়ন যতটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল ততটা কিন্তু হয়নি। আসলে প্রান্তিকতা সততই লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের পরিচিতির পথে এক বৃহৎ অন্তরা...

প্রখর গরজ ও শ্রদ্ধায় নিবেদিত একটি ‘সুকান্ত সংখ্যা’ - শতদল

হাতে নিলে আর পাঁচটা নিয়মিত সংখ্যা পত্রিকার মতো মনে হলেও উত্তর ত্রিপুরার চুড়াইবাড়ী থেকে কবি, লেখক রতন চন্দ সম্পাদিত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ‘শতদল’ পত্রিকার সম্প্রতি প্রকাশিত ২৯তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, বৈশাখ ১৪৩৩, মে-২০২৬ (কবি সুকান্ত জন্মশতবর্ষ সংখ্যা) সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রমী। সেই মাত্র ৪২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক সংস্করণ হলেও প্রচ্ছদ থেকে শেষ পৃষ্ঠা অবধি যতন, গরজ ও উৎকর্ষের এক সম্ভার বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না মোটেও। বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র স্থান ধরে আছেন অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর সময়কাল থেকে আজ অবধি এবং আগত-অনাগত চিরকালীন এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী এই কবি মূলত একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেই সাহিত্যবিশ্বে পরিচিত হলেও তাঁর কবিতায় এর বাইরেও যে রয়ে গেছে বহুমাত্রিক এক বোধ, ভাষ্য - বোধ করি তার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি আজও। তবে যতই তাঁকে নিয়ে চর্চা হবে ততই এক এক করে খুলবে বিস্ময়ের ঝাঁপি এ কথা অনস্বীকার্য। এবং তারই এক নির্মোহ প্রয়াস ও প্রকাশ আলোচ্য সংখ্যাটি। সুসজ্জিত কবি-প্রতিকৃতিযুক্ত একটি নান্দনিক প্রচ্ছদ - সজ্জায়, বর্ণ সংস্থাপনে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য পাঠকের। সৌজন্যে মুদ...