রাতের
মতো গভীর আঁধার যেন দিনের আলোকে ঢেকে রেখেছে চিরতরে। সেই
সকাল থেকে নিকষ কালো আঁধারে ছেয়ে আছে চরাচর। আসন্ন
তাণ্ডবের আশংকায় মন খারাপের সাথে ভ্যাপসা গরমের অস্বস্তি লেগেই আছে শরীর জুড়ে। এই মুহূর্তে
জোর এক পশলা বৃষ্টিই পারে শুধু এই আঁধার থেকে মুক্তির পথ দেখাতে। ঘরের
ভেতরে গুমোট গরমে নাজেহাল অনন্ত গায়ে থাকা একমাত্র গেঞ্জিটাও খুলে ফেলে এক সময়। বুকের
কালো রোমশ ছবিটা আজ তেমন করে আর চোখে পড়ছে না। সব কালো
যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। অস্বস্তির
পারদ চড়তে চড়তে এক অসহ্যকর পর্যায়ে পৌঁছে যেতেই উদোম গায়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে অনন্ত। খোলা
আকাশটিও যেন আজ কালো শামিয়ানায় ঢাকা। অনন্তের
চোখে গোটা চরাচর যেন এক বদ্ধ কারাগার। সেখান
থেকে বেরিয়ে আসার সব পথ বুঝি আজ বন্ধ।
‘বুঝলি অনন্ত, এ যাত্রায় তোর নামটা আর লিস্টে শামিল করা
গেল না রে। আর ক’টা দিন সবুর কর। কিছুদিনের
মধ্যেই আরোও কিছু লোক নেওয়া হবে। তোর
ব্যাপারটা আমি দেখছি। চিন্তা করিস
না। কিছু একটা হবেই এবার। শুধু
ধৈর্য ধরে সংগঠনের কাজটা চালিয়ে যা আগের মতো।’ - দয়াময় দাস পার্টি ক্যাডারের মোটামুটি মাঝারি মাপের নেতা। ক্ষমতা
আছে বটে অনেকটাই। তাই তো এত খাতিরদারি। নাহলে
এই নির্দয় দয়াময়কে কি আর এতটা সমীহ করে চলে গ্রেজুয়েট অনন্ত ?
প্রচণ্ড
ক্ষোভ আর হতাশায় একটা খিল্লি দিতে ইচ্ছে করছিল অনন্তের। কিন্তু
বরাবরের মতোই চেপে গেল বহু কষ্টে। ধুরন্ধর
দয়াময় মনে হলো ভালো করে পড়ে নিলেন অনন্তকে - ‘শুনছি তুই নাকি আর
আগের মতো মন দিয়ে কাজ করছিস না ? এভাবে তো চলবে না। কিছু
পেতে হলে কিছু তো দিতেই হবে বাপু। তা আমরা
তো আর তোর কাছ থেকে টাকাপয়সা চাইছি না। কিন্তু
পার্টির কাজে ঢিলেমি দিলে আর তো কোনও পথ খোলা থাকবে না সামনে। তাই
বুঝেসুঝে চল। মাস ছয়েকের মধ্যে কিছু একটা হয়ে যাবে
এটা বলতে পারি নিশ্চিত।’
অনন্ত
এবার মুখ খুললো - কিন্তু দয়াময়-দা,
বয়সটা যে পেরিয়ে যাচ্ছে -
মাঝপথে
অনন্তকে থামিয়ে পোড় খাওয়া দয়াময় তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বললেন - সে চিন্তা তোর নয়, অনন্ত। আমার
উপর ছেড়ে দে। আমরা আছি তো, নাকি ?’
দয়াময়রা
আছেন বলেই তো আশা আছে অন্তরে। কিন্তু
আজকাল কিজানি আর ভরসা পাচ্ছে না অনন্ত। মনে
ঘোর সংশয় জাগে - দয়াময়রা আছেন তো ? না
শুধু থাকার ভানই করে যাচ্ছেন ? কিন্তু আজ অবধি অনেকেরই তো চাকরিবাকরি
করে দিছেন দয়াময়-দা। একবার
তো এম এল এর সঙ্গেও অনন্তের দেখা করিয়ে দিয়েছেন। ভরসার
বাণী শোনা গেছে সেখান থেকেও। কিন্তু
সব কথার এক কথা - কাজ করে যাও, পার্টির
কাজ। বাকিটা আমরা দেখছি।
যুগ
যুগ ধরে সেই কাজটাই করে যাচ্ছে অনন্তরা। কিন্তু
এই অনন্তের ঘরের আঁধার আর কাটছে না। মা-বাবার মৃত্যুর পর দাদা, বড়দারাও আর আগের মতো যত্নআত্তি
করছেন না অনন্তের। সেটাও বিলক্ষণ
বুঝতে পারে অনন্ত। আর করবেনই বা কেন ? একটি জোয়ান ছেলে শুধু ঘরে বসে বসে দু’বেলা অন্ন ধ্বংস
করবে এ তো আর চলতে পারে না। এমনিতেই
অভাবের সংসার। একটি মাত্র দোকান আর মেজদার টুকটাক কন্ট্রাকটরি
ব্যাবসায় তো আর এতগুলো পেট চলতে পারে না ঠিকঠাক। বৌদিরা
কিংবা বাচ্চারাও চোখের সামনেই গরিবির শিকার। সব দেখে, বুঝে বুকে
এক পাহাড় আশা নিয়ে বাঁচে অনন্ত। কোনওক্রমে
একটা চাকরি জোগাড় হয়ে গেলে হাল ফিরবে এ সংসারের। সবার
মুখে হাসি ফোটাবে অনন্ত। যে করেই হোক।
হাসি
ফোটাবে আরোও একটি মুখে। সেই ছাত্র জীবন
থেকেই অনন্তের বুদ্ধিদীপ্ত চেহারার সাথে এক বুক ভালোবাসার সন্ধান পেয়ে ধরা দিয়েছিল
যে মেয়েটি সেই অনামিকা আজো অপেক্ষা করে আছে - অনন্ত প্রতীক্ষা। চেহারার জৌলুস
আজ যেন অনন্তের চোখের সামনেই হারিয়ে যাচ্ছে অনামিকার।
এই ব্যাপারটিও
মোটামুটি জানা সব মহলেই। সবখান থেকেই
মাঝে মাঝে ঘুরপথে বাক্যবাণ আসে তেড়ে। নীলকণ্ঠের
মতো তা গলায়, বুকে ধরে রাখে অনন্ত। তির্যক
কথা শুনতে হয় ঘরের অন্দরমহল থেকে। বিদ্রুপের
হাসি ছুটে আসে পার্টি অফিস থেকেও। সব শোনেও
নীরবে নিবদ্ধ থাকে অনন্তের দৃষ্টি। ভাবে
পার্টির জন্য কী না করেছে এক সময়। বলতে
গেলে জীবনটাই তো বাজি রেখেছে পার্টির জন্য। তখন
কত আর বয়স হবে অনন্তের ? বড় জোর বছর দশেক। সেই
বয়সেই কোমলমতি অনন্তের হাতে পার্টির ছাত্র সংগঠনের এক সদস্যতা-পরিচায়ক চিরকুট ধরিয়ে দিয়েছিলেন পাশের গ্রামের সজল-দা। কিছুই
জানতো না তখন অনন্ত। সজল-দা বলেছিলেন - এই ছাত্র সংগঠন সারা দেশের। আজ থেকে
তুই ও সারা দেশের সাথে এক পথে চলার পথিক হয়ে গেলি।
মনে
মনে বেশ একটা গর্ব অনুভূত হচ্ছিল অনন্তের। কিন্তু
কী মনে করে যেন ঘটনাটি আর বলেনি ঘরে। কিন্তু
সেই চিরকুটের গা বেয়ে যে এভাবে বদলে যাবে পথ তা একেবারেই বুঝে উঠতে পারেনি অনন্ত। সেই
তখন থেকে সব সিস্টেমের বিরুদ্ধে একটা সংগ্রামী আন্দোলনে জড়িয়ে যেতে থাকলো অনন্ত। যা কিছু
চলমান সেসবের মধ্যেই যে অন্তর্নিহিত রয়েছে এক অন্য জগৎ সেই শিক্ষাটি ক্রমে ক্রমে মগজে
চালান করে দিচ্ছিলেন পার্টি নেতারা। সৌজন্যে
সেই ছাত্র সংগঠন। বিপ্লবের নতুন চিন্তাধারা, নতুন স্বপ্ন আর বিদেশি কিছু আদর্শের দোহাই দিয়ে অনন্তরা যাত্রা করলো এক মোহ
মরীচিকাময় অনন্ত যাত্রাপথে। সেই
যাত্রাপথ আজও পেরিয়ে যেতে পারলো না অনন্ত। স্বপ্নের
রঙ পাল্টেছে এত দিনে। বিপ্লবের স্বপ্ন
যখন থেকে বেঁচে থাকার স্বপ্নে পর্যবসিত হয়েছে তখন থেকেই চোখে অন্ধকার দেখছে এই অনন্ত
পথের যাত্রীরা।
এরই
মধ্যে বড়দা একদিন অনন্তকে বাগে পেয়ে বললেন - ‘দেখ ভাই, আমরা বামুন ঘরের মানুষ। এখন
আর সেই গোঁড়া সমাজ ব্যবস্থা তো নেই। কিন্তু
ঘরে ঘরে পূজা আচ্চা আর মন্দিরে মন্দিরে ভগবানের পুজো এখনও হয়। লোক
দেখাতে সবাই ধর্ম মানি না বলে জাহির করে কিন্তু উৎসবে পরবে মন্দিরে, মসজিদে হামলে পড়ে সবাই। এমনকি
প্রায় সবারই ঘরে ঠাকুর দেবতার ছবি আছে, পুজোও হয়। জানিস
তো ? বিপন্ন ভাষার আন্দোলনে কেউ এককাট্টা হয় না কিন্তু পুজো কিংবা
ঈদে মানুষের ঢল নামে রাস্তায় - আজো।’
প্রথমটা
কিছুই বুঝে উঠতে পারে না অনন্ত। ফ্যালফ্যাল
করে তাই তাকিয়ে থাকে শুধু। এমনিতে
এসব ধর্মফর্ম ব্যাপারগুলো শুনতে একদমই ভালো লাগে না অনন্তের। কবেই
এসব আফিংকে বিসর্জন দিয়েছে সে। সেই
ছাত্র সংগঠনের টিকেট নেওয়ার আগেই তার উপনয়ন দিয়েছিলেন বাবা। চিরকুট
প্রাপ্তির পর এক সময় সেই পৈতেটাকে জলে বিসর্জন দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ সেজেছিল অনন্ত। আপনি
আচরি ধর্ম অপরে শেখাও। অনন্তের এই সরল
নেতৃত্ব এক সময় ছাত্র সমাজে খুব প্রশংসিতও হয়েছিল। এরই
ফাঁক গলে কখন যে অনামিকা এসে জায়গা করে নিয়েছে হৃদয়ের একেবারে কাছাকাছি তা ভালো করে
অনুভবই করতে পারেনি অনন্ত। যেদিন
প্রথম ছাত্র আন্দোলনের সময় টিফিন রুমের এক নীরব মুহূর্তে অনেকটাই কাছে চলে এসেছিল অনামিকা
সেদিনই প্রথম আকাশ থেকে পড়ে ভালোবাসার নিভৃত ক্ষণটিকে আদরে সোহাগে সাজিয়ে রেখেছিল অনন্ত। সেই
থেকে মনে আর সংগ্রামে একই পথের পথিক অনন্ত আর অনামিকা।
জাতপাত, ধর্মের বালাই তাই কোনোদিনই ছিল না অনন্তের। কিন্তু
আজ হঠাৎ করে বড়দার মুখ থেকে কথাগুলো শুনে একটু বিব্রত বোধ করে অনন্ত। যতই
নিজের মতো করে চলুক না কেন আজও বড়দাদের উপরেই যে নির্ভরশীল সে কথাটি ভালো করেই জানে
অনন্ত। তাছাড়া মা বাবার মৃত্যুর পর বড়দা যেভাবে
সংসারটিকে টেনে নিয়ে গেছেন সে দায়ও কি আর এড়ানো যায় ? তাই বড়দার অসমাপ্ত
কথার অপেক্ষায় তাকিয়ে থাকে অনন্ত।
বড়দার
চোখে মুখে একদিকে অভাবজনিত নৈরাশ্য আর অন্যদিকে ভ্রাতৃপ্রেমের গরজ।
বলেন - ‘চাকরি চাকরি করে এতগুলো বছর তো কাটিয়ে দিলি কিন্তু কাজের কাজ তো কিছুই হলো
না। এভাবে এক গাল দাড়ি-গোঁফ রেখে ব্যাগ কাঁধে কলুর বলদ হয়ে আর কতকাল কাটাবি ?
সংসারের হাল তো দেখছিস। তাই বলছিলাম কি আশেপাশে পুরোহিতের অভাব। আজকাল এই জীবিকায়
আয়ও ভালো। তাই পূজা পার্বণের মন্ত্রগুলো কিছুটা শিখে নিয়ে নাহয় লেগে পড়। বেকার
ঘুরে বেড়ানোর চাইতে তো এটাই অনেক ভালো। কী বলিস ?’
কেমন
যেন একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে যায় অনন্ত। আজীবন চোখে দেখা সব স্বপ্ন যেন একে অপরের
দিকে নিষ্ঠুর বিদ্রুপের হাসি হাসছে। সব মতবাদ, আন্দোলন, বিপ্লব সব কিছু নিমিষে
তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার উপক্রম। আর দাঁড়াতে পারে না অনন্ত। সরে আসে সেই অসহ্যকর
পরিস্থিতি থেকে।
ঘরে
এসে নিভৃত ভাবনায় ডুবে যেতে থাকে যেন। ভগবানের পুজো করবে ? অনন্ত ? সেদিনের
ইয়ুনিয়ন লিডার ? কৈশোরাবধি ধর্মের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রামের ধ্বজাবাহী অনন্ত - ঠাকুর
পুজো করবে ? অলীক অস্তিত্বের সামনে হেরে বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে পার্টি লাইনের ঘোর
অনুসরণকারী অনন্ত ? না, এ সম্ভব নয়। কিছুতেই নয়।
পরমুহূর্তেই
আবার বিপরীত সত্ত্বা এসে টলিয়ে দেয় চিন্তাধারাকে। এ নিয়ে কতগুলো বছর হলো ? শুধু
মিথ্যে আশ্বাসের বাইরে কী পেয়েছে অনন্ত ? সেদিন অনামিকাও সেই কথাটিই বলছিল। পাত্তা
দেয়নি অনন্ত। মেয়েরা বরাবরই বাস্তব চিন্তাধারায় এগিয়ে থাকে পুরুষ বন্ধুদের চাইতে।
ভাবনায় পড়ে যায় অনন্ত। তাছাড়া অনামিকাকেও এভাবে অনন্ত কাল ধরে বঞ্চিত করে রাখতে
পারে না সে। কিন্তু কী তার ভবিষ্যৎ ? এতগুলো বছরে প্রতিশ্রুতির ক’টি ছ’মাস
পেরিয়েছে অনন্ত ? নিটফল তো সেই একই কথার পুনরাবৃত্তি - ‘এবার হলো না অনন্ত। পরের
বার নিশ্চিত হবে। পার্টির কাজ করে যা’। ভেতরে ভেতরে
একটা ঘেন্নার জন্ম হতে থাকে অনন্তের। এই করে করে চাকরির বয়েসটাও তো পেরিয়ে গেলো।
এভাবে ঘোর অনিশ্চয়তায় আর কতকাল বড়দাদের ঘাড়ে বসে খাওয়া যায় ? অনামিকার মুখটি ভেসে
ওঠে চোখের সামনে।
তা
বলে ঠাকুর পুজো ? কেমন বিকৃত একটা শব্দ বেরিয়ে এলো অনন্তের মুখ থেকে। কল্পনার
মূর্তিকে কীসের আরাধনা - এমনটাই জেনে এসেছে চিরদিন। কিন্তু আজ কী যে হলো - মনে
হচ্ছে যেন সেই মূর্তিই আজ বেঁচে থাকার পথ দেখাচ্ছেন অনন্তকে। এ কেমন বিকার মনের
মধ্যে ? আর ভাবতে পারে না অনন্ত। ঘন ঘোর কালো অন্ধকারের মধ্যেই শার্টটা গলিয়ে
বেরিয়ে যায় অনামিকাদের বাড়ির দিকে। পথে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে ঝমঝমিয়ে। অসহ্য
গরমের হাত থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে আগাপাশতলা ভিজতে থাকে অনন্ত। বৃষ্টিকথায় সিক্ত
হতে হতে সব দ্বিধা, সব ব্যর্থ আশ্বাসের মরীচিকা ছেড়ে জীবন পথের ক্লান্ত পথিক অনন্ত
নতুন প্রত্যয়ে এগিয়ে যায় আঁধার পেরিয়ে - আলোর পথে, অনাস্বাদিত মুক্তির পথে।
- - - - - -
- - - - -
Comments
Post a Comment