'বৃষ্টিকথা'র উন্মোচন - বরাকের সাহিত্য ধারায় নতুন মাইল ফলক
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
বলতে গেলে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে রইল 'কবির শহর' শিলচর। বরাকের ২৫৩ জন কবির বৃষ্টি বিষয়ক কবিতার সংকলন 'বৃষ্টিকথা'র উন্মোচন হলো গত ৭ নভেম্বর ২০২১ তারিখে শিলচর হাইলাকান্দি রোডে অবস্থিত শুভশ্রী বিবাহ ভবনে। 'বৃষ্টিকথা' সংকলনের সম্পাদকরা হলেন সুশান্ত ভট্টাচার্য, আদিমা মজুমদার, পম্পা গুহঠাকুরতা এবং সুপ্রদীপ দত্তরায়। আয়োজনে 'বৃষ্টিকথা বরাক' - যার উদ্যোক্তারা হলেন উপরোক্ত চারজনের বাইরেও দীপেন্দু দাস, ত্রিদেব চৌধুরী, রূপরাজ ভট্টাচার্য, দোলনচাঁপা দাসপাল এবং বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
এদিন সকাল হতেই নান্দনিক গরজে একে একে এসে উপস্থিত হতে থাকেন সাহিত্য জগতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে জড়িত শতাধিক গুণীজন। শিলচরের বাইরেও করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি, গুয়াহাটি এবং অন্যান্য জায়গা থেকে এসে এক ছাদের তলায় জড়ো হতে থাকেন বরাকের সঙ্গে জড়িত একাধিক কবিরা।
সকাল সাড়ে দশটায় অনুষ্ঠানের সূচনা হলো বর্ষীয়ান কবি আশুতোষ দাসের চমৎকার উদ্বোধনী ভাষণের মধ্য দিয়ে। অনুষ্ঠানের একদিন আগে অন্যতম উদ্যোক্তা তথা বরেণ্য কবি সুশান্ত ভট্টাচার্যের মাতৃবিয়োগ হয়। পরলোকগত আত্মার শান্তি কামনায় তাই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিটের নীরবতা পালন করা হয়।
এরপর একই মঞ্চে এদিন উন্মোচিত হয় একের পর এক সাতটি গ্রন্থ। প্রথমেই উন্মোচিত হয় 'বৃষ্টিকথা'। উন্মোচন করেন বর্ষীয়ান কবি মহুয়া চৌধুরী এবং নব প্রজন্মের কবি চান্দ্রেয়ী দেব। উন্মোচক হিসেবে নিজেদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন উভয়েই। নতুন ও পুরাতনের এক অপূর্ব মেলবন্ধনে আপ্লুত হয়ে উপস্থিত কবি দর্শকদের করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে প্রেক্ষাগৃহ। এরপর উন্মোচিত হয় 'দৃঢ় বন্ধন' পত্রিকার শারদ সংকলন 'শারদ অর্ঘ্য'। শতাধিক কবির কবিতা সম্বলিত এই সংকলনের সম্পাদকরা হলেন পম্পা গুহঠাকুরতা, দেবাশিস গুহঠাকুরতা, সুশান্ত ভট্টাচার্য, সুপ্রদীপ দত্তরায় এবং গোপাল চক্রবর্তী। সংখ্যাটির উন্মোচন করেন করিমগঞ্জ থেকে আগত সাহিত্যিক ও সমাজ সেবক অপর্ণা দেব এবং হাইলাকান্দি থেকে আগত কবি ঋতা চন্দ।
কবি সুশান্ত ভট্টাচার্যের ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ Pandemic Poetry র উন্মোচন করেন সাহিত্যিক এবং অধ্যাপক দীপেন্দু দাস। এ নিয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ তথ্যনির্ভর বক্তব্য রাখেন শ্রী দাস।
আরেক দ্বিভাষিক কবি কল্লোল চৌধুরীর কাব্যগ্রন্থ 'মেহগনি অন্ধকার' উন্মোচিত হয় দুই কবি ও সাহিত্যিক আশুতোষ দাস ও বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর হাত ধরে। বক্তব্য রাখেন শ্রী দাস। কবি কল্লোল চৌধুরীর কাব্য প্রতিভা নিয়ে আলোচনা করে উন্মোচিত গ্রন্থ থেকে দু'টি কবিতা পাঠ করে শোনান বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
বিশিষ্ট গল্পকার হিমাশিস ভট্টাচার্যের গল্পগ্রন্থ 'জীবনের অবয়ব' উন্মোচন করেন প্রথিতযশা গল্পকার ঝুমুর পান্ডে এবং সাহিত্যিক অধ্যাপক বিশ্বতোষ চৌধুরী। সারগর্ভ বক্তব্য রাখেন উভয়েই।
কবি রঘুনন্দন ভট্টাচার্যের কাব্যগ্রন্থ 'অনুরণন' উন্মোচিত হয় সাহিত্যিক আব্দুল মতিন লস্কর এবং কবি রবিশংকর ভট্টাচার্যের হাত ধরে। এবং সবার শেষে কবি সুপ্রদীপ দত্তরায়ের কাব্যগ্রন্থ 'সময় অসময়' উন্মোচন করেন তাঁর সহধর্মিণী সংযুক্তা দত্তরায় এবং বিশিষ্ট বাচিক শিল্পী মনোজ দেব। । বক্তব্য রাখেন উভয়েই।
সারা দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত কবিরা প্রত্যেকেই স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন। যাঁদের মধ্যে ছিলেন বর্ষীয়ান কবি দিলীপ কুমার দে থেকে শুরু করে নব প্রজন্মের কবি সপ্তমিতা নাথ, দেবলীনা রায়, রঞ্জিতা চক্রবর্তী, পঞ্চতপা নাথ সহ আরোও অনেকে এবং খুদে কবি সৃষ্টি মজুমদার পর্যন্ত।
অনুষ্ঠানের অঙ্গ হিসেবে বিশিষ্ট কবি অশোক বার্মা ও প্রাবন্ধিক তপোজ্যোতি ভট্টাচার্য সম্পাদিত বালার্ক পত্রিকার তরফ থেকে কবি সুশান্ত ভট্টাচার্য এবং গল্পকার আদিমা মজুমদারকে চন্দ্রাবতী স্মৃতি -সাহিত্য পুরস্কার ২০২১ হিসেবে মানপত্র, শাল ও পুস্পস্তবক দিয়ে সম্মানিত করা হয়। কবি সুশান্ত ভট্টাচার্যের অনুপস্থিতিতে তাঁর হয়ে পুরস্কার গ্রহণ করেন কবি দীপঙ্কর বিশ্বাস।
সূচনা থেকে অনবদ্য সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানকে মাধুর্যমণ্ডিত করে তোলেন কবি দোলনচাঁপা দাসপাল। পরবর্তীতে এই দায়িত্ব সুচারু রূপে পালন করেন কবি শতদল আচার্য। উন্মোচন অনুষ্ঠানে আগাগোড়া সহায়তা করেন উঠতি সাহিত্যিক মৌপিয়া চৌধুরী। অনুষ্ঠানে 'বৃষ্টিকথা'র প্রচ্ছদ শিল্পী হিসেবে বিশেষ সম্বর্ধনা জানানো হয় খুদে পটুয়া দেবোপম গুহঠাকুরতাকে।
প্রেক্ষাগৃহের বাইরে আকর্ষণীয় প্রদর্শনীতে বই বিক্রিরও ব্যবস্থা ছিল এবং বিক্রয়কৃত বইয়ের সংখ্যা ছিল আশাব্যঞ্জক। এই দিকটি কন্যা বৃষ্টিকে সঙ্গে নিয়ে সুনিপুণ হাতে সামলালেন গল্পকার মঞ্জরী রায়।
সব মিলিয়ে ঐতিহাসিক এই দিনটি বরাকের সাহিত্য আঙিনায় নিঃসন্দেহে এক মাইল ফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইল। একাধারে বাংলা সাহিত্যের সৃষ্টিশীলতার চলমান ধারার সম্ভাব্য স্তব্ধ গতির ধারণাকেও সমূলে নস্যাৎ করে দিল নিশ্চিতভাবেই।
- - - - - - বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
Comments
Post a Comment