আপন অনুভবের কাব্যগ্রন্থ - ‘যে কথা বলা হয়নি’
মাতৃভাষার গৌরব রক্ষার্থে এগারোটি
তাজা প্রাণের বলিদানের নিদারুণ অথচ গৌরবোজ্জ্বল কাহিনি লিপিবদ্ধ আছে যে ভাষার, যে অঞ্চলের
ইতিহাসে আসামের সেই বরাক উপত্যকার প্রান্তিক জেলা,
হাইলাকান্দিতে বসে যেসব কবি, সাহিত্যিকরা নানা
অসুবিধা তথা ঘাত প্রতিঘাতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উৎকৃষ্ট সাহিত্য সাধনায় কর্মরত রয়েছেন
তাঁদের মধ্যে এক উজ্জ্বল নাম কবি সুশান্ত মোহন চট্টোপাধ্যায়। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর
ষষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ তথা সার্বিক অষ্টম গ্রন্থ। এই সম্ভার থেকেই সাহিত্য পথে তাঁর
নিরলস যাপনকথার সুস্পষ্ট আভাস পাওয়া যায়। ভূমিকায় কবির কথায় - “...... কলম থেমে
থাকে না। বিভিন্ন প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করেও আমরা মাতৃভাষা চর্চায় ব্রতী। ...
দীর্ঘ সাড়ে চার দশকের ঊর্ধ্বকাল থেকে আমিও এই প্রয়াসে ব্রতী। কোন প্রশংসা বা
পুরস্কারের অভিপ্রায়ে নয়, মাতৃভাষাকে ভালোবেসেই এই কাজ।”
‘কবিমুখ’ শিরোনামে স্থানীয় আরেকজন কৃতি কবি ও সাহিত্যিক কল্লোল চৌধুরী লিখছেন - ‘... তাঁর কবিতায় বর্তমান সমাজ জীবনের নানা সমস্যা উঠে আসে এবং তাতে নারী সমাজের প্রতি তাঁর দুর্নিবার শ্রদ্ধা প্রতিভাত। তাঁর কবিতায় ছন্দের মাধুর্য ও পেলবতা লক্ষ্যনীয়।’ আলোচ্য গ্রন্থেও একাধিক কবিতায় ছন্দের প্রতি, বিশেষ করে অন্ত্যমিলে কবির ঝোঁক পরিলক্ষিত হয়। বলতে গেলে অধিকাংশ কবিতাই অন্ত্যমিল ছন্দে গ্রথিত। মোট ৫২ টি কবিতা সন্নিবিষ্ট হয়েছে কবির এই ৬৪ পৃষ্ঠার কাব্যগ্রন্থে।
কবির কবিতায় অনায়াসে ধরা দেয়
যাপিত অতীত। সংসার যাপনের ইতিকথা, অতীত ঐতিহ্য, ধর্মাচরণ - কিছুই বাদ যায় না। তাই
পাঁচালির আঙ্গিকে প্রথমেই গ্রন্থের শ্রীগণেশ করেছেন ‘গুরু প্রণাম’ কবিতার মাধ্যমে।
এর পর একে একে উঠে এসেছে, মাতৃভাষা প্রেম, উনিশের কথা ও ব্যথা, বৈশাখ ও বসন্ত,
প্রেম ভালোবাসা, জীবনবোধ, মাতৃবন্দনা এবং মহাপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ফরিয়াদ।
তৃপ্তি অতৃপ্তির দোটানায় কবির কলম থেকে নির্গত হয় অসাধারণ কিছু পংক্তি -
ছেলেবেলার সেই পুতুল খেলার সঙ্গী
দীর্ঘ অবসানে আজ অন্য এক মানুষ।
তার কাছে একটা মুক্ত মন চেয়েছিলাম
মস্ত বড় আকাশটাকে সে দেখিয়ে দিলে।
একটু স্নিগ্ধ পরশের অপেক্ষায় বসেছিলাম
পূর্ণিমার চাঁদটাকে দেখালে তখন।
উষ্ণ সান্নিধ্যের খোঁজে যখন বেড়াচ্ছিলাম
মধ্যাহ্ন সূর্যের দিকে ইশারায় দেখালে।
আমার অন্তঃসলিলা ফল্গুর বুকে শুধু চর জমা
তৃষ্ণা মেটাবার একফোঁটাও জল নেই এখন।
ভালোবাসার রঙিন গোলাপ কুঁড়িটা
অনাদরে অবহেলায় জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে গেছে।
সেই ছাই ভস্ম মেখে যোগী সেজে বেড়াচ্ছি
একটা শান্ত স্নিগ্ধ শ্মশানের অপেক্ষায়।
(কবিতা - অপেক্ষা)।
আছে কিছু বিষয়-ভিত্তিক, কিছু সুচিন্তিত কবিতাও। কর্ণের জীবনবীক্ষা নিয়ে লিখেছেন একটি দীর্ঘ কবিতা - ‘সময়ের সাক্ষীতে দাতা কর্ণের ইতিহাস’। সময় এবং ইতিহাসের প্রেক্ষিতে দানবীর কর্ণকে করেছেন নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন। কবির কল্পনাশক্তির মুনশিয়ানা এখানে স্পষ্ট প্রতিভাত। ‘বৈশাখ’কে নিয়ে কবির নস্টালজিয়া ফুটে উঠেছে একাধিক কবিতায়। সাজিয়েছেন অপূর্ব কথামালায় -
... সেই থেকে দুরন্ত বৈশাখী
নিয়ে যায় আমায় কোন এক অজানায়
সুখের মরুভূমি চষে বেড়াই
খুঁজি সেই প্রিয়তমায়
যার সাথে দেখা হয়েছিল
কোন এক বৈশাখে দু’জনায় ...
এক বৈশাখে দেখা হয়েছিল দু’জনায়
চাঁদ ডুবে যাওয়া এক পূর্ণিমায়।
(কবিতা - ডুবে যাওয়া চাঁদ)
কিংবা -
শ্রাবণকে চাই না আমি
যতই বাড়ুক রৌদ্র জ্বলা
বৈশাখ আমার সুখের আকর
তাকে নিয়েই জীবন চলা।
(কবিতা - বাইশ না পঁচিশ)।
প্রতিটি কবিতাতেই কবির ভাবনা, অনুভব ব্যক্ত হয়েছে সহজ সরল উক্তির হাত ধরে। কিছু কবিতা জীবনের সারমর্ম নিয়ে ভাবাতে বাধ্য করে পাঠককে। কিছু কবিতার বিশেষোল্লেখ তাই অনিবার্য - ‘যদি’, ‘অতীতের ভাবনা’, ‘যে ফুল ফোটেনি’, ‘কপালে ভাঁজ’, ‘আস্ফালন’, ‘নিধুবন’, ‘কবিরা মৃত্যুহীন’, ‘রোদন ভরা এ বসন্তে’, ‘চোরাবালি’, ‘ঘাসফুলের সাধ’, ‘মন্দাকিনী’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিনে’, ‘গর্ভধারিণী’ ইত্যাদি।
কিছু কবিতায় তৎসম শব্দ এবং কিছু প্রাচীন কাব্যশৈলীর ব্যবহার এড়াতে পারলে আঙ্গিক অধিকতর আধুনিক হতো নিঃসন্দেহে। যদিও অতীতকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গেলে এমন একটি ঝোঁক সচরাচর এসেই পড়ে রচনায়। গ্রন্থের প্রকাশক ‘কর্পোরেট পাবলিসিটি’ বসিরহাট। (এটা কি ছাপার ভুল ? পাবলিকেশনের জায়গায় পাবলিসিটি ?) পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত একটি গ্রন্থে বানান ভুল সাধারণতঃ আশা করা যায় না এবং এক্ষেত্রে প্রকাশকের দায়বদ্ধতা সম্পূর্ণ এড়ানো যায় না। ছাপাই, বাঁধাই, অক্ষরবিন্যাস মাঝারি মানের। কবি তার এই গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর ‘পরম দয়াল, শ্রীগুরু শ্রীশ্রী রামঠাকুর (কৈবল্যনাথ) ও পিতা স্বর্গীয় যতীন্দ্র মোহন চট্টোপাধ্যায়, মাতা স্বর্গীয়া সুধাংশু রাণী চট্টোপাধ্যায়’কে।
আঙ্গিক কিংবা সাজসজ্জাকে ছাপিয়ে কবিতার মাধুর্যে, আপন প্রতিভায় কবি সুশান্ত মোহন সার্বিক সফলতা ও স্নিগ্ধতায় পাঠক মহলে তুলে দিতে একশো ভাগ কৃতকার্য হয়েছেন সেইসব না বলা অনুভব, না বলা কথা - ‘যে কথা বলা হয়নি’ আজো।
‘কবিমুখ’ শিরোনামে স্থানীয় আরেকজন কৃতি কবি ও সাহিত্যিক কল্লোল চৌধুরী লিখছেন - ‘... তাঁর কবিতায় বর্তমান সমাজ জীবনের নানা সমস্যা উঠে আসে এবং তাতে নারী সমাজের প্রতি তাঁর দুর্নিবার শ্রদ্ধা প্রতিভাত। তাঁর কবিতায় ছন্দের মাধুর্য ও পেলবতা লক্ষ্যনীয়।’ আলোচ্য গ্রন্থেও একাধিক কবিতায় ছন্দের প্রতি, বিশেষ করে অন্ত্যমিলে কবির ঝোঁক পরিলক্ষিত হয়। বলতে গেলে অধিকাংশ কবিতাই অন্ত্যমিল ছন্দে গ্রথিত। মোট ৫২ টি কবিতা সন্নিবিষ্ট হয়েছে কবির এই ৬৪ পৃষ্ঠার কাব্যগ্রন্থে।
ছেলেবেলার সেই পুতুল খেলার সঙ্গী
দীর্ঘ অবসানে আজ অন্য এক মানুষ।
তার কাছে একটা মুক্ত মন চেয়েছিলাম
মস্ত বড় আকাশটাকে সে দেখিয়ে দিলে।
একটু স্নিগ্ধ পরশের অপেক্ষায় বসেছিলাম
পূর্ণিমার চাঁদটাকে দেখালে তখন।
উষ্ণ সান্নিধ্যের খোঁজে যখন বেড়াচ্ছিলাম
মধ্যাহ্ন সূর্যের দিকে ইশারায় দেখালে।
আমার অন্তঃসলিলা ফল্গুর বুকে শুধু চর জমা
তৃষ্ণা মেটাবার একফোঁটাও জল নেই এখন।
ভালোবাসার রঙিন গোলাপ কুঁড়িটা
অনাদরে অবহেলায় জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে গেছে।
সেই ছাই ভস্ম মেখে যোগী সেজে বেড়াচ্ছি
একটা শান্ত স্নিগ্ধ শ্মশানের অপেক্ষায়।
(কবিতা - অপেক্ষা)।
আছে কিছু বিষয়-ভিত্তিক, কিছু সুচিন্তিত কবিতাও। কর্ণের জীবনবীক্ষা নিয়ে লিখেছেন একটি দীর্ঘ কবিতা - ‘সময়ের সাক্ষীতে দাতা কর্ণের ইতিহাস’। সময় এবং ইতিহাসের প্রেক্ষিতে দানবীর কর্ণকে করেছেন নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন। কবির কল্পনাশক্তির মুনশিয়ানা এখানে স্পষ্ট প্রতিভাত। ‘বৈশাখ’কে নিয়ে কবির নস্টালজিয়া ফুটে উঠেছে একাধিক কবিতায়। সাজিয়েছেন অপূর্ব কথামালায় -
... সেই থেকে দুরন্ত বৈশাখী
নিয়ে যায় আমায় কোন এক অজানায়
সুখের মরুভূমি চষে বেড়াই
খুঁজি সেই প্রিয়তমায়
যার সাথে দেখা হয়েছিল
কোন এক বৈশাখে দু’জনায় ...
এক বৈশাখে দেখা হয়েছিল দু’জনায়
চাঁদ ডুবে যাওয়া এক পূর্ণিমায়।
(কবিতা - ডুবে যাওয়া চাঁদ)
কিংবা -
শ্রাবণকে চাই না আমি
যতই বাড়ুক রৌদ্র জ্বলা
বৈশাখ আমার সুখের আকর
তাকে নিয়েই জীবন চলা।
(কবিতা - বাইশ না পঁচিশ)।
প্রতিটি কবিতাতেই কবির ভাবনা, অনুভব ব্যক্ত হয়েছে সহজ সরল উক্তির হাত ধরে। কিছু কবিতা জীবনের সারমর্ম নিয়ে ভাবাতে বাধ্য করে পাঠককে। কিছু কবিতার বিশেষোল্লেখ তাই অনিবার্য - ‘যদি’, ‘অতীতের ভাবনা’, ‘যে ফুল ফোটেনি’, ‘কপালে ভাঁজ’, ‘আস্ফালন’, ‘নিধুবন’, ‘কবিরা মৃত্যুহীন’, ‘রোদন ভরা এ বসন্তে’, ‘চোরাবালি’, ‘ঘাসফুলের সাধ’, ‘মন্দাকিনী’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিনে’, ‘গর্ভধারিণী’ ইত্যাদি।
কিছু কবিতায় তৎসম শব্দ এবং কিছু প্রাচীন কাব্যশৈলীর ব্যবহার এড়াতে পারলে আঙ্গিক অধিকতর আধুনিক হতো নিঃসন্দেহে। যদিও অতীতকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গেলে এমন একটি ঝোঁক সচরাচর এসেই পড়ে রচনায়। গ্রন্থের প্রকাশক ‘কর্পোরেট পাবলিসিটি’ বসিরহাট। (এটা কি ছাপার ভুল ? পাবলিকেশনের জায়গায় পাবলিসিটি ?) পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত একটি গ্রন্থে বানান ভুল সাধারণতঃ আশা করা যায় না এবং এক্ষেত্রে প্রকাশকের দায়বদ্ধতা সম্পূর্ণ এড়ানো যায় না। ছাপাই, বাঁধাই, অক্ষরবিন্যাস মাঝারি মানের। কবি তার এই গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর ‘পরম দয়াল, শ্রীগুরু শ্রীশ্রী রামঠাকুর (কৈবল্যনাথ) ও পিতা স্বর্গীয় যতীন্দ্র মোহন চট্টোপাধ্যায়, মাতা স্বর্গীয়া সুধাংশু রাণী চট্টোপাধ্যায়’কে।
আঙ্গিক কিংবা সাজসজ্জাকে ছাপিয়ে কবিতার মাধুর্যে, আপন প্রতিভায় কবি সুশান্ত মোহন সার্বিক সফলতা ও স্নিগ্ধতায় পাঠক মহলে তুলে দিতে একশো ভাগ কৃতকার্য হয়েছেন সেইসব না বলা অনুভব, না বলা কথা - ‘যে কথা বলা হয়নি’ আজো।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
‘যে কথা বলা হয়নি’
সুশান্ত মোহন চট্টোপাধ্যায়
মূল্য - ১৬০ টাকা
যোগাযোগ - ৮১৩৪০৯৬৯০৯
সুশান্ত মোহন চট্টোপাধ্যায়
মূল্য - ১৬০ টাকা
যোগাযোগ - ৮১৩৪০৯৬৯০৯

Comments
Post a Comment