Skip to main content

দীর্ঘদিনের পথচলায় সমৃদ্ধ ১৫৩ তম উৎসব সংখ্যা - ‘মজলিশ সংলাপ’



এ রাজ্যের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় হাতে গোনা যে ক’টি ছোট পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম হল সাহিত্য পত্রিকা ‘সংলাপ’ বা ‘মজলিশ সংলাপ’। মাসিক থেকে বর্তমানে বছরে চারটি সংখ্যা অর্থাৎ ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা। বাংলা সাহিত্যের এই তথাকথিত তৃতীয় ভুবনে প্রতি তিন মাসে একটি সংখ্যা - তাও আবার সংলাপ-এর মতো হৃষ্টপুষ্ট একটি পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ করা যে কতখানি শ্রমসাধ্য তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অষ্টাদশ বর্ষে পদার্পণ করা এই পত্রিকা স্বভাবতই দীর্ঘদিন ধরে নিমগ্ন সাহিত্য চর্চা ও সাধনায় ব্রতী। বহু ঘাত প্রতিঘাতের ইতিহাস পেরিয়ে আজও অম্লান এই পত্রিকার নিরন্তর পথ চলা।
‘সংলাপ’-এর সর্বশেষ সংখ্যাটি (সংখ্যা ১৫৩, জুলাই - সেপ্টেম্বর ২০২২ উৎসব সংখ্যা) প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি কিছুটা দেরিতে। স্টেটমেন্ট সাইজের বিশাল ১৭৬ পৃষ্ঠার এই সংখ্যার বিষয় বিন্যাস লক্ষণীয়। সুচিন্তিত গদ্য বিভাগের ফাঁকে ফাঁকে বিন্যস্ত হয়েছে ‘কবিতার বারান্দায়’ শীর্ষক একাধিক কবিতাগুচ্ছ। তবে এই সুবিন্যস্ততার মধ্যেই রয়ে গেছে গত সংখ্যারই মতো সূচিপত্র ও ‘টাইটেল ভার্সো’ পেজের একাকার বিন্যাস। এ নিয়ে ভাবতে হবে বইকী সম্পাদককে।  
প্রথমেই ‘প্রথম পাতা’ শিরোনামে রয়েছে এক পৃষ্ঠার সংক্ষিপ্ত অথচ স্পষ্ট বার্তার সম্পাদকীয়। চিন্তা এবং সাথে প্রত্যয় প্রকাশ হয়েছে প্রকৃতির প্রতিশোধের সূত্র ধরে - ‘না, পলায়ন নয়। সংশোধন। এখনো যদি কিঞ্চিৎ মাত্র সময় অবশিষ্ট আছে আমাদের সবাইকে নতুন করে ভাবতে হবে, সচেতন হতে হবে। প্রায়শ্চিত্তের পথ ধরে এগোতে হবে ভাবী প্রজন্মের মঙ্গলের স্বার্থে’।
লেখালেখি পর্বের শ্রীগণেশ হয়েছে অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়ের শারদীয়া নিবন্ধ ‘দেবীমাহাত্ম্য ও শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা’ দিয়ে। দুর্গাপূজা ও শারোদৎসবের সৃষ্টি থেকে হাল আমল অবধি এক বিন্যস্ত সাতকাহন। এরপর রয়েছে শোভনা ভট্টাচার্যের বিশেষ নিবন্ধ ‘ঊনবিংশ শতাব্দীর খাসি সাহিত্য’। শিরোনামেই বর্ণিত তথ্যসমৃদ্ধ এক নিবন্ধ। সুপর্ণা লাহিড়ী বড়ুয়া ‘নারীবিশ্ব’ নিয়ে লিখেছেন নিবন্ধ ‘রূপচর্চার বাজারে নারী’। সুলিখিত যদিও খানিক বিস্তৃতির সুযোগ ছিল বলে মনে হতেই পারে। শেষটায় রয়েছে একটি চমৎকার বার্তা। ‘ব্যক্তিগত রচনা’ হিসেবে বীরেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের ‘এক জিপসীর কথা’ এ সংখ্যার এক সম্পদ বললেও অত্যুক্তি হবে না। জিপসীদের জীবনযাত্রার এক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাপ্রসূত নিবন্ধ।
গল্প বিভাগে রয়েছে সুচয়িত আটটি গল্প। ক্রমান্বয়ে রয়েছে বিজন কুমার সরকার-এর নির্জন দ্বীপের ডাক, সুকুমার রুজ-এর ‘ষড়মাত্রিক ঘেরাটোপ’, বিমলেন্দু ভট্টাচার্যের ‘বিস্ময়কাঁচ’, অনুপমা পাল-এর ‘খাঁচা’, অনুরাধা দাস-এর ‘অযতনের ধন’, বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর ‘কী করে বোঝাই’, সজল পাল-এর অশনি সংকেত এবং নন্দিতা সাহার ‘আত্মসম্মান’। প্রথমোক্ত তিনটি গল্পকে বড়গল্পের আওতায় ফেলা যায়। সব ক’টি গল্পই বিচিত্র ভাবনার বহিঃপ্রকাশ। যথাযথ বিন্যাস এবং সুলিখিত। স্বল্প পরিসরে আলাদা করে মন্তব্য অসম্ভব এবং নিষ্প্রয়োজনও।
এর পর রয়েছে চারটি ভিন্ন ধর্মের গদ্য। প্রথমেই ‘খোলা মনে’ শীর্ষক গদ্য বিভাগে শর্মিষ্ঠা দে’র গদ্য ‘বৈষম্য’। এরপর ‘সফরনামা’য় প্রশান্ত চক্রবর্তীর ‘চানডুবি : চাঁদ সওদাগরের দেশে’ - তথ্যের সুনিপুণ বিস্তারে এক চমৎকার ভ্রমণবৃত্তান্ত। সুনিপুণ গদ্যকার সঞ্জয় গুপ্ত ‘এলোমেলো ভাবনা’ শীর্ষক গদ্যে লিখেছেন - ‘ফ্রেমবন্দি মুহূর্তের কোলাজ’। যথারীতি সুখপাঠ্য এক ব্যতিক্রমী নিবেদন। কৃষ্ণা দাশগুপ্ত সংকলিত দীর্ঘ ২৯ পৃষ্ঠার নৃত্য-গীতিনাট্য ‘দুষ্যন্ত-শকুন্তলা’ এবারের সংখ্যার আরোও একটি সম্পদ। সংগীত ও সংলাপের সুললিত প্রয়োগে এক নান্দনিক উপস্থাপনা। অন্য পদ্য শিরোনামে সঞ্জয় চক্রবর্তী ও তুষারকান্তি সাহার গদ্যছন্দের দু’টি কবিতা সংখ্যাটিকে ঋদ্ধ করেছে বলা যায়। শেষ পর্বে আছে সৃষ্টি শ্রেয়মের বিচিত্র বিন্যাসের একটি অসমিয়া গল্প ‘একদিন একটি মহানগরে’র বাংলা অনুবাদ। অনুবাদক বাসুদেব দাস। মূল রচনা এবং অনুবাদ উভয়ই রুচিসম্পন্ন এবং সুখপাঠ্য।
‘কবিতার বারান্দায়’ কবিতা বিভাগে রয়েছে মোট ৩৬ জন কবির ৪০ টি কবিতা। বিশেষোল্লেখের দাবি রাখে রবীন্দ্র সরকার, মোনালিসা চট্টোপাধ্যায়, পারমিতা নাগ দে, কুণাল ভট্টাচার্য (এখানে কবিতার শিরোনাম ও কবিনামে ফন্ট সাইজের আকারে বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়েছে), সত্যজিৎ চৌধুরী, আরণ্যক বসু, সিক্তা বিশ্বাস, যশোধরা রায়চৌধুরী, শঙ্খ সেনগুপ্ত, বিপুল চক্রবর্তী, প্রাণজি বসাক, অপর্ণা দেব, পীযূষকান্তি সাহা, দেবলীনা সেনগুপ্ত এবং সমরবিজয় চক্রবর্তীর কবিতা। এছাড়াও ভালো কবিতা লিখেছেন শৈলেন সাহা, চিরঞ্জীব হালদার, শর্বাণীরঞ্জন কুণ্ডু, গুরুপ্রসাদ যশ, রাজকুমার দাস, সুবীর নাগচৌধুরী, সুপ্রভাত সরকার, সুর্য লাহিড়ী, রুদ্রেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ, সুশান্ত ভট্টাচার্য, শ্যামল ঘোষ, কমলিকা মজুমদার, অমৃত মাইতি, নীতিশ বর্মন, মালপাখি, নীলদীপ চক্রবর্তী, জ্যোতিষ দেব, সোনালী গুপ্ত, অজিত বাইরি, মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম ও অভীককুমার দে।
ছাপা ও অক্ষরবিন্যাস যথাযথ। সৌজন্যে ভবানী অফসেট…, গুয়াহাটি। বানান ও ছাপার ভুল প্রায় নেই বললেই চলে। সংগৃহীত প্রচ্ছদটি যথেষ্ট নজরকাড়া। প্রকাশক সোনালী গুপ্ত, পরিবেশনায় ‘মজলিশ বইঘর’।
এই বিশাল আয়োজনকে দুই মলাটে অসাধারণ নৈপুণ্যে বিন্যস্ত সজ্জায় সন্নিবিষ্ট করায় সম্পাদকের কর্মকুশলতার তথা সাহিত্য ভাবনা ও রুচিবোধের ছাপ স্পষ্ট। এমন একটি পত্রিকা তাই অনায়াসে জায়গা করে নেয় পাঠক মনে, জায়গা করে নেয় ছোটপত্রিকার সর্বকালীন আর্কাইভে।

- বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

মূল্য - ১৫০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৮৬৪০৬৬৯৯৪

Comments

  1. খুব সুন্দর আলোচনা। ঋগ্ধ হলাম। নিজের নাম দেখে মনটা নেচে উঠলো। মজলিস সংবাদ কে অজস্র ধন্যবাদ জানাই। একটি অন্যতম পত্রিকা।
    প্রাণজি বসাক। নতুন দিল্লি-৪৫

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত স্মরণ সংখ্যা ‘আলোহাওয়া’

একটি লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটপত্রিকা হচ্ছে সমাজের সাহিত্যদর্পণ । শুধুই সমকালিক নয়। যুগান্তরের ভাষাসাহিত্য ও তার যুগন্ধর স্রষ্টাদের সঙ্গে সমকালকে পরিচিত করে দেওয়ার এক প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম। আর একের পর এক এই লক্ষ্যেই উৎকৃষ্টতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি শহর থেকে প্রকাশিত ‘ সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক ’ পত্রিকা ‘ আলোহাওয়া ’ । রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার ১৯তম সংখ্যা - ২৫তম বর্ষ , পৌষ ১৪৩২ - ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যা । কবি জিতেন্দ্র নাথ সম্পাদিত এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যিক ‘ তুষারকান্তি নাথ স্মরণ সংখ্যা ’ হিসেবে । তুষারকান্তি নাথ এমন একজন সাহিত্যিক যাঁকে আখ্যায়িত করা যায় একজন সার্বিক সাহিত্যিক হিসেবে। ধারে ও ভারে তাঁর সৃষ্টি শুধু বরাক উপত্যকাতেই নয় এর বাইরেও সমাদৃত। তাঁর লেখনী রত্নপ্রসবা। পক্ষান্তরে এটাও বলা যায় যে ঘরে বাইরে কিছু স্বীকৃতি , কিছু প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকলেও তাঁর লেখালেখি ও নানাবিধ সৃষ্টিকর্মের গভীরতার মূল্যায়ন যতটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল ততটা কিন্তু হয়নি। আসলে প্রান্তিকতা সততই লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের পরিচিতির পথে এক বৃহৎ অন্তরা...

প্রখর গরজ ও শ্রদ্ধায় নিবেদিত একটি ‘সুকান্ত সংখ্যা’ - শতদল

হাতে নিলে আর পাঁচটা নিয়মিত সংখ্যা পত্রিকার মতো মনে হলেও উত্তর ত্রিপুরার চুড়াইবাড়ী থেকে কবি, লেখক রতন চন্দ সম্পাদিত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ‘শতদল’ পত্রিকার সম্প্রতি প্রকাশিত ২৯তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, বৈশাখ ১৪৩৩, মে-২০২৬ (কবি সুকান্ত জন্মশতবর্ষ সংখ্যা) সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রমী। সেই মাত্র ৪২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক সংস্করণ হলেও প্রচ্ছদ থেকে শেষ পৃষ্ঠা অবধি যতন, গরজ ও উৎকর্ষের এক সম্ভার বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না মোটেও। বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র স্থান ধরে আছেন অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর সময়কাল থেকে আজ অবধি এবং আগত-অনাগত চিরকালীন এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী এই কবি মূলত একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেই সাহিত্যবিশ্বে পরিচিত হলেও তাঁর কবিতায় এর বাইরেও যে রয়ে গেছে বহুমাত্রিক এক বোধ, ভাষ্য - বোধ করি তার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি আজও। তবে যতই তাঁকে নিয়ে চর্চা হবে ততই এক এক করে খুলবে বিস্ময়ের ঝাঁপি এ কথা অনস্বীকার্য। এবং তারই এক নির্মোহ প্রয়াস ও প্রকাশ আলোচ্য সংখ্যাটি। সুসজ্জিত কবি-প্রতিকৃতিযুক্ত একটি নান্দনিক প্রচ্ছদ - সজ্জায়, বর্ণ সংস্থাপনে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য পাঠকের। সৌজন্যে মুদ...