Skip to main content

দুঃখ বেদনার কাব্যিক উপস্থাপন - ‘বাস্তুহারার পদাবলি’


সাকুল্যে ৪০ পৃষ্ঠার একটি কাব্যগ্রন্থ। তার ৩২ টি পৃষ্ঠা জুড়ে আছে ২৩ টি কবিতা। তবু এ গ্রন্থটি নিজগুণে উঠে আসে আলোচনায় - বলা যায় তার প্রধান কারণ ‘বিষয়বস্তু’। বাস্তুহারা ও উদবাস্তু শব্দদু’টির অভিধানগত অর্থ ভিন্ন ভিন্ন হলেও তা একই সূত্রে বাঁধা। সুতরাং স্থানিক বা অঞ্চলভিত্তিক কিংবা দেশভিত্তিক বাস্তুহারাদের অমোঘ তকমাই হচ্ছে উদবাস্তু। বসতবাটিহারাদের অনিবার্য গন্তব্য তাই উদবাস্তু জীবন।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে আজ অবধি ভারতবর্ষের এই উত্তর পূর্বে সবচাইতে বেশি চর্চিত বিষয় হচ্ছে নাগরিকত্ব এবং উদবাস্তু সমস্যা। উদবাস্তুর ব্যাপারটিকে ঠিক সমস্যা বলাটা হয়তো যথাযথ হবে না। এক্ষেত্রে বলা ভালো উদবাস্তু ঘটনাক্রম। তবে বিভিন্ন স্তরে একে সমস্যা হিসেবে চিহ্নায়িত করার এক প্রবণতা সদাই পরিলক্ষিত হয় সংশ্লিষ্ট পক্ষের রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিসন্ধিমূলক স্বার্থে। এযাবৎ এই একটি বিষয় নিয়ে বিশেষ করে এ অঞ্চলে যত লেখালেখি হয়েছে, যত বইপত্তর প্রকাশিত হয়েছে তা বোধহয় অন্য কোনো বিষয়ের উপর হয়নি। বিষয়টি তাই সততই লক্ষণীয়। সাহিত্যের অঙ্গনে এর মূল্যও অপরিসীম।  
সুতরাং বাউলা সঞ্জয় অর্থাৎ সঞ্জয় চন্দ্র দাস-এর আলোচ্য গ্রন্থ ‘বাস্তুহারার পদাবলি’ও স্বভাবতই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে উৎসাহী পাঠকের। গুয়াহাটির ঋতম পাবিলিকেশন্‌স্‌ থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থটির সাংকেতিক মানানসই প্রচ্ছদ ও অলংকরণের সৌজন্যে কমল ঘোষ। গ্রন্থটির সংক্ষিপ্ত মুখবন্ধে কবি তাঁর কবিতা লিখার ধারা নিয়ে এবং এই গ্রন্থ প্রকাশের স্বপ্ন নিয়ে কবিতায় নয় তবু বলা যায় এক কাব্যিক বর্ণনা পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন। এখানে আছে কিছু দীর্ঘ কবিতা, কিছু হ্রস্ব কবিতা এবং কিছু গদ্য কবিতাও। প্রায় প্রতিটি কবিতাই বিষয়ভিত্তিক। বেশির ভাগটাই স্মৃতিচারণামূলক হলেও কবিতার ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে অনন্ত দুঃখ ব্যথার বাখান। কিছু শব্দের প্রক্ষেপনে আছে কিছু মৃদু প্রতিবাদও কোনো কোনো কবিতায়।
গ্রন্থের প্রথম কবিতাই গ্রন্থনামের কবিতা - ‘বাস্তুহারার পদাবলি’। এখানে প্রথম ও শেষ দু’টি লাইন এরকম -
জমছে আঁধার কমছে আলো দুঃখখোরের সংসারে
বুকের মাঝে ফুঁসছে ব্যথা ফেনিয়ে ওঠা জোয়ারে -
…………
দুঃখগুলি হজম করে তবু আশার নেশায় চলি
বুকের মাঝে বাজছে শুধু বাস্তুহারার পদাবলি…
ব্যাকরণ মেনে ছন্দ না হলেও পুরো কবিতাটিই অন্ত্যমিলে রচিত। এবং বলা যায় এই একটি কবিতার মধ্য দিয়েই গ্রন্থের একটি নির্যাস অনুভূত হয়। একাধারে এই কবিতায় আছে আঁধার, দুঃখ, ব্যথা। তবু এক মৃদু প্রতিবাদের সুরও ধ্বনিত হয় নিবিড় পাঠে। অবশ্য এটাও ঠিক আজ পর্যন্ত এই বিষয়টি নিয়ে যত লেখা প্রকাশিত হয়েছে তার প্রায় পুরোটাই এই দুঃখ ব্যথার চর্বতচর্বণ বই আর কিছু নয়। উদবাস্তুর প্রকৃত কারণ তথা দেশভাগের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণের যারা কুশীলব তাঁদের বিরুদ্ধে সেভাবে জোরদার প্রতিবাদ ধ্বনিত প্রায় হয়নি বললেই চলে।
আলোচ্য গ্রন্থে কবি অবশ্য শুধু এই অঞ্চলের বাস্তুহারাদের কথাই বলেননি। বিশ্ব জুড়ে কালে কালে ঘটমান এই অমানবিকতার উল্লেখ করেছেন বিভিন্ন কবিতায়। উঠে এসেছে দীপরবিল, কাজিরাঙা থেকে শুরু করে সন্দ্বীপ, মরিশাস, সুন্দরবন, আমাজনও। উনিশে মে’র প্রেক্ষাপটে আছে বাস্তুহারাদের উপর নেমে আসা কালো অধ্যায়ের উল্লেখ। একটুখানি ব্যতিক্রম হিসেবে আছে একটি কবিতা কবির শিক্ষাগুরু সুভাষ দে স্মরণে।  
এটুকুতেই কবিতার বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায় স্পষ্ট করে। ‘জোছনা-জলের উপাখ্যান’ ছয়টি প্যারাগ্রাফে বর্ণিত বাস্তুহারা জীবনের এক বিস্তৃত প্রতিচ্ছবি। শব্দে, বাক্যে বর্ণনায় এক স্মৃতিময় জীবনের পদাবলি। ‘আঁধার-গাথা’য় কবি অনেকটাই সাহসী ও খোলামেলা। নির্মম বাস্তবকে এঁকেছেন এ অঞ্চলের বাস্তুহারাদের ভাগ্য বিড়ম্বনার বাখানে -
‘যখন আঁধার নামে বাস্তুহারার পায়ে -
মুহূর্তে সরে যায় উম্‌মাখা মাটি, ছিঁড়ে যায় আজন্ম শিকড়,
চোখে ওঠে ঘোলাটে জল, ঘামের স্বাদের মতো জল
আর, কষ্টের কাদায় মাখামাখি ভোরে তবু স্বপন দেখে -
দেশহীন এক স্বদেশ-ভূমির; তারপর -
সহজেই ঘাড়ে তুলে নেয় উদোর পিণ্ডি
আর, কপালে সেঁটে নেয় আজন্ম সিল-মোহর - কালা (…?) বঙাল। ……’
- মূর্ত হয়ে ওঠে কাঁটাতারের যন্ত্রণা, বিধ্বস্ত স্বপ্ন। আছে দু’টি গদ্য কবিতা - ‘স্মৃতিভূমির ইতিকথা’ ও ‘একটা ছাতার গল্প’। গদ্য কবিতা হলেও প্রতিটি লাইনেই জড়িয়ে আছে কাব্যময়তার ছোঁয়া। ভিন্ন প্রেক্ষাপটে লিখা এই দু’টি কবিতা নিশ্চিতভাবেই এ গ্রন্থের সম্পদ। দ্বিতীয় কবিতায় সংকীর্ণতার গণ্ডি পেরিয়ে অপরূপ ব্যঞ্জনায় ফুটে উঠেছে সমন্বয়ের সুর, নিরাশার বেড়াজাল ডিঙিয়ে এক আশার মায়াজাল। অনুরূপ ভাবে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে আছে আরোও ক’টি উল্লেখযোগ্য কবিতা। যেমন - ‘আমাদের বাড়ির পাশে একটা অরণ্য হোক’, ‘বাঁশ-ঝাড়ের শ্রান্ত-ছায়ায়’, ‘তিনটি ঋতুর কবিতা’, ‘শেওলা ধরা প্রেম’ ইত্যাদি। তবে দুঃখ ব্যথার পাশাপাশি এক জোরালো প্রতিবাদ যেন কাঙ্ক্ষিত হয়েই রয়ে যায় শেষ অবধি।
‘ড়’ ও ‘র’-এর বেশ কিছু জায়গায় পারস্পরিক স্থানচ্যুতির বাইরে বানান ও ছাপার ভুল প্রায় নেই বললেই চলে। পেপারব্যাকে আবদ্ধ গ্রন্থটি কবি উৎসর্গ করেছেন তাঁর ‘বাবা-কে’। সব মিলিয়ে এক গরজের কাব্যিক উপস্থাপন এই ‘বাস্তুহারার পদাবলি’।

- বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

‘বাস্তুহারার পদাবলি’
বাউলা সঞ্জয়
মূল্য - ১২০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৯৫৪৭৫৯৮০৩

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত স্মরণ সংখ্যা ‘আলোহাওয়া’

একটি লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটপত্রিকা হচ্ছে সমাজের সাহিত্যদর্পণ । শুধুই সমকালিক নয়। যুগান্তরের ভাষাসাহিত্য ও তার যুগন্ধর স্রষ্টাদের সঙ্গে সমকালকে পরিচিত করে দেওয়ার এক প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম। আর একের পর এক এই লক্ষ্যেই উৎকৃষ্টতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি শহর থেকে প্রকাশিত ‘ সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক ’ পত্রিকা ‘ আলোহাওয়া ’ । রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার ১৯তম সংখ্যা - ২৫তম বর্ষ , পৌষ ১৪৩২ - ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যা । কবি জিতেন্দ্র নাথ সম্পাদিত এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যিক ‘ তুষারকান্তি নাথ স্মরণ সংখ্যা ’ হিসেবে । তুষারকান্তি নাথ এমন একজন সাহিত্যিক যাঁকে আখ্যায়িত করা যায় একজন সার্বিক সাহিত্যিক হিসেবে। ধারে ও ভারে তাঁর সৃষ্টি শুধু বরাক উপত্যকাতেই নয় এর বাইরেও সমাদৃত। তাঁর লেখনী রত্নপ্রসবা। পক্ষান্তরে এটাও বলা যায় যে ঘরে বাইরে কিছু স্বীকৃতি , কিছু প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকলেও তাঁর লেখালেখি ও নানাবিধ সৃষ্টিকর্মের গভীরতার মূল্যায়ন যতটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল ততটা কিন্তু হয়নি। আসলে প্রান্তিকতা সততই লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের পরিচিতির পথে এক বৃহৎ অন্তরা...

প্রখর গরজ ও শ্রদ্ধায় নিবেদিত একটি ‘সুকান্ত সংখ্যা’ - শতদল

হাতে নিলে আর পাঁচটা নিয়মিত সংখ্যা পত্রিকার মতো মনে হলেও উত্তর ত্রিপুরার চুড়াইবাড়ী থেকে কবি, লেখক রতন চন্দ সম্পাদিত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ‘শতদল’ পত্রিকার সম্প্রতি প্রকাশিত ২৯তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, বৈশাখ ১৪৩৩, মে-২০২৬ (কবি সুকান্ত জন্মশতবর্ষ সংখ্যা) সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রমী। সেই মাত্র ৪২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক সংস্করণ হলেও প্রচ্ছদ থেকে শেষ পৃষ্ঠা অবধি যতন, গরজ ও উৎকর্ষের এক সম্ভার বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না মোটেও। বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র স্থান ধরে আছেন অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর সময়কাল থেকে আজ অবধি এবং আগত-অনাগত চিরকালীন এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী এই কবি মূলত একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেই সাহিত্যবিশ্বে পরিচিত হলেও তাঁর কবিতায় এর বাইরেও যে রয়ে গেছে বহুমাত্রিক এক বোধ, ভাষ্য - বোধ করি তার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি আজও। তবে যতই তাঁকে নিয়ে চর্চা হবে ততই এক এক করে খুলবে বিস্ময়ের ঝাঁপি এ কথা অনস্বীকার্য। এবং তারই এক নির্মোহ প্রয়াস ও প্রকাশ আলোচ্য সংখ্যাটি। সুসজ্জিত কবি-প্রতিকৃতিযুক্ত একটি নান্দনিক প্রচ্ছদ - সজ্জায়, বর্ণ সংস্থাপনে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য পাঠকের। সৌজন্যে মুদ...