Skip to main content

গৌতম বসুর কবিতাবিশ্ব বিষয়ক ‘জলদগ্ধ লিপি’


১৭৮ পৃষ্ঠার গ্রন্থের দ্বিতীয় ব্লার্বে গ্রন্থকার গৌতম মণ্ডলকে কবি ও প্রাবন্ধিক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে যদিও আলোচ্য গ্রন্থটিকে মূলত একটি আলোচনা গ্রন্থ হিসেবেই অভিহিত করা যায়। কবি গৌতম বসুর কবিতার যাবতীয় অধ্যয়নসঞ্জাত এই গ্রন্থে আছে মোট পাঁচটি অধ্যায়। এর মধ্যে প্রথম অধ্যায় অর্থাৎ ‘গৌতম বসুর কবিতাবিশ্ব’ই হচ্ছে প্রধান রচনা - যা আলোচ্য কবির কবিতাবিশ্বের যাবতীয় প্রকাশিত কবিতার চুলচেরা বিশ্লেষণ। এই একটি রচনার মাধ্যমেই গ্রন্থকার গৌতম মণ্ডলকে অনায়াসে আমরা আলোচক হিসেবেই উল্লেখ করতে পারি, তাঁর নিজের মতোই। দশটি কাব্যগ্রন্থ, বহু প্রবন্ধ-নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার যাঁর মুকুটে তাঁর চাইতে বেশি উপযুক্ত আলোচক আর কেই বা হতে পারেন। সুতরাং গৌতম বসুর কবিতাবিশ্বে সবচেয়ে বেশি, সবচেয়ে গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম আলোচক হিসেবে গ্রন্থকার গৌতম মণ্ডলই হচ্ছেন যোগ্যতম ব্যক্তি।
অথচ… গৌতম বসুর কবিতাকে আত্মস্থ করতে গিয়ে আলোচক গৌতম মণ্ডল কবিকে যতটা আবিষ্কার করেছেন ঠিক ততটাই যেন নিমজ্জিত হয়েছেন অনাবিষ্কারের দোদুল্যমানতায়। আলোচক লিখছেন - ‘গৌতমের কবিতা কোনোভাবেই একরৈখিক ও মসৃণ নয়। বহুস্তরীয়। তাঁর কবিতায় আছে চূর্ণ চূর্ণ ভাবনা আর শব্দচিত্র। আছে বাচ্যার্থকে অতিক্রম করতে চাওয়ার একটা প্রয়াস। বিমূর্ততা। তবে কেন্দ্রীয় কোনো চেতনা যে নেই, তা নয় কাজ করে। আছে এবং সেটা হল অন্নভাবনা। খরা, বন্যা এবং হাহাকার। হিউম্যান সাফারিং। আর আছে পুরাণের অনুষঙ্গ।’ আবার অন্যখানে আলোচক লিখছেন - ‘প্রতিটি পাঠের শেষে কিছু না কিছু যেমন আবিষ্কার করি, তেমনি একটা অতৃপ্তিও। অনেক কবিতায় প্রবেশ করতে পারলেও তাকে সম্পূর্ণরূপে ভেদ করতে পারি না......।’ গৌতম বসুর কবিতার বিশ্বকে ভেদ করতে গিয়ে আলোচকের এই নির্ভেজাল স্বীকারোক্তি এবং পাশাপাশি নিজেকেও আবিষ্কার করতে পারার এক অনবদ্য প্রতিবেদন এই গ্রন্থ। কবিতায় ব্যবহৃত কাব্য ভাবনার, চরিত্রের, পঙ্‌ক্তিসমূহের, শব্দের, প্রতিটি যতিচিহ্নের এমনকি শব্দের মধ্যেকার শূন্য অংশেরও গভীর তাত্ত্বিক, নির্মোহ তথা প্রজ্ঞাসঞ্জাত বিশ্লেষণ ঋদ্ধ করেছে আলোচনাকে।   
প্রথম অধ্যায়ে কবি গৌতম বসুর প্রকাশিত মোট নয়টি কাব্যগ্রন্থেরই আলোচনা করেছেন আলোচক গৌতম মণ্ডল। কাব্যগ্রন্থগুলি হল - ‘অন্নপূর্না ও শুভকাল’, ‘অতিশয় তৃণাঙ্কুর পথে’, ‘রসাতল’, ‘নয়নপথগামী’, ‘স্বর্ণগরুড়চূড়া’, ‘মঞ্জুশ্রী’, ‘জরাবর্গ’, ‘সুকুমারীকে না-বলা কথা’ এবং ‘লয়’। এর মধ্যে কয়েকটিকে আলোচক ‘পুস্তিকা’ হিসেবে যুক্তি সহ অভিহিত করেছেন। প্রতিটি গ্রন্থ বা পুস্তিকারই শিরোনাম সহ অধিকাংশ কবিতার অন্দরে প্রবেশ করে আলোচক তুলে আনতে সচেষ্ট এবং সক্ষম হয়েছেন অপরূপ নৈপুণ্যে। বহু ক্ষেত্রে যদিও স্বতঃপ্রণোদিত কী এবং কেন-র উত্তরে আলোচক বহুলাংশে ধারণানির্ভর হয়ে বিশ্লেষণ করেছেন আসন্ন সম্ভাব্যতা। এর বাইরে উপায়ও ছিল না।
দ্বিতীয় অধ্যায় - ‘প্রসঙ্গ : অগ্রন্থিত কবিতা’। এখানে আছে কবি গৌতম বসুর অপছন্দের কবিতাগুলোকে স্বহস্তে বাতিল করার ঘটনা এবং পাশাপাশি অগ্রন্থিত কবিতাকে উদ্ধার করে তার আলোচনা ও প্রকাশের মতো গভীর অধ্যবসায়জনিত এক অনবদ্য শ্রদ্ধার্ঘ্য প্রদানের চমকপ্রদ বৃত্তান্ত। একজন আলোচক শুধু লেখালেখির মধ্যে নিজেকে আটকে না রেখে কষ্ট স্বীকার করে এমন কাজে আত্মিনিয়োগ করার এমন উদাহরণ সত্যিকার অর্থেই বিরল।
তৃতীয় অধ্যায় - ‘সাক্ষাৎকারসংগ্রহ’। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত ভিন্ন ভিন্ন সাক্ষাৎকার সংগ্রাহকের সংগৃহীত সাক্ষাৎকারের বিস্ত্রৃত এক তথ্যপূর্ণ প্রতিবেদন।
চতুর্থ অধ্যায় - ‘সাক্ষাৎকার’। আলোচকের দ্বারা কবি গৌতম বসুর সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকার। ২০১৭ সালে নেওয়া এই লিখিত সাক্ষাৎকারটি ‘শমী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এই পর্বে কবি গৌতম বসু তাঁর কবিতা ভাবনা, প্রতিটি গ্রন্থের মূল ভাব তথা তাঁর পছন্দ অপছন্দ আদি বিষয়ে নিজেকে মেলে ধরেছেন অবারিত করে। কবি, কবিতা ও কাব্যভাবনার আধারে এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার।
শেষ অধ্যায়ে আছে প্রকাশিত গ্রন্থের তথ্যপঞ্জি। এখানে কবিতার নাম সহ প্রতিটি গ্রন্থের যাবতীয় তথ্যাদি সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এই গ্রন্থ কবি গৌতম বসুর কবিতা সম্পর্কিত এক সম্পূর্ণ দলিল। ছাপা ও অক্ষরবিন্যাস যথাযথ। ‘আদম’ প্রকাশিত গ্রন্থটির প্রাসঙ্গিক শোভন প্রচ্ছদের সৌজন্যে শোভন পাত্র। গুটিকয়েক বানান, অবোধ্য প্রথম ব্লার্ব এবং সূচিপত্রে ভুল পৃষ্ঠাসংখ্যার উল্লেখের বাইরে এক অতি সুখপাঠ্য এবং অধ্যবসায়জনিত রুচিশীল সংকলন এই গ্রন্থ।
এই বিশাল আয়োজনের শেষপর্বে আলোচক লিখছেন - ‘গৌতম বসুর কবিতা নিয়ে মোটামুটি একটা রূপরেখা তৈরি করা গেল। কিন্তু প্রকৃতই কি গেল ?’ কবি এবং সার্বিকভাবেই আধুনিক কবিতার বিশ্লেষণে বোধ করি এই প্রশ্নচিহ্নটিই শেষ কথা।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

 

জলদগ্ধ লিপি গৌতম বসুর কবিতাবিশ্ব
গৌতম মণ্ডল
প্রকাশক - আদম, কলকাতা
মূল্য - ৩০০ টাকা

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত স্মরণ সংখ্যা ‘আলোহাওয়া’

একটি লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটপত্রিকা হচ্ছে সমাজের সাহিত্যদর্পণ । শুধুই সমকালিক নয়। যুগান্তরের ভাষাসাহিত্য ও তার যুগন্ধর স্রষ্টাদের সঙ্গে সমকালকে পরিচিত করে দেওয়ার এক প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম। আর একের পর এক এই লক্ষ্যেই উৎকৃষ্টতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি শহর থেকে প্রকাশিত ‘ সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক ’ পত্রিকা ‘ আলোহাওয়া ’ । রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার ১৯তম সংখ্যা - ২৫তম বর্ষ , পৌষ ১৪৩২ - ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যা । কবি জিতেন্দ্র নাথ সম্পাদিত এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যিক ‘ তুষারকান্তি নাথ স্মরণ সংখ্যা ’ হিসেবে । তুষারকান্তি নাথ এমন একজন সাহিত্যিক যাঁকে আখ্যায়িত করা যায় একজন সার্বিক সাহিত্যিক হিসেবে। ধারে ও ভারে তাঁর সৃষ্টি শুধু বরাক উপত্যকাতেই নয় এর বাইরেও সমাদৃত। তাঁর লেখনী রত্নপ্রসবা। পক্ষান্তরে এটাও বলা যায় যে ঘরে বাইরে কিছু স্বীকৃতি , কিছু প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকলেও তাঁর লেখালেখি ও নানাবিধ সৃষ্টিকর্মের গভীরতার মূল্যায়ন যতটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল ততটা কিন্তু হয়নি। আসলে প্রান্তিকতা সততই লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের পরিচিতির পথে এক বৃহৎ অন্তরা...

প্রখর গরজ ও শ্রদ্ধায় নিবেদিত একটি ‘সুকান্ত সংখ্যা’ - শতদল

হাতে নিলে আর পাঁচটা নিয়মিত সংখ্যা পত্রিকার মতো মনে হলেও উত্তর ত্রিপুরার চুড়াইবাড়ী থেকে কবি, লেখক রতন চন্দ সম্পাদিত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ‘শতদল’ পত্রিকার সম্প্রতি প্রকাশিত ২৯তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, বৈশাখ ১৪৩৩, মে-২০২৬ (কবি সুকান্ত জন্মশতবর্ষ সংখ্যা) সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রমী। সেই মাত্র ৪২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক সংস্করণ হলেও প্রচ্ছদ থেকে শেষ পৃষ্ঠা অবধি যতন, গরজ ও উৎকর্ষের এক সম্ভার বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না মোটেও। বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র স্থান ধরে আছেন অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর সময়কাল থেকে আজ অবধি এবং আগত-অনাগত চিরকালীন এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী এই কবি মূলত একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেই সাহিত্যবিশ্বে পরিচিত হলেও তাঁর কবিতায় এর বাইরেও যে রয়ে গেছে বহুমাত্রিক এক বোধ, ভাষ্য - বোধ করি তার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি আজও। তবে যতই তাঁকে নিয়ে চর্চা হবে ততই এক এক করে খুলবে বিস্ময়ের ঝাঁপি এ কথা অনস্বীকার্য। এবং তারই এক নির্মোহ প্রয়াস ও প্রকাশ আলোচ্য সংখ্যাটি। সুসজ্জিত কবি-প্রতিকৃতিযুক্ত একটি নান্দনিক প্রচ্ছদ - সজ্জায়, বর্ণ সংস্থাপনে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য পাঠকের। সৌজন্যে মুদ...