Skip to main content

নির্মোহ সারল্যে ভরপুর প্রতীতি - ‘কবিতা তোমায় ভালোবেসে’


শক্তপোক্ত পেপারব্যাকের মধ্যে ছয় বাই নয়ের ২৬ পৃষ্ঠাজোড়া গ্লসি মোটা কাগজ জুড়ে কুড়িটি কবিতা। সবক’টি কবিতাই প্রায় পৃষ্ঠাজোড়া। বরাক কিংবা উত্তরপূর্বের কবিতাবিশ্বে চান্দ্রেয়ী দেব কনিষ্ঠ কবিদের মধ্যে অন্যতম। আপন নিষ্ঠা ও কবিতার প্রতি অনতিক্রম্য ভালোবাসার জেরে, প্রাতিষ্ঠানিক কাব্যশিক্ষাবিহীন, কাণ্ডারিবিহীন (পড়ুন প্রাতিষ্ঠানিক অভিভাবকত্বহীন) তরীর একেলা যাত্রী।
সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কবিতা তোমায় ভালোবেসে’। নান্দনিক একটি প্রচ্ছদ প্রথমেই নজর কাড়ে যদিও প্রচ্ছদশিল্পীর নাম কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। যেমন পাওয়া গেল না প্রতি পাতার আবছায়া অলংকরণের শিল্পীর নামও। শেষ প্রচ্ছদে রয়েছে সংক্ষিপ্ত সচিত্র কবি-পরিচিত। গ্রন্থের প্রকাশক কবি নিজে হলেও সম্পাদনায় রয়েছেন তাঁর মা শ্যামলী দেব ও বাবা চন্দন দেব। কবি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থটি সচিত্র উৎসর্গ করেছেন ‘দাদুভাই’ পীযূষকান্তি চাকি ও ‘আম্মা’ সুধারাণী দেবকে। পরবর্তী পৃষ্ঠায় শুভেচ্ছা বার্তাস্বরূপ অভিনন্দন পত্র লিখেছেন প্রাক্তন অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য, প্রাক্তন শিক্ষিকা দেবী দাসগুপ্ত ও অপর্ণা ভৌমিক। নিখাদ সম্পাদকীয়তে কন্যার কবিতাপ্রীতির বিষয়ে উৎসাহব্যঞ্জক বার্তা দিয়েছেন দুই সম্পাদক। কবির তরফে অবশ্য কোনও ভূমিকা নেই এখানে।
এ তো গেল গৌরচন্দ্রিকা। দেখা যাক গ্রন্থমধ্যে কেমন ছড়িয়েছে কবিতার সৌরভ। দেখা যাচ্ছে প্রথম কবিতা ‘প্রেমময় ঠাকুর’ থেকে শুরু করে শেষ কবিতা ‘সময়টা শুধু আমারই থাক’ অবধি যেন কবিতাপথের এক প্রত্যয়িত যাত্রার সূচনা হয়েছে, যে যাত্রা চলবে নিরন্তর। নিজের পরিচিতি, নিজের ভাবনা ভালোবাসা, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, পরিচিত পরিবেশের বর্ণনা আর কবিতার প্রতি অমোঘ ভালোবাসারই কাব্যিক উপস্থাপনা এই কাব্যগ্রন্থ। ভালোবাসার একান্ত তাগিদে গড়ে ওঠা কবিতাগুলোর কাব্যমান এখানে বিচার্য হতে পারে না। তবু চান্দ্রেয়ীর কবিতায় কি সেসব নেই ? হয়তো আছে চৌদ্দ আনাই। ষোলো আনার পথে এই কাব্যগ্রন্থ এক ভিত্তি মাত্র। অধিকাংশ কবিতাতেই কবি নিজেকে উন্মুক্ত করেছেন নির্মোহ সারল্য ও বয়সোচিত পারঙ্গমতায়। অন্তত এমন ইঙ্গিত অনায়াসে খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর ‘ডেকে যায় শৈশব’, ‘কিচ্ছু চাইনি আমি’, ‘তাঁরা আছেন ভালো’, ‘আমি হতে চাই’ ইত্যাদি কবিতার স্তবকে স্তবকে। কিছু পঙক্তি ইঙ্গিত দিয়ে রাখে সেই সুন্দরতর পথের -
একদল মেঘেরা মিলে দল গড়ে/ নীল আকাশের তেপান্তরে/ এপার হতে আমি শামিল হতে চাই/ তাদের এক সহোদর হয়ে -/ চল না - আমরা বন্ধু হয়ে যাই...। (কবিতা - বন্ধু মেঘ)। কিংবা - আমি হতে চাই বৃষ্টির ধারা/ মেঘেরা আক্রোশে লুটিয়ে পড়বে/ অঝোরে ধরার বুকে...।/ আমি হতে চাই পূর্ণিমার জোছনা/ যার আঁচলে জড়িয়ে রাখব তোমায়/ অমাবস্যার আঁধার থেকে...। (কবিতা - আমি হতে চাই)।
ছাপার আপাত অস্পষ্টতা, ছন্দযুক্ত কবিতার অভাব এবং কিছু গদ্যশব্দের প্রয়োগ - এসব কাটিয়ে যথাযথ পরিশীলনে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রতীতি, আভাস খুঁজলেই পাওয়া যাবে চান্দ্রেয়ীর কবিতায়।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

মূল্য - ৫০ টাকা, যোগাযোগ - ৯৯৫৪৫৫৯১৪৯ 

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত স্মরণ সংখ্যা ‘আলোহাওয়া’

একটি লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটপত্রিকা হচ্ছে সমাজের সাহিত্যদর্পণ । শুধুই সমকালিক নয়। যুগান্তরের ভাষাসাহিত্য ও তার যুগন্ধর স্রষ্টাদের সঙ্গে সমকালকে পরিচিত করে দেওয়ার এক প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম। আর একের পর এক এই লক্ষ্যেই উৎকৃষ্টতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি শহর থেকে প্রকাশিত ‘ সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক ’ পত্রিকা ‘ আলোহাওয়া ’ । রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার ১৯তম সংখ্যা - ২৫তম বর্ষ , পৌষ ১৪৩২ - ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যা । কবি জিতেন্দ্র নাথ সম্পাদিত এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যিক ‘ তুষারকান্তি নাথ স্মরণ সংখ্যা ’ হিসেবে । তুষারকান্তি নাথ এমন একজন সাহিত্যিক যাঁকে আখ্যায়িত করা যায় একজন সার্বিক সাহিত্যিক হিসেবে। ধারে ও ভারে তাঁর সৃষ্টি শুধু বরাক উপত্যকাতেই নয় এর বাইরেও সমাদৃত। তাঁর লেখনী রত্নপ্রসবা। পক্ষান্তরে এটাও বলা যায় যে ঘরে বাইরে কিছু স্বীকৃতি , কিছু প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকলেও তাঁর লেখালেখি ও নানাবিধ সৃষ্টিকর্মের গভীরতার মূল্যায়ন যতটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল ততটা কিন্তু হয়নি। আসলে প্রান্তিকতা সততই লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের পরিচিতির পথে এক বৃহৎ অন্তরা...

প্রখর গরজ ও শ্রদ্ধায় নিবেদিত একটি ‘সুকান্ত সংখ্যা’ - শতদল

হাতে নিলে আর পাঁচটা নিয়মিত সংখ্যা পত্রিকার মতো মনে হলেও উত্তর ত্রিপুরার চুড়াইবাড়ী থেকে কবি, লেখক রতন চন্দ সম্পাদিত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ‘শতদল’ পত্রিকার সম্প্রতি প্রকাশিত ২৯তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, বৈশাখ ১৪৩৩, মে-২০২৬ (কবি সুকান্ত জন্মশতবর্ষ সংখ্যা) সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রমী। সেই মাত্র ৪২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক সংস্করণ হলেও প্রচ্ছদ থেকে শেষ পৃষ্ঠা অবধি যতন, গরজ ও উৎকর্ষের এক সম্ভার বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না মোটেও। বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র স্থান ধরে আছেন অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর সময়কাল থেকে আজ অবধি এবং আগত-অনাগত চিরকালীন এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী এই কবি মূলত একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেই সাহিত্যবিশ্বে পরিচিত হলেও তাঁর কবিতায় এর বাইরেও যে রয়ে গেছে বহুমাত্রিক এক বোধ, ভাষ্য - বোধ করি তার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি আজও। তবে যতই তাঁকে নিয়ে চর্চা হবে ততই এক এক করে খুলবে বিস্ময়ের ঝাঁপি এ কথা অনস্বীকার্য। এবং তারই এক নির্মোহ প্রয়াস ও প্রকাশ আলোচ্য সংখ্যাটি। সুসজ্জিত কবি-প্রতিকৃতিযুক্ত একটি নান্দনিক প্রচ্ছদ - সজ্জায়, বর্ণ সংস্থাপনে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য পাঠকের। সৌজন্যে মুদ...