Skip to main content

রাবীন্দ্রিক ভাবনায় নিবেদিত বৈচিত্রময় সম্ভার - ‘রবিয়ানা’ দ্বিতীয় সংকলন


যথেষ্ট মোটা কাগজ, ফন্ট এবং লাইন স্পেসিংও যথাযথ। ফলে ৮৩ পৃষ্ঠার পত্রিকাটি আপাতদৃষ্টিতে দেখলে মনে হবে সীমিত সংখ্যক বিষয় সন্নিবিষ্ট বইটি নিমেষেই না হলেও অন্তত সহজেই পড়ে শেষ করে ফেলা যাবে। কিন্তু আদপেই তা নয়। একের পর এক গদ্য ও পদ্যের সম্ভার এই পত্রিকা মোটেও একপঠনে শেষ হবার নয়।
‘রবিয়ানা’ দ্বিতীয় সংকলন। মরিয়নির (পত্রিকায় অবশ্য বানানটি মরিয়ানি হিসেবে লেখা আছে) রবিয়ানা সংগঠনের মুখপত্র তথা সাহিত্য পত্রিকা সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে সংগঠনটির গুয়াহাটি শাখার তত্ত্বাবধানে, রাজ্যের রাজধানী শহর গুয়াহাটিতে। প্রকাশকাল জুন ২০২৪ বলে লেখা আছে যদিও সম্ভবত খানিকটা দেরি হয়েছে প্রকাশিত হয়ে পাঠকের দরবারে পৌঁছে যেতে। শক্ত মলাটের পেপারব্যাক সংকলনটির গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যাবে একটি ছোট পত্রিকার যাবতীয় বৈশিষ্ট্য ও আঙ্গিক। কিছু লেখা যেমন তথ্য ও তত্ত্বভিত্তিক ঠিক তেমনি কিছু নবীন কবি-লেখকদেরও দেওয়া হয়েছে সুযোগ। এ সংখ্যার সম্পাদক গীতাঞ্জলী রায় ও অনুপ কুমার রায় (কলকাতা)। সম্পাদকীয়তে গীতাঞ্জলী লিখছেন - ‘...কলকল স্রোতে বাঙালি অবাঙালি সবার বুকের ভেতর রবীন্দ্রনাথ বইছেন নিজগুণে। সংস্কৃতি আর নবনির্মাণের এই অবগুণ্ঠনের জিয়নকাঠি মুঠোয় ভরে রবিয়ানা দ্বিতীয়বার একটি সংকলন বের করার পদক্ষেপ নিয়েছে, যার দায়ভার দিয়েছে আমার হাতে...।’ ‘রবিয়ানা’ আগাগোড়া একটি রাবীন্দ্রিক সংস্থা। স্বভাবতই রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা হয়েছে অধিকাংশ লেখা। তবে সাহিত্য পত্রিকার বৈশিষ্ট্য ও দায়ভারকে অবহেলা করে নয়।
সংকলনটিতে রয়েছে গদ্য-পদ্য-নিবন্ধের সমাহার যদিও বিন্যস্ত নয় বিভাগ। প্রথমেই ‘রবিয়ানার ইতিবৃত্ত’ লিখেছেন বিপ্লব ঘোষ। ‘দুই বিঘা জমি’ অবলম্বনে সমরেশ চক্রবর্তীর নাটক ‘বাস্তুহারা উপেন’ একটি উৎকৃষ্ট রচনা। দেবীপ্রিয়া ব্যানার্জীর নিবন্ধ ‘রবীন্দ্র চেতনায় নারী’, বিষয়কে ছুঁয়ে এক সংক্ষিপ্ত আলোকপাত বলা যায়। বিভাস দে লিখেছেন ‘বিশ্বের কবি আমাদের রবি’ যা রবিয়ানার রবীন্দ্র-প্রণাম অনুষ্ঠানের সূচনা সহ একটি গরজের প্রতিবেদন। সুবীর দাশগুপ্তের ‘পৃথিবীর অনুশাসন’ পরিবেশ ও প্রকৃতিবিষয়ক এক সংক্ষিপ্ত সচিত্র প্রতিবেদন। দেবলীনা সেনগুপ্তের ‘রবির শিশু ও শিশুর রবি’ শীর্ষক নিবন্ধটি যথেষ্ট মনোগ্রাহী হয়েছে। একটি শিশুর জীবন ও তার বেড়ে ওঠা নিয়ে রবীন্দ্রসৃষ্টি ও রবীন্দ্রভাবনার প্রকাশ। শুভেন্দু ব্যানার্জী লিখেছেন ‘প্রদীপ প্রজ্বলন ও তার গুরুত্ব’ নিয়ে। মন্ত্রাদির উল্লেখে লেখা একটি ব্যতিক্রমী নিবন্ধ যদিও ‘প্রজ্বলন’ শব্দটির বানানা অসংশোধিত রয়ে গেছে। মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম-এর নিবন্ধ ‘স্ত্রীর পত্র ছোটগল্পে নারীচেতনা’ তথ্যাদি সম্বলিত একটি বিস্তৃত মূল্যবান রচনা। ‘কবিগুরুর নৃত্য ভাবনা’ দেবী চন্দের একটি সুলিখিত নিবন্ধ। অযান্ত্রিক-এর ‘আফ্রিকা’ ছোটগল্প এক কথায় ব্যতিক্রমী ভাবনার ফসল এবং স্বভাবতই অনবদ্য। গল্প বিভাগে রয়েছে আরও দুটি গল্প। বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর ‘ধরিত্রীপুত্র’ ও দিবাকর ভট্টাচার্যের ‘পাহাড়ের সড়কে আত্মহত্যা’। শেষোক্ত গল্পটি অণুগল্প যদিও হয়ে উঠতে পারত একটি বিস্তৃত রহস্য-গল্প। কবিগুরুর জীবনে আগত দুঃখশোকের বহুপঠিত তথ্যের সম্যক উল্লেখ সহ সুমন দে’র অণুনিবন্ধ ‘দুঃখ কাকে বলে’ একটি সুসংহত, গোছানো রচনা। সুরঞ্জন রায় লিখেছেন ‘রবিয়ানা মরিয়ানি - আমার প্রথম অভিজ্ঞতা’। এমনই অভিজ্ঞতাপ্রসূত প্রতিবেদন লিখেছেন শিল্পী ও সাংবাদিক জয়নারায়ন রায় - ‘রবীন্দ্রনাথ ও রবিয়ানা : এক অবিরত যাত্রা’ এবং প্রলয় রায় - ‘রবিয়ানা অভিজ্ঞতা’। জয়িতা সেন-এর ‘পুরুষ, তুমি কেনো এমন !’ একজন পুরুষের বেড়ে ওঠার পথে পরিবার ও সমাজের বিসংগতিপূর্ণ আচরণের উপর এক পুত্র সন্তানের জননীর প্রতিবেদন। অশোক ভট্টাচার্যের ‘অন্য এক রবীন্দ্রনাথ’ ব্যক্তি-রবীন্দ্রনাথের জীবনের কিছু রসঘন ঘটনাবলির সুচয়িত নিবন্ধ। শেষ পাতায় রয়েছে বিখ্যাত সংগীত শিল্পী সৌমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে একটি শুভেচ্ছা বার্তা। লিখেছেন সুবীর দাশুগুপ্ত।
ত্রিভাষিক এই পত্রিকার ইংরেজি বিভাগে রয়েছে অভিষেক সেনগুপ্তের এক পৃষ্ঠার নিবন্ধ ‘Tagore and his musicality’, সুদীপ দাশগুপ্তের ‘Childhood Address’, নন্দিনী রায়ের ‘You’ ও সুমনা নন্দীর ‘An appeal to Womenhood’. এছাড়াও রয়েছে দুটি ইংরেজি কবিতা। লিখেছেন দীপশিখা সেনগুপ্ত ও অভিষেক মজুমদার। অসমিয়া বিভাগে রয়েছে তুলনামূলক সাহিত্য বিষয়ক একটি চমৎকার নিবন্ধ। মনোজ কুমার শর্মার ‘বিশ্বকবি আরু সাহিত্যরথীর দুটা গল্পর সাদৃশ্য সন্ধান’। প্রেক্ষিতে বিশ্লেষিত হয়েছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প ‘ছুটি’ ও সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার ছোটগল্প ‘মুক্তি’। এই নিবন্ধে এক বৃহৎ অংশের পুনর্মুদ্রণের ফলে খেই হারিয়ে যেতে পারে নিমগ্ন পঠনে। এছাড়া কবিগুরুর ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’ গানটির যাথার্থ্য বজায় রেখে অসমিয়া রূপান্তর করেছেন কুমুদ ঘোষ।
কবিতা বিভাগে বাংলা কবিতায় মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন অনুপ ধর, গীতাঞ্জলী রায়, প্রদীপ গুপ্ত, সুব্রত ভট্টাচার্য (ঋক তান), বিন্দি ভৌমিক (শিরোনামে বানান ভুল রয়ে গেছে), সোমা মুখার্জী, শিবানী বাগচী (তিনটি কবিতা), স্বদেশরঞ্জন মণ্ডল ও বিশাল কর্মকার। এই পর্বে এ ছাড়াও রয়েছে রূপম চক্রবর্তী, অশোক দাস ও কৌস্তভ বসুর কবিতা।
প্রচ্ছদচিত্র আবছা হলেও প্রাসঙ্গিক। সব মিলিয়ে নান্দনিক অলংকরণ, স্পষ্ট ছাপা তথা বৈচিত্রপূর্ণ বিষয়ের সমন্বয়ে এক প্রতিশ্রুতির উপস্থাপন - রবিয়ানা দ্বিতীয় সংকলন।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
মূল্য - ১৬০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৩৬৫৮৩০৬২১

Comments

  1. অত্যন্ত প্রশংসনীয় একটি বিশ্লেষণ পড়লাম আপনার,
    বইয়ের এমন পরিব্রাজক আজকাল খুব কম পাই,
    তাই আন্তরিক ধন্যবাদ ও সাধুবাদ জানাই 💐💐

    ReplyDelete
  2. খুব খুশি হলাম। অনেক অনেক ধন্যবাদ।
    কিন্তু মুশকিল হল এই যে এখানে কমেন্টদাতার নাম আসে না। তাই বুঝতে পারি না কে লিখলেন।
    এখানে নামটা লিখে জানালে খুশি হব।

    ReplyDelete
  3. খুব সুন্দর উপস্থাপনা করেছেন দাদা।

    ReplyDelete
  4. ধন্যবাদ, দাদা, দেবলীনা

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত স্মরণ সংখ্যা ‘আলোহাওয়া’

একটি লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটপত্রিকা হচ্ছে সমাজের সাহিত্যদর্পণ । শুধুই সমকালিক নয়। যুগান্তরের ভাষাসাহিত্য ও তার যুগন্ধর স্রষ্টাদের সঙ্গে সমকালকে পরিচিত করে দেওয়ার এক প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম। আর একের পর এক এই লক্ষ্যেই উৎকৃষ্টতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি শহর থেকে প্রকাশিত ‘ সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক ’ পত্রিকা ‘ আলোহাওয়া ’ । রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার ১৯তম সংখ্যা - ২৫তম বর্ষ , পৌষ ১৪৩২ - ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যা । কবি জিতেন্দ্র নাথ সম্পাদিত এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যিক ‘ তুষারকান্তি নাথ স্মরণ সংখ্যা ’ হিসেবে । তুষারকান্তি নাথ এমন একজন সাহিত্যিক যাঁকে আখ্যায়িত করা যায় একজন সার্বিক সাহিত্যিক হিসেবে। ধারে ও ভারে তাঁর সৃষ্টি শুধু বরাক উপত্যকাতেই নয় এর বাইরেও সমাদৃত। তাঁর লেখনী রত্নপ্রসবা। পক্ষান্তরে এটাও বলা যায় যে ঘরে বাইরে কিছু স্বীকৃতি , কিছু প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকলেও তাঁর লেখালেখি ও নানাবিধ সৃষ্টিকর্মের গভীরতার মূল্যায়ন যতটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল ততটা কিন্তু হয়নি। আসলে প্রান্তিকতা সততই লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের পরিচিতির পথে এক বৃহৎ অন্তরা...

প্রখর গরজ ও শ্রদ্ধায় নিবেদিত একটি ‘সুকান্ত সংখ্যা’ - শতদল

হাতে নিলে আর পাঁচটা নিয়মিত সংখ্যা পত্রিকার মতো মনে হলেও উত্তর ত্রিপুরার চুড়াইবাড়ী থেকে কবি, লেখক রতন চন্দ সম্পাদিত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ‘শতদল’ পত্রিকার সম্প্রতি প্রকাশিত ২৯তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, বৈশাখ ১৪৩৩, মে-২০২৬ (কবি সুকান্ত জন্মশতবর্ষ সংখ্যা) সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রমী। সেই মাত্র ৪২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক সংস্করণ হলেও প্রচ্ছদ থেকে শেষ পৃষ্ঠা অবধি যতন, গরজ ও উৎকর্ষের এক সম্ভার বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না মোটেও। বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র স্থান ধরে আছেন অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর সময়কাল থেকে আজ অবধি এবং আগত-অনাগত চিরকালীন এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী এই কবি মূলত একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেই সাহিত্যবিশ্বে পরিচিত হলেও তাঁর কবিতায় এর বাইরেও যে রয়ে গেছে বহুমাত্রিক এক বোধ, ভাষ্য - বোধ করি তার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি আজও। তবে যতই তাঁকে নিয়ে চর্চা হবে ততই এক এক করে খুলবে বিস্ময়ের ঝাঁপি এ কথা অনস্বীকার্য। এবং তারই এক নির্মোহ প্রয়াস ও প্রকাশ আলোচ্য সংখ্যাটি। সুসজ্জিত কবি-প্রতিকৃতিযুক্ত একটি নান্দনিক প্রচ্ছদ - সজ্জায়, বর্ণ সংস্থাপনে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য পাঠকের। সৌজন্যে মুদ...