Skip to main content

চেনা প্লটে অচেনা বয়ানের উপন্যাস - ‘মাটির কাব্য’


কাব্য শব্দটির বহুল প্রচলিত অর্থ যদিও কাব্যগ্রন্থ বা দীর্ঘ পদ্যরচনা কিন্তু এই শব্দের মূল অর্থ হচ্ছে ‘গদ্য বা পদ্যে রচিত ভাবাশ্রয়ী রসাত্মক রচনা’। অর্থাৎ একটি গদ্যকেও উপযুক্ত অর্থে কাব্য বলা যেতেই পারে। এবং সেই সূত্রে একটি উপন্যাসের শিরোনাম ‘মাটির কাব্য’ও হতেই পারে, যেখানে মাটির গন্ধ, মাটির সুখ দুঃখই উপন্যাসের দীর্ঘ ও প্রধান উপজীব্য বিষয়।
নারায়ণ মোদক বরাক উপত্যকার বাসিন্দা। যতটুকু কবি, লেখক তার চাইতেও বেশি পরিচিত একজন সফল সম্পাদক হিসেবে। এর আগেও তাঁর একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। সেই অর্থে তিনি ঔপন্যাসিকও। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘মাটির কাব্য’। ১৫৮ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসকে একটি নিখাদ সামাজিক উপন্যাস হিসেবেই শ্রেণিভুক্ত করা সংগত হবে বলে মনে হয় যদিও বিভিন্ন অনুষঙ্গ এসেছে কাহিনিরই খাতিরে। দেশভাগ পরবর্তী সময়ে দেশান্তরী উদ্‌বাস্তু জীবনের টিকে থাকার লড়াইকে কেন্দ্র করেই মূলত এই উপন্যাস।
দেশভাগের বিড়ম্বনায় হিন্দু বাঙালির দুঃখ দুর্দশার করুণ কাহিনি গল্প, কবিতা, উপন্যাসে প্রচুর লেখা হয়েছে। এখনও হচ্ছে এবং সামাজিক মাধ্যমে ও সাহিত্য পরিমণ্ডলে খুব গুরুত্ব সহকারে সেসব বিবেচ্য হচ্ছে আজও। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এটাই যে তার প্রায় একশো ভাগ রচনাতেই একতরফা দুঃখ দুর্দশার কাহিনিই বর্ণিত হয়েছে, হচ্ছে। কোথাও এর মূল কারণকে চিহ্নিত করে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সাহস কেউই দেখাতে পারেননি সেই অর্থে। এর পিছনে কোথাও লুকিয়ে রয়েছে এক অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক অভিসন্ধি। অত্যাচার, উৎপীড়নের ফলে বাধ্য হয়ে নিজেদের শৈশব-কৈশোরের খেলাভূমি, চোদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে কপর্দকহীন হয়ে শুধুমাত্র বেঁচে থাকার তাগিদে অন্যত্র চলে আসাকে আবার অনেকে ‘সেফ জোন’-এ থেকে এবং মগজ ধোলাই তথা স্বার্থসিদ্ধির খাতিরে ‘পলায়ন’ বলে আখায়িত করতেও পিছপা হন না।    
আলোচ্য উপন্যাসে গ্রন্থকার ছুঁয়ে গেছেন সেই দিকটিকে অত্যন্ত সচেতনভাবে এবং খোলাখুলি। প্রেক্ষাপট ও নির্ভীক সংলাপের মাধ্যমে দেখিয়েছেন বাস্তব। কোদালকে কোদাল বলার সাহস দেখিয়েছেন এই ঔপন্যাসিক। এখানে কিছু উদ্ধৃতি অপ্রাসঙ্গিক হবে না বলেই মনে হয় - ‘দুটি দেশ ভাগ হবার পরও অনেক হিন্দুরা মাটি কামড়ে পড়ে থাকে ভিটে না ছেড়ে, ভারতে না এসে। কিন্তু ৫০ এর দাঙ্গার পর আর সাহস করেননি সমীরণ পালদের মতো বাঙালি হিন্দুরা। যদিও নেহরু-লিয়াকত চুক্তিতে বলা হল যে যেখানে সংখ্যালঘু সে সেখানে নিরাপদে থাকতে পারবে নিজ ধর্ম নিজ সংস্কৃতি পালন করতে পারবে। তবুও তো হিন্দুরা পারল না। কিন্তু মুসলমানরা পারল যারা দেশভাগের পর চলে গিয়েছিল তাদের মধ্যে অনেকেই ফিরে এল ভারতবর্ষে। শ্যামলকে কে বোঝাবে এসব কথা ? ও যে মতাদর্শে দীক্ষিত হচ্ছে তাতে সমীরণবাবুর মতো আরও অনেক উদ্‌বাস্তু মিলে চিৎকার করলেও বোঝাতে পারবেন না। শ্যামলরা বলবে ধর্মের জন্য, জাতের জন্য দেশত্যাগ কেন করতে গেলে ? পৃথিবীতে একমাত্র মানুষের পরিচয়ে বেঁচে থাকতে পারলে না... ?’
মূল কাহিনি গড়ে উঠেছে নায়ক রাজ-এর বাবা নরেশবাবুকে কেন্দ্র করে যিনি সপরিবারে দেশান্তরী হয়ে, উদ্‌বাস্তু হয়ে এসেছিলেন এদেশে। দুই পুত্র ও দুই কন্যা নিয়ে প্রায় নিরন্ন থেকে অশেষ কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে তাঁকে। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে অবৈধ ব্যাবসায়ে জড়িত হতে হয়েছে তাঁকে বেঁচে থাকার খাতিরে, সন্তানসন্ততি ও পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে। তবে শীঘ্রই আবার ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছেন আগের জীবনে। তাঁর বড় ছেলে, আলোচ্য উপন্যাসের নায়ক রাজ, যে প্রচণ্ড গরিবির মধ্যেও সাহিত্য ও আহৃত আদর্শকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে নিয়ে গেছে তার জীবনতরী সেটাই আলোচ্য উপন্যাসের মূল কাহিনি। কাহিনিরই সঙ্গে সাযুজ্য রেখে এসেছে প্রেম ভালোবাসা, সাহিত্য দুনিয়ার নানা খোঁজখবর। সাহিত্যকে আঁকড়ে ধরেই রাজের কলকাতা চলে যাওয়া এবং সেখানে জীবনে দ্বিতীয়বারের মতো ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া সব কিছুই এগিয়েছে তরতরিয়ে। তবে এই প্রেম এক ভিন্নতর আঙ্গিকের প্রেম যেখানে ভালোবাসার মর্যাদা রক্ষায় এক অচিরাচরিত পথে এগিয়েছে রাজের জীবনধারা। আগাগোড়া এক আদর্শের সংঘাত ও সেখান থেকে আদর্শকেই প্রাধান্য হিসেবে দেখিয়েছেন উপন্যাসকার।
যে কোনো বয়সের পাঠকের পাঠযোগ্য এই উপন্যাসটি একাধারে যেমন শিখিয়েছে এক গভীর প্রত্যয়ের মন্ত্র তেমনি শত প্রলোভন, শত প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে আদর্শকে জীবনের মূলমন্ত্র করে বেঁচে থাকা যায় তার সুনির্দিষ্ট উপায়। দুই প্রজন্মের দুই ভিন্ন ধারার সংগ্রামকথা আলোচ্য এই উপন্যাসটি। বুনোটে, সংলাপে জমজমাট উপন্যাসে শুরু ও শেষটাকেও উপন্যাসকার ধরে রেখেছেন উপযুক্ত নৈপুণ্যে, খেই না হারিয়ে। সেই অর্থে এক সুখপাঠ্য উপন্যাস।
‘লেখকের কথা’য় বলা হয়েছে এটি তাঁর প্রথম জীবনে লেখা একটি উপন্যাস। স্বভাবতই বহু আগে লেখা উপন্যাসকে এতগুলো বছর বাদে ছাপাতে গিয়ে একদিকে বানান ও অন্যদিকে ছাপা বিভ্রাট উপন্যাসের গরিমা কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ণ করেছে। প্রুফ রিডারের ব্যর্থতায় পুরো উপন্যাসে প্রায় প্রতিটি ‘কী’ই ‘কি’ হয়ে আছে। একটি উপন্যাসের ক্ষেত্রে যা নিতান্তই বেমানান। দায় এড়াতে পারেন না প্রকাশকও। এর বাইরে কাগজ ও ছাপার মান ভালোই। করিমগঞ্জের স্কলার পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত বোর্ড বাঁধাই উপন্যাসটির মানানসই প্রচ্ছদের সৌজন্যে ঔপন্যাসিক স্বয়ং। গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর পুত্র-কন্যা নীলকমল ও নীলাঞ্জনাকে। সব মিলিয়ে চেনা প্লটে অচেনা বয়ানের উপন্যাস ‘মাটির কাব্য’।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

মূল্য - ২০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩৫০৭৬০৬৯ 

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত স্মরণ সংখ্যা ‘আলোহাওয়া’

একটি লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটপত্রিকা হচ্ছে সমাজের সাহিত্যদর্পণ । শুধুই সমকালিক নয়। যুগান্তরের ভাষাসাহিত্য ও তার যুগন্ধর স্রষ্টাদের সঙ্গে সমকালকে পরিচিত করে দেওয়ার এক প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম। আর একের পর এক এই লক্ষ্যেই উৎকৃষ্টতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি শহর থেকে প্রকাশিত ‘ সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক ’ পত্রিকা ‘ আলোহাওয়া ’ । রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার ১৯তম সংখ্যা - ২৫তম বর্ষ , পৌষ ১৪৩২ - ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যা । কবি জিতেন্দ্র নাথ সম্পাদিত এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যিক ‘ তুষারকান্তি নাথ স্মরণ সংখ্যা ’ হিসেবে । তুষারকান্তি নাথ এমন একজন সাহিত্যিক যাঁকে আখ্যায়িত করা যায় একজন সার্বিক সাহিত্যিক হিসেবে। ধারে ও ভারে তাঁর সৃষ্টি শুধু বরাক উপত্যকাতেই নয় এর বাইরেও সমাদৃত। তাঁর লেখনী রত্নপ্রসবা। পক্ষান্তরে এটাও বলা যায় যে ঘরে বাইরে কিছু স্বীকৃতি , কিছু প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকলেও তাঁর লেখালেখি ও নানাবিধ সৃষ্টিকর্মের গভীরতার মূল্যায়ন যতটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল ততটা কিন্তু হয়নি। আসলে প্রান্তিকতা সততই লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের পরিচিতির পথে এক বৃহৎ অন্তরা...

প্রখর গরজ ও শ্রদ্ধায় নিবেদিত একটি ‘সুকান্ত সংখ্যা’ - শতদল

হাতে নিলে আর পাঁচটা নিয়মিত সংখ্যা পত্রিকার মতো মনে হলেও উত্তর ত্রিপুরার চুড়াইবাড়ী থেকে কবি, লেখক রতন চন্দ সম্পাদিত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ‘শতদল’ পত্রিকার সম্প্রতি প্রকাশিত ২৯তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, বৈশাখ ১৪৩৩, মে-২০২৬ (কবি সুকান্ত জন্মশতবর্ষ সংখ্যা) সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রমী। সেই মাত্র ৪২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক সংস্করণ হলেও প্রচ্ছদ থেকে শেষ পৃষ্ঠা অবধি যতন, গরজ ও উৎকর্ষের এক সম্ভার বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না মোটেও। বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র স্থান ধরে আছেন অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর সময়কাল থেকে আজ অবধি এবং আগত-অনাগত চিরকালীন এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী এই কবি মূলত একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেই সাহিত্যবিশ্বে পরিচিত হলেও তাঁর কবিতায় এর বাইরেও যে রয়ে গেছে বহুমাত্রিক এক বোধ, ভাষ্য - বোধ করি তার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি আজও। তবে যতই তাঁকে নিয়ে চর্চা হবে ততই এক এক করে খুলবে বিস্ময়ের ঝাঁপি এ কথা অনস্বীকার্য। এবং তারই এক নির্মোহ প্রয়াস ও প্রকাশ আলোচ্য সংখ্যাটি। সুসজ্জিত কবি-প্রতিকৃতিযুক্ত একটি নান্দনিক প্রচ্ছদ - সজ্জায়, বর্ণ সংস্থাপনে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য পাঠকের। সৌজন্যে মুদ...