‘এক বৃন্তে দুটি কুসুম’। সমন্বয়ের শ্রেষ্ঠ আঙ্গিক হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত একটি শব্দবন্ধ বা বাক্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে সবার মননে। তবে ভিন্ন বৃন্তের দুটি কুসুমও যে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে সমন্বয়ের বার্তা ছড়িয়ে দিতে সক্ষম এমন ভিন্ন চিন্তার উদ্রেক একজন শিল্পীর বাইরে কে আর করতে পারেন ? এমনই চমৎকার একটি চিন্তাসমন্বিত প্রচ্ছদেই উজান অসমের মার্ঘেরিটা থেকে প্রস্ফুটিত হল বাংলা সাহিত্য সভা, অসম-এর লিডু-মার্ঘেরিটা শাখার প্রথম মুখপত্র তথা সাহিত্য পত্রিকা ‘সমন্বয়’। বস্তুত এই প্রচ্ছদ অনেকটাই এগিয়ে নিয়ে গেছে সংখ্যাটিকে। সৌজন্যে কবি ও শিল্পী বিকাশ সরকার।
১৩৬ পৃষ্ঠার ত্রিভাষিক এই সংখ্যাটির সম্পাদক আরেক পোড় খাওয়া লেখক শান্তনু সরকার যিনি পেরিয়ে এসেছেন সমাজ-সাহিত্যের বহু ঘাত প্রতিঘাত এবং রাজ্যের প্রধান দুটি ভাষার সাহিত্য জগতে যাঁর সব্যসাচী ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রথম সংখ্যা হিসেবে দুই মলাটের ভিতরে যদিও রয়ে গেছে বহু ত্রুটি, বহু অপরিপক্কতার ছাপ তবু গরজ, প্রয়াস ও শ্রমের উপস্থিতিও সমানভাবেই প্রকট। লেখালেখির সম্ভারও কম নয়, বিশেষ করে প্রতিষ্ঠিত কবি সাহিত্যিকদের পাশাপাশি স্থানীয় কবি লেখকদের উপস্থিতি লিটল ম্যাগাজিনের ধর্ম বজায় রাখতে বহুলাংশে সার্থক হয়ে উঠেছে। এভাবেই কুঁড়ি থেকে ধাপে ধাপে মহিরুহে পর্যবসিত হয় এক একটি সৃষ্টি।
অবিন্যস্ত সূচিপত্রকে বিন্যস্ত করে এগোলে দেখা যায় কিছু মূল্যবান প্রবন্ধ সন্নিবিষ্ট হয়েছে সংখ্যাটিতে। স্থানীয় বিষয় সমন্বিত যে ক’টি নিবন্ধ রয়েছে তার মধ্যে আছে সম্পাদকের ‘মার্ঘেরিটার বাঙালি সমাজ’, অমিত দাসের ‘মার্ঘেরিটার সাংস্কৃতিক কাঠামো তৈরিতে বাঙালির অবদান’ ও মণিশংকর দাসের ‘Carmel, Cadbury & Club’. সবকটিই যথেষ্ট তথ্যপূর্ণ, সুলিখিত ও প্রাসঙ্গিক। বিভিন্ন বিষয়ের উপর ড. প্রশান্ত চক্রবর্তী, অমৃত বরঠাকুর, মাণিক পাল, ড. নীতিশ দাস, মালবিকা শর্মা, খগেনচন্দ্র দাস, প্রণয় ফুকন, সঞ্জয় গুপ্ত ও অনিন্দ্য বরগোহাঞির লেখা নিবন্ধ তত্ত্ব ও তথ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং একাধারে গুরুত্বপূর্ণ ও সুলিখিত। এর বাইরেও রয়েছে সংক্ষিপ্ত নিবন্ধ ও কিছু আত্মানুসন্ধানমূলক লেখা। লিখেছেন তীর্থঙ্কর দাশ পুরকায়স্থ, চিরঞ্জিৎ নন্দী, মণিদীপা বরঠাকুর শর্মা ও পূরবী চক্রবর্তী সূত। ভিন্ন স্বাদের তথা ভিন্ন মানের গল্প লিখেছেন সজল পাল, পূরবী চৌধুরী (দুটি অণুগল্প), সীমা পুরকায়স্থ, অনুরাজ দত্ত, দেবজিৎ দেবনাথ ও হিমাশিস ভট্টাচার্য।
কাবিতার ডালি নিয়ে রয়েছেন অর্জুন দাস, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, সীমা পাল, দীপশ্রী দাস সরকার, নীলিম কুমার, ড. রঞ্জিত দত্ত (অনুবাদ), দিব্যলতা দত্ত, বিজয় ঘোষ, চন্দ্রিমা দত্ত, সমরবিজয় চক্রবর্তী, অতীন দাস, সুতপা চক্রবর্তী ও বিকাশ সরকার। অমিতাভ দেব চৌধুরীর গদ্যাংশ ও অতুল চন্দ্র শর্মার অনুবাদ (গোধূলি বেলায়) বিশেষ রচনা হিসেবে উল্লেখ করা যায়। সুজাতা পাল দেবনাথ ও পার্থসারথি দত্তের সাদাকালো চিত্রশিল্প বৈচিত্র প্রদান করেছে বিষয়ের।
গদ্যে পদ্যে প্রত্যয়িত সম্পাদকীয়ের অক্ষরাকার (ফন্ট) থেকে শুরু করে সর্বত্র বানান ভুল ও ছাপার মান তথা বর্ণ সংস্থাপন ও অলংকরণের দৈন্য পত্রিকাটির মান ক্ষুণ্ণ করেছে। অন্যথা নামিদামি কবি লেখকদের উপস্থিতিতে সুখপাঠ্য হয়ে উঠতে পারত সংখ্যাটি। প্রথম প্রয়াসের এই জড়তা কাটিয়ে উঠে পরবর্তী সংখ্যাসমূহ উন্নত মানের হবে বলে প্রত্যাশা করা যেতেই পারে।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
‘সমন্বয়’ - সম্পাদক শান্তনু সরকার
প্রকাশক - বাংলা সাহিত্য সভা, লিডু মার্ঘেরিটা শাখা।
.jpg)
Comments
Post a Comment