ভিতরে যিনি বসে রয়েছেন তিনিই কি তাহলে ঈশ্বর? এমন একটা প্রশ্ন এই মুহূর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে প্রভাসের মাথায়। ঈশ্বরকে সে দেখেনি কোনোদিন। যাঁকে চোখে দেখেনি তাঁর কথা শুনে তাঁকে ভালোবাসতে কিংবা বিশ্বাস করার মতো এতটা বোকা কিংবা অন্ধ ভাবার মতো ছেলে নয় প্রভাস। বাবা ছিলেন মনে প্রাণে কম্যুনিস্ট। তাই বাস্তববাদী শিক্ষায় প্রভাস যথেষ্ট শিক্ষিত। অন্তত প্রভাস নিজে এমনটাই ভাবে। মাঝে মাঝে মায়ের ঈশ্বর বিশ্বাসের কথা সে শুনেছে বটে তবে এসবে কখনও পাত্তা দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে ভাবেনি বাপ-ব্যাটার কেউই। নিজেকে ধীরে ধীরে সংসারে মানিয়ে নিলেও প্রভাস যখন ছোট ছিল তখন প্রতিমা কিছুটা চেষ্টা করেছিলেন ছেলের ভিতরে ভক্তিভাবের সঞ্চার করতে। কিন্তু সুকান্তবাবুর রক্তচক্ষুকে অবজ্ঞা করার মতো এতটা সাহস তিনি সঞ্চয় করে উঠতে পারেননি বলে অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়েছিল সেই প্রচেষ্টা। এর পর থেকে স্বাভাবিক ছন্দেই বেড়ে উঠেছে প্রভাস, স্বাভাবিক নিয়মেই গড়ে উঠেছে সংসার - কোনও অদেখা ঈশ্বরের বিধানে বা নির্ঘণ্টে নয়।
###
ডা. নীলকণ্ঠ চক্রবর্তী শহরের নামি শল্যচিকিৎসক। এনকেসি স্যার নামেই সবার কাছে পরিচিত। লোকমুখে শোনা যায় রোগীর শরীরের এমন কোন অঙ্গ নেই যার অপারেশন করতে অক্ষম ডা. নীলকণ্ঠ চক্রবর্তী। তাছাড়া তাঁর অপারেশন ব্যর্থ হয়েছে এমন কথা অতি বড় মিথ্যুকও বলার সাহস করে উঠতে পারেনি আজও।
– ডক্টর, বাবা বাঁচবেন তো? - হাসপাতালের চেম্বারে ডাক্তারের মুখোমুখি বসে ব্যগ্র হয়ে প্রশ্ন করে প্রভাস।
– দেখুন, বাঁচা মরা তো ঈশ্বরের হাতে। তাঁর মর্জির বাইরে কেউ কি যেতে পারে? তবে আমি আশাবাদী। এখন বেশি দেরি করা যাবে না। আপনারা শিগগির ফর্মালিটিজ কমপ্লিট করে ফেলুন। নষ্ট করার মতো সময় বেশি হাতে নেই আর।
একজন ডাক্তারও এভাবে ঈশ্বরের মর্জি অনুযায়ী চলেন? এটা ঠিক পছন্দ হল না প্রভাসের। তবু এসব পছন্দ-অপছন্দের সময় এখন নেই ভেবেই আর বসে না থেকে প্রভাস ছুটে গেল মায়ের কাছে। বাবার - বলতে গেলে অর্ধমৃত দেহের সামনে অসহায় দৃষ্টি নিয়ে প্রভাসের ফেরার পথের দিকে প্রতিমার মতোই তাকিয়ে রয়েছিলেন প্রতিমা দেবী।
ততক্ষণে বাবার বেঁচে থাকার ব্যাপারে আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছে প্রভাস। এত বড় এক আকস্মিক দুর্ঘটনায় সুকান্তবাবুর মতো এমন শক্তপোক্ত মানুষটি যে লহমায় মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারেন তা মা-ছেলের কেউই যেন মেনে নিতে পারছেন না। এক লহমায় যেন পুরো ঘটনাটি প্রভাসের চোখের সামনে ভেসে উঠল ফের লোমহর্ষক সিনেমায় দেখার মতো।
সেদিন শেষ রাত থেকেই আকাশ জুড়ে গুড়গুড় আওয়াজ আর হালকা হাওয়ার দাপট। সকাল থেকেই ঝেঁপে নেমেছিল বৃষ্টি। তবু তার মধ্যেই পথে নেমেছিলেন সুকান্তবাবু। পার্টি অফিসে একটি জরুরি মিটিং ছিল ঠিক সকাল সাড়ে দশটায়। সুকান্তবাবু দলের একনিষ্ঠ নেতা হওয়ার সুবাদে অত্যন্ত সময়ানুবর্তী ছিলেন। নানা গুণে তিনি গুণান্বিত। তাই দলে একটা পরিচিতি আছে তাঁর। পার্টি অফিসের পথ গেছে বটতলা বাজারের দিকেই। সুতরাং প্রভাসকে যখন যেতেই হবে একবার বাজারের দিকে - মায়ের টুকটাক সামগ্রীর ফর্দ দেখে এসব কিনতে, তাই একসাথেই বেরিয়েছিলেন দুজন। দুজনের হাতেই ছাতা ছিল। অন্যথা ভিজে একশা হওয়ার থেকে আর রক্ষা ছিল না। গলিতে ততক্ষণে জল জমতে শুরু হয়েছে। মূল রাস্তা কিছুটা উঁচুতে থাকায় প্রায়শ এমনটা হয়। গলি যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে এসে মূল রাস্তায় ওঠার মুহূর্তেই প্রচণ্ড বেগে একটি ভ্যানগাড়ি এসে পিচ্ছিল রাস্তায় আর বেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে সুকান্তবাবুকে ধাক্কা দিয়ে ছিটকে বেরিয়ে গেল নিমেষে। প্রভাস পিছন থেকে অসহায়ের মতো দেখা ছাড়া কিছুই করতে পারল না। সুকান্তবাবু গিয়ে পড়লেন কংক্রিটের সাইড ডিভাইডারে। না, কোনো রক্তপাত হয়নি। তবে সঙ্গে সঙ্গেই জ্ঞান হারালেন তিনি। ইতিমধ্যেই লোকজন ভিড় জমিয়েছে ঘটনাস্থলে। নানাজনের নানা মন্তব্য ভেসে আসতে লাগল প্রভাসের কানে। কিন্তু সেসবে পাত্তা না দিয়ে তৎক্ষণাৎ সুকান্তবাবুকে ধরে একটি অটো-রিকশাতে উঠিয়ে সোজা চলে এল হাসপাতালে।
###
যথাশীঘ্র সব ধরনের লেখাপড়ার কাজ শেষ করে ফেলেছে প্রভাস। রোগীকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অপারেশন কক্ষে। প্রতিমা অপারেশন কক্ষের বাইরে বসে অনবরত বিড়বিড় করে মন্ত্র আওড়াচ্ছেন। আর খানিক পরপরই শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে নিচ্ছেন সিক্ত চোখের কোণদুটি। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে প্রভাস। তার বুকের ভেতর এক তীব্র আলোড়ন।
শহরের এক প্রান্তে একটি নাতি উচ্চ পাহাড়ের গায়ে ছবির মতো গড়ে উঠেছে এই অত্যাধুনিক সুবিধাযুক্ত হাসপাতাল। বাবার অ্যাক্সিডেন্টের পর এর বাইরে আর অন্য কোনওখানে নিয়ে যাওয়ার কথা মনে হয়নি প্রভাসের। তড়িঘড়ি অটো করে সটান তাই এখানেই চলে এসেছে। মূল রাস্তা থেকে উপরে ওঠার পথে প্রভাস লক্ষ করেছে দুপাশে অসংখ্য ফুলের গাছ। এই কদিনেই গাছগুলো বড় হয়ে তাতে ফুলও ধরেছে দেদার। গোলাপ, জবা, টগর, নীল অপরাজিতা...। ইমার্জেন্সি বিভাগের দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলেই ডান দিকে নীলকণ্ঠ শিবের মূর্তি। সামনে প্রজ্বলিত ধূপ-দীপ।
এবার অপারেশন কক্ষের বাইরেই প্রভাস লক্ষ করল ভগবান শিব-শংকরের আরও একটি মূর্তি আছে। সেদিকে চোখ গেল প্রভাসের। হাসপাতালেও ঈশ্বর? ভাবে প্রভাস। ধর্ম ও বিজ্ঞানের বিরোধের কথাই শুনে এসেছে চিরটা কাল। আজ এভাবে সহাবস্থান দেখে বিচলিত বোধ করে সে। কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে সব। মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখল প্রতিমা একদৃষ্টিতে সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন। হাতদুটো জোড় করে আছেন অপলক। মনে পড়ে গেল প্রভাসের - একদিন, সে যখন অনেকটাই ছোট ছিল তখন বাবা আচ্ছা করে বকেছিলেন মাকে -
– তোমাকে আগেই বলেছি এসব ঠাকুর দেবতার ছবিটবি এনে ঘর নোংরা করো না। আমি এসব একেবারেই পছন্দ করি না।
– জানি তো। কিন্তু আমি যে অসহায়। আমার আজন্মলালিত সংস্কার কী করে একেবারেই জলাঞ্জলি দিই বলো তো? - জবাবে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন মাও।
– তোমার যা খুশি করো, তবে আমার চোখে যেন এসব না পড়ে। এসব সংস্কার নয়, কুসংস্কার। এর বিরুদ্ধেই আমার আজন্ম লড়াই। সে তো তুমি ভালো করেই জানো।
চুপ থেকেছিলেন মা। এরপর মাকে আর দেখেনি প্রভাস এমন করতে। তাহলে কি মা একেবারেই ছেড়ে দিয়েছিলেন এসব? - ভাবে প্রভাস।
এই মুহূর্তে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছেন বাবা। মায়ের চোখে মুখে শঙ্কার পাশাপাশি এক স্বর্গীয় প্রভা প্রত্যক্ষ করে প্রভাস। এর আগে এমন আর কখনও দেখেছে বলে তার মনে হচ্ছে না। মা যেন এখন এক অন্য জগতে অবস্থান করছেন। যেখানে আকুল প্রার্থনার বাইরে আর কিছু নেই। আর সেই প্রার্থনার জেরেই কি মায়ের এমন মুখচ্ছবি? একুশের তরতাজা সাহসী ঘোর বাস্তববাদী প্রভাস আসলে কোনোদিনই সেভাবে তাকায়নি মায়ের মুখপানে। মাকে জড়িয়ে ধরে বলে -
– চিন্তা করো না মা, ডা. নীলকণ্ঠ আছেন। বাবার কিচ্ছু হবে না। ভালো হবেন তিনি।
ভেতরে ভেতরে যেন ক্রমশ ভেঙে পড়ছে প্রভাস। বাবার সেরকম কিছু হলে কী হবে অতঃপর ? আন্দোলন, প্রতিবাদ, মিছিল, কমরেড, লাল সেলাম এসবের বাইরে বাবার মুখ থেকে বিশেষ কিছুই শোনেনি সে। সংসার চলেছে যেমন তেমন করে, দুবেলা দুমুঠো ভাত জুটেছে ঠিকই কিন্তু সংসারের বাস্তব চিত্র যে কী তা সে দেখেনি কখনও। আজ বড় অসহায় লাগছে নিজেকে। অথচ মায়ের চেহারায় প্রভাস যেন দেখতে পাচ্ছে এক প্রত্যয়ের ছবি। ভেবে পায় না কোথা থেকে আসে এই প্রত্যয়। চমকে ওঠে সহসা। তবে কি অলক্ষে থাকা মায়ের সেই ঈশ্বরই এর নেপথ্যে ? ভাবনায় এক অদম্য দোটানা এসে আচ্ছন্ন করে ফেলে প্রভাসের অন্তর্জগৎ। দেখতে কেমন মায়ের সেই ঈশ্বর ? পুজোমণ্ডপের সেইসব ঠাকুর দেবতাদের মতো ? এসব তো নিছক পৌত্তলিকতা। অন্তত এমন শিক্ষাই তো চিরদিন সে পেয়ে এসেছে বাবার থেকে। উথালপাতাল চিন্তায় আচ্ছন্নতার মধ্যেই হঠাৎ করে সামনে থাকা অপারেশন কক্ষের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন ডা. এনকেসি।
– অপারেশন সাকসেসফুল। প্রভাসের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখ করে বললেন ডাক্তার। প্রভাস কোন মন্ত্রবলে যেন উঠে দাঁড়িয়েছে পুতুলের মতো। মাও দাঁড়িয়ে আছেন।
– বিপদ আপাতত কেটে গেছে। তবে এখান থেকে ছাড়া পেতে দিন তিনেক লাগবে। এখন আইসিইউতে আছেন তিনি। বিকেলে আপনারা গিয়ে দেখা করতে পারবেন.... ডাক্তার কথা বলছেন - প্রভাস যেন ঘোরের মধ্যে। তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে মুগ্ধ হয়ে। ডাক্তারের চোখ মুখ থেকে শুরু করে আস্ত অবয়ব যেন এক অলীক অপরূপ জ্যোতির্ময় আভায় পরিপূর্ণ হয়ে একই আদলের এক তৃতীয় মূর্তির রূপ পরিগ্রহ করেছে। পৃথিবীর যাবতীয় বাস্তব অবাস্তব সবকিছু একাকার হয়ে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে প্রভাসকে।
মায়ের ডাকে আচমকা যেন সুদূর এক অপার্থিব জগৎ থেকে বাস্তবের মাটিতে নেমে আসে প্রভাস।
– শুনেছিস ? তোর বাবা সুস্থ হয়ে যাবেন। গলা ধরে আসে প্রতিমার। প্রভাস জড়িয়ে ধরে মাকে। আনন্দে, বিস্ময়ে।
– হ্যাঁ মা। তুমি ঠিকই বলতে। ঈশ্বর আছেন। আমি আজ, এইমাত্র ঈশ্বরকে দেখলাম।
চমকে ওঠেন প্রতিমা। অবাক হয়ে তাকান ছেলের দিকে। পরমুহূর্তেই প্রতিমা দেবী দেখলেন এক ছুটে বেরিয়ে গেল প্রভাস হাসপাতালের বাইরে। প্রতিমা দেবী কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন প্রভাসের যাওয়ার দিকে।
কয়েক মুহূর্ত। হাঁপাতে হাঁপাতে হাতে করে একগুচ্ছ নীলকণ্ঠ ফুল নিয়ে ফেরে প্রভাস। একে একে ইমার্জেন্সির সামনে ও অপারেশন কক্ষের বাইরে থাকা নীলকণ্ঠ শিবের মূর্তির সামনে সেগুলো অর্পণ করে হাত জোড় করে প্রণতি জানায়। প্রতিমা দেবীর দুই চোখ বেয়ে তখন হৃদয়ের যাবতীয় উচাটন ঝরে ঝরে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুজলের ধারা হয়ে। আর ইতিমধ্যে খবর পেয়ে সুকান্তবাবুর পার্টি অফিস থেকে আসা উপস্থিত ছেলেগুলো অবাক হয়ে লক্ষ করতে থাকে প্রভাসের কার্যকলাপ!
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

Comments
Post a Comment