২০২১-এর জুনে প্রথম প্রকাশ। নাম ছিল ‘শব্দ’। একই নামে অন্য পত্রিকা থাকায় পরবর্তীতে ‘শব্দ নিরন্তর’ নামে প্রকাশিত হতে থাকে পত্রিকাটি। ক্রমে অনেক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নিরন্তর প্রকাশিত হতে হতে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে পত্রিকার ৫০তম সংখ্যা, জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, জুন ২০২৬, বর্ষ ৬, সংখ্যা ১। আগে মাসিক ছিল যদিও ৫০তম সংখ্যা থেকে এটি চতুর্মাসিক হিসেবে প্রকাশিত হবে বলেও সম্পাদক জানিয়েছেন তাঁর সম্পাদকীয়তে। অকপট সম্পাদকীয়তে রয়েছে ছোট থেকে বড় হওয়ার বৃত্তান্ত। রয়েছে পরিবর্তনের পটকথা, গরজ ও প্রত্যয়ের কথা। কিছু উদ্ধৃতি হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না - ‘...পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যায় আমি বলেছিলাম এটি মূলত একটি কবিতা পত্রিকা এবং আয়তনে নিতান্তই ছোট। তবে মাঝেমধ্যে এতে গল্প, প্রবন্ধ এবং সাহিত্যের অন্যান্য দিকও ছাপা হবে আর প্রতি মাসে একটি করে সংখ্যা বেরোবে। এটাই ছিল পত্রিকাটির প্রাথমিক সংকল্প। মাঝেমধ্যে ব্যত্যয় যে হয়নি তা নয় তবে প্রতিমাসে নিয়মিত প্রকাশ করার জন্য আমাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ছিল। এভাবেই ৪৯তম সংখ্যা পেরিয়ে এটি তাঁর ৫০তম সংখ্যা... ‘শব্দ নিরন্তর’ এখন থেকে আর শুধু কবিতা পত্রিকা হয়ে রইল না। সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার পরিচয় বহন করবে পত্রিকাটি এটাই আপাতত সিদ্ধান্ত...।’
প্রথমেই বলতে হয় পত্রিকাটির অনন্য প্রচ্ছদের কথা, যা পাঠকের পাঠতৃষ্ণা জাগিয়ে তোলার সহায়ক। সম্পাদকের স্বকৃত এই প্রচ্ছদ একাধারে নান্দনিক ও প্রাসঙ্গিক। ১৬০ পৃষ্ঠার এই বিশেষ সংখ্যায় রয়েছে মূলত এই অঞ্চলের কবি-লেখকদের একগুচ্ছ রচনা। নানা আঙ্গিকের, নানা স্বাদের। প্রথমেই রয়েছে গল্প বিভাগ। মোট ১২টি গল্পে সেজে উঠেছে এই বিভাগ। কিছু অসাধারণ গল্প, কিছু ভিন্নমাত্রিক, ভিন্ন স্বাদের। সব গল্পের ভিতরকথার উল্লেখ পরিসরে কুলোবে না। তবে বলতেই হয় পত্রিকার সবচাইতে সমৃদ্ধ একটি বিভাগ। যাঁরা লিখেছেন তাঁরা হলেন - রবীন বসু, গৌতম বাড়ই, চিরশ্রী দেবনাথ, সুকান্ত পাল, রূপরাজ ভট্টাচার্য, ঋতা চন্দ, মানিক চক্রবর্তী, শর্মিলী দেব কানুনগো, সৌম্যকান্তি ভট্টাচার্য, কাশ্যপজ্যোতি ভট্টাচার্য, বাপ্পি নীহার ও দেবযানী চৌধুরী। গৌতম, চিরশ্রী ও সুকান্তের গল্পকে বড়গল্প হিসেবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে।
কবিতা বিভাগেও স্বভাবতই নানা আঙ্গিকের কবিতার সন্নিবেশ। লিখেছেন - দিব্যেন্দু ভট্টাচার্য, ভক্ত সিং, সুব্রত পুরকায়স্থ, অমিতাভ সেনগুপ্ত, শান্তনু গঙ্গারিডি, রাজেশ শর্মা, পিঙ্কু চন্দ, শতদল আচার্য, আশুতোষ দাস, নীলাদ্রি ভট্টাচার্য, জিতেন্দ্র নাথ, কিরণ দেবী, রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ, মধুমিতা ভট্টাচার্য, দেবারতি দে, নিরুপম শর্মা চৌধুরী, শিপ্রা শর্মা মহন্ত, অনন্যা ভট্টাচার্য, আশিসরঞ্জন নাথ, তীর্থঙ্কর চক্রবর্তী ও দেবদত্ত চক্রবর্তী। প্রতিষ্ঠিত কবিদের পাশাপাশি সব বহুল পরিচিত কবিদের উপস্থিতি। স্বভাবতই একটি জমজমাট বিভাগ। মায়াময় কবিতা, মোহনীয় শব্দেরা এসে ভিড় করেছে পৃষ্টাভ্যন্তরে। তবে অপেক্ষাকৃত নবীন কিছু কবির কবিতার পঙ্ক্তিবিন্যাস হয়তো আরও একটু গোছালো হতে পারত। কারণ পঙ্ক্তির সহজপাঠ বিন্যাসের উপর বহুলাংশে নির্ভরশীল।
দুটি আলাদা বিভাগ - ‘একটি ভৌতিক কাহিনি’ এবং ‘অণুগল্প’ রয়েছে কবিতার পর। গল্প বিভাগের পরই দেওয়া যেত তবে মাঝে কবিতার সন্নিবেশ পাঠবৈচিত্র নিশ্চিতই প্রদান করবে পাঠকমানসে। ভৌতিক গল্প লিখেছেন হিমু লস্কর। এই গল্পকার বহুদিন ধরেই এ জাতীয় গল্প লিখছেন। ‘আগন্তুক’ গল্পে হয়তো তিনি ছাড়িয়ে গেছেন পূর্বের সব গল্পকে। জমাট বিষয়ের উপর একটি উৎকৃষ্ট গল্প। ভাষা, বুনোট, সংলাপে পরিপুষ্ট একটি উপভোগ্য গল্প। অণুগল্প লিখেছেন শঙ্কু চক্রবর্তী, সত্যজিৎ নাথ, বিজয়িনী ভট্টাচার্য, শর্মিলা দত্ত ও বিশ্বরাজ ভট্টাচার্য। বৈচিত্র এখানেও তবে সত্যজিৎ ও বিশ্বরাজ নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী।
ব্যতিক্রমীভাবে প্রবন্ধ রয়েছে সব শেষে। এই বিভাগে রয়েছে মোট তিনটি রচনা। অতীন দাস লিখেছেন ‘একুশের উত্তরাধিকার : ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ আজ প্রত্যাহ্বানের মুখে’। তথ্যভিত্তিক একটি নির্মোহ আলোচনা। মীনাক্ষি চক্রবর্তী সোম-এর ১০ পৃষ্ঠাব্যাপী নিবন্ধ ‘রবীন্দ্র ছোটোগল্পে ব্যতিক্রমী নারী’ একটি বিস্তৃত অধ্যয়নসঞ্জাত রচনা। অনেকটাই গভীরে যেতে সক্ষম হয়েছেন লেখক। ‘বাংলা ভাষা ও বরাকের বাঙালি’ নিবন্ধটি লিখেছেন সুশান্ত মোহন চট্টোপাধ্যায়। সেকাল থেকে একালের তথ্য ও তত্ত্বে অনেকটাই ঋদ্ধ একটি লেখা। শেষ সংযোজন হিসেবে রয়েছে উপত্যকার কবি ছন্দা দামের সদ্য প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘পিদিম শিখার আলো’র উপর বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর একটি আলোচনা।
সব মিলিয়ে এক বৈচিত্রময় সম্ভার নিঃসন্দেহে। ছাপা ও কাগজের মান চলনসই। বানানবিভ্রাট রয়ে গেছে বেশ কিছু এমনকী লেখার শিরোনামেও। সম্পাদকীয়তে রচনাসংখ্যার উল্লেখে ও সূচিপত্রের পৃষ্ঠাসংখ্যায় গোল রয়েছে, হয়তো অনবধানতায়। তবু সব কিছু ছাপিয়ে বাংলা সাহিত্যের এই ভুবনে বিষয়ে, বিস্তৃতিতে, নান্দনিকতায় এক ব্যতিক্রমী প্রত্যয় হয়েই সংগ্রহের তালিকায় জায়গা করে নিতে সক্ষম আলোচ্য ৫০তম সংখ্যাটি।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
‘শব্দ নিরন্তর’ ৫০তম সংখ্যাসম্পাদক - বাপ্পি নীহার
প্রকাশক - শব্দ নিরন্তর প্রকাশনী
মূল্য - ২০০ টাকা, যোগাযোগ - ৯৪৩৫১৭৯৩৯৮

Comments
Post a Comment